একটি জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ মানুষ পড়তে-লিখতে জানেন — কিন্তু বাংলায় নয়।
জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত একটি লেখার বাক্য: “বম আদিবাসীরা ৮০ ভাগ অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। তবে বাংলায় নয়। ইংরেজি বর্ণমালায় মিশনারিদের প্রবর্তিত পদ্ধতিতে অবলীলায় বম শব্দগুলো লেখা যায়।”
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাক্ষরতার গড় হার যেখানে ৪৩.৯ শতাংশ, সেখানে বম জাতির এই হার ব্যতিক্রম — এবং তার পেছনে আছে ১৮৯৪ সালে দুজন মিশনারির তৈরি একটি বর্ণমালা, যা ছড়িয়েছিল বাইবেলের পথ ধরে।
এই লেখাটি বমদের একটি সংহত পরিচিতি দাঁড় করানোর চেষ্টা: নামের ইতিহাস, সমাজের গঠন, খ্রিষ্টধর্মে যাওয়ার আগে ও পরে, আর সেই বর্ণমালার গল্প।
সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বম জনগোষ্ঠী নিয়ে যে আলোচনা — সেটি একটি সংবেদনশীল ও চলমান বিষয়, এবং এই লেখায় তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সে প্রসঙ্গ আলাদা লেখার দাবি রাখে, যেখানে নথিভুক্ত তথ্য ও বিতর্কিত অভিযোগ কড়াভাবে আলাদা রাখা যাবে।
বমদের নাম নিয়ে যত লেখা হয়েছে, পাহাড়ের আর কোনো জনগোষ্ঠীর নাম নিয়ে সম্ভবত তত হয়নি — এবং প্রায় সবই বাইরের লোকের দেওয়া নাম।
জুমজার্নালের আর্কাইভে “বম জাতির আদ্যোপান্ত” লেখাটিতে লেখক ও সালসহ একটি তালিকা আছে:
| যিনি লিখেছেন | যে নামে |
|---|---|
| বুকানন, ১৭৯৮ | বনজো |
| ম্যাক্রোয়া, ১৮০১ | বনযোগী |
| বারবে, ১৮৪৫ | বুনজোস |
| পিয়ারে, ১৮৪৫ | বৌন-জুস, বৌনজিস |
| লোরেন, ১৯৪০ | বম, বম-জো |
| লোফলার, ১৯৫৯ | বোম-জৌ |
| সোফার, ১৯৬৪ | বনযোগী, বোম |
“বনযোগী” নামটির উৎস বিশেষভাবে লক্ষণীয়। হাচিনসনের (১৯০৬) ব্যাখ্যা অনুযায়ী Banjogi এসেছে “ban” অর্থাৎ বন এবং “jogi” অর্থাৎ পরিব্রাজক থেকে — forest wandering tribe। কিন্তু আর্কাইভের লেখাটি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেছে: “‘বন’ (Ban) এবং ‘যোগী’ (Jogi) শব্দ দুটির কোনোটি বমদের নিজস্ব নয়।”
বমরা নিজেদের কী বলেন? ঐ লেখার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট: Bawm, Bom, Bom-Zo, Bawm-Zo, Zo, Lai, Laimi — “ছাড়া অন্য নামগুলো নিজেদের বেলায় কখনো ব্যবহার করেনি”। ইংরেজি উইকিপিডিয়াও লিখছে তাঁরা নিজেদের বলেন “Bawmzo” বা “Bawm Zo”।
“বম” শব্দের অর্থ নিয়ে আর্কাইভের লেখাটি জির কুং সাহু ও এস এল পারদোর কাজ উদ্ধৃত করেছে। বিশেষ্য হিসেবে শব্দটির অর্থ ‘coop, cage, container, or basket’; কিন্তু ক্রিয়া হিসেবে অর্থ ‘unite, to become one, merge’ — এবং লেখকদ্বয়ের মতে দ্বিতীয় অর্থটিই নামের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে বেশি মানানসই।
ঐ ব্যাখ্যার সঙ্গে একটি ইতিহাস জড়ানো: শিকারের প্রয়োজনে স্থান বদল, গোত্রীয় লড়াই ও উপগোত্রীয় দ্বন্দ্বের কারণে বমরা বারবার ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন; সেই ছড়ানো দলগুলোকে একত্র করার প্রক্রিয়া থেকেই “বম” নামের প্রচলন।

বাংলাদেশে বমরা থাকেন বান্দরবানের রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও সদর উপজেলায় এবং রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায়। এর বাইরে ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারের চিন প্রদেশেও বম জনগোষ্ঠীর বসবাস।
গ্রামের সংখ্যা নিয়ে আর্কাইভের লেখাটির ভেতরেই অসঙ্গতি আছে — শুরুতে বলা হয়েছে “৭০টি গ্রামে বমরা বসবাস করে”, আর কিছু অনুচ্ছেদ পরে “দুই জেলার মোট পাঁচটি থানায় ৬৫টি গ্রামে বমদের বসবাস রয়েছে”। কোনটি সঠিক, তা নিষ্পত্তি করা যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
জনসংখ্যার হিসাব:
| উৎস | সংখ্যা |
|---|---|
| ১৯৯১ আদমশুমারি | 6,978 |
| বম সোশাল কাউন্সিল বাংলাদেশের নিজস্ব জরিপ, ২০০৩ | 9,500 |
| BBS আদমশুমারি ২০২২ | 13,193 |
আর্কাইভের লেখাটির মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ: “সরকারি পরিসংখ্যানে বম জনগোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না… বমরা সরকারি পরিসংখ্যান যথাযথ নয় বলে মনে করে।” ২০০৩ সালে তাঁদের নিজস্ব জরিপে পাওয়া সংখ্যাটি ১৯৯১-এর সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় আড়াই হাজার বেশি ছিল।
একই ধরনের ব্যবধান আমরা দেখেছি খিয়াং ও খুমিদের ক্ষেত্রেও — বিস্তারিত আছে ক্ষুদ্রতম পাঁচ জনগোষ্ঠী নিয়ে লেখাটিতে।
বম সমাজ দুটি গোত্রে বিভক্ত — শুনথলা (Sunthla) ও পাংহয় (Panghawi)। প্রতিটির অধীনে অনেক উপদল আছে; আর্কাইভের লেখাটিতে দুই গোত্র মিলিয়ে পঞ্চাশের বেশি উপদলের নাম তালিকাভুক্ত — শুনথলার অধীনে জাহাও, জাথাং, চিনজা, লনচেও, চেওরেক, সিয়ারলন, সানদৌ, তেনু প্রভৃতি; পাংহয়ের অধীনে সাইলুক, পালাং, রোখা, সাতেক, রুপিচাই, সাখং, সাহু, আমলাই প্রভৃতি।
একটি সমসাময়িক প্রবণতাও নথিভুক্ত: “ইদানীং বমরা তাদের নামের আগে বা পরে গোত্রের নাম লিখতে শুরু করেছেন” — উদাহরণ হিসেবে দেওয়া আছে এস লনচেও, জির কুং সাহু, জুয়ামলিয়ান আমলাই।
এটি নিছক নামকরণের রীতি নয়। উপগোত্রের নাম প্রকাশ্যে লেখা মানে সমাজের ভেতরের একটি কাঠামোকে বাইরের জগতে দৃশ্যমান করা — এবং যে নামগুলো বাইরের লোকে ভুলভাবে লিখে এসেছে, তার বিপরীতে নিজের নামটি নিজেদের মতো করে লেখা।

খ্রিষ্টধর্মের আগে বমদের ধর্মবিশ্বাস ছিল সর্বপ্রাণবাদী। আর্কাইভের বর্ণনায় ভূত-প্রেত, ঝাড়-ফুঁক, মন্ত্র-তন্ত্র, ওঝা-বৈদ্য ও জ্যোতিষবিদ্যায় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।
কিন্তু কেন্দ্রীয় ধারণাটি চমকপ্রদ। বমরা খুজিং-পাথিয়ান-কে বিধাতা মানেন — তিনি স্রষ্টা, “তিনি কখনো রুষ্ট হন না, তিনি সদা কল্যাণময়ী”। আর ঠিক এই কারণেই —
“তাই বমদের খুজিং বা পাথিয়ান-এর প্রতি পূজা, যজ্ঞ, বলিদান, অর্ঘ্য নিবেদন কিছুই করতে হয় না। কেননা তিনি কারো অমঙ্গল করেন না। যত পূজা, যজ্ঞ, অর্ঘ্য নিবেদন করা হয় সবই অপদেবতার উদ্দেশ্যে। কারণ যত অকল্যাণ — জরা, ব্যাধি-মৃত্যু, ফসল-হানি, খরা-অনাবৃষ্টি, প্লাবন, মহামারি — সবই তাদের কীর্তি।”
অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় পূজা কৃতজ্ঞতার নয়, প্রতিরক্ষার। যিনি ভালো করেন তাঁকে তুষ্ট করার দরকার নেই; যাঁরা ক্ষতি করেন, আয়োজন তাঁদের জন্যই। ধর্মতাত্ত্বিকভাবে এটি একটি সুসংগত অবস্থান, এবং জুম-নির্ভর জীবনে দুর্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে বম ও পাংখুয়ারা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করেন।
একটি নাম বারবার ফিরে আসে — পাস্টর এইচ ডালা (Pastor H. Dala), যাঁকে ঐ লেখায় বলা হয়েছে “বম সমাজে খ্রিস্ট ধর্ম শিক্ষা, চার্চ প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রসারণের প্রধান ভূমিকা পালনকারী”। তাঁর সন্তানেরা আজ বম সমাজের নেতৃত্বস্থানে — শিক্ষকতা, ধর্মশিক্ষা ও সমাজসেবায়।
আজ ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় বমদের ধর্ম হিসেবে লেখা আছে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্ম। তবে ঐ পাতায় রূপান্তরের ইতিহাস, কোন মিশন বা কোন সাল — কিছুই নেই। সেই ইতিহাসের বিবরণ আসছে কেবল জুমজার্নালের নিজস্ব আর্কাইভ থেকেই।
ধর্মান্তরের গল্পটা আসলে একটি বর্ণমালার গল্পও — এবং এই দুটি আলাদা করা যায় না।
আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী খ্রিষ্টান মিশনারিদের আসার আগে বম, পাংখুয়া, লুসাই তথা মিজো/জৌ ভাষায় কোনো বর্ণমালা ছিল না। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে দুজন মিশনারি — Rev. J. H. Lorrain ও Rev. F. W. Savidge — আইজলে আসেন এবং রোমান বর্ণমালা অনুসরণে একটি বর্ণমালা প্রবর্তন করেন।
সেই বর্ণমালা দিয়ে তাঁরা বের করেন বাইবেলের অংশ, ধর্মীয় শিক্ষার পুস্তিকা ও অভিধান। এরপর মিজোরাম থেকে আসা লুসাই ধর্মপ্রচারকেরা এই বর্ণমালা বম ও পাংখুয়াদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন — একই বর্ণমালা আজও বম ও পাংখুয়ারা ব্যবহার করেন।
ক্রমটা লক্ষ করার মতো: বর্ণমালা এল ১৮৯৪-এ, ধর্মান্তর শুরু ১৯১৮-র পর, আর বর্ণমালার ব্যাপক ব্যবহারও শুরু সেই ধর্মান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই। অর্থাৎ লিপি প্রথমে এসেছিল ধর্মপ্রচারের বাহন হিসেবে, তারপর হয়ে উঠেছে একটি জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার ভিত্তি।
আজ বম ভাষায় “বেশ কয়েকটি বই ও একটি মাসিক পত্রিকা” আছে — পাহাড়ের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এটি বিরল। পাহাড়ি ভাষা ও লিপির সামগ্রিক ছবি আছে মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে আমাদের লেখায়।
এখানেই এই লেখার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি। আর্কাইভের দাবি অনুযায়ী বমদের সাক্ষরতার হার ৮০ শতাংশ — কিন্তু সেটি বাংলায় নয়, মিশনারিদের প্রবর্তিত রোমান-ভিত্তিক বম বর্ণমালায়।
প্রেক্ষাপটটা রাখুন পাশাপাশি: পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক সাক্ষরতার হার ৪৩.৯ শতাংশ, জাতীয় হার ৫১.৮ শতাংশ। বমদের হার — যদি সংখ্যাটি সঠিক হয় — দুটোরই অনেক উপরে।
একই লেখায় আরেকটি তথ্য এই হারটিকে ব্যাখ্যা করে: “দুয়েকটি বাদ দিলে প্রতি বম গ্রামেই হয় সরকারি নয় নিজেদের উদ্যোগে স্কুল রয়েছে।”
তবে সংখ্যাটি নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। ৮০ শতাংশ কোন জরিপের ফল, কোন সালের — আর্কাইভের লেখায় তা বলা নেই। এবং “অক্ষরজ্ঞান” বলতে ঠিক কী মাপা হয়েছে, তাও স্পষ্ট নয়। [যাচাই প্রয়োজন]
একটি প্রশ্ন এখান থেকেই ওঠে, যার উত্তর কোনো উৎসে নেই: সরকারি মাতৃভাষা-শিক্ষা কর্মসূচিতে যে পাঁচটি ভাষা আছে, বম তার একটি নয় — অথচ বমদের নিজস্ব বর্ণমালা, বই ও পত্রিকা আছে এবং সাক্ষরতার হারও উঁচু। এই ব্যবস্থাটি সরকারি কর্মসূচির বাইরে থেকেই দাঁড়িয়েছে।
বমরা নিজেদের কী নামে ডাকেন?
Bawm, Bom, Bawm-Zo, Bom-Zo, Zo, Lai বা Laimi। “বনযোগী”, “বনজো”, “বুনজোস” ইত্যাদি নাম বাইরের লেখকদের দেওয়া — আর্কাইভের উৎস অনুযায়ী বমরা সেগুলো কখনো নিজেদের বেলায় ব্যবহার করেননি।
“বম” শব্দের অর্থ কী?
বন্ধন, মিলন, একত্রীভুক্ত হওয়া। জির কুং সাহু ও এস এল পারদোর মতে ক্রিয়াপদ হিসেবে শব্দটির অর্থ “unite, to become one” — এবং ছড়িয়ে পড়া ছোট ছোট দলকে একত্র করার ইতিহাস থেকেই নামটির উৎপত্তি।
বমরা কোথায় থাকেন, কতজন?
বান্দরবানের রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও সদর এবং রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায়। BBS-এর ২০২২ আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে তাঁদের সংখ্যা 13,193।
বম ভাষার বর্ণমালা কে তৈরি করেন?
১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে দুজন খ্রিষ্টান মিশনারি — Rev. J. H. Lorrain ও Rev. F. W. Savidge — আইজলে এসে রোমান বর্ণমালা অনুসরণে এটি তৈরি করেন। একই বর্ণমালা বম ও পাংখুয়ারা ব্যবহার করেন।
খ্রিষ্টধর্মের আগে বমদের ধর্ম কী ছিল?
সর্বপ্রাণবাদী। তাঁরা খুজিং-পাথিয়ানকে স্রষ্টা মানতেন, কিন্তু তিনি কখনো ক্ষতি করেন না বলে তাঁর উদ্দেশে কোনো পূজা করতে হতো না — সব পূজা ও বলিদান হতো অপদেবতাদের তুষ্ট করতে, যাঁদের কীর্তি বলে মনে করা হতো রোগ, খরা, ফসলহানি ও মহামারিকে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026