icon

ত্রিপুরা ঢোল খা-অম ও উসুইদের খাইং: কী দিয়ে তৈরি, কোন অনুষ্ঠানে বাজে

Jumjournal

Last updated Nov 3rd, 2026 icon 1

খাগড়াছড়ির নন্দনকাননে গরিয়া নাচের একটি ছবিতে নাচিয়েদের বৃত্তের বাইরে এক যুবক দাঁড়িয়ে আছেন। গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো একটি লম্বাটে কাঠের ঢোল, দুই মুখে চামড়া, গায়ে আড়াআড়ি টানা ফিতা। ঢোলটির নাম ছবির বিবরণে নেই। ছাপা উৎসে ত্রিপুরাদের ঢোলের যে নাম পাওয়া যায়, তা খা-অম।

ত্রিপুরা ঢোল খা-অম সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া দুটি কথা বলে: এটি উসুইদের ঢোল খাইং-এর মতোই একটি ঢোল জাতীয় যন্ত্র, আর গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এটি বাজানো অপরিহার্য। খাইং-এর উপাদান উৎসে আছে: হালকা গামারি জাতীয় কাঠের ফ্রেম, তাতে বাঘ বা ছাগলের চামড়া। খা-অমের নিজস্ব উপাদান, মাপ বা বাজানোর ভঙ্গি বাংলাদেশের কোনো উৎসে আলাদা করে লেখা নেই।

এই লেখা কেবল ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঢোল নিয়ে: খা-অম, উসুই দফার খাইং, আর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসে “খাম” নামে যে ঢোলের বিবরণ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জনগোষ্ঠীর যন্ত্রের পূর্ণ তালিকা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা লেখায়; গরিয়া নাচের মুদ্রা, গান আর বৈসুর আচার-ক্রম আছে গরিয়া নৃত্য ও বৈসু লেখায়। এখানে সেগুলো আবার বলা হয়নি।

ত্রিপুরা ঢোল খা-অম: বাংলাপিডিয়া যা বলে

বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধের উপজাতীয় বাদ্যযন্ত্র অংশে ঢোল জাতীয় পাঁচটি নাম আছে: খাইং, খা-অম, বুঙ্গ, পেহ্‌ এবং গঙ্গ বা দারখোয়াং। এর মধ্যে খা-অম ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর, খাইং উসুই জনগোষ্ঠীর। খা-অম নিয়ে নিবন্ধে দুটি বাক্যই আছে, তার বেশি নয়।

বাংলা সংস্করণের বাক্য দুটি এরকম: খা-অম “খাইং-এর মতোই ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঢোল জাতীয় বাদ্যযন্ত্র”, এবং “গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে খা-অম বাজানো অপরিহার্য” (বাংলাপিডিয়া, বাদ্যযন্ত্র)। ইংরেজি সংস্করণে বাক্যটি একটু আলাদা: ত্রিপুরারা kha-am বাজান “during the Garaiya religious festivals and functions” (Banglapedia, Musical Instruments)। ইংরেজি সংস্করণে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কথা নেই, আর “অপরিহার্য” শব্দটিও নেই।

নামটির বানানও লক্ষ করার মতো। বাংলায় হাইফেন দিয়ে “খা-অম”, ইংরেজিতে “kha-am”। এই বানান অন্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। জুমজার্নালের আর্কাইভ আর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসগুলো যে ঢোলের কথা বলে, তার নাম লেখা হয়েছে খাম, kham বা khamb। নামের এই প্রশ্নে পরে আলাদা অংশ আছে।

খা-অমকে “ঢোল জাতীয়” বলার অর্থ: বাংলাপিডিয়া এটিকে বাঁশি, বেহালা-জাতীয় বা তারযন্ত্রের দলে রাখেনি, রেখেছে চামড়ার ঢোলের দলে, মারমাদের বুঙ্গ আর উসুইদের খাইং-এর পাশে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য ঢোলগুলোর মাপ ও উপাদানের ছক আছে বাদ্যযন্ত্রের তালিকার ঢোল অংশে।

খা-অম আর খাইং কী দিয়ে তৈরি

খা-অমের উপাদান কোনো বাংলাদেশি উৎসে আলাদা করে লেখা নেই; বাংলাপিডিয়া কেবল বলেছে এটি খাইং-এর মতো। খাইং-এর বিবরণ আছে: হালকা গামারি জাতীয় কাঠের ফ্রেমে বাঘ বা ছাগলের চামড়া, উসুইরা তৈরি করেন “নিজস্ব কারিগরি কৌশলে”। ভারতের উৎসে খাম ঢোলের বিবরণ আরও বিস্তারিত: কাঠের খোল, দুই মুখে ছাগলের চামড়া।

খাইং: কাঠ আর চামড়া

বাংলা বাংলাপিডিয়া লিখেছে, খাইং “বাঘ বা ছাগলের চামড়া এবং হালকা গামারি জাতীয় কাঠের ফ্রেম দিয়ে তারা নিজস্ব কারিগরি কৌশলে তৈরি করে।” ইংরেজি সংস্করণেও একই: “The frame is made of light gamari wood over which the skin of a tiger or goat is stretched.” পার্বত্য চট্টগ্রামের যন্ত্রগুলোর মধ্যে কাঠের প্রজাতির নাম কেবল এই একটি যন্ত্রের বেলাতেই পাওয়া যায়, যন্ত্রের তালিকার উপাদান-ছকেও তা দেখা যায়।

“কারিগরি কৌশল” কী, অর্থাৎ খোল কীভাবে খোদাই হয়, চামড়া কীভাবে শুকানো ও টানা হয়, কোন দড়ি বা ফিতায় বাঁধা হয়, সে বিবরণ বাংলাপিডিয়ায় নেই। বাঘের চামড়ার কথাটি পুরোনো চর্চার বিবরণ কি না, তাও উৎসে বলা নেই।

খাম: ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসে

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসে “খাম” নামের ঢোলের গড়ন নিয়ে কয়েকটি বর্ণনা আছে। সবচেয়ে বিস্তারিতটি ইংরেজি উইকিপিডিয়ার পুরোনো “Musical instruments of Tripura” নিবন্ধের, যার একটি অনুলিপি en-academic সাইটে রয়ে গেছে (আর্কাইভ কপি)। সেখানে লেখা:

  • ত্রিপুরীদের খাম দুই মুখের ঢোল, পিপার মতো গড়ন, দুই মুখের চামড়া মোটামুটি সমান মাপের।
  • খোলটি “Gamai (Teak)” বা অন্য গাছের গুঁড়ি খুঁড়ে বানানো।
  • দুই মুখে ছাগলের চামড়া, পাকানো চামড়ার বেড় দিয়ে আটকানো; সেই বেড়ে ভর করে খোলের চারপাশে আড়াআড়ি চামড়ার ফিতা টেনে চামড়া কষা হয়।

বর্তমান ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Kham (instrument)” পাতা সংক্ষেপে বলে, খাম কাঠ ও ছাগলের চামড়ায় তৈরি, মোটামুটি নলাকার, দুই প্রান্তে একটি করে চামড়ার পর্দা (Kham (instrument))। “Music of Tripura” পাতায় আছে “কাঠ ও পশুর চামড়ায় তৈরি” খামের কথা (Music of Tripura)। আগরতলার ত্রিপুরা স্টেট ট্রাইবাল মিউজিয়ামের নিদর্শন-তালিকায় খামের বিবরণ এক লাইনের: দুটি চামড়ার পর্দা টেনে তৈরি ঢোল (Tripura State Tribal Museum)।

বরক টাইমসের একটি লেখা (নিধি মিশ্র, 10 জুলাই 2023) খামকে বলেছে কাঠের নলাকার ঢোল, দুই মুখে পশুর চামড়া (Borok Times)। কোন কাঠ, কোন পশুর চামড়া, সেখানে নেই।

সাদা পোশাক পরা এক যুবক গলায় দড়িতে ঝোলানো দুই মুখের লম্বাটে কাঠের ঢোল বাজাচ্ছেন; ঢোলের গায়ে চামড়ার ফিতা টানা, পাশে লাল পোশাকে নাচছেন এক নারী
খাগড়াছড়ির নন্দনকাননে গরিয়া নৃত্যের সঙ্গে ঢোল বাজাচ্ছেন একজন বাদক, মে 2023 (মূল ছবির অংশ)। দুই মুখে চামড়া, গায়ে টানা ফিতা আর গলায় ঝোলানোর দড়ি দেখা যাচ্ছে। ছবির বিবরণে যন্ত্রটির স্থানীয় নাম নেই। ছবি: Ahidul hasan · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

গামারি আর “Gamai”

দুই দেশের দুই উৎসে কাঠের নাম কাছাকাছি শোনায়। বাংলাপিডিয়া খাইং-এর ফ্রেমকে বলেছে “গামারি জাতীয়” কাঠের, আর পুরোনো উইকিপিডিয়া নিবন্ধ খামের খোলকে বলেছে “Gamai (Teak)” বা অন্য গাছের গুঁড়ির। একই পুরোনো নিবন্ধ ত্রিপুরীদের আরেকটি যন্ত্র ওয়াখরাপের ভিত্তি তৈরির কাঠ হিসেবে গামাই, করই ও গর্জনের নাম দিয়েছে, আর লিখেছে এই গুঁড়িগুলো সংগ্রহ করা হয় জুম চাষ শুরুর আগে। দুই উৎসের “গামারি” আর “Gamai” একই গাছ কি না, কোনো উৎস তা বলেনি।

খাইং উসুইদের ঢোল, আর উসুই ত্রিপুরাদের একটি দফা

বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধ খাইংকে উসুই জনগোষ্ঠীর ঢোল বলেছে, উসুইকে ত্রিপুরা থেকে আলাদা নামে। অথচ বাংলাপিডিয়ার নিজেরই “ত্রিপুরা” নিবন্ধ এবং জুমজার্নালের আর্কাইভ উসুইকে ত্রিপুরাদের 36টি দফা বা গোত্রের একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তাই খাইংও ত্রিপুরা সমাজেরই একটি দফার ঢোল।

প্রভাংশু ত্রিপুরার লেখা বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধে 36টি দফার তালিকা আছে, তাতে উসুই, রিয়াং, জমাতিয়া, হালাম, মুরাসিং-সহ সব নাম (বাংলাপিডিয়া, ত্রিপুরা; ইংরেজিতে Tripuris, The)। আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত লেখাও 36 দফার তালিকায় উসুইকে রেখেছে, এবং লিখেছে বাংলাদেশে এর মধ্যে “সম্ভবত ১৩/১৪টি দফা” বাস করে, যাদের মধ্যে উসুই আছে।

“বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধে উসুইদের নামে আরও তিনটি যন্ত্র আছে: সেঁদা (ঘুঘুর বাসার মতো দেখতে, চামড়ায় ঢাকা কাঠের তিন তারের যন্ত্র), চং প্রেই (তিন তারের খোদাই করা কাঠের যন্ত্র) আর ফকির দাঙ্গাইস (ত্রিপুরা ও উসুই দুই জনেরই একতারা-জাতীয় যন্ত্র)। এগুলোর বিবরণ তালিকার লেখায় আছে। ঢোল বলতে উসুইদের নামে কেবল খাইং।

উসুইদের উৎসবের মধ্যে বাংলাপিডিয়া একটির নাম দিয়েছে: ফসল তোলার পর অন্নদাত্রী লক্ষ্মীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে মাইলুকমা উৎসব (বাংলাপিডিয়া, নবান্ন)। সেই উৎসবে খাইং বাজে কি না, বা খাইং কোন কোন অনুষ্ঠানে বাজে, কোনো উৎসে তা লেখা নেই। খাইং-এর বেলায় উৎস যা দেয় তা কেবল মাপ আর উপাদান; খা-অমের বেলায় উল্টো, কেবল উপলক্ষ।

খা-অম, খাম, kham: এক যন্ত্রের নানা বানান?

বাংলাপিডিয়া যন্ত্রটির নাম লিখেছে খা-অম ও kha-am। জুমজার্নালের আর্কাইভে ককবরক গীতিকার বিকাশ রায় দেববর্মা লিখেছেন খাম। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ইংরেজি উৎসে নামটি kham, কোথাও khamb। নামগুলো কাছাকাছি, সবকটিই ঢোল; তবে খা-অম আর খাম একই যন্ত্র, এমন কথা কোনো উৎস সরাসরি লেখেনি।

আর্কাইভের ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ লেখাটি বিকাশ রায় দেববর্মার, ককবরক থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সুনীল দেববর্মা। সেখানে খাম নামটি আসে যন্ত্রের একটি ভাগ বোঝাতে, আলাদা বিবরণ ছাড়া। লেখাটিতে ত্রিপুরা সরকার ও এডিসি প্রশাসনের উল্লেখ আছে, যা থেকে বোঝা যায় লেখক ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রেক্ষাপটে লিখছেন। এই লেখার আরও বিস্তারিত পাঠ আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র লেখায়।

ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Kham (instrument)” পাতা আরেকটি তথ্য দেয়: একই নামে যন্ত্রটি পরিচিত ডিমাসা, তিওয়া, বোড়ো-সহ কয়েকটি তিব্বতি-বর্মি জনগোষ্ঠীর মধ্যে। বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধ লিখেছে, ত্রিপুরাদের ভাষা ককবরক “দক্ষিণ বোডো শ্রেণিভুক্ত একটি প্রধান ভাষা”। এই দুই তথ্য পাশাপাশি রাখা যায়; তবে নামটির উৎপত্তি বা অর্থ নিয়ে কোনো উৎস কিছু বলেনি।

“খাম” শব্দটি চাকমা বা মারমা ঢোলের নামের সঙ্গে মেলে না। মারমাদের ঢোলের নাম বুঙ্গ, প্যাহ্‌, চে; চাকমাদের ঢুল, ডগর, তাক (আর্কাইভের বাদ্যযন্ত্র-পাঠ)। নামগুলোর এই ভিন্নতা থেকেই বোঝা যায় কেন এক জনগোষ্ঠীর যন্ত্রের কথা অন্য জনগোষ্ঠীর বেলায় খাটানো যায় না।

খাম কীভাবে বাজে: হাতে, কাঠিতে, গলায় ঝুলিয়ে

খা-অম কীভাবে বাজানো হয়, বাংলাদেশের কোনো উৎসে নেই। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের খাম নিয়ে উৎসগুলো দুই রকম কথা বলে। উইকিপিডিয়া লিখেছে খাম গলায় ঝোলানো বা কোমরে বাঁধা থাকে, বাজানো হয় হাতে। বরক টাইমস (2023) আর IJSDR পত্রিকার একটি প্রবন্ধ (2024) লিখেছে কাঠি দিয়ে চামড়ায় আঘাত করে বাজানো হয়।

বর্তমান “Kham (instrument)” পাতার বাক্য: খাম “is suspended from the neck, tied to the waist and played with the hands”। পুরোনো উইকিপিডিয়া নিবন্ধে আরও দুটি ভঙ্গি আছে: কোলে বা মাটিতে রেখে বাজানো, এবং হাতে বা “strings” দিয়ে বাজানো। শেষ শব্দটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে, নিবন্ধে ব্যাখ্যা নেই।

উল্টো দিকে বরক টাইমসের লেখা: খাম “is played by striking the skin surfaces with wooden sticks”। IJSDR-এর মার্চ 2024 সংখ্যায় জবনিকা ত্রিপুরা ও পদ্মিনী ত্রিপুরার প্রবন্ধ “Traditional Musical Instruments in Indigenous People of Tripura”-তে খামের বিবরণ প্রায় হুবহু একই বাক্যে লেখা, এবং প্রবন্ধটির তথ্যসূত্রে বরক টাইমসের ওই লেখাটির নাম আছে (IJSDR প্রবন্ধ, PDF)। তাই “কাঠি দিয়ে বাজানো” দাবির পেছনে দুটি নয়, কার্যত একটি স্বাধীন উৎস।

নন্দনকাননের ছবিতে বাদকের ঢোল গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো, যা উইকিপিডিয়ার “suspended from the neck” বর্ণনার সঙ্গে মেলে। তবে ছবিতে বাদক হাতে না কাঠিতে বাজাচ্ছেন, স্থির ছবি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না, আর ছবির ঢোলটি খা-অম কি না, ছবির বিবরণে লেখা নেই।

গরাইয়া পূজায় খা-অম কেন অপরিহার্য

বাংলাপিডিয়া লিখেছে গরাইয়া পূজায় খা-অম বাজানো অপরিহার্য, কিন্তু কেন অপরিহার্য, সে ব্যাখ্যা দেয়নি। অন্য উৎসগুলো দেখায় গরিয়া পূজা ও গরিয়া নাচের সঙ্গে ঢোল প্রায় সব বিবরণেই আছে: বাংলাদেশের আর্কাইভে “ঢোল-বাঁশি”, ভারতের উৎসে “drums and flutes”, আর একটি প্রতিবেদনে নাম ধরে খাম, সুমুই ও সারিন্দা।

আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় আছে, হারি বৈসুর দিন থেকে “একটানা ৫/৭ দিন ধরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে গরয়া চেরকরা ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে গরয়া নৃত্য পরিবেশন করে।” অর্থাৎ বাংলাদেশে গরিয়া দলের সঙ্গে ঢোল ঘোরে পাড়া থেকে পাড়ায়। নাচের দল কীভাবে গঠিত হয়, কোন দিনে পূজা, নাচে পাওয়া চাল-মুরগির কী হয়, সেসব আছে গরিয়া নৃত্য ও বৈসুর লেখায়।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের দিকে, ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Dances of Tripura” লিখেছে গরিয়া নাচ “is accompanied by drums and flutes” এবং নাচিয়েরা গ্রাম থেকে গ্রামে ধীরে ধীরে লয় বাড়িয়ে নাচেন (Dances of Tripura)। হিউম্যানস অব নর্থইস্টের একটি প্রতিবেদন (আত্রেয়ী দত্ত, 10 জুন 2025) গরিয়া পূজার বাজনার অংশে যন্ত্রের নাম দিয়েছে: সুমুই বাঁশি, খাম ঢোল আর সারিন্দা (Humans of Northeast)। একই প্রতিবেদন লিখেছে পূজার কেন্দ্রে থাকে গরিয়া দেবতার প্রতীক বাঁশের দণ্ড।

উইকিপিডিয়ার “Garia puja” পাতা লিখেছে উৎসবটি বৈশাখে সাত দিন-সাত রাত ধরে চলে, ককবরকভাষী জনগোষ্ঠী ও হালামরা গরিয়া দেবতার পূজা করেন (Garia puja)। সেখানে ঢোলের কথা নেই।

উপর থেকে তোলা ছবি: খোলা মাঠে বৃত্ত করে নাচছেন লাল ও সাদা পোশাকের নারী-পুরুষ, চারপাশে দর্শকের ভিড়, ডান দিকে বসে ঢোল বাজাচ্ছেন একজন
রাঙামাটিতে ত্রিপুরাদের গরিয়া নৃত্য: বৃত্ত করে নাচ, ডান পাশে ঢোলবাদক। ছবি: MOHAMMAD SHAJAHAN Bangladesh · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

নাচটির নামও উৎসভেদে বদলায়: বাংলাপিডিয়ায় গরাইয়া, আর্কাইভে গরয়া ও গরিয়া, বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধে গড়িয়া, ইংরেজিতে Garia বা Goria। একই বাংলাপিডিয়া নিবন্ধে শিমুর বাঁশির প্রসঙ্গে নাচটির নাম ছাপা হয়েছে “পরাইয়া নৃত্য”, ইংরেজিতে “Paraiya dance”; এটি আলাদা কোনো নাচ কি না, নিবন্ধে ব্যাখ্যা নেই।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ঢোল: শোকের অনুষ্ঠানেও বাজনা

বাংলা বাংলাপিডিয়া অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় খা-অম বাজানোকে অপরিহার্য বলেছে। বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধ আরও সাধারণভাবে বলেছে, ত্রিপুরাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমাপ্তি টানা হয় গীত, বাদ্য ও নৃত্যের মাধ্যমে। কোন ধাপে ঢোল বাজে, কে বাজান, কী তালে, তার বিবরণ কোনো উৎসে নেই।

“ত্রিপুরা” নিবন্ধের বাক্যটি এরকম: “আর যখন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয় তারও সমাপ্তি টানা হয় গীত, বাদ্য ও নৃত্যের মাধ্যমে।” একই অনুচ্ছেদে লেখা, বিয়ের অনুষ্ঠান “অবশ্যই গীতি বাদ্য ও নৃত্য সহকারে” সম্পাদন করতে হয়, আর শিশুর জন্মের খবর ঘোষিত হয় শঙ্খধ্বনিতে। নিবন্ধটি আরও জানায়, দুঃখ, বেদনা ও শোকের সঙ্গে যুক্ত ভোজানুষ্ঠানকে ত্রিপুরারা বলেন “সামৌং”।

আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় মৃত্যু ও সৎকারের ধাপগুলো বিস্তারিত: সাধারণত মৃতদেহ দাহ করা হয়; দাহের আগে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়; বাঁশের শবাধারে শ্মশানে নেওয়ার সময় ঘর থেকে শ্মশান পর্যন্ত সাদা সুতা টেনে নেওয়া হয়; উত্তর দিকে মাথা রেখে দাহ; পুরুষের চিতা 5 ধাপের, নারীর 7 ধাপের; সাত বা তেরো দিন পর শ্রাদ্ধ। এই বিবরণে ঢোল বা কোনো বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ নেই।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের দুটি উৎস একই দিকে ইঙ্গিত করে। IJSDR প্রবন্ধের সারাংশ লিখেছে, বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টির মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে গান ও নাচ বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গী হয়। আদিবাসী লাইভস ম্যাটার-এ অনুপ্রভা দেববর্মার লেখা (13 অক্টোবর 2022) দেববর্মা দফার শেষকৃত্যের বিবরণে লিখেছে, চতুর্দশ দিনের সকালে ছেলে মৃতের ভস্মের পাত্র নিয়ে জলাশয়ের দিকে যান, সঙ্গে বড় শোভাযাত্রা, পথজুড়ে গান আর নাচ (The Last Rites Of The Debbarma Tribe Of Tripura)। সেখানে কোনো যন্ত্রের নাম নেই।

অর্থাৎ “অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় খা-অম অপরিহার্য” দাবিটির পেছনে নাম ধরে বলা উৎস একটিই, বাংলা বাংলাপিডিয়া। শোকের অনুষ্ঠানে বাজনা থাকে, এই সাধারণ কথাটি আরও দুটি উৎসে আছে। ঢোলটি দাহের সময় বাজে, শোভাযাত্রায় বাজে, না শ্রাদ্ধে, তা জানা যায়নি।

আর কোন অনুষ্ঠানে ত্রিপুরাদের ঢোল বাজে

উৎসে ত্রিপুরাদের আরও অন্তত চারটি উপলক্ষে ঢোলের কথা আছে: সিমতৗং পূজায় প্রদীপ জ্বালানোর সময়, বিয়ের কাথারক পূজার নাচে, লেবাং বুমানি নাচে, আর অসুস্থতা সারানোর আচারে। কোথাও ঢোলের নাম দেওয়া নেই, কেবল লেবাং বুমানির বিবরণে “khamb”।

সিমতৗং পূজা

আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত অনুযায়ী সিমতৗং মানে প্রদীপ প্রজ্বালন: বৈসুর আগে, বিশেষ করে বসন্তকালে, প্রয়াত পিতৃপুরুষদের মঙ্গল কামনায় বংশপ্রদীপ জ্বালানোর পূজা। বাঁশের কারুকাজ করা চাকলায় পাঁচ বা সাতটি প্রদীপ জ্বলে। চোন্তাই যখন পিতৃপুরুষদের নাম ধরে সংকল্প বাক্য উচ্চারণ করেন, তখন “ঢোলের গ্রীংচাং গ্রীংচাং বোলে” আত্মীয়-স্বজনেরা বিশেষ ভঙ্গিতে প্রদীপ জ্বালান। ঢোলের বোল লিখে রাখা আছে কেবল এই একটি বিবরণে।

কাথারক পূজা ও বিয়ে

একই লেখা অনুযায়ী বিয়েতে কাথারক পূজা বাধ্যতামূলক, আর পূজা শেষে বর ও কনে পক্ষের দুজন কেঁজুকেজা “ঢোলের তালে তালে” মাথায় দীপশিখাসহ বোতল, হাতে থালা নিয়ে পানিভর্তি কলসির উপর উঠে নাচেন। এই নাচের অন্য নাম বোতল নৃত্য বা মাঙ্গলিক নৃত্য; জুম কাটা শুরুর আগে বা কোনো শুভ কাজের আগেও কাথারক পূজা হয়।

লেবাং বুমানি

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ফসল কাটার সময়ের নাচ লেবাং বুমানি। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Dances of Tripura” লিখেছে, পুরুষেরা বাঁশের খটখটি (টক্কা) দিয়ে তাল রাখেন, আর নাচের সঙ্গে বাজে বাঁশি, “khamb”, পুং নামের একটি তালযন্ত্র ও সারিন্দা। বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধের লোকনৃত্যের তালিকায় লেবাং আছে, তবে বাংলাদেশে এই নাচে কোন যন্ত্র বাজে, সে তথ্য নেই।

অসুস্থতা সারানোর আচার

পুরোনো উইকিপিডিয়া নিবন্ধ লিখেছে, ত্রিপুরীরা মনে করেন অপশক্তি মানুষের অসুখের কারণ, আর অসুস্থ ব্যক্তির জন্য যে জটিল আচার পালন করা হয়, তাতে থাকে “roaring beats of the drums”। আচারটির নাম বা ঢোলের নাম সেখানে নেই, এবং অন্য কোনো উৎসে এই দাবির সমর্থন পাওয়া যায়নি।

উপলক্ষ ঢোলের নাম উৎসে দেশ উৎস
গরাইয়া/গরিয়া পূজা খা-অম বাংলাদেশ বাংলাপিডিয়া (বাংলা ও ইংরেজি)
গরিয়া নৃত্য, বৈসুর সময় “ঢোল” বাংলাদেশ আর্কাইভ, ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত
গরিয়া পূজার বাজনা খাম (Kham) ভারত হিউম্যানস অব নর্থইস্ট, 2025
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া খা-অম বাংলাদেশ বাংলা বাংলাপিডিয়া (ইংরেজিতে নেই)
অন্ত্যেষ্টির সমাপ্তি “বাদ্য” (যন্ত্রের নাম নেই) বাংলাদেশ বাংলাপিডিয়া, ত্রিপুরা
সিমতৗং পূজা “ঢোল” (বোল: গ্রীংচাং গ্রীংচাং) বাংলাদেশ আর্কাইভ
কাথারক পূজা, বিয়ে “ঢোল” বাংলাদেশ আর্কাইভ
লেবাং বুমানি khamb ভারত উইকিপিডিয়া, Dances of Tripura
অসুস্থতা সারানোর আচার “drums” ভারত পুরোনো উইকিপিডিয়া নিবন্ধ

খামের সঙ্গে কোন যন্ত্র বাজে: তাল আর সুরের ভাগ

বিকাশ রায় দেববর্মা ককবরক যন্ত্রগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: সারিন্দা, সুমুই (বাঁশি) ও চংপ্রেং “স্বর চয়নের বাদ্যযন্ত্র”, আর খাম ও ওয়াখপ “ধীর বা দ্রুত তালে তাল মিলিয়ে বাজার বাদ্যযন্ত্র”। দাংদু দুই কাজেই চলে। অর্থাৎ ত্রিপুরা সংগীতে খাম তাল রাখার যন্ত্র, সুর তোলার নয়।

আর্কাইভের ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ লেখার বাক্যটি: “আমাদেব সারিন্দা, সুমুই (বাঁশি) চংপ্রেং গুলো হল স্বর চয়নের বাদ্যযন্ত্র, আর খাম, ওয়াখপ ইত্যাদি হল ধীর বা দ্রুত তালে তাল মিলিয়ে বাজার বাদ্যযন্ত্র।” দাংদু সম্পর্কে লেখা, অতীতে যুবতীরা এটি বাজাতেন, স্বর চয়ন করে বা তাল মিলিয়ে দুইভাবেই।

ওয়াখপ নামটির কাছাকাছি একটি যন্ত্র ভারতের উৎসে আছে, ইংরেজিতে “Uakhrap”। তবে তার বিবরণ উৎসভেদে আলাদা। IJSDR প্রবন্ধ বলছে ওয়াখরাপ মূলত বাঁশের তৈরি, বাঁশ মাপমতো কেটে মাঝখান দুই ভাগ করা, মামিতা নাচে ব্যবহৃত। পুরোনো উইকিপিডিয়া নিবন্ধ বলছে এটি তার ও চামড়ার পর্দার মিশ্রণ, অর্ধবৃত্তাকার কাঠের ভিত্তির উপর বাঁশের নল বসানো। আর্কাইভের “ওয়াখপ” আর এই “Uakhrap” একই যন্ত্র কি না, কোনো উৎস বলেনি।

বাঁশির নামেও দুই দেশের উৎস দুই রকম: বাংলাপিডিয়ায় ত্রিপুরাদের বাঁশি শিমুর, আর্কাইভ ও ভারতের উৎসে সুমুই। IJSDR প্রবন্ধ লিখেছে সুমুই দুই রকমের, সাত ছিদ্রের ও আট ছিদ্রের। চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরাদের বাঁশের যন্ত্র খেংগ্রং-কে ত্রিপুরারা কী নামে ডাকেন, তা আছে খেংগ্রং বাদ্যযন্ত্রের লেখায়।

খাইং, খা-অম আর খাম পাশাপাশি: এক ছকে

তিনটি নামের পাশে উৎস যা যা বলে, এক ছকে রাখলে দেখা যায় কোথায় তথ্য আছে আর কোথায় ফাঁকা। খাইং-এর মাপ ও উপাদান আছে, উপলক্ষ নেই। খা-অমের উপলক্ষ আছে, গড়ন নেই। খামের গড়ন ও বাজানোর ভঙ্গি আছে, তবে সব তথ্যই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎস থেকে।

বিষয় খাইং খা-অম খাম (kham/khamb)
কাদের উসুই (ত্রিপুরাদের একটি দফা) ত্রিপুরা ত্রিপুরী (ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য); একই নাম ডিমাসা, তিওয়া, বোড়োদের মধ্যেও
খোলের কাঠ হালকা গামারি জাতীয় কাঠের ফ্রেম উৎসে নেই (“খাইং-এর মতোই”) “Gamai (Teak)” বা অন্য গাছের গুঁড়ি খুঁড়ে (পুরোনো উইকিপিডিয়া); কেবল “কাঠ” (অন্য উৎস)
চামড়া বাঘ বা ছাগলের উৎসে নেই ছাগলের (উইকিপিডিয়া); “পশুর চামড়া” (বরক টাইমস)
মুখ উৎসে নেই উৎসে নেই দুই মুখ, মোটামুটি সমান মাপের
বাঁধন উৎসে নেই উৎসে নেই পাকানো চামড়ার বেড়, আড়াআড়ি চামড়ার ফিতা
মাপ দুই থেকে আড়াই হাত লম্বা, এক হাতের বেশি চওড়া (বাংলা); দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা, এক ফুট চওড়া (ইংরেজি) উৎসে নেই উৎসে নেই
বাজানো উৎসে নেই উৎসে নেই হাতে (উইকিপিডিয়া); কাঠিতে (বরক টাইমস, IJSDR)
ধরা হয় উৎসে নেই উৎসে নেই গলায় ঝুলিয়ে, কোমরে বেঁধে, কোলে বা মাটিতে রেখে
উপলক্ষ উৎসে নেই গরাইয়া পূজা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া গরিয়া পূজা, লেবাং বুমানি নাচ
মূল উৎস বাংলাপিডিয়া বাংলাপিডিয়া উইকিপিডিয়া, ত্রিপুরা স্টেট ট্রাইবাল মিউজিয়াম, বরক টাইমস, IJSDR, আর্কাইভ

ছকের সবচেয়ে বড় ফাঁক খা-অমের ঘরে। বাংলাদেশের ত্রিপুরাদের ঢোলটির নিজস্ব গড়নের বিবরণ কোথাও লেখা হয়নি; যা আছে তা হয় উসুইদের খাইং-এর সঙ্গে তুলনা, নয়তো সীমান্তের ওপারের খামের বিবরণ।

উৎসগুলো কোথায় মেলে না

এই বিষয়ে উৎসগুলোর মধ্যে অন্তত সাতটি জায়গায় অমিল আছে। প্রতিটি নিচে এক লাইনে, উৎসের নামসহ।

  1. খাইং-এর মাপ: বাংলা বাংলাপিডিয়া বলছে দুই থেকে আড়াই হাত লম্বা, এক হাতের বেশি চওড়া; ইংরেজি বাংলাপিডিয়া বলছে দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা, এক ফুট চওড়া।
  2. খাইং-এর বানান: ইংরেজি বাংলাপিডিয়া তালিকায় লিখেছে khaing, পরের বাক্যেই khaim।
  3. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় খা-অম: বাংলা বাংলাপিডিয়া বলছে অপরিহার্য; ইংরেজি বাংলাপিডিয়া কেবল গরাইয়া উৎসব ও অনুষ্ঠানের কথা বলছে, অন্ত্যেষ্টির নয়।
  4. খাম বাজানোর ভঙ্গি: উইকিপিডিয়া বলছে হাতে; বরক টাইমস ও IJSDR বলছে কাঠিতে; পুরোনো উইকিপিডিয়া বলছে হাতে বা “strings” দিয়ে।
  5. উসুইয়ের পরিচয়: বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধ উসুইকে আলাদা জনগোষ্ঠী হিসেবে লিখেছে; বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধ ও জুমজার্নালের আর্কাইভ উসুইকে ত্রিপুরাদের একটি দফা বলেছে।
  6. ওয়াখরাপের গড়ন: IJSDR বলছে মূলত বাঁশের; পুরোনো উইকিপিডিয়া বলছে কাঠের ভিত্তিতে তার ও চামড়ার পর্দা।
  7. ত্রিপুরাদের বাঁশির নাম: বাংলাপিডিয়া বলছে শিমুর; আর্কাইভ ও ভারতের উৎস বলছে সুমুই।

খা-অম কি হারিয়ে যাচ্ছে

খা-অম বা খাম বিলুপ্ত, এমন কথা কোনো উৎস লেখেনি। তবে ত্রিপুরা লোকবাদ্যের চর্চা কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ দুটি উৎসে আছে। বিকাশ রায় দেববর্মা লিখেছেন, জীবিত দু-একজন শিল্পীর কাছ থেকে যন্ত্র বাজানো শিখতে নবীনদের কেউ এগিয়ে আসছেন না; IJSDR প্রবন্ধও লিখেছে মানুষ ধীরে ধীরে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

আর্কাইভের ককবরক সংগীত লেখায় বিকাশ রায় দেববর্মা কয়েকজন শিল্পীর নাম দিয়েছেন: চংপ্রেং-শিল্পী সম্প্রই দেববর্মা, সারিন্দার শিল্পী সন্তোষ দেববর্মা ও ইন্দ্র দেববর্মা, বংশীবাদক রামপদ জমাতিয়া, বৈদ্য দেববর্মা। তাঁর ভাষায়, “অথচ তাদের কাছ থেকে ওই সকল বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের সম্যক ধারনা নিতে নবীনদের মধ্য থেকে কেউ এগিয়ে আসছেনা।” তালিকায় কোনো খাম-বাদকের নাম নেই।

একই লেখায় একটি হারানো যন্ত্রের কথা আছে: “মুরি নামে একটি বাদ্যযন্ত্রও ছিল, তবে ককবরক ভাষীরা অনেক আগেই এটাকে হারিয়ে ফেলেছে।” মুরি দেখতে কেমন ছিল, কোনো উৎসে লেখা নেই। ঢোলের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি ভিন্ন: যন্ত্রটি বাজছে, ছবিতেও আছে, কিন্তু তার নাম, গড়ন আর আচারে তার জায়গা বাংলাদেশের দিক থেকে প্রায় লেখাই হয়নি।

অন্য জনগোষ্ঠীর যন্ত্র নিয়েও একই রকম আলাদা পাঠ আছে, যেমন ম্রোদের প্লুং বাঁশির ধরন নিয়ে লেখাটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি বিষয়ক অন্যান্য লেখা পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।

প্রশ্নোত্তর

খা-অম কোন জনগোষ্ঠীর বাদ্যযন্ত্র?

বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধ অনুযায়ী খা-অম ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঢোল জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। একই নিবন্ধ ঢোল-জাতীয় যন্ত্রের তালিকায় খাইং, খা-অম, বুঙ্গ, পেহ্‌ ও গঙ্গ বা দারখোয়াং-এর নাম দিয়েছে। খা-অমকে সেখানে বলা হয়েছে “খাইং-এর মতোই” একটি যন্ত্র, আর গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এটি বাজানো অপরিহার্য।

খা-অম কী দিয়ে তৈরি হয়?

খা-অমের উপাদান বাংলাপিডিয়া আলাদা করে লেখেনি; লিখেছে এটি “খাইং-এর মতোই”। খাইং-এর ফ্রেম হালকা গামারি জাতীয় কাঠের, তাতে বাঘ বা ছাগলের চামড়া। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসে “খাম” নামের ঢোলের বিবরণ আছে: কাঠের খোল, দুই মুখে ছাগলের চামড়া, চামড়ার ফিতায় টানা। খা-অম আর খাম একই যন্ত্র কি না, কোনো উৎস স্পষ্ট করে বলেনি।

খাইং কোন জাতির ঢোল?

বাংলাপিডিয়ার বাংলা ও ইংরেজি দুই সংস্করণেই খাইং উসুই জনগোষ্ঠীর ঢোল। বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধ আর জুমজার্নালের আর্কাইভের “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখা উসুইকে ত্রিপুরাদের 36টি দফা বা গোত্রের একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। আর্কাইভের হিসাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী 13–14টি দফার মধ্যেও উসুই আছে। খাইং-এর মাপ ও উপাদানও বাংলাপিডিয়ায় দেওয়া আছে।

খাইং ঢোল কত বড়?

দুই উৎসে মাপ দুই এককে। বাংলা বাংলাপিডিয়া লিখেছে খাইং দৈর্ঘ্যে দুই হাত থেকে আড়াই হাত, প্রস্থে এক হাতের বেশি। ইংরেজি বাংলাপিডিয়া লিখেছে দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা, এক ফুট চওড়া। দুটি একই নিবন্ধের দুই ভাষার সংস্করণ, তবু সংখ্যাগুলো আলাদা। ঢোলটির মাপ নিয়ে অন্য কোনো স্বাধীন উৎস পাওয়া যায়নি।

ত্রিপুরা ঢোল খাম কীভাবে বাজানো হয়?

উৎসগুলো এক কথা বলে না। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Kham (instrument)” লিখেছে খাম গলায় ঝোলানো বা কোমরে বাঁধা থাকে, বাজানো হয় হাতে। উইকিপিডিয়ার পুরোনো একটি নিবন্ধ কোলে বা মাটিতে রেখেও বাজানোর কথা বলে। বরক টাইমস (2023) ও IJSDR-এর 2024 সালের প্রবন্ধ লিখেছে কাঠি দিয়ে চামড়ায় আঘাত করে বাজানো হয়।

গরাইয়া পূজায় কোন ঢোল বাজে?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী গরাইয়া পূজায় ত্রিপুরাদের খা-অম বাজানো অপরিহার্য। ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার ভাষায় ত্রিপুরারা খা-অম বাজান “Garaiya religious festivals and functions”-এ। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটি প্রতিবেদন (হিউম্যানস অব নর্থইস্ট, 2025) গরিয়া পূজার উৎসবে খাম ঢোল, সুমুই বাঁশি ও সারিন্দার কথা লিখেছে। বাংলাদেশের আর্কাইভ গরিয়া দলের সঙ্গে কেবল “ঢোল-বাঁশি” লিখেছে।

ত্রিপুরাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কি বাজনা বাজে?

বাংলা বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধ লিখেছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় খা-অম বাজানো অপরিহার্য। প্রভাংশু ত্রিপুরার লেখা বাংলাপিডিয়ার “ত্রিপুরা” নিবন্ধ লিখেছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমাপ্তি টানা হয় গীত, বাদ্য ও নৃত্যের মাধ্যমে। তবে মৃতদেহ দাহ থেকে শ্রাদ্ধ পর্যন্ত কোন ধাপে ঢোল বাজে, কে বাজান, সে বিবরণ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

খাম আর খা-অম কি একই যন্ত্র?

কোনো উৎস দুটিকে সরাসরি এক বলেনি। বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের ত্রিপুরাদের ঢোলের নাম লিখেছে খা-অম, ইংরেজিতে kha-am। জুমজার্নালের আর্কাইভে বিকাশ রায় দেববর্মার ককবরক সংগীত বিষয়ক লেখায় তাল রাখার যন্ত্রের নাম খাম। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ইংরেজি উৎসে নামটি kham বা khamb। নাম কাছাকাছি, যন্ত্রের পরিচয়ও ঢোল।

খাম ছাড়া ত্রিপুরাদের আর কোন তালের যন্ত্র আছে?

জুমজার্নালের আর্কাইভে বিকাশ রায় দেববর্মা লিখেছেন সারিন্দা, সুমুই ও চংপ্রেং সুর তোলার যন্ত্র, আর খাম ও ওয়াখপ ধীর বা দ্রুত তালে তাল মেলানোর যন্ত্র। দাংদু দুই কাজেই চলে। ভারতের উৎসে লেবাং বুমানি নাচে বাঁশের খটখটি (টক্কা) দিয়ে তাল রাখার কথাও আছে।

খা-অম বা খাম কি হারিয়ে যাচ্ছে?

যন্ত্রটি বিলুপ্ত বলে কোনো উৎস লেখেনি। তবে আর্কাইভের ককবরক সংগীত লেখায় বিকাশ রায় দেববর্মা লিখেছেন, লোকবাদ্যযন্ত্রের যে দু-একজন শিল্পী এখনো জীবিত, তাঁদের কাছ থেকে যন্ত্র ব্যবহারের ধারণা নিতে নবীনদের কেউ এগিয়ে আসছেন না। একই লেখায় আছে, মুরি নামের একটি যন্ত্র ককবরক ভাষীরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছেন।

ত্রিপুরা ঢোল খা-অম কোথায় দেখা যায়?

বাংলাদেশের কোনো জাদুঘরে খা-অম বা খাইং সংরক্ষিত আছে কি না, তার তথ্য পাওয়া যায়নি। ভারতের আগরতলার ত্রিপুরা স্টেট ট্রাইবাল মিউজিয়ামের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের তালিকায় খাম আছে, ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী দুটি চামড়ার পর্দা টেনে তৈরি একটি ত্রিপুরী ঢোল হিসেবে। বাংলাদেশে বৈসুর সময় গরিয়া নৃত্যের দলের সঙ্গে ঢোল দেখা যায়।

যা এখনো জানা যায়নি

  • বাংলাদেশের ত্রিপুরাদের খা-অম কী কাঠে, কোন পশুর চামড়ায়, কোন মাপে তৈরি হয়, তার নিজস্ব বিবরণ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি; উৎস কেবল বলে এটি খাইং-এর মতো।
  • খা-অম আর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের খাম একই যন্ত্র কি না, কোনো উৎস স্পষ্ট করে বলেনি।
  • অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কোন ধাপে খা-অম বাজে, কে বাজান, বিশেষ কোনো তাল আছে কি না, জানা যায়নি। আর্কাইভের সৎকার-বিবরণে বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ নেই।
  • উসুইদের খাইং কোন কোন অনুষ্ঠানে বাজে, মাইলুকমা উৎসবে বাজে কি না, তথ্য নেই।
  • খাইং বা খা-অম এখন কারা তৈরি করেন, কোথায় পাওয়া যায়, দাম কত, সে বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
  • বাংলাদেশের কোনো জাদুঘরে খা-অম বা খাইং সংরক্ষিত আছে কি না, জানা যায়নি।
  • বাংলাপিডিয়ার “পরাইয়া নৃত্য” আর গরাইয়া/গরিয়া নৃত্য একই নাচ কি না, নিবন্ধে ব্যাখ্যা নেই।
  • ঢোলের বোল লিখে রাখা আছে কেবল সিমতৗং পূজার বিবরণে (“গ্রীংচাং গ্রীংচাং”); গরিয়া নাচ বা অন্য আচারের তাল-বোল কোথাও লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র

  1. জুমজার্নাল আর্কাইভ, “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল। লিংক
  2. বিকাশ রায় দেববর্মা (অনুবাদ: সুনীল দেববর্মা), “ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ”, জুমজার্নাল আর্কাইভ, 2019। লিংক
  3. মোমেন চৌধুরী (উপজাতীয় বাদ্যযন্ত্র অংশ), “বাদ্যযন্ত্র”, বাংলাপিডিয়া। লিংক
  4. Banglapedia, “Musical Instruments”, Banglapedia (English)। লিংক
  5. প্রভাংশু ত্রিপুরা, “ত্রিপুরা”, বাংলাপিডিয়া। লিংক
  6. Probhangshu Tripura, “Tripuris, The”, Banglapedia (English)। লিংক
  7. বাংলাপিডিয়া, “নবান্ন”, বাংলাপিডিয়া। লিংক
  8. Wikipedia, “Kham (instrument)”, English Wikipedia। লিংক
  9. Wikipedia, “Music of Tripura”, English Wikipedia। লিংক
  10. Wikipedia, “Dances of Tripura”, English Wikipedia। লিংক
  11. Wikipedia, “Tripura State Tribal Museum”, English Wikipedia। লিংক
  12. Wikipedia, “Garia puja”, English Wikipedia। লিংক
  13. Wikipedia (পুরোনো সংস্করণ), “Musical instruments of Tripura”, en-academic আর্কাইভ কপি। লিংক
  14. Nidhi Mishra, “Traditional Musical Instruments of Tripura: A Harmonious Symphony in Wood and Metal”, Borok Times, 10 July 2023। লিংক
  15. Jabanika Tripura ও Padmini Tripura, “Traditional Musical Instruments in Indigenous People of Tripura”, IJSDR, Vol. 9 Issue 3, March 2024। লিংক
  16. Aatreyi Dutta, “Garia Puja – A Tribal Festival Praying for a Good Harvest”, Humans of Northeast, 10 June 2025। লিংক
  17. Anuprava Debbarma, “The Last Rites Of The Debbarma Tribe Of Tripura”, Adivasi Lives Matter, 13 October 2022। লিংক
  18. Ahidul hasan, “Tripura Traditopnal “Garia Dance” (ছবি)”, Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0। লিংক

সর্বশেষ হালনাগাদ: 2 নভেম্বর 2026

 

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
[DISPLAY_ULTIMATE_SOCIAL_ICONS]

আরও কিছু লেখা