ছবিটা বান্দরবানের কোনো এক ঘরের ভেতরে তোলা। বাইরে দিন, কিন্তু বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে বিন্দু বিন্দু হয়ে — দেয়ালজুড়ে ছোট ছোট সোনালি ফুটো। মেঝেতে বসা এক তরুণী, কোমরে বাঁধা তাঁত, সামনে টানটান করে বাঁধা সুতোর সারি। ডান হাতে বাঁশের শলা, বাঁ হাত সুতোর ভেতরে। জুমজার্নালের আর্কাইভে ছবিটার নিচে লেখা আছে একটাই লাইন — “বেইন বুননরত বম নারী”।
এই এক লাইনই মোটামুটি সব। চাকমা বা তঞ্চঙ্গ্যা পোশাকের বেলায় আমরা প্রতিটি অংশের নাম ধরে ধরে বলতে পারি — পিনন, খাদি, খবং, ফারদ্দরী। ম্রো পোশাকের বেলায় একটা নাম পাওয়া যায়, কিন্তু তিন উৎসে তিন রকম বানানে। আর বম পোশাকের বেলায় ছবি আছে, বাজার আছে, বিক্রির দাম আছে — নাম নেই। বাংলাপিডিয়া, বাংলা উইকিপিডিয়া, ইংরেজি উইকিপিডিয়া, তিনটিতেই বম পোশাক নিয়ে একটি বাক্যও নেই।
এই লেখাটা তাই দুই ভাগে সমান হবে না, আর সেটা লুকানোর কিছু নেই। যা নথিভুক্ত, তা-ই লিখছি; যা নেই, সেটাও লিখে রাখছি — কারণ ফাঁকটা নিজেই একটা তথ্য। কোমর-তাঁতের পুরো কারিগরি প্রক্রিয়া নিয়ে আলাদা লেখা আছে পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ-এ; এটি তার একটি শাখা।
ম্রো লেখক সিংইয়ং ম্রোর “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান” লেখাটিতে কথাটা একদম সোজা করে বলা: “আদিবাসীরা জুমের উৎপাদিত কার্পাস তুলা দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় পোষাক পরিচ্ছদ ও কাপড় তৈরী করে।” সেই তুলা থেকে বিশেষ উপায়ে সুতো তৈরি হয়, তারপর “বন থেকে নানা ধরনের গাছের রস ও লতা পাতার রস মিশিয়ে সুতো বিভিন্ন রঙ করানো হয়।”
এই সুতো দিয়ে কী কী হয়, তারও তালিকা আছে — বিছানার কম্বল, গায়ে দেওয়ার কম্বল, ওড়না, পরিধানের কাপড়, জামা।
খেয়াল করার মতো ব্যাপারটা হলো তুলাটা কেনা হচ্ছে না, ফলানো হচ্ছে। একই লেখায় জুমের মাসভিত্তিক ফসলের তালিকায় ধান-তিল-তিশি-ভুট্টার পাশেই বারবার আসে কার্পাস তুলা। অর্থাৎ যে জমিতে ভাত, সেই জমিতেই কাপড়। জুম চাষের পূর্ণ চক্রটা তাই একই সঙ্গে খাদ্যের আর বস্ত্রের চক্র।
এটা শুধু ম্রোদের কথা নয়। “বম জাতির আদ্যোপান্ত”-তে লেখা আছে, একসময় বমদের জুমে “সারা বছরের ধান, মরিচ হতো আর অর্থকরী হিসেবে কার্পাস তুলা, তিল প্রচুর উৎপন্ন হতো।” তুলার কারণেই তৎকালে পার্বত্য অঞ্চলকে বলা হতো ‘কার্পাস মহল’।
আজ ছবিটা উল্টো। The Daily Star-এর “Weaving: An indigenous heritage in Chittagong Hill Tracts” প্রতিবেদন বলছে, বয়নকারী নারীরা এখন তিন পার্বত্য জেলার প্রায় ১৫০টি স্থানীয় বাজার থেকে তুলা সংগ্রহ করেন — ১ কেজি তুলা ২২০ টাকায়, তা থেকে অন্তত দুটি পিস, বাজারে যার দাম ৬০০ টাকার বেশি। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী তিন জেলায় কোমর-তাঁতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ৫০,০০০, আর যন্ত্রচালিত তাঁতের প্রতিষ্ঠান মোটে ২০টি — সবগুলোই রাঙামাটিতে।

ম্রো নারীর প্রধান পরিধেয়টির নাম নিয়ে তিনটি উৎস তিন রকম বানান লেখে, আর মাপ নিয়ে দুই রকম হিসাব দেয়। দুটোই এখানে পাশাপাশি রাখছি।
৬ ইঞ্চি আর ৮–১০ ইঞ্চির তফাতটা ছোট নয় — কাপড়টা হাঁটু ছোঁবে কি ছোঁবে না, তা এতেই ঠিক হয়। কোনটা ঠিক, সেটা মীমাংসা করার মতো তৃতীয় কোনো মাপ কোথাও পাইনি, তাই দুটোই রইল।
বাংলাপিডিয়া আরও জানাচ্ছে, বাজারে যাওয়ার সময় ম্রো নারীরা শরীরের উপরের অংশে একখণ্ড কাপড় জড়িয়ে নেন, আর মাথার পেছনে বাঁ পাশে চুল বাঁধেন।
এর একটা অনেক পুরোনো বিবরণও আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Mru people” ভুক্তিতে Census of India, 1931: Burma-র বরাত দিয়ে লেখা হয়েছে, তখন বিয়ের আগে ম্রো নারীরা ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত রাখতেন এবং নিচের অংশে একটি ছোট কাপড় পরতেন — আর সেই কাপড়ের সুতো কেনা হতো ভারতীয় বণিকদের কাছ থেকে। এটি ১৯৩১ সালের বার্মার আদমশুমারির বিবরণ, বাংলাদেশের ম্রোদের আজকের চর্চা নয়; আর সুতোর উৎস নিয়ে এটি সিংইয়ং ম্রোর বিবরণের ঠিক উল্টো কথা বলছে। দুটোই লিখে রাখা ছাড়া উপায় নেই।
ওয়ানক্লাই নিয়ে সবচেয়ে নির্দিষ্ট কারিগরি তথ্যটা এসেছে আর্কাইভ থেকেই, এবং সেটা রঙের। সিংইয়ং ম্রো লিখছেন:
“ম্রো আদিবাসীরা জুমে ‘স্রাম’ নামে এক প্রকার উদ্ভিদ জন্মায়। এই উদ্ভিদ গরম পানিতে সেদ্ধ করে সুতার কালো রং করায়। এরপর তার মেয়েদের পড়নের কাপড় ‘ওয়ানক্লাই’ তৈরী করে।”
অর্থাৎ কালোটা এখানে ঘটনাচক্রে নয় — নির্দিষ্ট একটা গাছ জুমে বোনা হয় শুধু ওই রংটার জন্য, আর সেই রং করা সুতো দিয়েই ওয়ানক্লাই তৈরি হয়। কাপড়ের রঙ ঠিক করে দিচ্ছে জুমের ফসল-তালিকা।
একই লেখায় বাকি রংগুলোর কথাও আছে: জুমে ফলানো দোপাটি ফুলের পাতার রস, সীমের পাতার রস আর হলুদ দিয়ে সুতো রং করানো হয়।
‘স্রাম’ উদ্ভিদটি প্রচলিত বাংলা নামে কী, বা এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় কী — কোনো পঠিত উৎসে পাইনি। [যাচাই প্রয়োজন]
পুরুষের পোশাক নিয়ে বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুনির্দিষ্ট: “ম্রো পুরুষরা নেঙটি পরে। একখন্ড কাপড় দুই উরুর মাঝখান দিয়ে কোমরে জড়িয়ে রাখে।” বাজারে যাওয়ার সময় তাঁরা লুঙ্গি ও জামা পরেন; চুল লম্বা রেখে কপালে পেঁচিয়ে নেন, মাথায় পাগড়িও বাঁধেন। বাংলা উইকিপিডিয়ায় এই নেঙটির একটি ম্রো নাম দেওয়া আছে — ‘ডং’।
১৯৩১ সালের বিবরণে জিনিসটা আরও খুঁটিয়ে বলা: কাপড়টি কোমরে দুই পাক দিয়ে জড়িয়ে দুই ঊরুর মাঝ দিয়ে টেনে নেওয়া হয়, দুই প্রান্ত ঝুলে থাকে — একটি সামনে, একটি পিছনে; এবং কাপড়টি তাঁরা নিজেরাই বানান। ওই একই বিবরণে বলা হয়েছে, তখন ম্রো পুরুষেরা ‘খা-ওক’ (Kha-ok) নামে বার্মিজ ধরনের জ্যাকেট পরতেন — যেটি নিজেদের বোনা নয়, ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনা। নিজের তাঁতের কাপড় আর কেনা কাপড় যে একই পোশাক-সেটে পাশাপাশি চলত, ৯০ বছর আগেই।
অলংকারের তালিকাটা তুলনায় সমৃদ্ধ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ম্রো নারীরা মাথায় ও কানে ফুল পরেন, গলায় পুঁতির মালা — ম্রো ভাষায় কেংঙঅর; কানে রূপার বিশেষ অলংকার রামচেং, আর বাহুতে ধাতুর বালা। বাংলা উইকিপিডিয়া এর সঙ্গে যোগ করে পায়ের নূপুর খক খ্যান, কোমরের বিছা রোওয়া কম, মাথায় গোঁজা পাহাড়ি ফুল পাও এবং চিরুনি ছুরুত — যদিও এই নামগুলোর কোনোটির সঙ্গে তথ্যসূত্র নেই।
এখানে একটা মিল চোখে পড়ে। ১৯৩১-এর আদমশুমারিতে লেখা ছিল, ম্রো নারীরা কোমরের পুঁতির মালায় তামার টুকরো গাঁথেন এবং কানে পরেন প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা ফাঁপা রূপার নল। বাংলাপিডিয়ার ‘রামচেং’ আর ১৯৩১-এর ওই রূপার নল একই জিনিস কি না, কোনো উৎস মিলিয়ে বলে না — কিন্তু বর্ণনা দুটো কাছাকাছি।
পোশাক কেবল পরার জিনিস নয়, লেনদেনের জিনিসও। আর্কাইভের “প্রথাগত আইনে আদিবাসী ম্রো নারীর অবস্থান” লেখাটিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় কাপড়ের হিসাব ধরে ধরে দেওয়া আছে: কনেপক্ষ থেকে বরের পিতাকে সম্মান জানিয়ে দেওয়া হয় ৪০ হাত লম্বা একটি সাদা কাপড়, পাগড়ি হিসেবে ব্যবহারের জন্য; আর বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গেলে নতুন বরকে দেওয়া হয় পাঁচ হাত পাগড়ির কাপড় ও এক সের শুঁটকি।
বমদের দিকে এলে ছবি আর সংখ্যা আছে, নাম নেই।
প্রথম আলোর ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর ছবিঘর “কোমরতাঁতে বম নারীরা” (আলোকচিত্র: মংহাইসিং মারমা) বান্দরবানের বম পাড়ায় তোলা নয়টি ছবি। ক্যাপশনগুলোতে যা যা আছে: সুতোর জট এড়াতে দুই পাশে বোতলে জড়িয়ে সুতো আলাদা করে গোল করে রাখা; কচি বাঁশের আগায় সুতো পেঁচিয়ে নেওয়া; মাফলার বুনছে এক কিশোরী; কম্বল বুনছেন এক নারী; আর তৈরি হয়ে যাওয়া কম্বল-মাফলার শৈলপ্রপাত পর্যটনকেন্দ্রে বিক্রির জন্য সাজানো হচ্ছে।
একটি ক্যাপশনে পোশাকটির একটা নাম আছে — “বোনার জন্য প্রস্তুত করে রাখা বম জনগোষ্ঠীর মেয়েদের পরিহিত থামি”। কিন্তু ‘থামি’ শব্দটা বম ভাষার নয়; এটি মারমা ও বার্মিজ প্রচলনের শব্দ, যা নিয়ে আলাদা লেখা আছে মারমা থামি ও আংগি নিয়ে। বাংলা প্রতিবেদনে পাহাড়ি নারীদের যেকোনো নিম্নাঙ্গের কাপড়কেই প্রায়ই ‘থামি’ বলা হয়। বম ভাষায় কাপড়টির নিজের নাম কী — এই ক্যাপশনে নেই, অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উৎসেও পাইনি।
The Daily Star-এর ওই প্রতিবেদনে বয়নে দক্ষ সম্প্রদায়ের তালিকায় “Byom” অর্থাৎ বমদের নাম আছে; ম্রোদের নাম নেই। আর জুমজার্নালের আর্কাইভে বমদের বয়ন নিয়ে যা আছে, তা একটিমাত্র বাক্য, এবং সেটি অতীত কালে লেখা: “অতীতে বম সমাজের নারীরা গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি তাঁত বস্ত্র তৈরি, পশুপালন ও জুম চাষাবাদের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ছিল।”
এই শূন্যতাটা যে অনিবার্য ছিল না, সেটা বোঝা যায় পাশের একটি জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে। “পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত”-তে পাংখোয়া নারী ও পুরুষের পোশাকের পূর্ণ নামতালিকা আছে — মাপসহ, বাংলা অর্থসহ। বম ও পাংখোয়ারা একই বর্ণমালা ব্যবহার করে, একই সময়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে, দুই ভাষাই কুকি-চিন পরিবারের। তবু একটির পোশাক পুরোপুরি লিপিবদ্ধ, অন্যটির একেবারেই নয়। পাংখোয়াদের নামগুলো বমদের বেলায় খাটবে ধরে নেওয়া যায় না — আলাদা জনগোষ্ঠী, আলাদা ভাষা — তাই সেগুলো এখানে লিখছি না। কিন্তু ফাঁকটা যে গবেষণার অভাবের, ঐতিহ্যের অভাবের নয়, সেটা এতে স্পষ্ট।
নাম না থাকলেও বম সমাজে কাপড়ের একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় গুরুত্ব নথিভুক্ত আছে, আর সেটা বেশ অস্বাভাবিক।
“বম জাতির আদ্যোপান্ত”-তে খুয়া-টেম বা পাড়াশুদ্ধি — গ্রাম শুচিকরণের অনুষ্ঠানটির বিবরণে বলা হয়েছে, ওই দিন “গ্রামের কারো বাড়ির উঠানে, আঙিনায় বা চালে এক টুকরো কাপড়ও টাঙানো থাকতে পারবে না।” কারণ হিসেবে লেখা: “কোনো কাপড়-চোপড় বিশেষ করে মেয়েদের পরিধানের বস্ত্র ঘরের বাইরে থাকলে তা এই ‘পাড়াশুদ্ধি’ বা গ্রাম শুচিকরণ অনুষ্ঠানকে অকার্যকর করে দেয়।” এমনকি পিঠে করে লাউয়ের খোলে পানি আনার সময় কারও পিঠ বা কাপড় ভিজে গেলেও অনুষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়ে যায়।
অর্থাৎ কাপড় এখানে নিছক পরিধেয় নয় — একটি গোটা গ্রামের আচার সফল হবে কি হবে না, তা ঠিক হচ্ছে কাপড় কোথায় আছে তার উপর।
উল্টো দিকে, পোশাক আনুষ্ঠানিক মর্যাদারও চিহ্ন। বমদের সিয়া কী দেং বা শিং নৃত্য — বিখ্যাত মৃত ব্যক্তির স্মরণে অতি ব্যয়বহুল ভোজ-উৎসব — সম্পর্কে আর্কাইভে লেখা, নর্তকেরা “মাথায় পাগড়িসহ উত্তম পোশাক পরিধান করে একক অথবা সমবেতভাবে নৃত্য পরিবেশন করে।” ওই একই লেখায় উদ্ধৃত একটি বম গীতের পঙ্ক্তিতে কন্যার গলায় “জোড়া পুঁতির মালা” ঝনঝনিয়ে ওঠে। বম পোশাক ও অলংকারের যেটুকু ছবি আমাদের কাছে আছে, তার অনেকটাই এসেছে গান আর নৃত্যের বর্ণনা থেকে — পোশাকের বর্ণনা থেকে নয়।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৪ আগস্ট ২০২৬