icon

পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ

Jumjournal

Published on Oct 6th, 2026 icon 6

রাঙামাটির রাঙাপানি গ্রামে একজন নারী মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছেন। তাঁর কোমরের পেছনে চামড়ার একটি চওড়া বেল্ট, সেখান থেকে টান টান হয়ে সুতোর পাল্লা চলে গেছে সামনের একটি কাঠের গোঁজ পর্যন্ত। তাঁতটি কোনো কাঠামোয় বসানো নয় — তাঁতের এক প্রান্ত তিনি নিজে। শরীর সামান্য পেছনে হেলালে টান বাড়ে, সামনে ঝুঁকলে ঢিল পড়ে। এই টান-ঢিলের হিসাবেই ঠিক হয় কাপড়টা মিহি হবে না মোটা।

এই তাঁতের নাম বেইন। আর এতে যে কাপড় ওঠে, তার সবচেয়ে পরিচিত রূপ পিনন হাদি। বাংলা ইন্টারনেটে পিনন হাদি নিয়ে যা পাওয়া যায় তার প্রায় সবটাই “ঐতিহ্যবাহী পোশাক” বলে থেমে যায় — কিন্তু কীভাবে বোনা হয়, তাঁতের অংশগুলোর নাম কী, রঙ কোথা থেকে আসে, একটা পিনন তুলতে কত দিন লাগে আর তাতে তাঁতির কত থাকে — এসব প্রশ্নের উত্তর কোথাও একসাথে নেই। এই লেখাটা সেই ফাঁকটা ভরাট করার চেষ্টা।

সূচিপত্র
  1. বেইন কী, আর কোমর-তাঁত আসলে কীভাবে দাঁড়ায়
  2. তাঁতের অংশগুলোর নাম কী কী
  3. সুতা থেকে কাপড়: ধাপগুলো কী
  4. রঙ কোথা থেকে আসে
  5. আলাম: নকশার নিজস্ব ব্যাকরণ
  6. এক তাঁত, আলাদা পোশাক: সম্প্রদায়ভেদে পার্থক্য
  7. একটি পিনন বুনতে কত সময়, তাঁতি কত পান
  8. বেইন টেক্সটাইল ও বাণিজ্যিকীকরণ: কী বদলেছে
  9. যা এখনো জানা যায়নি
  10. সচরাচর জিজ্ঞাসা

বেইন কী, আর কোমর-তাঁত আসলে কীভাবে দাঁড়ায়

ইংরেজিতে একে বলে backstrap loom — পিঠ-বন্ধনী তাঁত। বাংলায় সাধারণত লেখা হয় “কোমর তাঁত”। যন্ত্র হিসেবে এটি অসম্ভব সরল: কয়েকটি বাঁশের কাঠি, একটি বেল্ট, আর টান ধরে রাখার জন্য একটি স্থির খুঁটি বা দেয়াল। বাংলাদেশ ও ভারতের সমতলের হস্তচালিত তাঁতে যেমন কাঠের বড় ফ্রেম, প্যাডেল আর বসার আসন থাকে, বেইনে তার কিছুই নেই।

সরলতার দাম আছে। ফ্রেম-তাঁতে টান ঠিক রাখে যন্ত্র; বেইনে টান ঠিক রাখে তাঁতির শরীর। ফলে কাপড়ের সমতা পুরোপুরি নির্ভর করে তাঁতি কতক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকতে পারছেন তার উপর। রাঙামাটির রাঙাপানি গ্রামে ৭৫টি তাঁতি পরিবারের উপর চালানো একটি জরিপে গবেষকেরা লিখেছেন, উত্তরদাতাদের মধ্যে কোমরব্যথা, পেশিতে টান, মাথাব্যথা আর চোখের সমস্যা প্রায় সর্বজনীন — এবং এগুলো সরাসরি এই বসার ভঙ্গি ও দীর্ঘ সময়ের সঙ্গে যুক্ত (Chakma, Muzib & Akter 2022)।

বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, চাকমা ঘরের “নান্দনিকভাবে সবচেয়ে পরিচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ বস্তু” হলো বেইন। সেখানে আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি চাকমা মেয়েকে বুনন শেখান তার মা ও গুরুজনেরা, আর দক্ষতাটি পরিবারের ভেতরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়। বুননের এই দক্ষতাকে “ভালো স্ত্রী ও ভালো মায়ের যোগ্যতা” হিসেবে দেখা হতো, এবং বয়নশিল্পের সঙ্গে একধরনের আধ্যাত্মিক মূল্য জড়িয়ে আছে (Banglapedia, Art and Crafts)।

এই শেষ বাক্যটা খেয়াল করার মতো। বেইন এখানে নিছক একটা কাজের যন্ত্র নয় — এটি বিয়ের বাজারে একটি সামাজিক মাপকাঠিও ছিল। সেই কারণেই বুনন-দক্ষতার পতন কেবল অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, সামাজিক ভূমিকারও বদল।

বম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবনচিত্র
বম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবনচিত্র। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

তাঁতের অংশগুলোর নাম কী কী

জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত “চাকমা জাতি” লেখাটিতে বুননের সরঞ্জামকে বলা হয়েছে সজপদর, এবং তার অংশগুলোর একটি নামতালিকা দেওয়া আছে:

অংশের নাম (চাকমা)তালিকায় যেভাবে আছে
তাগলক · বিয়োঙ · তারাম · ব-কাদিসজপদর-এর অন্তর্ভুক্ত
সুচ্ছেক বাঁশ · সিয়েং · তাম্মে বাঁশবাঁশের অংশ
তাচ্ছিচাম · কুদুক কাদাক · ঠুটচুমো (থুচ্চুমো)সজপদর-এর অন্তর্ভুক্ত
চরগা · চোরগি · রিবেঙ · নাদেইসজপদর-এর অন্তর্ভুক্ত
বেইনো ভেরা · রিঝি · রদং · লেভলেভি · মুমসজপদর-এর অন্তর্ভুক্ত

এখানে একটি সরাসরি বিরোধ আছে, যা চেপে যাওয়া ঠিক হবে না। বাংলাপিডিয়া লিখেছে বেইনের “প্রধান অংশ বারোটি, প্রায় সবগুলোই বাঁশ ও ছাও সুপারি গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি”। অথচ উপরের তালিকায় নাম আছে আঠারোটির মতো। দুটোই ভুল নাও হতে পারে — বাংলাপিডিয়া বলছে “প্রধান অংশ”, অর্থাৎ কাঠামোগত অংশ; আর তালিকাটি সম্ভবত সহায়ক সরঞ্জামসহ পুরো সেট ধরেছে। তবু কোনটি “অংশ” আর কোনটি “সরঞ্জাম”, সেই সীমারেখাটা কোনো উৎসেই স্পষ্ট করা নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

উপাদান নিয়ে দুই উৎস অবশ্য একমত: বাঁশ প্রধান, আর সঙ্গে সুপারি গাছের কাঠ। এটা নিছক সহজলভ্যতার প্রশ্ন নয় — বাঁশ হালকা, সোজা আর টানে সামান্য নমনীয়, যা কোমর-তাঁতের জন্য জরুরি। ভারী কাঠ হলে তাঁতির শরীরের উপর চাপ আরও বাড়ত।

সুতা থেকে কাপড়: ধাপগুলো কী

রাঙাপানির জরিপ অনুযায়ী কাপড় তৈরির ধাপগুলোর মধ্যে “প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টি হলো রং করা”। কাঁচামাল হিসেবে গবেষকেরা যা উল্লেখ করেছেন: মোম, তুলা, সুতা ও বাঁশ। এর বেশিরভাগ তাঁতিরা ঘরেই তৈরি করেন, কিছু বাজার থেকে কেনেন। জরিপের ১৮.৩ শতাংশ তাঁতির নিজে কাঁচামাল প্রস্তুতের দক্ষতা নেই — তাঁরা সবটাই বাজার থেকে কেনেন; বাকিরা নিজেরাই বানান।

একই গবেষণা বলছে, রং করার প্রক্রিয়াটি শেষ হতে এক থেকে দেড় সপ্তাহ লাগে। এটি বোনার সময়ের বাইরে — অর্থাৎ তাঁতে ওঠার আগেই সুতোর পেছনে দেড় সপ্তাহ চলে যায়।

আগে কাঁচামালের উৎসও ছিল ভিন্ন। গবেষকেরা লিখেছেন, কয়েক দশক আগে তাঁতিরা জুম চাষের মাধ্যমেই পোশাকের কাঁচামাল ফলাতেন — অর্থাৎ তুলা জুমক্ষেতের একটি ফসল ছিল। আজ উল ও রেয়ন ব্যবহৃত হয়। জুমের সঙ্গে বয়নের এই সংযোগটি গুরুত্বপূর্ণ: জুম চাষ কমে যাওয়া মানে কেবল খাদ্যের প্রশ্ন নয়, বস্ত্রের কাঁচামালের শৃঙ্খলও ছিঁড়ে যাওয়া।

আজকের ছবিটা আলাদা। ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত লেখাটিতে বলা হয়েছে, “বর্তমানে ত্রিপুরা রমণীরা রং করা বিভিন্ন রঙের সুতা ক্রয় করে কাপড় বোনে” — অর্থাৎ রং করার ধাপটাই অনেক ঘরে বাদ পড়ে গেছে, বাজার থেকে রঙিন সুতা কিনে সরাসরি তাঁতে ওঠানো হচ্ছে।

রঙ কোথা থেকে আসে

প্রাকৃতিক রঙের উৎস নিয়ে নির্দিষ্ট নাম পাওয়া কঠিন, কারণ বেশিরভাগ লেখা “গাছের পাতা ও বাকল” বলে সাধারণীকরণ করে ফেলে। একটি নির্দিষ্ট নাম অবশ্য আমাদের নিজস্ব আর্কাইভে আছে: ত্রিপুরাদের প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, “কালমা নামক গাছের পাতা ও অন্যান্য গাছের পাতা ও গাছের বাকলা দিয়ে রং তৈরি করা হয়ে থাকে।”

রঙের ব্যবহারেও সম্প্রদায়ভেদে স্পষ্ট পার্থক্য আছে, এবং সেটি নকশার চেয়েও দ্রুত চোখে পড়ে:

  • ত্রিপুরা: সব গোত্রের পোশাকে লাল, কালো, নীল, হলুদ ও সাদা — তবে “লাল ও কালো রঙটাই অধিক ব্যবহার” (জুমজার্নাল আর্কাইভ)।
  • চাকমা: বাংলা উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় প্রচলিত রঙ কালো, তার উপর “সূক্ষ্ম নীল রেখা ও লাল রেখার নকশা”।
  • তঞ্চঙ্গ্যা: বাংলাপিডিয়ায় পিনন/পিনুইনকে বলা হয়েছে “সাত রঙা হাতে-বোনা কাপড়”, আর উল্লেখ আছে যে তাঁরা “দেশীয় পোশাক তৈরিতে সাদা সুতা সবচেয়ে কম ব্যবহার করেন”।

শেষ পয়েন্টটি লক্ষণীয়। “সাদা সুতা সবচেয়ে কম” — এটি নান্দনিক পছন্দ, নাকি সাদা রঙের সঙ্গে যুক্ত কোনো সামাজিক অর্থ, তা উৎসে ব্যাখ্যা করা নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

আলাম: নকশার নিজস্ব ব্যাকরণ

পাহাড়ি বয়নের সবচেয়ে কম-আলোচিত অথচ সবচেয়ে চমকপ্রদ জিনিসটি হলো আলাম। এটি পরার কাপড় নয়। জুমজার্নালের আর্কাইভে একে বলা হয়েছে “নানা রঙের নানা ডিজাইনের ফুলে বোনা একটি কাপড়… এটিকে বলা যেতে পারে ডিজাইন ক্লথ। এটা নারীরা তাদের বুনন কাজে ব্যবহার করে।”

অর্থাৎ আলাম হলো নকশার নমুনা-খাতা — কাগজে নয়, কাপড়ে। বাংলাপিডিয়া এই জিনিসটির কার্যপদ্ধতি আরও স্পষ্ট করে: “আট বছর বয়সের কাছাকাছি একটি মেয়েকে নানা নকশা শিখতে উৎসাহ দেওয়া হয়, যেগুলো তার মা তাকে দেখান একটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বোনা নমুনা-সংকলন থেকে। একে বলা হয় আলাম।”

একটি আলামে কতগুলো নকশা থাকে? রাঙাপানির জরিপে সংখ্যাটি দেওয়া আছে: প্রতিটি আলামে বর্তমানে ৯৬ থেকে ১১৫টি নকশা সংরক্ষিত। গবেষকেরা আলামকে “চাকমা ঐতিহ্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলোর একটি” বলেছেন।

নকশার নামগুলো আসে মূলত ফুল থেকে। একই গবেষণায় উদাহরণ হিসেবে যেগুলোর নাম দেওয়া আছে: ঝোরাফুল, জংলিপাজন, মণিপুরী ফুল, এদো-দাতফুল, বেগুন বিজিফুল। ইংরেজি প্রতিবেদনে নামগুলো প্রতিবর্ণীকৃত অবস্থায় আছে (JhoraPhul, JongliPajon, Manipuri Flower, Edo-datPhul, Begun BijiPhul), তাই বাংলা বানানের নির্ভুল রূপ যাচাই করা দরকার। [যাচাই প্রয়োজন]

এই নামকরণের একটা ফল আছে যা সহজে চোখে পড়ে না: নকশা যখন নাম পায়, তখন সেটি আর কেবল অলংকরণ থাকে না — তা হয়ে ওঠে একটি ভাগ করা শব্দভাণ্ডার। এক তাঁতি আরেকজনকে বলতে পারেন কোন নকশাটি তুলতে হবে, লিখিত নকশা ছাড়াই।

এক তাঁত, আলাদা পোশাক: সম্প্রদায়ভেদে পার্থক্য

কোমর-তাঁত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সব জনগোষ্ঠীতেই আছে, কিন্তু তাতে ওঠা পোশাকের নাম, গঠন ও নকশা আলাদা। একটিকে অন্যটির “রূপভেদ” বলে চালানো সবচেয়ে সাধারণ ভুল।

জনগোষ্ঠী নিচের অংশ উপরের অংশ অন্যান্য
চাকমা পিনোন খাদি (বক্ষবন্ধনী) কাগই, খবং (পাগড়ি), আলাম
তঞ্চঙ্গ্যা পিনন / পিনুইন (সাত রঙা) খাদি; কেবোই (হাতাওয়ালা জামা) খাবং, ফাদুরি/ফাদুই (সাদা কোমরবন্ধ)
মারমা থবিং / থবিইং (থামি) বেদাই আংগি; রাংগাই আংগি (বক্ষবন্ধনী) খাঃগ্রোঃ (রুপার কোমরবন্ধ), গবং
ত্রিপুরা রিনাই রিসা (বক্ষবন্ধনী), কুবাই রিসা পাগড়ি হিসেবেও ব্যবহৃত

ত্রিপুরাদের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যটি আরও গভীরে যায়। জুমজার্নালের আর্কাইভে রিনাইয়ের কয়েকটি ধরনের নাম দেওয়া আছে — রিনাই চাঙগ্রং, রিনাই খাইচৈংতৈ, রিনাই নাগি, রিনাই কলফ, রিনাই বেখ:, য়ংসা রিনাই; আর রিসার ধরন — খাজা রিসা, বখরুক রিসা, চাঙ রিসা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি হলো: “ত্রিপুরা রমণীর পোশাক রিনাই-রিসার নকশার বিন্যাস দেখে কে কোন দফার রমণী তা অনায়াসেই চিহ্নিত করা যায়।” অর্থাৎ নকশা এখানে পরিচয়পত্রের কাজ করে — দফা বা গোত্র চেনা যায় কাপড় দেখে।

বিস্তারিত জানতে দেখুন মারমা জাতির আদ্যোপান্ত এবং তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত।

একটি বিতর্কিত দাবি এখানে উল্লেখ করা দরকার। বাংলা উইকিপিডিয়ার পিনন হাদি পাতায় লেখা আছে, পোশাকটির ধরন এসেছে ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসা থেকে। দাবিটির সমর্থনে ওই পাতায় যে তিনটি সূত্র দেওয়া আছে সেগুলো মূলত ভারতের জনগোষ্ঠী-সমীক্ষা ও একটি সম্পাদিত সংকলন — পোশাকের উৎস-সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট গবেষণা নয়। এই উৎপত্তি-দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। [যাচাই প্রয়োজন]

একটি পিনন বুনতে কত সময়, তাঁতি কত পান

এটিই সেই প্রশ্ন, যার উত্তর প্রায় কোনো বাংলা লেখায় নেই। রাঙাপানি গ্রামের জরিপ থেকে কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়।

সময়: গবেষকদের ভাষায়, “একটি পূর্ণ পিনন সেটের জন্য ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ অবিচ্ছিন্ন মনোযোগ ও নিরলস শ্রম দরকার।” এর সঙ্গে যোগ করুন রং করার এক থেকে দেড় সপ্তাহ। অর্থাৎ শূন্য থেকে একটি পিনন সেট দাঁড়াতে বাস্তবে এক মাসের বেশি সময় লাগে।

আয়: জরিপের ৭৫টি পরিবারের আনুমানিক পারিবারিক আয়ের বিন্যাস —

আয়ের স্তরপরিবারশতাংশ
10,000-এর নিচে1520.0%
20,000-এর নিচে1114.7%
30,000-এর নিচে3749.3%
40,000-এর নিচে1216.0%

মূল প্রতিবেদনে এই সংখ্যাগুলোর একক নিয়ে অসঙ্গতি আছে — কোথাও ডলার চিহ্ন, কোথাও “tk.” লেখা। প্রসঙ্গ বিচারে এগুলো টাকায় মাসিক পারিবারিক আয় বোঝাচ্ছে বলেই মনে হয়, কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। [যাচাই প্রয়োজন]

সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অনুপাত:

  • ৭৭.৩ শতাংশ বয়ন-নির্ভর পরিবারের আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই। অর্থাৎ তাঁত বন্ধ হলে বিকল্প নেই।
  • ৬৬.৭ শতাংশের শিক্ষা প্রাথমিক পর্যন্ত — ফলে পেশা বদলের সুযোগও সীমিত।
  • ৮৮ শতাংশ তাঁতির চাষযোগ্য জমি আছে, ৯০ শতাংশ কৃষিকাজেও যুক্ত। বয়ন তাই বহু ঘরে একমাত্র নয়, বরং দ্বিতীয় স্তম্ভ।
  • ৬৯.৩ শতাংশ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, গড় সুদের হার প্রায় ৮ শতাংশ। রাঙামাটিতে সরকার-নিবন্ধিত এনজিওর সংখ্যা ৪২।

গবেষকদের উপসংহারটি সরাসরি: স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো তাঁতিদের পণ্য কিনে “চড়া দামে” পুনর্বিক্রয় করে; তাঁতিরা ব্যবসার ধরন বা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বিক্রির কৌশল না জানায় “কম দামে পাইকারি বিক্রি করেন, আর স্থানীয় ব্র্যান্ড সেই পণ্যই শোরুমে উঁচু দামে বিক্রি করে।”

বেইন টেক্সটাইল ও বাণিজ্যিকীকরণ: কী বদলেছে

ঘরের তাঁত থেকে দোকানের তাক — এই যাত্রার একটি নির্দিষ্ট নাম আছে। জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত মঞ্জুলিকা চাকমাকে নিয়ে লেখাটি এই ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তারিত বাংলা বিবরণগুলোর একটি।

সংক্ষেপে ঘটনাক্রম: মঞ্জুলিকা চাকমার জন্ম ১৯৪৪ সালে রাঙামাটিতে, বাবা কালীরতন খীসা ও মা পঞ্চলতা খীসার ঘরে। পঞ্চাশের দশকে তাঁর মা বাড়ির কোমর-তাঁতে টেবিল ও পর্দার কাপড়, নারীদের শাল ইত্যাদি বুনে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বিক্রি করতেন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল করিমের নজরে পড়ায় এই বস্ত্রশিল্পের বিকাশে উৎসাহ মেলে।

এরপরের ধাপটিই কারিগরিভাবে নির্ণায়ক। ১৯৬৫ সালে মাত্র দুটি তাঁত জোগাড় করে তিনি কোমর-তাঁতের বুনন পদ্ধতি হস্তচালিত তাঁতে প্রয়োগ করেন — অর্থাৎ কোমর-তাঁতের নকশা ও কৌশল ফ্রেম-তাঁতে অনুবাদ করেন। ১৯৭৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি এই কাজে নামেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন বেইন টেক্সটাইল।

এই “অনুবাদ”-টিই বাণিজ্যিকীকরণের চাবি। কোমর-তাঁতে একজন তাঁতি এক মাসে একটি সেট তোলেন; হস্তচালিত তাঁতে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ে। কিন্তু একই সঙ্গে কাপড়টি আর ঠিক আগের জিনিসটি থাকে না — টান, ঘনত্ব ও প্রান্তের চরিত্র বদলে যায়। আজ বাজারে “পিনন” নামে যা বিক্রি হয় তার কতটা কোমর-তাঁতের আর কতটা ফ্রেম-তাঁতের, সেই ভাগটা কোনো উৎসেই আলাদা করে দেওয়া নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

পরিসরের কিছু সংখ্যা ওই লেখাটিতেই আছে: রাঙামাটি শহর ও আশপাশে প্রায় ৭ হাজারের বেশি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, যাঁদের ৯০ শতাংশই নারী; তিন পার্বত্য জেলায় গড়ে ওঠা কারখানার সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। রাঙাপানির গবেষণাপত্রে ব্র্যান্ড হিসেবে নাম এসেছে Baintextile, Banani Textile ও Boyan Textile-এর।

তবে ওই একই লেখায় মঞ্জুলিকা চাকমার নিজের মূল্যায়নটি অনেক বেশি সংযত। তিনি বলেছেন, নতুন করে তাঁত কারখানা গড়ে উঠছে না; যাঁরা কাপড়ের ব্যবসা করছেন তাঁরা “তাঁতের কাপড় দিয়ে নয়” — বিভিন্ন জায়গা থেকে কাপড় কিনে এনে বুটিক ও ব্লক করে বিক্রি করছেন। বিক্রি নির্ভর করে পর্যটকের উপর, আর দক্ষ কারিগর পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

দুটি ছবি তাই পাশাপাশি রাখা দরকার: শিল্প হিসেবে পাহাড়ি বস্ত্র আজ দেশে-বিদেশে পরিচিত; আর কারিগর হিসেবে বেইনের তাঁতি এখনো মাসে ৩০ হাজারের নিচে আয় করা পরিবারেই থাকেন।

যা এখনো জানা যায়নি

এই লেখাটি লিখতে গিয়ে যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, সেগুলো গোপন না করে এখানে রাখা হলো।

  • বেইনের অংশ কয়টি — বাংলাপিডিয়া বলছে ১২টি প্রধান অংশ, আমাদের আর্কাইভের তালিকায় ১৮টির মতো নাম। কোনটি কাঠামোগত অংশ আর কোনটি সহায়ক সরঞ্জাম, সেই সীমারেখা কোনো উৎসে স্পষ্ট নয়।
  • অংশগুলোর কাজ — নামের তালিকা আছে, কিন্তু তাগলক বা রিবেঙ ঠিক কোন কাজটি করে, তার কোনো বর্ণনা কোথাও পাওয়া যায়নি। এটি মাঠ-নথিভুক্তি ছাড়া পূরণ হবে না।
  • প্রাকৃতিক রঙের গাছের তালিকা — একটিমাত্র নাম (“কালমা”) পাওয়া গেছে, এবং সেটিও ত্রিপুরা প্রসঙ্গে। কোন গাছ থেকে কোন রঙ, কোন সম্প্রদায়ে — সেই তালিকা তৈরি হয়নি।
  • নকশার নামের পূর্ণ তালিকা — একটি আলামে ৯৬ থেকে ১১৫টি নকশা থাকে বলে জানা গেছে, কিন্তু নামসহ কোনো তালিকা প্রকাশিত অবস্থায় নেই। পাঁচটি নাম পাওয়া গেছে, তাও ইংরেজি প্রতিবর্ণীকরণে।
  • ম্রো ও বম বস্ত্র — এই দুই জনগোষ্ঠীর বয়ন নিয়ে ব্যবহারযোগ্য কোনো নির্ভরযোগ্য বিবরণ এই দফায় পাওয়া যায়নি, তাই উপরের ছকে তাদের রাখা হয়নি। বানিয়ে লেখার চেয়ে বাদ রাখা ভালো।
  • জিআই স্বীকৃতি — পিনন হাদি ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে কি না তা যাচাই করতে গিয়ে কোনো সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। তাই এখানে সে দাবি করা হয়নি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

পিনন আর হাদি কি একই জিনিস?
না। পিনন হলো কোমর থেকে নিচের অংশে পরার কাপড়, আর হাদি (বা খাদি) উপরের অংশের। দুটি আলাদা কাপড়, একসঙ্গে পরা হয় বলে “পিনন হাদি” একটি জোড়া নাম হিসেবে প্রচলিত হয়েছে।

বেইন আর সাধারণ হস্তচালিত তাঁতের পার্থক্য কী?
হস্তচালিত তাঁতে সুতোর টান ধরে রাখে কাঠের ফ্রেম। বেইনে টান ধরে রাখে তাঁতির নিজের শরীর — এক প্রান্ত বাঁধা থাকে কোমরে, অন্য প্রান্ত একটি স্থির খুঁটিতে। তাই বেইনে কাপড়ের সমতা তাঁতির বসার ভঙ্গির উপর নির্ভর করে, এবং শারীরিক ধকলও অনেক বেশি।

একটি পিনন বুনতে কত সময় লাগে?
রাঙামাটির রাঙাপানি গ্রামে চালানো জরিপ অনুযায়ী একটি পূর্ণ পিনন সেটের জন্য ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ একটানা কাজ দরকার। এর আগে সুতা রং করার প্রক্রিয়াতেই লাগে আরও এক থেকে দেড় সপ্তাহ।

আলাম জিনিসটা কী?
আলাম পরার পোশাক নয় — এটি নকশার নমুনা-কাপড়, একধরনের বোনা ক্যাটালগ। মা থেকে মেয়ের কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে যায়, আর মেয়েরা প্রায় আট বছর বয়স থেকে এটি দেখে নকশা শেখে। একটি আলামে ৯৬ থেকে ১১৫টি নকশা পর্যন্ত থাকতে পারে।

পিনন কি শুধু চাকমারাই পরে?
না। তঞ্চঙ্গ্যা নারীরাও পিনন বা পিনুইন পরেন, তবে নকশা আলাদা এবং বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় তা “সাত রঙা”। মারমাদের সমতুল্য পোশাক থবিং ও আংগি, ত্রিপুরাদের রিনাই ও রিসা। তাঁত এক, পোশাক আলাদা।

তথ্যসূত্র

  1. Atoshi Chakma, Md Moniruzzaman Muzib & Shamima Akter, “The Impact of Backstrap Loom on Ethnic Community: A Study on Rangamati Hill District”, International Journal of Humanities and Social Science Invention (IJHSSI), Vol. 11, Issue 2, Ser. II, February 2022, pp. 38–43. DOI: 10.35629/7722-1102023843. পিডিএফ
  2. “Art and Crafts”, Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh, Asiatic Society of Bangladesh. লিংক
  3. Dinonath Tanchanga, “Tanchangya, The”, Banglapedia. লিংক
  4. Sadat Ullah Khan, “Marma, The”, Banglapedia. লিংক
  5. “পিনন হাদি”, বাংলা উইকিপিডিয়া. লিংক
  6. “চাকমা জাতি”, জুমজার্নাল আর্কাইভ — বুননের সরঞ্জাম (সজপদর), পোশাক ও আলামের বিবরণ। লিংক
  7. “আদিবাসী তাঁত বস্ত্র শিল্পের পথ প্রদর্শক মঞ্জুলিকা চাকমা”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক
  8. “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ — রিনাই-রিসার ধরন ও কালমা পাতার রঙ। লিংক
  9. “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ — থবিং, বেদাই আংগি, রাংগাই আংগি। লিংক
  10. “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক

সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
[DISPLAY_ULTIMATE_SOCIAL_ICONS]

আরও কিছু লেখা