বান্দরবান শহরের রাজার মাঠে দুই সারি পানিভর্তি নৌকা বা গামলা। এক পাশে মারমা তরুণেরা, অন্য পাশে তরুণীরা, হাতে মগ। পানি ছোড়া চলে নৌকা খালি না হওয়া পর্যন্ত, তারপর নতুন দল আসে। এই দৃশ্যের নামই সাংগ্রাই জলকেলি।
সাংগ্রাই জলকেলি হলো মারমাদের নববর্ষ উৎসব সাংগ্রাইয়ের পানিখেলা, মারমা ভাষায় যার নাম রিলং পোয়ে, আর অনুষ্ঠানের নামে “মৈত্রী পানিবর্ষণ”। এটি হয় এপ্রিলের মাঝামাঝি, সাংগ্রাইয়ের শেষ দিকে, বান্দরবান, রাঙামাটি, কাপ্তাই ও খাগড়াছড়িতে। পানি ছোড়ার আগে নদীর তীরে বুদ্ধমূর্তি স্নান করানো হয়, আর পানির অর্থ পুরনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে ফেলা।
বৈসাবির তিন উৎসব, বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসু, কোন দিনে কী আচার মানে, সেই তুলনা আছে আমাদের বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুর আলাদা আচার-ক্রম লেখায়। এই লেখা কেবল মারমা সাংগ্রাইয়ের পানির অংশ নিয়ে: নাম, শুরু, তারিখ, আচার, জায়গা, আর উৎসগুলো কোথায় একে অপরের সঙ্গে মেলে না।
সূচিপত্র
সাংগ্রাই জলকেলি হলো মারমা নববর্ষ সাংগ্রাইয়ের শেষ দিকের পানিখেলা, যেখানে তরুণ-তরুণীরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে পানি ছোড়েন। মারমা নামটি বাংলা উৎসে “রিলং পোয়ে” বা কাছাকাছি বানানে লেখা হয়; আনুষ্ঠানিক আয়োজনের নাম “মৈত্রী পানিবর্ষণ”। নামের বানান উৎসভেদে আলাদা।
বাংলা উইকিপিডিয়ার সাংগ্রাই নিবন্ধ লেখে, সাংগ্রাইয়ের প্রধান আকর্ষণ পানিখেলা, “যেটিকে মারমারা বলে রিলং পোয়েঃ”। রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটের জেলার ঐতিহ্য পাতা একই অনুষ্ঠানকে বলে “রিলং পোয়েহ্” এবং জানায়, রাঙামাটিতে মারমারা এটি “মৈত্রী পানি উৎসব” নামে দীর্ঘদিন ধরে পালন করছেন। বাংলাপিডিয়ার Vaisabi ভুক্তি ইংরেজিতে লেখে Rilongpoey।
ইংরেজি সংবাদপত্রে বানান আরও ছড়ানো। নিচের ছকে প্রতিটি রূপ যে উৎসে যেভাবে আছে, সেভাবেই দেওয়া হলো।
| লেখা রূপ | উৎস | সাল |
|---|---|---|
| রিলং পোয়েঃ, ড়িলংপোয়ে | বাংলা উইকিপিডিয়া, “সাংগ্রাই” | বর্তমান সংস্করণ |
| রিলং পোয়েহ্, মৈত্রী পানি উৎসব | রাঙামাটি জেলা পোর্টাল | বর্তমান সংস্করণ |
| Rilongpoey | বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি) | বর্তমান সংস্করণ |
| Moita rilong poye | The Daily Star (লাইফস্টাইল) | 2005 |
| Rilong Bwoi | The Daily Star | 2014 |
| Sangrai Ri-lang-poe | Dhaka Tribune | 2024 |
| Re Long Poye | The Daily Star (পয়লা বৈশাখ ক্রোড়পত্র) | 2026 |
| মৈত্রী পানিবর্ষণ, মৈত্রী পানি বর্ষণ | প্রথম আলো; আমাদের আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” | 2026; আর্কাইভ |
| জলকেলি, জলোৎসব, সাংগ্রাই জল উৎসব | বাংলা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ২৪ | 2022, 2026 |
“মৈত্রী” শব্দটি যে অর্থে বসেছে, তা বান্দরবানের উৎসব উদযাপন পরিষদের স্লোগানেও আছে। বাংলা ট্রিবিউনের 2022 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সেবারের স্লোগান ছিল, সব কালিমা যেন “মৈত্রীময় জলধারায়” মুছে যায়। “রিলং” বা “পোয়ে” শব্দের আক্ষরিক অর্থ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি; তবে বান্দরবানের মূল উৎসবের নামও খবরে “সাংগ্রাই পোয়ে” বা “মাহাঃ সাংগ্রাই পোয়েঃ” হিসেবে আসে (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2022; বিডিনিউজ২৪, 2026)।
সাংগ্রাই শব্দটি “সাক্রাই” (সাল) থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়, যার বাংলা প্রতিরূপ “সংক্রান্তি”; কথাটি বাংলা উইকিপিডিয়ার। উৎসবটি মারমারা আরাকান ও বর্মা থেকে সঙ্গে এনেছিলেন বলে বিশ্বাস প্রচলিত। কবে থেকে সাংগ্রাই পালন শুরু, তার নির্দিষ্ট ইতিহাস কোনো উৎসে নেই।
বাংলা উইকিপিডিয়ার সাংগ্রাই ও বৈসাবি নিবন্ধ দুটি একই অনুচ্ছেদে বলে, সাংগ্রাইয়ের দিন ঠিক হয় মারমা বর্ষপঞ্জি “সাংগ্রাই জ্যা” দিয়ে, আর এই সাল গণনা 1359 খ্রিষ্টাব্দের আগে থেকে চলছে। বৈসাবি নিবন্ধটি এর পরেই যোগ করে, সাংগ্রাইয়ের উৎপত্তি নিয়ে মারমা ভাষায় নানা কল্পকাহিনি বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে মুখে প্রচলিত, কিন্তু উদযাপন কবে শুরু তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। সেই কাহিনিগুলোর কোনোটির লিখিত বিবরণ যাচাইযোগ্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি, তাই এখানে কোনো কাহিনি দেওয়া হলো না।
উৎপত্তি নিয়ে আরেকটি বক্তব্য এসেছে সরকারি সূত্রে। বাসসের বরাতে প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের 11 এপ্রিল 2025-এর প্রতিবেদন লেখে, বিশ্বাস করা হয় যে আরাকান ও বর্মা থেকে মারমারা যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন, তখন সাংগ্রাই উৎসবও সঙ্গে আনেন। একই প্রতিবেদন তথ্য অধিদপ্তরের (PID) একটি ফিচারের বরাতে বলে, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস ও কম্বোডিয়ায় একই সময়ে নববর্ষ পালিত হয়, যার নাম সংক্রান।
এই প্রতিবেশী উৎসবগুলোর নামও উৎসে আছে। বাংলা উইকিপিডিয়া জানায়, এপ্রিলের মাঝামাঝি পানিখেলা মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও চীনের দাই জনগোষ্ঠীতেও হয়; মিয়ানমারে এর নাম “থিনগন”, থাইল্যান্ড ও লাওসে “সংক্রান”। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Sangrain নিবন্ধ উৎসবটিকে “South and Southeast Asian solar New Year”-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে দেখায় এবং মারমা ও রাখাইন দুই জাতির উৎসব বলে।
পাশের জাতি চাকদের সাংগ্রাইংয়েও একই প্রভাবের কথা আছে। আমাদের আর্কাইভের চাক জাতির আদ্যোপান্ত লেখাটি জানায়, চাকদের সাংগ্রাইং বর্মী সনের দিন-তারিখ মেনে হয় এবং এতে বর্মী সংস্কৃতির কিছুটা প্রভাব দেখা যায়; সেই প্রভাব কবে থেকে, তা লেখাটির ভাষায় “জানা নেই”।
পানি ছিটানোর রীতি পুরনো হলেও মঞ্চ ও নৌকা সাজিয়ে আনুষ্ঠানিক “মৈত্রী পানিবর্ষণ” বান্দরবানে শুরু হয় 1974 সালে, এমন বক্তব্য আছে প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদনে। অন্যদিকে দ্য ডেইলি স্টার (2014) ও ঢাকা ট্রিবিউন (2018) একে শতবর্ষের পুরনো উৎসব বলেছে। দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখা হলো।
প্রথম আলোয় 14 এপ্রিল 2025 প্রকাশিত বুদ্ধজ্যোতি চাকমার প্রতিবেদন বান্দরবানের দুজন প্রবীণের বক্তব্য দেয়। জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইং চ প্রু মাস্টারের ভাষ্য অনুযায়ী মৈত্রী পানিবর্ষণ বা পানিখেলা আগে ছিল না; তখন তরুণ-তরুণীরা পরস্পরের সম্মতিতে একে অপরকে পানি ছিটিয়ে দিতেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মং নু চিং মারমার মতে, 1973-74 সালে কয়েকজন যুবক মিয়ানমারে মৈত্রী পানিবর্ষণ উৎসব দেখে ফেরেন এবং 1974 সালে তাঁরাই প্রথম বান্দরবান জেলা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি চালু করেন; সেখান থেকে তিন পার্বত্য জেলার মারমা সমাজে ছড়ায়। একই প্রতিবেদন লেখে, বান্দরবানে 1970-এর দশকের মাঝামাঝি মিয়ানমারের অনুকরণে মৈত্রী পানিবর্ষণ শুরু হয়েছিল।
উল্টো দিকে, দ্য ডেইলি স্টারের 14 এপ্রিল 2014-এর প্রতিবেদন বান্দরবানের সাংগ্রাইকে “century-old festival” বলেছে, আর ঢাকা ট্রিবিউনের 2018 সালের প্রতিবেদন সরাসরি লিখেছে, পানি ছোড়াছুড়ি একটি “century-old traditional event”। এ দুটি প্রতিবেদনের কোনোটিই সালটির উৎস দেয়নি।
আমাদের আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় নৌকা ও মণ্ডপসহ পুরো আয়োজনের যে বর্ণনা আছে, তার সূত্র হিসেবে লেখা আছে “আহসান ১৯৯৩”। অর্থাৎ অন্তত 1993 সালের একটি লিখিত বিবরণে নৌকাভিত্তিক মৈত্রী পানিবর্ষণ নথিভুক্ত। 1974-এর আগে পানিখেলা কেমন ছিল, তার লিখিত বর্ণনা পাওয়া যায়নি।
সাংগ্রাই হয় মারমা বর্ষপঞ্জির পুরনো বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিনে, যা এখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারে সাধারণত 13, 14 ও 15 এপ্রিল ধরা হয়। জলকেলি হয় এর শেষ দিকে। তবে জায়গাভেদে তারিখ সরে: 2026 সালে খাগড়াছড়িতে 14 এপ্রিল, বান্দরবানে 15-16 এপ্রিল, রাঙামাটিতে 17 এপ্রিল।
বাংলা উইকিপিডিয়া মারমা বর্ষপঞ্জির নাম লেখে “ম্রাইমা সাক্রঃয়” এবং জানায়, আগে এই পঞ্জিকা অনুযায়ী তিন দিন এপ্রিলের মাঝামাঝি যেকোনো সময়ে পড়ত, এখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিল রেখে 13, 14 ও 15 এপ্রিল পালন করা হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়া একে বর্মী ক্যালেন্ডার (Burmese calendar) বলে। পঞ্জিকার ধরন নিয়ে উৎসে অমিল আছে: দ্য ডেইলি স্টারের 2005 সালের ভ্রমণ-লেখা বলে মারমা পঞ্জিকা বর্মী চান্দ্রবর্ষের মতো, তবে নববর্ষের দিন বাংলা সৌরবর্ষের সঙ্গে মেলে; দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (13 এপ্রিল 2025) লেখে, মারমা, ম্রো, খেয়াং ও চাকেরা এ উৎসব পালন করেন “মিয়ানমারের সৌর বর্ষপঞ্জি” অনুযায়ী।
এখানে উৎসগুলো তিন রকম কথা বলে। রাঙামাটি জেলা পোর্টাল বলে, রিলং পোয়েহ্ হয় সাংগ্রাইয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে। বাংলা উইকিপিডিয়া বলে উৎসবের শেষ দিনে, আর যোগ করে যে 15 এপ্রিলের পাশাপাশি অনেক জায়গায় 16, 17 ও 18 এপ্রিলেও আয়োজন হয়, যাতে সবাই সব অনুষ্ঠানে যেতে পারেন। দ্য ডেইলি স্টারের 2005 সালের লেখা বলে তৃতীয় দিনে আনুষ্ঠানিক আয়োজন, তবে দ্বিতীয় দিনের বিকেলে বুদ্ধস্নানের পরেই শিশুরা পানি ছিটানো শুরু করে দেয়।
পত্রিকার খবরে বিভিন্ন বছরের আসল সূচি এরকম:
| বছর ও স্থান | যা হয়েছিল | উৎস |
|---|---|---|
| 2005, বান্দরবান | দ্বিতীয় দিন সাঙ্গু নদীর তীরে বুদ্ধস্নান, তারপর অনানুষ্ঠানিক পানি ছিটানো; তৃতীয় দিন রাজার মাঠে দুই নৌকা রেখে আনুষ্ঠানিক আয়োজন | The Daily Star |
| 2014, বান্দরবান | চার দিনের উৎসব; পানি ছিটানোর দুই দিনের কর্মসূচি শুরু 15 এপ্রিল | The Daily Star |
| 2022, বান্দরবান | 13 এপ্রিল শোভাযাত্রা; 15 এপ্রিল বিকেলে সাঙ্গু নদীর তীরে জলকেলির উদ্বোধন, এর মধ্য দিয়েই উৎসব শেষ | বাংলা ট্রিবিউন |
| 2024, কাপ্তাই ও রাঙামাটি | 15 এপ্রিল কাপ্তাইয়ে একটি শতবর্ষী বৌদ্ধ বিহারের মাঠে; পরদিন 16 এপ্রিল রাঙামাটির মারী স্টেডিয়ামে | Dhaka Tribune |
| 2026, খাগড়াছড়ি | 14 এপ্রিল (পয়লা বৈশাখ) “মহা সাংগ্রাই” শোভাযাত্রার পরে জলকেলি | বাংলা ট্রিবিউন, ইনডিপেনডেন্ট টিভি |
| 2026, বান্দরবান | ছয় দিনের সূচি: 11-12 এপ্রিল লোকজ খেলা, 13 এপ্রিল শোভাযাত্রা, 14 এপ্রিল বুদ্ধস্নান ও পিঠা উৎসব, 15-16 এপ্রিল মৈত্রী পানিবর্ষণ | টিবিএস, বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো |
| 2026, রাঙামাটি | 17 এপ্রিল (শুক্রবার) চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী স্টেডিয়ামে দিনব্যাপী জল উৎসব | বিডিনিউজ২৪, Dhaka Tribune |
“মূল সাংগ্রাই” কোন তারিখে, তা নিয়েও উৎস আলাদা: বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলে 14 এপ্রিল; ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের 2025 সালের ফিচারও 14 এপ্রিলকে মারমা নববর্ষের শুরু বলে; ঢাকা ট্রিবিউন (2024) কাপ্তাইয়ের প্রসঙ্গে লেখে মূল সাংগ্রাই 15 এপ্রিল।
উৎসবের সময় নিয়ে আরেকটি তথ্য: 2022 সালে বান্দরবানে আনুষ্ঠানিক সাংগ্রাই ফিরেছিল দুই বছরের বিরতির পর। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার 13 এপ্রিল 2022-এর প্রতিবেদনর শিরোনামই ছিল “২ বছর পর বান্দরবানে সাংগ্রাই উৎসব”, আর আয়োজকেরা বলেছিলেন মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে উৎসব আবার শুরু হচ্ছে।
সাংগ্রাইয়ের তিন দিনের নাম রাঙামাটি জেলা পোর্টাল অনুযায়ী পাইং ছোয়াই, সাংগ্রাই আফ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং; বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধ অনুযায়ী সাংগ্রাই আক্যা (বা পাইং ছোয়ায়), সাংগ্রাই বাক্ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং। প্রথম দিনটি ফুল তোলার, শেষ দিনটি বিদায়ের। মাঝের দিনের নামে উৎসগুলোর মিল নেই।
| উৎস | প্রথম দিন | দ্বিতীয় দিন | তৃতীয় দিন |
|---|---|---|---|
| রাঙামাটি জেলা পোর্টাল | পাইং ছোয়াই | সাংগ্রাই আফ | সাংগ্রাই আপ্যাইং |
| বাংলা উইকিপিডিয়া, “বৈসাবি” | সাংগ্রাই আক্যা বা পাইং ছোয়ায় (পুষ্প আহরণ) | সাংগ্রাই বাক্ (সাংগ্রাইয়ের দিন) | সাংগ্রাই আপ্যাইং (বিদায়) |
| বাংলা উইকিপিডিয়া, “সাংগ্রাই” | পাইংছোয়াই (ফুল সাংগ্রাই, 13 এপ্রিল) | প্রধান সাংগ্রাই (14 এপ্রিল) | আলাদা নাম নেই; 15 এপ্রিল পানিখেলা |
| প্রথম আলো, 2025 | পাইনসোয়ে বা ফুল সাংগ্রাইং | সাংগ্রাইং অ্যাখ্যেয়া বা মূল সাংগ্রাইং | উল্লেখ নেই |
| The Daily Star, 2005 (ইংরেজি বানান) | Sangrai Aacro | Sangrai Akoa | Sangrai Atha |
বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধে প্রথম দিনের আরেকটি নামও আছে, “পাইং দোয়াক”। চাকদের সাংগ্রাইংয়ের তিন দিনের নাম, আর্কাইভের চাক-লেখা অনুযায়ী, পাইংছোয়েত (ফুল দিবস), আক্যাই ও আপ্যাইং; প্রথম ও তৃতীয় দিনের নাম মারমা নামের খুব কাছাকাছি। ডেইলি স্টারের ইংরেজি বানানের নামগুলোর বাংলা রূপ কোনো বাংলা উৎসে পাওয়া যায়নি, তাই রোমান হরফেই রাখা হলো।
পাইংছোয়াই মানে ফুল ছেঁড়ার দিন। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী এটি সাধারণত 12 এপ্রিলের রাতে হয়: মারমা তরুণ-তরুণীরা রাত জেগে পিঠা বানান, ভোরের আগে পাহাড় থেকে সাদা “সাংগ্রাই পাইং” ফুল তুলে এনে মায়ের হাতে দেন, সেই ফুলে প্রথমে বুদ্ধপূজা, তারপর ঘরের দরজা সাজানো হয়।

উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় সাংগ্রাই পাইং একটি সাদা পাহাড়ি ফুল, থোকায় থোকায় অসংখ্য ছোট ফুল থাকে, বসন্তে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের পাহাড়ে ফোটে। ফুলগুলো সাংগ্রাইয়ের জন্য আগে থেকে তোলা হয় না, যাতে পাহাড়ে ফুল ছড়িয়ে থাকে। ঘরের দরজায় সাজানো ফুল দেখেই বোঝা যায়, নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে।
একই নিবন্ধ জানায়, ছোটদের রাতে পাহাড়ে যেতে না দেওয়ার জন্য বয়োজ্যেষ্ঠরা “ফ্রুজুমা” নামের মারমা ডাইনির ভয় দেখান; প্রচলিত গল্পে ফ্রুজুমা সাংগ্রাই পাইংয়ের লোভ দেখিয়ে কোনো শিশুকে দলছুট করে গভীর জঙ্গলে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ভোরের আগে বেরোনো যায় না।
এই রীতি এখন কতটা টিকে আছে, তা নিয়ে দুটি স্থানীয় কণ্ঠ পাওয়া যায়। প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদনে থোয়াইং চ প্রু মাস্টার বলেছেন, পাইনসোয়ে বা ফুল সাংগ্রাইংয়ের দিনে আগে ফুল-পাতা দিয়ে ঘর সাজানো হতো, “কিন্তু এখন আর সাজানো হয় না”। বিডিনিউজ২৪-এ 2024 সালে প্রকাশিত ঞ্যোহ্লা মংয়ের মতামত-লেখা জানায়, আগে তরুণেরা বন থেকে “সাংগ্রাইং পাঁই” সংগ্রহে বের হতেন; লেখাটি এর পাশাপাশি বিজু ফুল এখন বনে কমে যাওয়ার কথা বলে।
উইকিপিডিয়া পাইংছোয়াইয়ের দিনেই “সাংগ্রাই জীঃঈ” নামের হাটের কথাও লেখে, যেখানে বুদ্ধস্নানের জন্য পবিত্র পানি, পাকা নারকেল, মোমবাতি থেকে শুরু করে শিশুদের পানি ছোড়ার বোতল ও প্লাস্টিকের পিচকারি পর্যন্ত বিক্রি হয়।
সাংগ্রাইয়ে পানির প্রথম ব্যবহার ধর্মীয়। আমাদের আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী মন্দিরের বুদ্ধমূর্তি শোভাযাত্রা করে নদীর তীরে নেওয়া হয়, বাঁশের মঞ্চে রেখে চন্দন ও ডাবের পানি ঢালা হয়, আর সেই পানি লোকেরা সংরক্ষণ করেন, কারণ বিশ্বাস, তা খেলে রোগ সারে।
আর্কাইভের বিবরণ ধাপে ধাপে এমন: শোভাযাত্রায় থাকেন বৌদ্ধ ভিক্ষু, স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ; যাওয়ার পথে বাদ্যযন্ত্র বাজে; মানুষ সঙ্গে নেন চন্দনের জল ও ডাবের পানি। স্নানের পর দায়কদের দেওয়া নতুন চীবর বুদ্ধমূর্তিকে পরানো হয় এবং মূর্তি মন্দিরে ফেরে। বিকেলে মন্দিরে শীল প্রার্থনা, ধর্মোপদেশ শোনা ও প্রদীপ জ্বালানো হয়। একই দিনের কর্মসূচিতে তরুণ-তরুণীদের মন্দির পরিষ্কারের কথাও আছে, যাকে আর্কাইভ “একটি পবিত্র কাজ” বলেছে; সঙ্গে পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, বুদ্ধমূর্তিকে চীবর দান ও ভিক্ষুদের ছোয়াইং (খাবার) দান।
2005 সালে বান্দরবানে এই অনুষ্ঠান সরাসরি দেখে লেখা দ্য ডেইলি স্টারের ভ্রমণ-লেখা আরও একটি খুঁটিনাটি দেয়: শোভাযাত্রা যে পথ দিয়ে যাবে, সব বয়সের ভক্তরা আগেই সেই পথ ধুয়ে দেন। সাঙ্গু নদীর বালুচরে ছোট একটি ছাউনি বানিয়ে তার নিচে মূর্তি স্নান করানো হয়। লেখিকা অনুষ্ঠানটির নাম লেখেন “Goain snan”, আর জানান, এই স্নানই জলকেলির সূচনা ঘোষণা করে।
বাংলা উইকিপিডিয়ার সাংগ্রাই নিবন্ধ বুদ্ধস্নানকে প্রধান সাংগ্রাইয়ের দিনে রাখে এবং লেখে, মারমারা স্নানের পানি পান করেন রোগমুক্তির বিশ্বাসে; এরপর ধর্মদেশনা ও মোমবাতি জ্বালানো। বৈসাবি নিবন্ধ স্নানের পানির উপাদান বলে “নাইংসা” (এক ধরনের সুগন্ধি) মেশানো পানি ও ডাবের পানি। চাকদের ক্ষেত্রে আর্কাইভ একই রকম “নাইংছা-ই” বা চন্দন পানি আর দুধের কথা লেখে।
বর্তমান আয়োজনেও বুদ্ধস্নান জলকেলির আগের দিনে থাকে। ঢাকা ট্রিবিউন (13 এপ্রিল 2026) অনুযায়ী 2026 সালে বান্দরবানে 14 এপ্রিল সাঙ্গু নদীর তীরে বুদ্ধমূর্তি স্নান, সন্ধ্যায় পিঠা উৎসব, আর 15 এপ্রিল রাজার মাঠে মৈত্রী পানিবর্ষণ। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (2022) প্রথম দিনের কর্মসূচিতে বৌদ্ধ বিহারে “ছোয়াইঃ” (আহার) দান, বুদ্ধমূর্তি স্নান ও ধর্মদেশনার কথা লেখে, আর দ্বিতীয় দিনে সাঙ্গু নদীর বালুচরে জলকেলি।
সাংগ্রাইয়ে প্রবীণদের সম্মান জানানো একটি আলাদা আচার, যার একটি অংশ পানির। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী মারমা তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান করান, বিনিময়ে প্রবীণেরা তাঁদের সাংগ্রাইয়ের সেলামি দেন ও নতুন বছরের আশীর্বাদ করেন।
প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদনে থোয়াইং চ প্রু মাস্টারের বর্ণনা প্রায় একই: মূল সাংগ্রাইংয়ের দিনে বৌদ্ধবিহারে যাওয়া অষ্টশীলধারী বয়স্কদের তরুণ-তরুণীরা গোসল করাতেন, আর প্রবীণেরা আশীর্বাদ হিসেবে যে টাকা দিতেন, তা দিয়ে পিঠা তৈরি হতো। আমাদের আর্কাইভের মারমা-লেখাও পরের দুই দিনের কর্মসূচিতে “বয়োজ্যেষ্ঠদের পূজা” ও বয়োজ্যেষ্ঠ-প্রতিবেশীদের জন্য বিশেষ খাবার পাঠানোর কথা লেখে।
শহরে এটি এখন মঞ্চের অনুষ্ঠান। 2022 সালে বান্দরবানে বয়োজ্যেষ্ঠ পূজায় আয়োজকেরা প্রবীণদের মোমবাতি, আগরবাতি, দেশলাই ও ফল দান করেন (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা)। 2026 সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে “বয়স্ক পূজা”য় প্রবীণদের মোমবাতি, নগদ অর্থ ও নতুন পোশাক উপহার দেওয়া হয় (বিডিনিউজ২৪)। 2014 সালের ডেইলি স্টারের কর্মসূচি-তালিকায় এর নাম “Shakree Puja”।
উঠানে প্রবীণদের স্নান করানোর রীতি কমে আসছে বলে লিখেছেন ঞ্যোহ্লা মং, বিডিনিউজ২৪-এর 2024 সালের লেখায়: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও চাক সমাজে বয়স্কদের যত্ন নিয়ে উঠানে বসিয়ে স্নান করানোর সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে, আর পাহাড়ে পানির অভাবে এটি দ্রুত বিলুপ্ত হবে বলে তাঁর আশঙ্কা।
সাংগ্রাই জলকেলিতে খোলা মাঠে মণ্ডপ বানিয়ে দুই পাশে পানিভর্তি নৌকা বা বড় পাত্র রাখা হয়। এক পাশে তরুণ, অন্য পাশে তরুণীরা দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে পানি ছোড়েন, পাত্র খালি হলে আবার ভরা হয়, আর এক দলের পর আরেক দল আসে। এই গড়ন আর্কাইভ, উইকিপিডিয়া ও পত্রিকায় প্রায় একই।

“মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” (সূত্র: আহসান 1993) অনুযায়ী বড় একটা মাঠে মণ্ডপ বানানো হয়, মণ্ডপের দুই দিকে দুটি বড় পানিভর্তি নৌকা থাকে। একটি নৌকার পাশে তরুণদের দল অবস্থান নেয়। খেলা শুরু হলে দুই দল প্রতিপক্ষের দিকে নৌকার পানি ছুড়তে থাকে যতক্ষণ না ফুরায়; ফুরালে আবার ভরা হয়; একটি ব্যাচ শেষ হলে নতুন ব্যাচ আসে।
বাংলা উইকিপিডিয়া যোগ করে, অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকে দূর-দূরান্তের মারমারা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে আসেন, মেয়েরা থামি, ছেলেরা লুঙ্গি পরে; সকালে স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা র্যালি করেন; মারমা “রোয়াজা” (গ্রামপ্রধান) অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন, তারপর আনুষ্ঠানিক পানিখেলা। আনুষ্ঠানিকতার বাইরে সেদিন সবার হাতে পানির বোতল থাকে, যে কেউ যে কাউকে পানি ছিটাতে পারেন, কেউ আপত্তি করেন না, বরং একে আশীর্বাদ হিসেবে নেন।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা কিছুটা আলাদা: পানিখেলার জন্য বাড়ির আঙিনায় আগে থেকে প্যান্ডেল বানানো হয়, মারমা তরুণীরা সেখানে অপেক্ষা করেন, তরুণেরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দল বেঁধে প্যান্ডেলে পৌঁছালে পানি ছিটানো শুরু হয়।
2005 সালে বান্দরবানে আনুষ্ঠানিক আয়োজন হয়েছিল “Marma king’s playground”-এ, মাঠে দুটি পানিভর্তি নৌকা, একটি ছেলেদের, একটি মেয়েদের (The Daily Star)। 2022 সালে বান্দরবানের উৎসব উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্দিষ্ট মঞ্চে সামনে নানা পাত্রে পানি রেখে তরুণ-তরুণীরা অবস্থান নেন, গান গেয়ে একে অপরের দিকে পানি ছোড়েন: ছেলেরা মেয়েদের দিকে, মেয়েরা পাল্টা ছেলেদের দিকে। 2026 সালে বান্দরবানে পানিভর্তি গামলা ও নৌকার দুই পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগীরা পরস্পরকে ভেজানোর খেলায় নামেন (প্রথম আলো)। দ্য ডেইলি স্টারের 2026 সালের পয়লা বৈশাখ ক্রোড়পত্র জানায়, সাজানো প্যান্ডেলে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা অংশ থাকে।
2005 সালের লেখাটি একটি ছোট আচরণও লক্ষ করেছিল: পথে শিশুরা পানি ছিটানোর আগে বাংলায় অনুমতি চাইছিল, “didi ektu paani dei”। প্রথম আলোয় থোয়াইং চ প্রু মাস্টারও পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে “পরস্পরের সম্মতিতে” পানি ছিটানোর কথা বলেছেন।
বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী পানিখেলার পরেই মেয়েদের দড়ি টানাটানি, ছেলেদের বলী খেলা আর বাঁশ চড়া, মারমা নামে “তইং তাং” হয়। তইং তাংয়ে 25 ফুটের বেশি লম্বা বাঁশের মাথায় টাকা বাঁধা থাকে; একজনের কাঁধে আরেকজন উঠে মানব-মিনার বানিয়ে সেটি নামাতে হয়, আর বাঁশের মাথায় তেল থাকায় নাড়া খেলেই বাঁশ পিছল হয়। দুপুরের পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সাংগ্রাই নৃত্যসহ মারমা নাচ-গান হয়। শোভাযাত্রায় বাজানো মারমা বাদ্যযন্ত্রের নাম দিয়েছে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (2025): বুং (ছোট ঢোল), পাই (বড় ঢোল) ও হ্ন্যেহ্ (বিশেষ বাঁশি); পাহাড়ের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বিস্তারিত আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আমাদের লেখায়।
সব উৎস একমত যে জলকেলির পানি পুরনো বছরের দুঃখ, দুর্ভাগ্য ও গ্লানি ধুয়ে ফেলার প্রতীক। পাশাপাশি কয়েকটি উৎস দ্বিতীয় একটি অর্থের কথা বলে: তরুণ-তরুণীর পছন্দ প্রকাশ, যা কখনো বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। এই দ্বিতীয় অর্থটিকে উৎসগুলো “বিশ্বাস” বা “myth” হিসেবেই লিখেছে।
আমাদের আর্কাইভ অনুযায়ী মারমা সমাজ আশা করে পূর্ববর্তী বছরের সব যন্ত্রণা, দুঃখ, দুর্ভাগ্য ও মালিন্য এই পানিতে ধুয়ে যাবে। রাঙামাটি জেলা পোর্টাল লেখে, পানি উৎসবের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা একে অপরকে “শুভেচ্ছার বৃষ্টিতে” সিক্ত করেন এবং পুরনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে নতুন জীবনের দিকে পা বাড়ান। বাংলাপিডিয়া বলে, মারমা তরুণ-তরুণীরা পানিকে পবিত্রতার প্রতীক মনে করেন এবং পরস্পরকে পানি ছিটিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করেন। 2026 সালে রাঙামাটির উৎসব কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা ট্রিবিউনকে একই কথা বলেন: উদ্দেশ্য পুরনো বছরের দুঃখ ধুয়ে নতুন বছরকে নতুন সম্প্রীতি নিয়ে বরণ।
বাংলা উইকিপিডিয়া এর সঙ্গে দুটি সামাজিক প্রেক্ষাপট যোগ করে, দুটিই কেবল এই উৎসে পাওয়া গেছে: পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন জুম মৌসুম শুরু হয় সাংগ্রাইয়ের পরে, আর মারমারা মাঘী পূর্ণিমা থেকে সাংগ্রাই পর্যন্ত নতুন বিয়ে করেন না। নিবন্ধটির ভাষায়, সাংগ্রাই মানে পুরনো সব ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু।
2005 সালের ডেইলি স্টার লেখে, দুই নৌকার এই খেলা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া বা প্রস্তাব দেওয়ার একটি অনানুষ্ঠানিক উপায়, যদিও প্রতীকী প্রস্তাব সবসময় বিয়েতে গড়ায় না। বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধ বলে, মারমা যুবকেরা পছন্দের মানুষটির গায়ে পানি ছিটিয়ে সবার সামনে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। 2026 সালের ডেইলি স্টার ক্রোড়পত্র একে একটি “myth” বলে: বিশ্বাস আছে, নির্দিষ্ট কোনো মেয়েকে পানি ছিটানো ছেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত যেতে পারে। একই লেখা জানায়, আয়োজকেরা কখনো টাকার বিনিময়ে ছেলেদের পছন্দের মেয়ের মুখোমুখি সারিতে দাঁড়ানোর ব্যবস্থাও করেন।

সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় বান্দরবান জেলা শহরের রাজার মাঠে ও সাঙ্গু নদীর তীরে। রাঙামাটিতে মূল আয়োজন চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী স্টেডিয়ামে, কাপ্তাইয়ে একটি পুরনো বৌদ্ধ বিহারের মাঠে, খাগড়াছড়িতে জেলা সদরের পানখাইয়াপাড়ায়। এর বাইরে পাড়ায় পাড়ায় ছোট আয়োজন হয়।
| জেলা | জায়গা | আয়োজক (খবর অনুযায়ী) | উৎস |
|---|---|---|---|
| বান্দরবান | জেলা শহরের রাজার মাঠ (আনুষ্ঠানিক মৈত্রী পানিবর্ষণ); সাঙ্গু নদীর তীর ও বালুচর (বুদ্ধস্নান, জলকেলি); শহরতলির চেমি ডলুপাড়া | সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন পরিষদ | প্রথম আলো 2026, বাংলা ট্রিবিউন 2022, ডেইলি স্টার বাংলা 2022 |
| বান্দরবান | গুংগুরুমুখ খেয়াংপাড়া (খেয়াংদের সাংলান উপলক্ষে মৈত্রী পানিবর্ষণ) | উল্লেখ নেই | প্রথম আলো 2026 |
| রাঙামাটি | চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী স্টেডিয়াম | মারমা সংস্কৃতি সংস্থা (মাসস) | বিডিনিউজ২৪ 2026, Dhaka Tribune 2024 |
| রাঙামাটি (কাপ্তাই) | কাপ্তাই উপজেলার একটি শতবর্ষী বৌদ্ধ বিহারের মাঠ | বিহারের সাংগ্রাই জলোৎসব উদযাপন কমিটি | Dhaka Tribune 2024 |
| খাগড়াছড়ি | জেলা সদরের পানখাইয়াপাড়া, মারমা উন্নয়ন সংসদের মাঠ (শোভাযাত্রা শুরু ও শেষ) | মারমা উন্নয়ন সংসদ, মারমা যুব সংসদ | বাংলা ট্রিবিউন 2026, ইনডিপেনডেন্ট টিভি 2026 |
বান্দরবানে এটি একক জাতির আয়োজনও নয়। প্রথম আলোর 15 এপ্রিল 2026-এর প্রতিবেদন লেখে, মারমাদের সাংগ্রাইং ও খেয়াংদের সাংলান উপলক্ষে মৈত্রী পানিবর্ষণ হয়েছে, রাজার মাঠে “হাজারো পাহাড়ি ও বাঙালি নারী-পুরুষের সমাগম” হয়েছে, আর একই দিনে আলীকদম ও রুমায় ম্রোদের চাংক্রান মেলা হয়েছে। রাঙামাটিতেও মারমাদের পাশাপাশি চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও বাঙালিরা অংশ নেন বলে লিখেছে বিডিনিউজ২৪।
জেলাভিত্তিক ভ্রমণ-তথ্য, কোন জায়গা কার, আর পাহাড়ে যাওয়ার আগে কী জানা দরকার, তা আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশে।
না, এক নয়, তবে কাছাকাছি। বর্মী পঞ্জিকা মানে এমন কয়েকটি জাতির নববর্ষের নাম সাংগ্রাইয়ের কাছাকাছি, আর তাঁদের কারও কারও উৎসবেও পানিখেলা আছে। প্রতিটির আচার আলাদা উৎসে আলাদা করে লেখা; এক জাতির বিবরণ অন্য জাতির বেলায় খাটানো যায় না।
নামগুলো: বিডিনিউজ২৪ (2026) অনুযায়ী বর্মী পঞ্জিকা অনুসরণকারীদের মধ্যে চাকেরা সাংগ্রাই, ম্রোরা চাংক্রান, খেয়াংরা সাংলান ও খুমিরা সাংক্রাই নামে বর্ষবরণ করেন। প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদন বলে, মারমা, ম্রো, খুমি, খেয়াং ও চাক, এই পাঁচ জাতির উৎসবের নাম প্রায় কাছাকাছি উচ্চারণে সাংগ্রাইং, রীতিও প্রায় একই। খুমিদের উৎসবের নাম নিয়ে অমিল আছে: বিডিনিউজ২৪ লেখে সাংক্রাই, প্রথম আলো লেখে চাংক্রাই, দ্য ডেইলি স্টার (2014) লেখে Chankrai।
চাক: আর্কাইভের চাক-লেখা অনুযায়ী তৃতীয় দিন আপ্যাইং থেকে কয়েক দিন পাড়া থেকে পাড়ায় বুদ্ধপূজায় যাওয়া হয় (“ফারা রিক্ষ্যে”), বুদ্ধমূর্তি, ভিক্ষু ও উপাসক-উপাসিকাদের স্নান করানো হয়, আর এ সময় এক পাড়ার যুবক-যুবতীদের সঙ্গে আরেক পাড়ার পানিখেলা হয়। মারমাদের মতো মঞ্চ-নৌকার আয়োজনের কথা সেখানে নেই।
খেয়াং: 2026 সালে বান্দরবানের গুংগুরুমুখ খেয়াংপাড়ায় সাংলান উপলক্ষে মৈত্রী পানিবর্ষণ হয়েছে (প্রথম আলো)। এর বাইরে খেয়াংদের পানিখেলার বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।
রাখাইন: ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া সাংগ্রাইকে মারমা ও রাখাইন দুই জাতির নববর্ষ বলে; দ্য ডেইলি স্টারের 2026 সালের ক্রোড়পত্রও দুই জাতির উৎসব হিসেবে একসঙ্গে লেখে। কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর উপকূলে রাখাইন বসতির ইতিহাস আছে ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে উপকূলে রাখাইন বসতি নিয়ে আমাদের লেখায়। রাখাইন উৎসবের আচার-ক্রম এই লেখার বিষয় নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন জাতির কোন উৎসব, তার সারণি আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লেখায়।
সাংগ্রাই জলকেলি এখন আগের চেয়ে বড় ও আনুষ্ঠানিক। পাহাড়ের লেখক ও প্রবীণেরা তিনটি পরিবর্তনের কথা বলেন: পাড়ার স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন মঞ্চনির্ভর হয়েছে, পাহাড়ে পানির উৎস শুকাচ্ছে অথচ শহরের উৎসবে ট্রাকে করে পানি আনা হচ্ছে, আর আয়োজক কমিটি নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিয়েছে।
আনুষ্ঠানিকতা: থোয়াইং চ প্রু মাস্টার প্রথম আলোকে বলেন, আগের চেয়ে এখনকার আয়োজন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতানির্ভর। একই প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির সংস্কৃতিকর্মী ধীমান খীসা বলেন, আগে সবাই ঘরে ঘরে লোকজ ধারায় উৎসব পালন করতেন; এখন তা অনুষ্ঠাননির্ভর। প্রতিবেদনটি জানায়, শোভাযাত্রা, ফুল ভাসানো ও মৈত্রী পানিবর্ষণের মতো নাগরিক আয়োজন এসেছে আশির দশকের মাঝামাঝি “বৈসাবি” নাম চালুর পর থেকে, যদিও বান্দরবানে মৈত্রী পানিবর্ষণ শুরু হয়েছিল তার আগে, 1970-এর দশকের মাঝামাঝি।
পানির সংকট: ঞ্যোহ্লা মংয়ের লেখা রুমা ও থানচি উপজেলা সদরের উদাহরণ দেয়: আগে উঁচু পাহাড়ের ছড়ার পানি পাইপে সরবরাহ হতো, এখন উল্টো ট্রাকে করে পানি নিয়ে গিয়ে বিলি করতে দেখা যায়। তাঁর পর্যবেক্ষণ, শহরের মারমারা ট্রাকে পানি এনে পানি ছিটানোর উৎসব করবেন, অথচ দূর গ্রামের নারীরা এক কলসি পানি পেতে 3-4 ঘণ্টা ব্যয় করেন। লেখাটি মঞ্চ ও “বড় অতিথি” আনার প্রতিযোগিতা আর খেলার নামে জুয়ার সমালোচনাও করে।
কমিটি নিয়ে বিরোধ: প্রথম আলোর 6 এপ্রিল 2026-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বান্দরবান জেলা শহরে সাংগ্রাইং উদযাপনের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি প্রতিবছর আয়োজনের দায়িত্বে থাকে, আর সরকার বদলালে কমিটির নেতৃত্বও বদলায়। 2026 সালে দুটি উদযাপন কমিটির বিরোধ জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকেও মেটেনি; মীমাংসার দায়িত্ব দেওয়া হয় মারমা সুশীল সমাজকে। বিরোধ শেষ পর্যন্ত কীভাবে মিটেছে, সে বিষয়ে আলাদা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি; তবে 13 এপ্রিল উদযাপন পরিষদের ব্যানারে রাজার মাঠ থেকেই শোভাযাত্রা বের হয় (টিবিএস)।
সাংগ্রাই জলকেলি মারমা জাতির নববর্ষ উৎসব সাংগ্রাইয়ের পানিখেলা। মাঠে মণ্ডপ বানিয়ে দুই পাশে পানিভর্তি নৌকা বা পাত্র রাখা হয়, এক পাশে তরুণ ও অন্য পাশে তরুণীরা দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে পানি ছোড়েন। আমাদের আর্কাইভ, বাংলাপিডিয়া ও রাঙামাটি জেলা পোর্টাল অনুযায়ী এর অর্থ পুরনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে নতুন বছর বরণ।
বাংলা উইকিপিডিয়া লেখে “রিলং পোয়েঃ”, রাঙামাটি জেলা পোর্টাল “রিলং পোয়েহ্”, বাংলাপিডিয়া Rilongpoey। দ্য ডেইলি স্টার 2005 সালে লিখেছিল Moita rilong poye, 2014 সালে Rilong Bwoi। আনুষ্ঠানিক আয়োজনের প্রচলিত বাংলা নাম “মৈত্রী পানিবর্ষণ”, রাঙামাটিতে “মৈত্রী পানি উৎসব”।
সাংগ্রাই সাধারণত 13 থেকে 15 এপ্রিল, আর জলকেলি হয় এর শেষ দিকে। জায়গাভেদে দিন আলাদা: 2026 সালে খাগড়াছড়িতে 14 এপ্রিল, বান্দরবানে 15 ও 16 এপ্রিল, রাঙামাটির মারী স্টেডিয়ামে 17 এপ্রিল। বাংলা উইকিপিডিয়া জানায়, অনেক জায়গায় 16 থেকে 18 এপ্রিলেও আয়োজন হয়।
রাঙামাটি জেলা পোর্টাল অনুযায়ী পাইং ছোয়াই, সাংগ্রাই আফ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং। বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধ অনুযায়ী সাংগ্রাই আক্যা বা পাইং ছোয়ায় (ফুল তোলা), সাংগ্রাই বাক্ (সাংগ্রাইয়ের দিন) ও সাংগ্রাই আপ্যাইং (বিদায়)। প্রথম ও তৃতীয় দিনের নামে উৎসগুলো মোটামুটি একমত, দ্বিতীয় দিনের নামে নয়।
প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মং নু চিং মারমা বলেছেন, 1973-74 সালে কয়েকজন যুবক মিয়ানমারে এই উৎসব দেখে আসেন এবং 1974 সালে বান্দরবান শহরে প্রথম আনুষ্ঠানিক আয়োজন করেন। অন্যদিকে দ্য ডেইলি স্টার (2014) ও ঢাকা ট্রিবিউন (2018) একে শতবর্ষের পুরনো রীতি বলেছে।
সাংগ্রাইয়ে পানির প্রথম ব্যবহার ধর্মীয়। আমাদের আর্কাইভের মারমা-লেখা অনুযায়ী বুদ্ধমূর্তি শোভাযাত্রা করে নদীর তীরে নিয়ে বাঁশের মঞ্চে রাখা হয়, চন্দন ও ডাবের পানি ঢালা হয়, আর সেই পানি রোগ সারায় বিশ্বাসে সংরক্ষণ করা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের 2005 সালের বিবরণে এই স্নানই জলকেলির সূচনা ঘোষণা করে।
এটি একটি প্রচলিত বিশ্বাস। দ্য ডেইলি স্টার 2005 সালে লিখেছিল, দুই নৌকার পানিখেলা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অনানুষ্ঠানিক উপায়, তবে সবসময় বিয়েতে গড়ায় না। বাংলা উইকিপিডিয়া বলে, মারমা যুবকেরা পছন্দের মানুষকে পানি ছিটিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। ডেইলি স্টারের 2026 সালের ক্রোড়পত্র একে “myth” বলেছে।
বান্দরবান শহরের রাজার মাঠ ও সাঙ্গু নদীর তীরে সবচেয়ে বড় আয়োজন হয়, শহরতলির চেমি ডলুপাড়াতেও হয়। রাঙামাটিতে মারমা সংস্কৃতি সংস্থা চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী স্টেডিয়ামে আয়োজন করে। কাপ্তাইয়ে একটি শতবর্ষী বৌদ্ধ বিহারের মাঠে, আর খাগড়াছড়িতে মারমা উন্নয়ন সংসদের উদ্যোগে পানখাইয়াপাড়ায় আয়োজন হয়।
পাইংছোয়াই মানে ফুল ছেঁড়ার দিন, সাংগ্রাইয়ের প্রথম পর্ব। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী 12 এপ্রিলের রাতে মারমা তরুণ-তরুণীরা জেগে থেকে পিঠা বানান, ভোরের আগে পাহাড় থেকে সাদা “সাংগ্রাই পাইং” ফুল তুলে আনেন। সেই ফুলে প্রথমে বুদ্ধপূজা, তারপর ঘরের দরজা সাজানো হয়।
না। বৈসাবি ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজুর প্রথম অক্ষর জুড়ে তৈরি একটি যৌথ নাম। প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী নামটি আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে পরিচিতি পেয়েছে। তিন উৎসবের সময় এক, কিন্তু আচার আলাদা; জলকেলি মূলত মারমা সাংগ্রাইয়ের অংশ।
বিডিনিউজ২৪-এর 2026 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্মী পঞ্জিকা অনুসরণকারীদের মধ্যে চাকেরা সাংগ্রাই, ম্রোরা চাংক্রান, খেয়াংরা সাংলান ও খুমিরা সাংক্রাই নামে বর্ষবরণ করেন। উইকিপিডিয়া ও দ্য ডেইলি স্টার রাখাইনদের নববর্ষকেও সাংগ্রাই বলে। প্রতিটি জাতির আচার আলাদা।
হ্যাঁ। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী মারমা তরুণ-তরুণীরা পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান করান, প্রবীণেরা সেলামি ও আশীর্বাদ দেন। প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদনে থোয়াইং চ প্রু মাস্টার বলেছেন, মূল সাংগ্রাইংয়ের দিনে অষ্টশীলধারী বয়স্কদের গোসল করানো হতো, আর তাঁদের দেওয়া টাকায় পিঠা তৈরি হতো।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026