icon

এক বিদ্যালয়, পাঁচ জাতীয় ফুটবলার: মগাছড়ির প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমার গল্প

Jumjournal

Published on Nov 8th, 2026 icon 0

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, সংবাদমাধ্যমে যার নাম লেখা হয় মগাছড়ি বা মঘাছড়ি। বীরসেন চাকমা ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। 2011 সালে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল শুরু হলে তিনি পাহাড়ের নানা জায়গা থেকে মেয়েদের খুঁজে এনে নিজের বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। সেই দল থেকে পাঁচজন পরে জাতীয় দলে খেলেছেন: ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, রূপনা চাকমা, আনাই মগিনি ও আনুচিং মগিনি।

পাঁচজনই 2022 সালের সাফজয়ী দলে ছিলেন। কোনো কোনো প্রতিবেদন বীরসেনের হাতে খুঁজে পাওয়া খেলোয়াড় হিসেবে তিনজনের নাম বলে, কোনোটি পাঁচজনের। কে কবে, কোন পথে এই বিদ্যালয়ে এলেন, খরচ কে জোগালেন, আর বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে দলটি কী ফল করেছিল—নিচে প্রতিটি দাবি উৎসের নামসহ দেওয়া হলো। যেখানে উৎসগুলো একমত নয়, সেখানে দুটোই রাখা হয়েছে।

এই লেখা একটি বিদ্যালয় আর একজন শিক্ষকের গল্প। খেলোয়াড়দের পূর্ণ জীবনী আছে আলাদা লেখায়: ঋতুপর্ণা চাকমার জীবনী, গোল ও পুরস্কার, গোলরক্ষক রূপনা চাকমার পথচলা এবং মনিকা চাকমা ও ফিফার আলোচিত গোল। সাফজয়ী দলের সব পাহাড়ি খেলোয়াড়ের গ্রাম ও টুর্নামেন্টভিত্তিক হিসাব আছে সাফজয়ী নারী দলে পাহাড়ের মেয়েদের তালিকায়।

সূচিপত্র

  1. বীরসেন চাকমা কে, কোন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন
  2. মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কোথায়, নামের বানান কেন এত রকম
  3. বঙ্গমাতা গোল্ডকাপে মগাছড়ির ফল
  4. খেলোয়াড় খোঁজার পদ্ধতি
  5. কোন পাঁচজন জাতীয় ফুটবলার
  6. ঋতুপর্ণা চাকমা
  7. মনিকা চাকমা
  8. রূপনা চাকমা
  9. আনাই ও আনুচিং মগিনি
  10. খরচ কে দিত
  11. কোচ কারা ছিলেন
  12. প্রাথমিক থেকে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়
  13. সাফ জয়ের পর
  14. উৎসভেদে অমিল
  15. প্রশ্নোত্তর
  16. যা এখনো জানা যায়নি
  17. তথ্যসূত্র

বীরসেন চাকমা কে, আর তিনি কোন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন?

বীরসেন চাকমা রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। প্রথম আলো তাঁকে বলেছে বিদ্যালয়ের “তৎকালীন প্রধান শিক্ষক”, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম 2024 সালে বলেছে “সাবেক প্রধান শিক্ষক”। ঢাকা ট্রিবিউনের 2022 সালের প্রতিবেদনে তাঁর বয়স 59 বছর, আর তিনি নিজেই জানান এক মাস পরে অবসরে যাচ্ছেন।

ঢাকা ট্রিবিউনের সেই প্রতিবেদন (7 অক্টোবর 2022) তাঁকে বর্ণনা করেছে ফুটবলের প্রতি গভীর টানওয়ালা একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। নিজে তিনি কখনো ফুটবল খেলেননি, এ কথাও একই প্রতিবেদনে আছে। তাঁর ভাষায় (ইংরেজি থেকে অনুবাদ): “আমি কখনো ফুটবল খেলিনি, কিন্তু খেলাধুলার প্রতি আমার দুর্বলতা আছে।”

ঋতুপর্ণা চাকমার সঙ্গে বীরসেন চাকমা আত্মীয়তার সূত্রে কাকা-ভাতিজি, দুজনের বাড়িও কাছাকাছি—প্রথম আলো (8 মার্চ 2025) এ কথা লিখেছে। ঢাকা ট্রিবিউন (4 জুলাই 2025) তাঁকে বলেছে ঋতুপর্ণার “paternal uncle”। ঢাকা ট্রিবিউনের 2022 সালের প্রতিবেদনে বীরসেন নিজে বলেন, ঋতুপর্ণা তাঁর “ঘনিষ্ঠ আত্মীয়”।

নামের বানান উৎসভেদে আলাদা। প্রথম আলো, ইত্তেফাক ও বিডিনিউজ লেখে “বীরসেন চাকমা”; প্রথম আলোর 2026 সালের একটি প্রতিবেদন লেখে “বীর সেন চাকমা”। ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে আছে Bir Sen, Birsen, Biro Sen ও Birasen। এই লেখায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রূপ “বীরসেন চাকমা” রাখা হয়েছে।

মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কোথায়, আর নামের বানান কেন এত রকম?

বিদ্যালয়টি রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে। প্রথম আলো (16 জানুয়ারি 2023) লিখেছে “ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়”। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, মগাছড়ি থেকে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় প্রায় দুই মাইল দূরে, আর মগাছড়িতে অনুশীলনের মাঠ ছিল না; মাঠ ছিল ঘাগড়ায়।

মগাছড়ি একটি গ্রামের নামও। প্রথম আলো (20 সেপ্টেম্বর 2022) লিখেছে, ঋতুপর্ণা চাকমার বাড়ি “কাউখালীর ঘাগড়া ইউনিয়নে মগাছড়ি গ্রামে”। হিল ভয়েস (24 সেপ্টেম্বর 2022) একই জায়গাকে লিখেছে Moghachari village, Ghagra union। ঢাকা ট্রিবিউন (29 সেপ্টেম্বর 2022) জানায়, সাফ জয়ের পর পাঁচ খেলোয়াড় রাত 8টায় ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়ি এলাকায় পৌঁছালে তাঁদের মালা দিয়ে বরণ করা হয়।

বীরসেন চাকমা যে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন, সেই ঘাগড়া ইউনিয়নসহ কাউখালী উপজেলার মৌজা মানচিত্রের অংশ
কাউখালী উপজেলার মৌজা জিওকোড মানচিত্রের উপরের অংশ। কমলা রঙের এলাকাটি 57-ঘাগড়া ইউনিয়ন; মগাছড়ি এই ইউনিয়নের ভেতরে, তবে মানচিত্রে গ্রামের নাম আলাদা করে দেখানো নেই। ছবি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, Small Area Atlas of Bangladesh – Rangamati Zila · সরকারি নথি (উইকিমিডিয়া কমন্স)

বিদ্যালয়ের নাম বাংলায় অন্তত দুই রকম লেখা হয়। ইংরেজিতে রূপ আরও বেশি। নিচের ছকে কোন উৎস কোন বানান লিখেছে, তা দেওয়া হলো।

বানানউৎস ও তারিখ
মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়প্রথম আলো, 16 জানুয়ারি 2023; 15 নভেম্বর 2024; 8 মার্চ 2025
মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ইত্তেফাক, 29 সেপ্টেম্বর 2022; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, 23 নভেম্বর 2024; প্রথম আলো, 27 জুন 2026
Mogachhari primary schoolঢাকা ট্রিবিউন, 7 অক্টোবর 2022 ও 4 ডিসেম্বর 2024
Maghachari / Maghachari Primary Schoolঢাকা ট্রিবিউন, 13 এপ্রিল 2019; হিল ভয়েস, 24 সেপ্টেম্বর 2022
Moghachhari Government Primary Schoolদ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, 1 জানুয়ারি 2012
Mogachari Govt Primary Schoolদ্য ডেইলি স্টার, 2 মার্চ 2014
Mogai Chhari Government Primary Schoolবাংলাদেশ পোস্ট, 11 নভেম্বর 2024

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকায় বিদ্যালয়টির সরকারি বানান কী, তা কোনো উন্মুক্ত উৎসে পাওয়া যায়নি। বাংলা সংবাদপত্রে “মগাছড়ি” বানানটিই বেশিবার এসেছে, তাই এই লেখায় সেটি রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের মানচিত্রে গাঢ় লাল রঙে চিহ্নিত কাউখালী উপজেলা, পাশে হালকা লাল রঙে রাঙামাটি জেলা
চট্টগ্রাম বিভাগে কাউখালী উপজেলার অবস্থান (গাঢ় লাল); হালকা লাল অংশ রাঙামাটি জেলার বাকি উপজেলা। ছবি: C1MM · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ কী, আর মগাছড়ির মেয়েরা সেখানে কী ফল করেছিল?

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট মেয়েদের জাতীয় স্কুল প্রতিযোগিতা, শুরু 2011 সালে। মগাছড়ির মেয়েরা 2011 সালের আসরে চট্টগ্রাম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়। জাতীয় শিরোপার বছর নিয়ে উৎসগুলো এক নয়: কেউ বলে 2011, কেউ 2012। 2013 সালের আসরে দলটি জাতীয় রানার্সআপ।

ঢাকা ট্রিবিউন (4 জানুয়ারি 2018) লিখেছে, টুর্নামেন্টটির আয়োজক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিবছর প্রায় 64,000 বিদ্যালয়ের দশ লাখের বেশি মেয়ে এতে খেলে। ইউএনবির একটি প্রতিবেদনে প্রথম আসর সম্পর্কে বলা হয়েছে, 60,000-এর বেশি বিদ্যালয়ের দশ লাখের বেশি ছাত্রী অংশ নিয়েছিল। বাফুফের নারী কমিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, এই টুর্নামেন্ট সারা দেশে মেয়েদের ফুটবল নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছে।

মগাছড়ির ফল নিয়ে যত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, সেগুলো সাল ধরে নিচে সাজানো হলো।

আসরফলউৎস
2011, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্ব (ফাইনাল 30 ডিসেম্বর 2011, এম এ আজিজ স্টেডিয়াম)মগাছড়ি চ্যাম্পিয়ন; রানার্সআপ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আটলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, 1 জানুয়ারি 2012
2011, জাতীয় পর্বমগাছড়ি চ্যাম্পিয়নপ্রথম আলো, 16 জানুয়ারি 2023, 15 নভেম্বর 2024 ও 8 মার্চ 2025; ঢাকা ট্রিবিউন, 7 অক্টোবর 2022 (“প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন”); হিল ভয়েস, 24 সেপ্টেম্বর 2022
2012“জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন”প্রথম আলো, 27 জুন 2026
2013 (তৃতীয় আসর; ফাইনাল প্রতিবেদন 2 মার্চ 2014)জাতীয় রানার্সআপ; ফাইনালে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে 4-1 গোলে হার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামেদ্য ডেইলি স্টার, 2 মার্চ 2014; ঢাকা ট্রিবিউন, 7 অক্টোবর 2022; ঢাকা ট্রিবিউন, 13 এপ্রিল 2019

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে মগাছড়ির ফাইনাল জয়ের বাক্যটিতে প্রতিযোগিতার নাম লেখা “Bangabandhu Gold Cup”। একই প্রতিবেদনের পরের অনুচ্ছেদে কুমিল্লার রাজমঙ্গলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের চ্যাম্পিয়ন বলা হয়েছে। মগাছড়ির সেরা খেলোয়াড় হিসেবে যাঁর নাম এসেছে, তিনি একজন মেয়ে। প্রতিবেদনের শিরোনাম বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা—দুই টুর্নামেন্টের বিভাগীয় পর্বের সমাপ্তি নিয়ে।

“2011 না 2012” প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, প্রথম আসরের বিভাগীয় ফাইনালই হয় 2011 সালের 30 ডিসেম্বর, ফলে জাতীয় ফাইনাল পরের বছরে গড়ায়। তবে প্রথম আসরের জাতীয় ফাইনালের তারিখ ও ফল জানানো কোনো সমসাময়িক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তাই সালটি দুই রকমই রাখা হলো।

ঋতুপর্ণা চাকমা সম্পর্কে প্রথম আলো (8 মার্চ 2025) লিখেছে: “২০১১ সালে বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় মগাছড়ি স্কুল আর ঋতুপর্ণার সময় হয় রানার্সআপ।” উইকিপিডিয়ার ইংরেজি নিবন্ধ জানায়, ঋতুপর্ণা 2013 সালে দশ বছর বয়সে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে বিদ্যালয়ের হয়ে খেলেন। ঢাকা ট্রিবিউন ও ডেইলি স্টার মিলিয়ে দেখা যায়, 2013 সালের আসরেই মগাছড়ি জাতীয় রানার্সআপ।

বীরসেন চাকমা কীভাবে পাহাড় ঘুরে খেলোয়াড় খুঁজতেন?

বীরসেন চাকমা 2011 সালে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্বের খেলা দেখতে পার্বত্য চট্টগ্রামের নানা জায়গায় যেতেন। প্রতিভাবান মেয়েদের দেখলে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে দেখা করে নিজের বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে রাজি করাতেন। ঢাকা ট্রিবিউন লিখেছে, এর পুরো খরচ তিনি নিজে বহন করেন।

তাঁর নিজের বর্ণনা (ঢাকা ট্রিবিউন, 7 অক্টোবর 2022, ইংরেজি থেকে অনুবাদ): “আমি উপজেলা, জেলা আর বিভাগীয় পর্বের খেলা দেখতাম, প্রতিভাবান খুদে ফুটবলার খুঁজতাম। ভেবেছিলাম, ওদের এক জায়গায় আনতে পারলে ওরা আসল সামর্থ্য দেখাতে পারবে।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিভাবকদের কাছে যাওয়ার আগে তিনি সংশ্লিষ্ট লোকজনের সঙ্গে কথা বলে নিতেন।

প্রথম আলোর 27 জুন 2026 সালের প্রতিবেদনে গল্পটির আরেক দিক আছে। সেখানে বলা হয়েছে, বীর সেন চাকমা একদিন কোচ শান্তিমনি চাকমাকে ডেকে বলেন, “একটা বালিকা ফুটবল দল গড়ে তোল।” এরপর দুজনে পার্বত্য জেলাগুলোর পাড়া-মহল্লা ঘুরে মেয়ে ফুটবলার খুঁজতে থাকেন। অনেক অভিভাবক রাজি হননি। প্রতিবেদনের ভাষায়, 2011 সালের দিকে মেয়েরা ফুটবল খেলবে—এই ধারণাই অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল।

শেষ পর্যন্ত 17 জন মেয়েকে পাওয়া যায়। তাদের থাকার ব্যবস্থা হয় ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের একটি পরিত্যক্ত ভবনে, সকাল-বিকেল অনুশীলন চলে। ঢাকা ট্রিবিউনে শান্তিমনি চাকমা একই সংখ্যার কথা বলেন: ভবনটি মেরামত করে 17 জন মেয়েকে রাখা হয়েছিল, সবাই এক কক্ষে, পাশে একটি রান্নাঘর।

এলাকার লোকজনের কটু কথাও শুনতে হয়েছে। বীরসেন চাকমা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন (অনুবাদ): “অনেকে অনেক কথা বলেছে। জিজ্ঞেস করেছে, মেয়েরা কেন ফুটবল খেলবে।” মানুষকে দেখাতে যে মেয়েরাও ফুটবল খেলতে পারে, তাঁরা মাঝেমধ্যে লিনা নামের একজনকে মাঠে নিয়ে আসতেন—প্রতিবেদনে শুধু এই নামটুকুই আছে, পুরো পরিচয় নেই।

রাঙামাটিতে মেয়েদের ফুটবল তখন একেবারে নতুনও ছিল না। ঢাকা ট্রিবিউন লিখেছে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন 2005 সালে রাঙামাটিতে মাসব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করেছিল। সেই ক্যাম্পের বেশির ভাগ মেয়ে ছিলেন চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর। বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের প্রধান কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ঢাকা ট্রিবিউনকে (2018) জানান, 2009 থেকে 2011 সালের মধ্যে খেলা 36 জন নারী ফুটবলারের সবাই এসেছিলেন পাঁচটি জেলা থেকে, তার দুটি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি।

মগাছড়ি থেকে কোন পাঁচজন জাতীয় ফুটবলার এসেছেন, আর বীরসেন চাকমা কাকে কবে আনলেন?

পাঁচজন হলেন ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, রূপনা চাকমা, আনাই মগিনি ও আনুচিং মগিনি। ঢাকা ট্রিবিউন (7 অক্টোবর 2022) লিখেছে, পাঁচজনই মগাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে পড়েছেন। প্রথম আলো (16 জানুয়ারি 2023) জানায়, সবাইকে মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছিল।

তবে এক প্রশ্নে উৎসগুলো ভিন্ন: বীরসেন চাকমা নিজে কতজনকে খুঁজে এনেছিলেন। বাংলাদেশ পোস্ট (11 নভেম্বর 2024) লিখেছে, তিনি মনিকা, ঋতুপর্ণা ও রূপনা—এই তিনজনকে আবিষ্কারে মূল ভূমিকা রাখেন; একই প্রতিবেদনের পরের অংশে আনাই ও আনুচিংকেও তিনি খুঁজে পান বলে উল্লেখ আছে। ইত্তেফাক (29 সেপ্টেম্বর 2022) লিখেছে, পাঁচজন বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে “বিভিন্ন স্কুলের হয়ে খেলে” উঠে এসেছেন এবং তাঁদের “নিবিড় মমতায় গড়ে তোলেন” বীরসেন চাকমা।

খেলোয়াড়বাড়ি (উৎস অনুযায়ী)মগাছড়িতে আসাউৎস
ঋতুপর্ণা চাকমামগাছড়ি গ্রাম, ঘাগড়া ইউনিয়ন, কাউখালী, রাঙামাটিস্থানীয় শিক্ষার্থী; তৃতীয় শ্রেণিতে ফুটবল শুরু, 2012 সালে দলে (ঢাকা ট্রিবিউন)। প্রথম আলো 2023: 2014 সালে যোগ দেনপ্রথম আলো 2022, 2023, 2025; ঢাকা ট্রিবিউন 2022, 2025
মনিকা চাকমালক্ষ্মীছড়ি উপজেলা, খাগড়াছড়ি (হিল ভয়েস: বর্মাছড়ি)2012 সালে বীরসেনের চোখে পড়েন, 2013 সালে ভর্তিঢাকা ট্রিবিউন 2019, 2024; বাংলাদেশ পোস্ট 2024
রূপনা চাকমাভূঁইয়োআদাম গ্রাম, ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন, নানিয়ারচর, রাঙামাটি2011 সালে রাঙামাটি স্টেডিয়ামের একটি স্কুল ম্যাচে চোখে পড়েন; পরে কাউখালীতে আনা হয়। প্রথম আলো 2023: 2014 সালে যোগ দেনপ্রথম আলো 2022, 2023; ঢাকা ট্রিবিউন 2022
আনাই মগিনিসাতভাইয়া পাড়া, খাগড়াছড়ি সদর2011 সালের বঙ্গমাতায় বাছাই; বাবাকেও সঙ্গে আনা হয়প্রথম আলো 2023; ঢাকা ট্রিবিউন 2022; দ্য ডেইলি স্টার 2021
আনুচিং মগিনিসাতভাইয়া পাড়া, খাগড়াছড়ি সদরআনাইয়ের যমজ বোন; একই সঙ্গে আসেনপ্রথম আলো 2023; ঢাকা ট্রিবিউন 2022; দ্য ডেইলি স্টার 2021

ঢাকা ট্রিবিউন লিখেছে, পাঁচজন পার্বত্য চট্টগ্রামের দুটি জনগোষ্ঠীর—চাকমা ও মারমা। প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়েদের আনা হয়েছিল খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম এলাকা থেকে। পাঁচজনের মধ্যে দুজন রাঙামাটির, তিনজন খাগড়াছড়ির।

ঋতুপর্ণা চাকমা কীভাবে কাকার বিদ্যালয়ে ফুটবল শুরু করলেন?

ঋতুপর্ণা চাকমা মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজেরই শিক্ষার্থী ছিলেন। তৃতীয় শ্রেণিতে প্রথম ফুটবলে লাথি মারতে গিয়ে পায়ের নখ উঠে যায়, তিনি খেলা ছাড়তে চেয়েছিলেন। প্রথম আলো (8 মার্চ 2025) লিখেছে, শিক্ষকেরা প্রায় জোর করেই তাঁকে খেলাতেন, আর এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে বলতে হয় প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমার নাম।

প্রথম আলো জানায়, ঋতুপর্ণা এক বছর বীরসেনের ছোট ভাইয়ের বাসায় থেকে পড়াশোনা ও অনুশীলন করেন। স্থানীয়ভাবে ফুটবল শেখাতেন শান্তিমনি চাকমা। আর বীরসেন “ছায়ার মতো ভাতিজিকে আগলে রাখতেন”, দিতেন আর্থিক সহায়তা। ফোনে বীরসেন প্রথম আলোকে বলেন: “ঋতু খুব ছোট ছিল। কিন্তু খেলত দুর্দান্ত। প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রতিভা।”

ঋতুপর্ণার পরিবারের অবস্থা কঠিন ছিল। কোচ শান্তিমনি চাকমা ঢাকা ট্রিবিউনকে (4 জুলাই 2025) বলেন, তাঁর মা-বাবা পরিবারের খাবার ও কাপড় জোগাতেই হিমশিম খেতেন। প্রথম আলো লিখেছে, বাবা বরজবাঁশি চাকমা ক্যানসারে মারা যান। একই প্রতিবেদনে ঋতুপর্ণার মায়ের নাম বোজপুতি চাকমা; প্রথম আলোর 2022 সালের প্রতিবেদনে বানানটি বোজোপতি চাকমা।

বিকেএসপিতে ভর্তির সময়ও বীরসেন এগিয়ে আসেন। প্রথম আলো লিখেছে, ভর্তি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ 40–50 হাজার টাকা দরকার ছিল, পরিবারের কাছে তা ছিল না; বীরসেন “এদিক-ওদিক থেকে” টাকা সংগ্রহ করেন। ঋতুপর্ণা প্রথম আলোকে বলেন: “আমি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। স্যার পাশে না থাকলে এত দূর আসতে পারতাম না।”

বিকেএসপিতে ভর্তির সাল নিয়ে উৎসভেদ আছে। প্রথম আলো (2025) বলছে 2016, ঢাকা ট্রিবিউন (4 জুলাই 2025) বলছে 2015। হিল ভয়েস লিখেছে, ঋতুপর্ণা ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিকেএসপিতে যান। তাঁর জাতীয় দল ও সাফের পূর্ণ বিবরণ আছে ঋতুপর্ণা চাকমার জীবনী লেখায়।

মনিকা চাকমা লক্ষ্মীছড়ি থেকে মগাছড়িতে এলেন কীভাবে?

মনিকা চাকমার বাড়ি খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায়। নিজের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে তিনি 2011 ও 2012 সালের বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে খেলেন। 2012 সালে বীরসেন চাকমা তাঁর খেলা দেখে মগাছড়িতে নিতে চান। মনিকা 2013 সালে মগাছড়িতে ভর্তি হন এবং সেই বছরের বঙ্গমাতায় মগাছড়ির হয়ে খেলেন—ঢাকা ট্রিবিউনের 2019 ও 2024 সালের দুটি সাক্ষাৎকারে এ বিবরণ আছে।

ঢাকা ট্রিবিউনের 4 ডিসেম্বর 2024 সালের সাক্ষাৎকারে মনিকা বলেন (অনুবাদ), 2011 সালে তাঁর দল জেলা পর্বে উঠে এক ম্যাচ হেরে ফিরে আসে, 2012 সালে তারা জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। শুরুতে মা-বাবাকে ছেড়ে যেতে চাননি। মগাছড়িতে গিয়ে ছাত্রাবাসে উঠলেন, দিনে দুবার অনুশীলন করতেন। সেখানেই প্রথম ওয়ার্ম-আপ শেখেন, আর স্ট্রাইকার থেকে বাঁ প্রান্তে সরে যান।

বীরসেন সম্পর্কে মনিকা একই সাক্ষাৎকারে বলেন, মেয়েদের জাতীয় দল বলে কিছু আছে, তা তিনি জানতেন না। বীরসেন চাকমা তাঁকে জানান, তাঁর কাছে এমন খেলোয়াড় আছেন যাঁরা জাতীয় দলে খেলেছেন। এভাবেই জাতীয় দলে খেলার স্বপ্নটি তাঁকে দেখান।

মগাছড়িতে যাওয়ার পর বাবার মনোভাবও বদলায়। ঢাকা ট্রিবিউন (13 এপ্রিল 2019) লিখেছে, শুরুতে বাবা খেলায় খুব একটা সমর্থন দিতেন না। মগাছড়ির হয়ে খেলতে দেখে তিনি সমর্থন দিতে শুরু করেন। একই প্রতিবেদনে বীরসেনকে বলা হয়েছে মনিকার “mentor, and her first ever coach”।

ঢাকা ট্রিবিউনের 2022 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বীরসেন মনিকাকে তাঁর বোনসহ রাঙামাটিতে নিয়ে আসেন, তবে কিছু অসুবিধার কারণে বোন পরে বাড়ি ফিরে যান। বাংলাদেশ পোস্ট লিখেছে, মনিকাকে প্রথম ফুটবলের মৌলিক পাঠ দেন লক্ষ্মীছড়ির মরাচেঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের “গোপাল স্যার”। তাঁর পরের পথচলা আছে মনিকা চাকমার আলোচিত গোল নিয়ে লেখায়।

রূপনা চাকমা কি মগাছড়িতে পড়েছিলেন? দুই উৎস, দুই বিবরণ

রূপনা চাকমার বাড়ি নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ভূঁইয়োআদাম গ্রামে। ঢাকা ট্রিবিউন (2022) বলছে, বীরসেন ও শান্তিমনি তাঁকে 2011 সালে রাঙামাটি স্টেডিয়ামের এক স্কুল ম্যাচে খুঁজে পান এবং পরে কাউখালীতে আনেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে (2022) রূপনার মা বলেছেন, তাঁকে প্রথম লক্ষ করেন ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান।

ঢাকা ট্রিবিউনের বিবরণে রূপনার মা-বাবা প্রথমবার রাজি হননি। বীরসেনের এক আত্মীয় ছিলেন রূপনার প্রতিবেশী; তাঁর পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত রূপনাকে কাউখালীতে আনা হয়। প্রতিবেদনটি জানায়, শান্তিমনি চাকমার হাতেই রূপনা ফরোয়ার্ড থেকে গোলরক্ষক হন।

খরচের ক্ষেত্রেও রূপনা আলাদা। ঢাকা ট্রিবিউন লিখেছে, দূর এলাকা থেকে আসা চারজনের থাকা-খাওয়ার খরচ বীরসেন জোগাড় করেন, “রূপনা ছাড়া”। রূপনার খরচ বহন করেন কাছের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নলিনী মোহন চাকমা, আর রূপনা তাঁর বাড়িতেই থেকে অনুশীলন করতেন।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (23 সেপ্টেম্বর 2022) রূপনার মা কালাসোনা চাকমাকে উদ্ধৃত করেছে। প্রাথমিকে পড়ার সময় রূপনা রাঙামাটি স্টেডিয়ামে বঙ্গমাতা খেলতে যান, আর সেখানেই চন্দ্রা দেওয়ান তাঁকে লক্ষ করেন। চন্দ্রা দেওয়ানের নিজের বক্তব্য: তিনি রূপনাকে বিনা বেতনে ষষ্ঠ শ্রেণিতে নিজের বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন এবং এক শিক্ষকের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেন। একই প্রতিবেদনে চন্দ্রা দেওয়ান মেয়েদের সাফল্যের কৃতিত্ব দেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বীরসেন চাকমা ও কোচ শান্তিমনি চাকমাকেও।

প্রথম আলো (2023) রূপনাকে তালিকাভুক্ত করেছে সেই দলে, যাঁরা 2014 সালে যোগ দিয়ে মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রথম আলো 2022 সালে লিখেছে, রূপনার বাবা মারা যান রূপনা মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায়। গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর পূর্ণ গল্প আছে রূপনা চাকমার জীবনী লেখায়।

আনাই ও আনুচিং মগিনি: যমজ বোনের সঙ্গে বাবাকেও কেন আনতে হলো?

আনাই ও আনুচিং মগিনি যমজ বোন, বাড়ি খাগড়াছড়ি সদরের সাতভাইয়া পাড়ায়। বিভাগীয় পর্বে তাদের খেলা দেখে বীরসেন চাকমা তাদের নিজের বিদ্যালয়ে আনতে চান। কিন্তু দুজন এত ছোট ছিল যে মা-বাবা ছেড়ে থাকতে চায়নি। তখন বীরসেন তাদের বাবাকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন—ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য ডেইলি স্টার দুটি পত্রিকাই এ কথা লিখেছে।

বীরসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন (অনুবাদ): “ওরা বড় প্রতিভা। ওদের গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, তাই ওদের বাবাকেও নিয়ে এসেছিলাম। বাবা আর মেয়েদের—সবাইকে আমরা রেখেছিলাম।” দ্য ডেইলি স্টারের (24 ডিসেম্বর 2021) প্রতিবেদনে তাদের বাবার নাম রিপ্রু মগ। তিনি জানান, 2011 সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় দুজন প্রথম বঙ্গমাতায় খেলে।

এখানে বিদ্যালয়ের নামে একটি অমিল আছে। দ্য ডেইলি স্টার (2021) বীরসেনকে লিখেছে কাউখালীর “বগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়”-এর প্রধান শিক্ষক। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতভাইয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে বীরসেন দুই বোনকে বগাপাড়ার বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। ঢাকা ট্রিবিউন (2022) ও প্রথম আলো (2023) দুজনকেই মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেছে।

দ্য ডেইলি স্টারের একই প্রতিবেদনে সাতভাইয়া পাড়া বিদ্যালয়ের রঞ্জন নামের একজন বলেন, দুই বোনের খেলার কারণে তাঁদের বিদ্যালয় 2011 সালে বঙ্গমাতার জেলা পর্বে চ্যাম্পিয়ন ও বিভাগীয় পর্বে রানার্সআপ হয়। 2021 সালের সাফ অনূর্ধ্ব-19 ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি করেন আনাই।

খরচ কে দিত? বীরসেন চাকমা বেতন আর সঞ্চয় ভেঙে চালিয়েছেন

শুরুর বছরগুলোতে মেয়েদের থাকা-খাওয়ার খরচ মূলত বীরসেন চাকমা নিজে দিতেন। ঢাকা ট্রিবিউন (2022) লিখেছে, তাঁকে প্রায়ই বেতনের টাকা খরচ করতে হতো, কখনো কখনো ব্যাংকের সঞ্চয়ও ভাঙতে হয়েছে। কোচ শান্তিমনি চাকমা ওই প্রতিবেদনে বলেন, ঘাগড়ার ভবনে 17 জন মেয়ে থাকার সময় “সব খরচ বীরসেনদা বহন করতেন”।

প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদন লিখেছে, তৎকালীন প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমার “আর্থিক সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে” প্রতিদিন অনুশীলন চলত। ঋতুপর্ণার ক্ষেত্রে প্রথম আলো (2025) জানায়, তিনি যত দূর পেরেছেন সব খরচ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বীরসেনের নিজের কথায়: “যত দূর পেরেছি, ওর সব খরচ দিতে চেষ্টা করেছি।”

অভাব তবু ছিল। প্রথম আলো (27 জুন 2026) লিখেছে, খেলোয়াড়দের বুট কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না; ছেঁড়া বুট সেলাই করে অনুশীলন চলত। অনেক সময় মেয়েদের জন্য ন্যূনতম নাশতারও ব্যবস্থা করা যায়নি। কোচ শান্তিমনি চাকমা বলেন, একজন ফুটবলারকে ভালো খাবার দিতে না পারাটাই তাঁর সবচেয়ে বড় কষ্ট।

এই খরচের কোনো লিখিত হিসাব কোনো উৎসে নেই। কত টাকা বীরসেন চাকমা নিজে দিয়েছেন, কত এসেছে অন্যদের কাছ থেকে—তার অঙ্ক কোনো প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। একমাত্র নির্দিষ্ট অঙ্কটি ঋতুপর্ণার বিকেএসপি ভর্তির 40–50 হাজার টাকা, যা প্রথম আলোর হিসাবে তিনি এদিক-ওদিক থেকে জোগাড় করেন।

বীরসেন চাকমা নিজে খেলেননি—তাহলে মেয়েদের কারা ফুটবল শেখালেন?

বীরসেন চাকমা নিজে ফুটবল খেলেননি; খেলা শেখানোর মূল দায়িত্ব ছিল স্থানীয় কোচ শান্তিমনি চাকমার। বাংলাদেশ পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরি জ্ঞান না থাকায় বীরসেন সাবেক জাতীয় ফুটবলার বরুণ বিকাশ দেওয়ান ও তাঁর বড় ভাই অরুণ বিকাশ দেওয়ানের সাহায্য চান, আর তাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেন।

শান্তিমনি চাকমা

ঢাকা ট্রিবিউন (2022) লিখেছে, শান্তিমনি চাকমা ছিলেন মগাছড়ির শিরোপাজয়ী দলের কোচ। তিনি নিজে স্ট্রাইকার ছিলেন, চট্টগ্রাম পাইওনিয়ার লিগে রাঙামাটি জেলা দলের হয়ে খেলেছেন। নিজেকে বলেন “স্বশিক্ষিত” কোচ। প্রথম আলো (2026) জানায়, অভাবের কারণে তিনি পেশাদার খেলোয়াড় হতে পারেননি। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই; শ্রমিক দিয়ে পাহাড়ে হলুদ ও আদা চাষ করে সংসার চালান।

শান্তিমনির নামের বানানও কয়েক রকম: প্রথম আলোতে শান্তিমনি ও শান্তিমণি, ইত্তেফাকে “শান্তি মনি”, ইংরেজিতে Shanti Moni। প্রথম আলোর 2024 সালের প্রতিবেদনের একটি ছবির ক্যাপশনে “শান্তি বিকাশ চাকমা” এবং শেষাংশে “শান্তিময়” নামও এসেছে; একই প্রতিবেদনের মূল অংশে নামটি শান্তিমণি চাকমা।

বরুণ বিকাশ দেওয়ান ও অরুণ বিকাশ দেওয়ান

বাংলাদেশ পোস্ট (11 নভেম্বর 2024) লিখেছে, বরুণ বিকাশ দেওয়ান তখন রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি ঢাকার আবাহনী, মোহামেডান ও মুক্তিযোদ্ধার মতো ক্লাবে খেলেছেন। তিনি ও তাঁর বড় ভাই অরুণ বিকাশ দেওয়ান ঋতুপর্ণা, রূপনা ও মনিকাকে কোচিং করান। প্রতিবেদনটি তিনজনের ভূমিকা এভাবে ভাগ করেছে: গোপাল স্যার মৌলিক পাঠ দিয়েছেন, বীরসেন স্যার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, বরুণ ও অরুণ স্যার দিয়েছেন ফুটবলের মূল প্রশিক্ষণ।

দেশ রূপান্তরকে (21 এপ্রিল 2023) দেওয়া সাক্ষাৎকারে বরুণ বিকাশ দেওয়ান নিজেকে তিন পার্বত্য জেলার একমাত্র ফুটবলার বলেন, যিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কাউখালী উপজেলায় নিয়মিত অনুশীলন হয়, আর ঘাগড়া স্কুল কর্তৃপক্ষ পাহাড়ি মেয়েদের নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ দিচ্ছে।

আরও যাঁদের নাম এসেছে

ঢাকা ট্রিবিউনে বীরসেন আনসার নারী দলের কোচ সুইহ্লামং মারমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। ছুটিতে বাড়ি এলে তিনি মেয়েদের পরামর্শ দিতেন, সামাজিক বাধা পেরোতে সাহস জোগাতেন। মনিকা ও আনাই-আনুচিংয়ের ক্ষেত্রে খাগড়াছড়ির নিজ নিজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভূমিকাও উৎসগুলোতে আছে।

প্রাথমিক শেষে মেয়েরা কোথায় গেল? ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে দল ধরে রাখার পরিকল্পনা

প্রাথমিক শেষ হলে মেয়েদের একসঙ্গে ঘাগড়া (বহুমুখী) উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়, যাতে দল ভেঙে না যায়। প্রথম আলো (2026) লিখেছে, শান্তিমনি ও বীর সেন চাকমা উদ্যোগ নিয়ে এ কাজ করেন। শান্তিমনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিনা খরচে ভর্তি করানো হয়।

কোন সালে এই স্থানান্তর হয়, তা নিয়ে তিন রকম তথ্য আছে। প্রথম আলো (2023) বলছে 2015 সালে দলটিকে ঘাগড়ায় ভর্তি করা হয়। হিল ভয়েস ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সূত্রে লিখেছে, আনাই, মনিকা ও আনুচিং 2012 সালে সেখানে ভর্তি হন। প্রথম আলো (15 নভেম্বর 2024) সহকারী প্রধান শিক্ষক শশীমনি চাকমার বরাতে লিখেছে, ঘাগড়ায় মেয়েদের দল গঠন হয় 2013 সালে, আর পাঁচজন 2013 থেকে 2017 পর্যন্ত সেখানে প্রশিক্ষণ নেন।

ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের মেয়েরা বাংলাদেশ স্কুল-মাদ্রাসা গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় 2013 থেকে 2015 টানা তিনবার রানার্সআপ হয়, 2016 সালে চ্যাম্পিয়ন—শশীমনি চাকমার বরাতে প্রথম আলো (2024) এ তথ্য দিয়েছে। প্রথম আলো (2026) একই ফলকে বলেছে জাতীয় রানার্সআপ ও জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, 2016 সালের ফাইনালে তারা কলসিন্দুর উচ্চবিদ্যালয়কে হারায়। শশীমনির হিসাবে 2017 সাল থেকে বিদ্যালয়টি আরও পাঁচবার রানার্সআপ হয়েছে।

সালঘটনাউৎস
2011–2012বঙ্গমাতা শুরু; মগাছড়ি বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন (30 ডিসেম্বর 2011); 17 জন মেয়েকে ঘাগড়ার পরিত্যক্ত ভবনে রেখে অনুশীলনফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস 2012; প্রথম আলো 2026; ঢাকা ট্রিবিউন 2022
2012ঋতুপর্ণা দলে; বীরসেন মনিকার খেলা দেখেনঢাকা ট্রিবিউন 2019, 2022, 2025
2013মনিকা মগাছড়িতে ভর্তি; মগাছড়ি বঙ্গমাতায় জাতীয় রানার্সআপ; ঘাগড়ায় মেয়েদের দল গঠনঢাকা ট্রিবিউন 2024; ডেইলি স্টার 2014; প্রথম আলো 2024
2015–2016ঋতুপর্ণা বিকেএসপিতে (সাল উৎসভেদে)ঢাকা ট্রিবিউন 2025; প্রথম আলো 2025
2016ঘাগড়া স্কুল-মাদ্রাসা গ্রীষ্মকালীন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন; সেনাবাহিনীর সহায়তায় ছাত্রাবাস নির্মাণ, আবাসিক ক্যাম্প শুরুপ্রথম আলো 2023, 2024, 2026
2022 (সেপ্টেম্বর)পাঁচজন সাফজয়ী; মগাছড়ি ও ঘাগড়ায় সংবর্ধনা; বীরসেনের অবসরের ঘোষণাইত্তেফাক 2022; ঢাকা ট্রিবিউন 2022
2024 (নভেম্বর)দ্বিতীয় সাফ জয়ের পর রাঙামাটিতে সংবর্ধনা; বীরসেনকেও সম্মাননাবিডিনিউজ 2024

ঘাগড়ার মেয়েদের এখনকার অবস্থাও উৎসে আছে। প্রথম আলো (15 নভেম্বর 2024) লিখেছে, তখন 32 জন মেয়ে দুটি টিনের ছাউনির কক্ষে গাদাগাদি করে থাকত, রান্না করত নিজেরাই। শুধু দুই বেলার চাল আসত রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে। বছরে 100টির বেশি বল লাগে বলে জানান সহকারী প্রধান শিক্ষক। প্রথম আলো (2026) জানায়, সেনাবাহিনীর সহায়তায় তৈরি ছাত্রাবাসে তখন 26 জন মেয়ে থেকে অনুশীলন করত।

প্রথম আলোর 2024 সালের প্রতিবেদনে শিক্ষকদের আক্ষেপ: কলসিন্দুরের মতো ঘাগড়া বিদ্যালয়টি সরকারি হয়নি। প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান 2023 সালে প্রথম আলোকে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের দাবি জানান। মনিকা চাকমাও 2024 সালে রাঙামাটির সংবর্ধনায় একই দাবি তোলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য একটি বিদ্যালয় নিজের চেষ্টায় কীভাবে চলে, তা আছে লামার পাওমুম থারক্লা ম্রো স্কুল নিয়ে আমাদের লেখায়।

সাফ জয়ের পর বীরসেন চাকমা কী বললেন, কী সম্মান পেলেন?

2022 সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম সাফ জয়ের পর পাঁচ খেলোয়াড়কে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় ও মগাছড়ি এলাকায় বরণ করা হয়। 2024 সালের নভেম্বরে দ্বিতীয় সাফ জয়ের পর রাঙামাটির চিং হ্লা মং মারী স্টেডিয়ামে ঋতুপর্ণা, মনিকা ও রূপনার সংবর্ধনায় সম্মাননা পান “মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক” বীরসেন চাকমা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (23 নভেম্বর 2024) লিখেছে, সেদিন বীরসেন চাকমা ছাড়াও সম্মাননা পান ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান, প্রশিক্ষক শান্তিমনি চাকমা, বর্মাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধারশমনি চাকমা এবং ফিফা রেফারি জয়া চাকমা। সংবর্ধনায় ঋতুপর্ণা বলেন, যে মাঠে খেলে তাঁরা জাতীয় দলে এসেছেন, তার অবস্থা খুবই খারাপ; নতুন খেলোয়াড় তৈরিতে মাঠটির সংস্কার দরকার।

2022 সালে ঢাকা ট্রিবিউনকে বীরসেন জানান, অবসরের পরও তিনি “শান্তি বাবু”র সঙ্গে এ কাজ চালিয়ে যেতে চান। তাঁর পরামর্শ (অনুবাদ): সারা দেশে খেলোয়াড়দের একসঙ্গে রেখে প্রশিক্ষণের এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে শুধু ফুটবলারই নয়, “বোমা” (তারকা) বেরিয়ে আসবে। 2019 সালে মনিকাকে নিয়ে তাঁর মন্তব্য ছিল (অনুবাদ): মনিকার খেলায় তিনি নেতিবাচক কিছু দেখেননি; তিনি ভালো দৌড়ান, তাঁর দৃষ্টি ভালো, দলের জন্য খাটেন।

প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদন জানায়, প্রথম আলোর নারী ফুটবল তহবিল থেকে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়কে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। একই তহবিল থেকে সাফজয়ী দলের 30 সদস্যের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। মগাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা বীরসেন চাকমা ব্যক্তিগতভাবে কোনো সরকারি পুরস্কার বা অনুদান পেয়েছেন কি না, সে তথ্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

পাহাড়ের মেয়েদের এই ধারা বড় প্রেক্ষাপটে বুঝতে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখাগুলোর সংকলন দেখতে পারেন।

উৎসভেদে অমিল: কোন তথ্যে সংবাদমাধ্যমগুলো একমত নয়

একই ঘটনার সাল, স্থান ও ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে কয়েকটি অমিল আছে। এগুলো নিচে পাশাপাশি রাখা হলো, কোনোটিকে ঠিক বা ভুল বলা হয়নি।

প্রশ্নএক উৎসঅন্য উৎস
বঙ্গমাতায় মগাছড়ির জাতীয় শিরোপা2011 (প্রথম আলো 2023, 2024, 2025; ঢাকা ট্রিবিউন 2022: “প্রথম আসর”)2012 (প্রথম আলো 2026)
বীরসেন কতজনকে খুঁজে আনেনতিনজন: ঋতুপর্ণা, মনিকা, রূপনা (বাংলাদেশ পোস্ট 2024, প্রথম অনুচ্ছেদ)পাঁচজন (ঢাকা ট্রিবিউন 2022; ইত্তেফাক 2022; প্রথম আলো 2026)
ঋতুপর্ণা ও রূপনার যোগদানঋতুপর্ণা 2012; রূপনা 2011-এ চোখে পড়েন (ঢাকা ট্রিবিউন 2022, 2025)দুজনই 2014 (প্রথম আলো 2023)
রূপনাকে প্রথম লক্ষ করেন কেবীরসেন ও শান্তিমনি (ঢাকা ট্রিবিউন 2022)চন্দ্রা দেওয়ান (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2022)
বীরসেন কোন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকমগাছড়ি/মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (অধিকাংশ উৎস)বগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (দ্য ডেইলি স্টার 2021)
ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তির সাল2012 (হিল ভয়েস 2022)2015 (প্রথম আলো 2023); দল গঠন 2013 (প্রথম আলো 2024)
ঋতুপর্ণার বিকেএসপিতে ভর্তি2015 (ঢাকা ট্রিবিউন 2025)2016 (প্রথম আলো 2025)
মনিকা মগাছড়িতে কবে2013-এ ভর্তি (ঢাকা ট্রিবিউন 2019, 2024)2011-এর বঙ্গমাতায় বাছাই, সে বছর “মনিকা চাকমাদের দলটি” জাতীয় চ্যাম্পিয়ন (প্রথম আলো 2023)

ঢাকা ট্রিবিউনের 29 সেপ্টেম্বর 2022 সালের সংবর্ধনা প্রতিবেদনে মগাছড়িতে উপস্থিত ব্যক্তিদের তালিকায় একটি নাম লেখা “Birsen Tanchagya”। একই ঘটনার অন্য কোনো প্রতিবেদনে এই নাম পাওয়া যায়নি।

প্রশ্নোত্তর

বীরসেন চাকমা কে?

বীরসেন চাকমা রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়ি (মঘাছড়ি) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। 2011 সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ শুরু হলে তিনি পাহাড়ের নানা জায়গা থেকে মেয়েদের খুঁজে নিজের বিদ্যালয়ে আনেন। ঢাকা ট্রিবিউন 2022 সালে তাঁর বয়স লেখে 59 বছর; তিনি তখন অবসরের কথা জানান।

মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কোথায়?

বিদ্যালয়টি রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে, মগাছড়ি এলাকায়। প্রথম আলো (2023) একে “ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়” বলেছে। ঢাকা ট্রিবিউনের হিসাবে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এর দূরত্ব প্রায় দুই মাইল। ঋতুপর্ণা চাকমার বাড়িও মগাছড়ি গ্রামে।

মগাছড়ি থেকে কতজন জাতীয় ফুটবলার এসেছেন?

ঢাকা ট্রিবিউন (2022) ও প্রথম আলো (2023) অনুযায়ী পাঁচজন: ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, রূপনা চাকমা, আনাই মগিনি ও আনুচিং মগিনি। পাঁচজনই 2022 সালের সাফজয়ী দলে ছিলেন। বাংলাদেশ পোস্ট (2024) বীরসেনের আবিষ্কার হিসেবে প্রথমে তিনজনের নাম বলেছে: ঋতুপর্ণা, মনিকা ও রূপনা।

মগাছড়ির মেয়েরা কবে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ জেতে?

প্রথম আলোর তিনটি প্রতিবেদন (2023, 2024, 2025) ও ঢাকা ট্রিবিউন (2022) বলছে 2011 সালের প্রথম আসরে। প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদন বলছে 2012। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, 2011 সালের 30 ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফাইনালে মগাছড়ি চ্যাম্পিয়ন হয়। 2013 সালের আসরে দলটি জাতীয় রানার্সআপ।

বঙ্গমাতা ফাইনালে মগাছড়ি কার কাছে হেরেছিল?

দ্য ডেইলি স্টার (2 মার্চ 2014) জানায়, বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের তৃতীয় আসরের ফাইনালে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় 4-1 গোলে মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে হারায়। খেলা হয় ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। ঢাকা ট্রিবিউন এই আসরকে 2013 সালের বলেছে।

বীরসেন চাকমা কি ঋতুপর্ণা চাকমার আত্মীয়?

হ্যাঁ। প্রথম আলো (8 মার্চ 2025) লিখেছে, আত্মীয়তার সূত্রে বীরসেন ও ঋতুপর্ণা কাকা-ভাতিজি, বাড়িও কাছাকাছি। ঢাকা ট্রিবিউন (2025) তাঁকে ঋতুপর্ণার চাচা বা “paternal uncle” বলেছে। ঋতুপর্ণা এক বছর বীরসেনের ছোট ভাইয়ের বাসায় থেকে পড়াশোনা ও অনুশীলন করেন।

মেয়েদের থাকা-খাওয়ার খরচ কে দিতেন?

ঢাকা ট্রিবিউন (2022) অনুযায়ী দূর থেকে আসা মেয়েদের থাকা-খাওয়ার খরচ বীরসেন চাকমা নিজে জোগাড় করতেন, প্রায়ই বেতন থেকে, কখনো ব্যাংকের সঞ্চয় ভেঙে। ব্যতিক্রম রূপনা চাকমা: তাঁর খরচ দিতেন কাছের এক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নলিনী মোহন চাকমা। ঋতুপর্ণার বিকেএসপি ভর্তির 40–50 হাজার টাকাও বীরসেন সংগ্রহ করেন।

মগাছড়ির মেয়েদের কোচ কে ছিলেন?

মূল কোচ শান্তিমনি চাকমা, রাঙামাটি জেলা দলের সাবেক স্ট্রাইকার ও স্বশিক্ষিত কোচ। তাঁর হাতেই রূপনা ফরোয়ার্ড থেকে গোলরক্ষক হন (ঢাকা ট্রিবিউন 2022)। বাংলাদেশ পোস্ট (2024) জানায়, সাবেক জাতীয় ফুটবলার বরুণ বিকাশ দেওয়ান ও তাঁর ভাই অরুণ বিকাশ দেওয়ান বিনা পারিশ্রমিকে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেন।

প্রাথমিকের পর মেয়েরা কোন বিদ্যালয়ে পড়েছে?

ঘাগড়া (বহুমুখী) উচ্চবিদ্যালয়ে, যা মগাছড়ি থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে। দল যাতে না ভাঙে, তাই সবাইকে একসঙ্গে ভর্তি করা হয়, বিনা খরচে। ভর্তির সাল উৎসভেদে 2012, 2013 বা 2015। ঘাগড়ার মেয়েরা 2016 সালে স্কুল-মাদ্রাসা গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় (প্রথম আলো 2023, 2024)।

আনাই ও আনুচিং মগিনিকে কীভাবে আনা হয়েছিল?

যমজ দুই বোন খাগড়াছড়ি সদরের সাতভাইয়া পাড়ার। বিভাগীয় পর্বে তাদের খেলা দেখে বীরসেন চাকমা নিজের বিদ্যালয়ে আনতে চান। দুজন খুব ছোট ছিল, মা-বাবা ছেড়ে থাকতে চায়নি; তাই তাদের বাবাকেও সঙ্গে আনা হয় (ঢাকা ট্রিবিউন 2022; দ্য ডেইলি স্টার 2021)।

বীরসেন চাকমা কি সংবর্ধনা বা সম্মাননা পেয়েছেন?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (23 নভেম্বর 2024) জানায়, দ্বিতীয় সাফ জয়ের পর রাঙামাটির চিং হ্লা মং মারী স্টেডিয়ামের সংবর্ধনায় তাঁকে “মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক” হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। কোনো জাতীয় পুরস্কার বা সরকারি অনুদানের তথ্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

যা এখনো জানা যায়নি

  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নথিতে বিদ্যালয়টির সরকারি বানান কী—মগাছড়ি না মঘাছড়ি—তা কোনো উন্মুক্ত সরকারি তালিকায় পাওয়া যায়নি।
  • বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের প্রথম আসরের জাতীয় ফাইনাল কবে, কোথায়, কার বিপক্ষে হয়েছিল এবং ফল কী ছিল, তা জানানো কোনো সমসাময়িক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
  • বীরসেন চাকমা কবে প্রধান শিক্ষক হিসেবে মগাছড়িতে যোগ দেন, কবে ঠিক অবসরে যান, তার নথিভুক্ত তারিখ জানা যায়নি। 2022 সালের অক্টোবরে তিনি “এক মাস পরে” অবসরের কথা বলেছিলেন।
  • দ্য ডেইলি স্টার (2021) তাঁকে বগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লিখেছে। তিনি কখনো দুই বিদ্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন কি না, বা এটি নামের ভিন্নতা কি না, তা জানা যায়নি।
  • মেয়েদের পেছনে বীরসেন মোট কত টাকা খরচ করেছেন, তার কোনো হিসাব কোনো উৎসে নেই।
  • 2011 সালের দলের 17 জন মেয়ের বাকিরা পরে কী করেছেন, সে তথ্য পাওয়া যায়নি।
  • বাংলাদেশ পোস্টে বর্ণিত বরুণ ও অরুণ বিকাশ দেওয়ানের প্রশিক্ষণ কোন বছর থেকে কত দিন চলেছে, তা জানা যায়নি।

তথ্যসূত্র

  1. প্রথম আলো, “মনিকা-রুপনাদের স্কুল পেল দুই লাখ টাকা”, সাধন বিকাশ চাকমা, 16 জানুয়ারি 2023। prothomalo.com/bangladesh/pkb1sgz0zy
  2. প্রথম আলো, “মেয়েরা যে ফুটবল খেলে, ছোটবেলায় তা–ই জানতেন না ঋতুপর্ণা চাকমা”, 8 মার্চ 2025। prothomalo.com/lifestyle/j6wvcpapyt
  3. প্রথম আলো, “নির্দিষ্ট বেতন নেই, তবু নিজের শ্রমে পাহাড়ে ঋতুপর্ণা–রুপনাদের মতো ফুটবলার গড়ে তুলছেন এই কোচ”, 27 জুন 2026। prothomalo.com/lifestyle/xl49f00lt5
  4. প্রথম আলো, “সেই ঘাগড়া স্কুলেই ঋতুপর্ণাদের অপেক্ষায় তৃষা, অপর্ণারা”, সাধন বিকাশ চাকমা, 15 নভেম্বর 2024। prothomalo.com/bangladesh/district/uhvm9zvlf7
  5. প্রথম আলো, “সাফজয়ী রুপনা ও ঋতুপর্ণার বাড়িতে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক”, 20 সেপ্টেম্বর 2022। prothomalo.com/bangladesh/district/t1hisaoiaa
  6. Dhaka Tribune, “The story of how 5 Bangladesh national women’s team footballers were discovered in the Chittagong Hill Tracts”, 7 October 2022. dhakatribune.com/sport/football/295436
  7. Dhaka Tribune, “Monika, the Rangamati girl dreaming big”, 13 April 2019. dhakatribune.com/sport/football/174156
  8. Dhaka Tribune, Monika Chakma interview, “We three sisters were mad for football”, 4 December 2024. dhakatribune.com/sport/football/367150
  9. Dhaka Tribune, “A big match player from the hills”, 4 July 2025. dhakatribune.com/sport/football/385517
  10. Dhaka Tribune, “5 Saff champions receive warm welcome with torch procession in Rangamati”, 29 September 2022. dhakatribune.com/bangladesh/294967
  11. Dhaka Tribune, “Rise of the Bangladesh girls”, Shishir Hoque, 4 January 2018. dhakatribune.com/sport/football/134601
  12. ইত্তেফাক, “নিজেদের স্কুলে উষ্ণ সংবর্ধনা পাহাড়ি পাঁচ ফুটবলারকে”, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি, 29 সেপ্টেম্বর 2022। ittefaq.com.bd/615002
  13. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, “সাফজয়ী ৩ কন্যাকে নিয়ে রাঙামাটি শহরে মোটর শোভাযাত্রা, উচ্ছ্বাস”, ফজলে এলাহী, 23 নভেম্বর 2024। bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/b5d7021403ac
  14. Bangladesh Post, “Rise of three SAFF victors”, Talha Kamal, 11 November 2024. bangladeshpost.net/posts/rise-of-three-saff-victors-149559
  15. The Daily Star, “A day of football fest”, 2 March 2014. thedailystar.net/a-day-of-football-fest-13798
  16. The Daily Star, “‘My daughters were born as pearls in a poor household’”, 24 December 2021. thedailystar.net/node/2924666
  17. The Financial Express, “Bangabandhu-Bangamata Divisional Gold Cup football tourney ends”, 1 January 2012. today.thefinancialexpress.com.bd
  18. The Business Standard, “The girls who dared to dream”, 23 September 2022. tbsnews.net/sports/women-who-dared-dream-501818
  19. Hill Voice, “Seven SAAF winner indigenous woman footballers brightened in triumph”, 24 September 2022. hillvoice.net/?p=13025
  20. দেশ রূপান্তর, “ফুটবল নিয়ে আগ্রহ কমে গেছে পাহাড়িদেরও” (বরুণ বিকাশ দেওয়ানের সাক্ষাৎকার), 21 এপ্রিল 2023। deshrupantor.com/421607
  21. UNB, Bangladesh’s women footballers (tag page, Bangamata first edition figures). unb.com.bd/news/tag/143011
  22. Wikipedia, “Ritu Porna Chakma” (accessed 8 November 2026). en.wikipedia.org/wiki/Ritu_Porna_Chakma
  23. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, Small Area Atlas of Bangladesh – Rangamati Zila: Kawkhali Upazila mauza geocode map। উইকিমিডিয়া কমন্স

সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 নভেম্বর 2026

প্রসঙ্গঃ ,
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
[DISPLAY_ULTIMATE_SOCIAL_ICONS]

আরও কিছু লেখা