প্লুং বাঁশি ম্রো সমাজের সবচেয়ে পরিচিত বাদ্যযন্ত্র, কিন্তু সাধারণ বাঁশের বাঁশির মতো এক নলে ফুঁ দিয়ে এটি বাজে না। একটি শুকনো তিতা লাউয়ের খোলে দুই সারিতে কয়েকটি সরু বাঁশের নল গেঁথে, প্রতিটি নলের গোড়ায় বাঁশেরই পাতলা একটি রিড বসিয়ে, জোড়াগুলো মোম দিয়ে আটকে প্লুং তৈরি হয়। আর প্লুংমা, প্লুংকে ও তিনতেং প্লুংয়ের তফাত নলের সংখ্যায়: বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী নিচে দুটি ও ওপরে একটি নল থাকলে প্লুংমা, নিচে দুটি ও ওপরে দুটি থাকলে প্লুংকে, নিচে তিনটি ও ওপরে দুটি থাকলে তিনতেং প্লুং।
এই লেখায় প্লুং তৈরির প্রতিটি ধাপ, নামের পুরো তালিকা, কোন অনুষ্ঠানে কোন প্লুং বাজে আর উৎসগুলো কোথায় একে অন্যের সঙ্গে মেলে না, সব এক জায়গায় রাখা হলো। প্রধান উৎস জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহে থাকা ক্লাউস-ডিটার ব্রাউন্স ও লোরেঞ্জ ল্যোফলারের বই Mru: Hill People on the Border of Bangladesh (Birkhäuser, 1990), যেখানে প্লুং বানানো, সুর বাঁধা ও বাজানোর বর্ণনা ছবিসহ আছে। পাহাড়ের সব বাদ্যযন্ত্রের পরিচয় এক নজরে পেতে দেখুন আমাদের পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্রের পাঠ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা; ম্রো সমাজ, ক্রামা ধর্ম ও বর্ণমালার পরিচয় আছে ম্রো জাতি নিয়ে আমাদের মূল লেখায়।
এই লেখায় যা আছে
বাংলায় প্লুংকে সাধারণত “বাঁশি” বলা হয়, আর বাংলাপিডিয়াও লিখেছে ম্রো ভাষায় প্লুং শব্দের অর্থ বাঁশি। কিন্তু গঠনের দিক থেকে এটি মুখ-অর্গান: লাউয়ের খোলের ভেতরে ফুঁ দিলে বাতাস কয়েকটি বাঁশের নলে ভাগ হয়ে যায়, আর প্রতিটি নলের নিজস্ব রিড কাঁপে। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বইয়ের শব্দকোষে প্লুংয়ের সংজ্ঞাই “মুখ-অর্গান”।
বইটির শব্দকোষে প্লুং (plung) সম্পর্কে লেখা আছে: এটি একটি বায়ুবাদ্য, যাকে “চেং” বা মুখ-অর্গান বলা হয়, তবে হারমোনিকার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা চলবে না; এর নানা ধরন আছে, আর সবগুলোতেই একটি লাউয়ের খোলে দুই সারিতে কয়েকটি নল বসানো থাকে। একই জায়গায় বলা হয়েছে, এ রকম যন্ত্র থাইল্যান্ড, লাওস, দক্ষিণ চীন এবং বোর্নিওর দায়াকদের মধ্যেও আছে।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Gourd mouth organ” নিবন্ধ এই পরিবারকে চার ভাগে ভাগ করেছে এবং তৃতীয় ধরনের উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের ম’বুওত আর থাই-লাও খেনের পাশে “বাংলাদেশের প্লুং”-এর নাম দিয়েছে। নিবন্ধটি পুরো পরিবারটিকে “free reed” বা মুক্ত-রিডের যন্ত্র বলে, যার Hornbostel–Sachs শ্রেণি 412.132। অর্থাৎ বাদ্যযন্ত্রের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসে প্লুং বাঁশির (যেখানে বাতাস কোনো ধারে কেটে শব্দ হয়) দলে নয়, রিডের দলে পড়ে।
শব্দটা নিয়ে আরেকটি কথা জানা দরকার। সমকালে 2021 সালে প্রকাশিত ফারহা তানজীম তিতিলের ভ্রমণলেখায় বলা হয়েছে, ম্রোরা বাঁশকে বলে “কাও” আর বাঁশের বাঁশিকে “প্রুই”। লেখক ম্রোদের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে নিজের ধারণা লিখেছেন যে প্লুং কোনো একক বাঁশি নয়, বরং ছোট-বড় বহু বাঁশির “অর্কেস্ট্রা বা ঐকতান”। এটি লেখকের ব্যাখ্যা, অভিধানের সংজ্ঞা নয়; তবে নিচে দেখা যাবে, উৎসবে প্লুং সত্যিই দলবদ্ধভাবে, নানা মাপের যন্ত্রে বাজানো হয়।
উচ্চারণ ও বানানেও ভিন্নতা আছে। বাংলা বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধে “প্লুং”, অথচ একই বিশ্বকোষের “ম্রো” নিবন্ধের এক জায়গায় “প্লং”। আমাদের আর্কাইভের সিংইয়ং ম্রো এবং প্রথাগত আইন নিয়ে লেখাটিতে “পুং”। ইংরেজিতে plung, plong ও ploong তিনটিই চলে; ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বইয়ের একটি ছবির ক্যাপশনে বানানটি “pfung”। এই লেখায় সর্বত্র “প্লুং” ব্যবহার করা হয়েছে।
প্লুংয়ের তিনটি মূল উপকরণ: পাহাড়ে জন্মানো তিতা লাউয়ের শুকনো খোল, সরু বাঁশের নল, আর জোড়া আটকানোর মোম। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, পাহাড়ে উৎপন্ন এক প্রকার তিতা লাউয়ের খোল ও সরু বাঁশের নল দিয়ে ম্রো ও খুমিরা “নিজস্ব কারিগরি কলাকৌশলে” প্লুং তৈরি করে। মোমটি কোন ধরনের, তা নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়।
লাউটি কোথা থেকে আসে, তার উত্তর আছে আমাদের আর্কাইভে। ম্রো লেখক সিংইয়ং ম্রোর জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান নিয়ে লেখা বলছে, তিতা লাউ জুমেই জন্মায়; এত তিতা যে খাওয়া যায় না। এর খোলস দিয়ে পানি তোলা হয়, ফসলের বীজ রাখা হয়, কারণ খোলের ভেতরে ফোমের মতো এক প্রকার প্রলেপ থাকে। একই লেখায় আছে: “ম্রো আদিবাসীরা এই তিতা লাউয়ের খোলস দিয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশি (পুং) তৈরী করে।”
অর্থাৎ প্লুংয়ের প্রধান অংশটি জুমের ফসল। জুমের বছরজুড়ে কাজের হিসাব জানতে দেখতে পারেন জুম চাষ নিয়ে আমাদের মাসভিত্তিক লেখা। সিংইয়ং ম্রোর একই লেখার জুম-পঞ্জিতে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে পশুপাখি তাড়ানো ও জুমঘরে পাহারার সরঞ্জামের তালিকায় “তুম প্লুং (এক প্রকার বাঁশি)”-এর নামও আছে; সেটি কেমন যন্ত্র, লেখায় তার বর্ণনা নেই।
নলগুলো সরু বাঁশের। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই অনুযায়ী প্রতিটি নল বাঁশের একটি কাণ্ড থেকে কাটা, নিচের মাথা বন্ধ। দলের প্লুংয়ে নলের মাথার ওপর আরেকটি বাঁশের নল বসানো থাকে, যাকে বইটি “bourdon” বলেছে; এ নিয়ে নিচে বিস্তারিত আছে। পার্বত্যনিউজ ও কক্সবাজার নিউজের 30 মার্চ 2026-এর প্রতিবেদনে উপকরণটিকে বলা হয়েছে “বাঁশের কঞ্চি”।
এখানেই উৎসগুলোর প্রথম অমিল। পার্বত্যনিউজ ও কক্সবাজার নিউজ, দুটি প্রতিবেদনেই কঞ্চিগুলো “মৌচাকের মোম” দিয়ে আটকানোর কথা আছে; মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ম্রোদের প্লুং নিয়ে ইউনেস্কোর সহযোগী সংস্থা ICHCAP-এর 2014 সালের নথিতেও “beeswax”। অন্যদিকে ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই লিখেছে, নলগুলো লাউয়ের সঙ্গে আটকানো হয় গাঢ় বাদামি “wasp wax” বা বোলতার মোম দিয়ে; বইটির মতে মৌমাছির মোম ম্রোরা ব্যবহার করেন কেবল বোনা ও সেলাইয়ের কাজে, আর ফুঁকনল বা মুখ-অর্গানের ছিদ্র বন্ধ করতে ভিন্ন ধরনের মোম লাগে। বইয়ের বর্ণনা কয়েক দশক আগের মাঠকর্মের, প্রতিবেদন দুটি 2026 সালের; দুই সময়ে বা দুই অঞ্চলে উপকরণ আলাদা হতে পারে কি না, কোনো উৎস তা বলেনি।
প্লুং বানানোর সবচেয়ে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বইয়ে। সংক্ষেপে: লাউয়ের গলায় বাঁশের ফুঁকনল জুড়ে দেওয়া হয়, লাউয়ের পেটে দুই সারিতে নল গাঁথা হয়, প্রতিটি নলের লাউয়ের ভেতরে থাকা অংশে একটি ছোট বাঁশের রিড বসানো হয়, নলের গায়ে আঙুলের একটি ছিদ্র কাটা হয়, আর সব জোড়া মোমে সিল করা হয়।
বই, উইকিপিডিয়ার “Mru people” নিবন্ধ এবং দুটি সংবাদ-প্রতিবেদন মিলিয়ে ধাপগুলো এ রকম দাঁড়ায়। প্রতিটি ধাপের পাশে উৎস দেওয়া হলো, কারণ কয়েকটি ধাপ কেবল একটি উৎসেই আছে।
বইয়ের একটি নকশাচিত্রের ক্যাপশনে একক যন্ত্রের মাপও আছে: 8 থেকে 10টি বাঁশের নল দুই সারিতে একটি বোতল-লাউয়ের পাশে গাঁথা থাকে। নিচের ছকে বিভিন্ন উৎসে নলের সংখ্যা পাশাপাশি রাখা হলো।
| উৎস | কোন যন্ত্র | নলের সংখ্যা |
|---|---|---|
| ব্রাউন্স ও ল্যোফলার (নকশাচিত্র) | মুখ-অর্গান | 8–10, দুই সারিতে |
| ব্রাউন্স ও ল্যোফলার | একক বাজনার প্লুং | 8 (“eight-pipe mouth organ”) |
| ব্রাউন্স ও ল্যোফলার | বিয়ের প্লুং | 6 |
| উইকিপিডিয়া (“Mru people”) | সাধারণ বর্ণনা | সাধারণত 3 থেকে 5 |
| উইকিপিডিয়া (“Ploong”) | সবচেয়ে বড় প্লুং | 8টি লম্বা নল |
| পার্বত্যনিউজ ও কক্সবাজার নিউজ (প্রতিবেদকের বর্ণনা) | প্লুং | 4 বা 6 |
| একই প্রতিবেদন (কারিগর চিংতুই ম্রো) | প্লুং | 5 বা 6 |
| বাংলাপিডিয়া | চার ধরন | 3, 4, 5 ও 9 (নিচের ছক দেখুন) |
| পেন মিউজিয়াম | “plung kee” | 2 + 3 = 5 |
এক দিনে কটি প্লুং বানানো যায়? কক্সবাজার নিউজের প্রতিবেদনে কারিগরদের বরাতে বলা হয়েছে, উপকরণ প্রস্তুত থাকলে এক দিনে কয়েকটি ছোট প্লুং তৈরি সম্ভব। পার্বত্যনিউজ একই কথা কারিগর চিংতুই ম্রোর বরাতে লিখেছে। তবে প্রতিবেদনের আরেকটি সতর্কতাও মনে রাখার মতো: হাতের দক্ষতা না থাকলে ভালোভাবে সুর ফোটে না।
বাদক ফুঁকনল দিয়ে লাউয়ের ভেতরে বাতাস দেন, আর আঙুল দিয়ে নলের গায়ের ছিদ্র বন্ধ করেন। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই ও উইকিপিডিয়া দুটোই একটি অপ্রত্যাশিত নিয়ম লিখেছে: কোনো নল কেবল তখনই বাজে, যখন তার ছিদ্রটি ঢাকা থাকে। খোলা ছিদ্রের নল নীরব থাকে। ফলে আঙুল চাপা মানে সুর তোলা, ছেড়ে দেওয়া মানে থামানো।
পার্বত্যনিউজের প্রতিবেদনও একই রকম বর্ণনা দেয়: ফুঁ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে কম্পন তৈরি হয়ে সুর হয়, আর প্রতিটি কঞ্চির একটি করে ছিদ্রে আঙুল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নানা সুর ও ছন্দ তৈরি হয়।
নল দুই সারিতে বসে, আর দুই হাতে দুই সারি বাজানো হয়। কিন্তু কোন হাত কোন সারিতে, তা নিয়ে উৎসে উল্টো কথা আছে। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই বলছে পেছনের সারি ডান হাতের, সামনের সারি বাঁ হাতের; উইকিপিডিয়ার “Mru people” নিবন্ধ বলছে পেছনের সারি বাঁ হাতে, সামনের সারি ডান হাতে বাজে। উইকিপিডিয়ার নির্মাণ-বর্ণনার অনুচ্ছেদটিতে কোনো উৎস উল্লেখ নেই।
ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই অনুযায়ী একটি প্লুংয়ের নলগুলো সাধারণত চতুর্থ ও পঞ্চম স্বরান্তরে (“4ths and 5ths”) বাঁধা হয়। দলবদ্ধ বাজনায় এর চেয়েও কঠিন কাজ: শুধু একটি যন্ত্রের নলগুলো নয়, দলের সব যন্ত্রকে একে অন্যের সঙ্গে মেলাতে হয়, কারণ একসঙ্গে বাজালে সব যন্ত্রের সুর মিলে যেতে হবে। রিডের ওপরের মোমের দলাই এই সুর বাঁধার উপায়। বইয়ের আরেকটি ক্যাপশন অনুযায়ী নল যত লম্বা, সুর তত নিচু। সমকালের লেখাও একই কথা বলে অন্যভাবে: সবচেয়ে বড় বাঁশিটি “বেইজের কাজ” করে, গম্ভীর সুর তোলে, আর সবচেয়ে ছোটটি থাকে “লিড সুর” হিসেবে।
ব্রাউন্স ও ল্যোফলার লিখেছেন, ম্রো প্লুং-দলের বাজনা একঘেয়ে তো নয়ই, ইউরোপের বাঁশি বা ব্যাগপাইপ দলের মতোও নয়; রাতে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে কয়েক মাইল দূর থেকে শোনা যায়, আর দূর থেকে তাঁদের কানে এটি সবচেয়ে বেশি মনে করিয়ে দিয়েছে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। উইকিপিডিয়ার “Ploong” নিবন্ধে লেখা আছে, সবচেয়ে বড় প্লুংয়ের আওয়াজকে ব্যাগপাইপ বা ইলেকট্রনিক অর্গানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দুই তুলনা একে অন্যের বিপরীত; দুটিই বাইরের শ্রোতার কানের বর্ণনা।
বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধ (আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র অংশ, লেখক মোমেন চৌধুরী) অনুযায়ী ম্রো সমাজে নলের সংখ্যা অনুসারে প্লুংয়ের চারটি নাম প্রচলিত। তফাত কেবল নিচের ও ওপরের নলের সংখ্যায়। বাংলা ও ইংরেজি দুই সংস্করণেই একই চারটি ধরন একই সংখ্যায় দেওয়া আছে।
| নাম | ইংরেজি বাংলাপিডিয়ায় বানান | নিচে নল | ওপরে নল | মোট | ব্যবহার (বাংলাপিডিয়া) |
|---|---|---|---|---|---|
| প্লুংমা | plungma | 2 | 1 | 3 | আলাদা করে বলা নেই; সাধারণভাবে প্লুং বাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পূজাপার্বণ এবং মানতের অনুষ্ঠানে |
| প্লুংকে | plungke | 2 | 2 | 4 | |
| তিনতেং প্লুং বা তুলেরুম প্লুং | tinteng plung / tulerum plung | 3 | 2 | 5 | |
| রিনাপ্লুং | rinaplung | 5 | 4 | 9 | কেবল কলেরা, মহামারি বা দৈব-দুর্বিপাক থেকে রক্ষার বিশেষ অনুষ্ঠানে |
তিনটি জিনিস ছকটি থেকে স্পষ্ট হয়। প্রথমত, প্লুংমা সবচেয়ে ছোট বিন্যাস, মাত্র তিন নলের। দ্বিতীয়ত, প্লুংকে আর তিনতেং প্লুংয়ের তফাত একটি নলের: নিচের সারিতে দুটি বনাম তিনটি। তৃতীয়ত, রিনাপ্লুং বাকি তিনটির চেয়ে অনেক বড়, নয় নলের, আর এর ব্যবহারও আলাদা।
“নিচে” আর “ওপরে” বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেনি। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বর্ণনায় নলগুলো লাউয়ের দুই সারিতে বসে, আর পার্বত্যনিউজের প্রতিবেদনে লাউয়ের “দু’পাশে” ছিদ্র করার কথা আছে; মিয়ানমারের ICHCAP নথিতেও কিছু যন্ত্রে লাউয়ের ওপরে ও নিচে আলাদা নল বসানোর বিবরণ আছে। “নিচে-ওপরে” এই দুই সারি নাকি লাউয়ের দুই দিক, কোনো উৎস তা নিশ্চিত করে বলেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পেন মিউজিয়ামে রাখা একটি ম্রো প্লুংয়ের নথিতে যন্ত্রটির নাম “Plung or plung kee”, আর বর্ণনায় আছে এক গুচ্ছে দুটি ও আরেক গুচ্ছে তিনটি, মোট পাঁচটি নল। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে প্লুংকে চার নলের, আর পাঁচ নলের বিন্যাসের নাম তিনতেং প্লুং। “kee” আর “কে” একই শব্দের দুই বানান কি না, আর জাদুঘরের নামকরণ কোন সূত্রে, নথিতে তার উল্লেখ নেই।
বাংলাপিডিয়ার চারটি নামের বাইরে আরও নাম প্রচলিত। 2026 সালের মার্চে আলীকদমের ম্রো বাঁশি-কারিগর চিংতুই ম্রো পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, প্রতিটি বাঁশির আলাদা নাম আছে: প্লুং কাকমা, প্লুং ক্লাং, তিংতেং প্লুং, ত্র, রিনা প্লুং ও পুরুই। নৃত্যের বাঁশি, কলেরা বাঁশি (রিনা প্লুং), গো-হত্যার বাঁশি এবং উৎসব-পার্বণে বাজানোর জন্য আলাদা আলাদা বাঁশি আছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
| নাম | কোথায় পাওয়া যায় | মন্তব্য |
|---|---|---|
| প্লুংমা | বাংলাপিডিয়া | 3 নল |
| প্লুংকে / plung kee | বাংলাপিডিয়া; পেন মিউজিয়াম | বাংলাপিডিয়ায় 4 নল, জাদুঘরের নমুনায় 5 নল |
| তিনতেং প্লুং / তিংতেং প্লুং | বাংলাপিডিয়া; পার্বত্যনিউজ ও কক্সবাজার নিউজ | বাংলাপিডিয়ায় 5 নল; অপর নাম তুলেরুম প্লুং |
| রিনাপ্লুং / রিনা প্লুং | বাংলাপিডিয়া; দুই প্রতিবেদন | “রিনা” মানে কলেরা (প্রতিবেদন) |
| প্লুং কাকমা | দুই প্রতিবেদন | গঠন বা ব্যবহারের বর্ণনা নেই |
| প্লুং ক্লাং | দুই প্রতিবেদন | গঠন বা ব্যবহারের বর্ণনা নেই |
| পুরুই / প্রুই | দুই প্রতিবেদন; সমকাল | সমকালের লেখায় “প্রুই” মানে বাঁশের বাঁশি |
| ত্র | পার্বত্যনিউজ | বাংলাপিডিয়ায় “ত্র” ম্রো ভাষায় বেহালা-জাতীয় যন্ত্র বে-আনার নাম |
| তু | বাংলাপিডিয়া; ব্রাউন্স ও ল্যোফলার | এক নলের লাউ-যন্ত্র; নিচে আলাদা অংশ |
দুটি সতর্কতা। প্রথমত, কক্সবাজার নিউজে একই কারিগরের তালিকায় “ত্র” নেই, পার্বত্যনিউজে আছে; আর বাংলাপিডিয়া “ত্র” নামটি একটি বেহালা-জাতীয় তারের যন্ত্রের জন্য ব্যবহার করেছে। কারিগর কোন অর্থে নামটি বলেছেন, প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায় না। দ্বিতীয়ত, বাংলাপিডিয়া লিখেছে “তিনতেং”, প্রতিবেদন দুটি লিখেছে “তিংতেং”। ম্রো বর্ণমালায় শব্দটি কীভাবে লেখা হয়, তা পাওয়া যায়নি।
“রিনা” মানে কলেরা, আর রিনাপ্লুং মানে কলেরার বাঁশি; পার্বত্যনিউজ ও কক্সবাজার নিউজের প্রতিবেদন এভাবেই নামটি ব্যাখ্যা করেছে। নামের পেছনে ম্রো সমাজে দুটি কাহিনি প্রচলিত, দুটিই কলেরা মহামারি নিয়ে। কিন্তু রিনাপ্লুং কখন বাজে, সে প্রশ্নে বাংলাপিডিয়া আর একজন ম্রো লেখকের বই সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলে।
আলীকদমের 4 নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাত পুং ম্রো পার্বত্যনিউজকে কাহিনিটি বলেছেন। পাহাড়ের ওপরের এক ম্রো গ্রামে হঠাৎ সবাই কলেরায় আক্রান্ত হয়, অনেকে মারা যায়। কবিরাজের চিকিৎসা বা দেবতার পূজা, কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। তখন গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি স্বপ্নে দেখেন, এক সন্ন্যাসী তাঁকে লাউয়ের খোল আর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে, মৌচাকের মোমে জুড়ে একটি বাঁশি বানাতে বলছেন; সেটি বাজিয়ে গ্রাম সাতবার প্রদক্ষিণ করলে সবাই সেরে উঠবে। গ্রামের লোকেরা প্রথমে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করে। তিনি তবু বাঁশিটি বানান, বাজিয়ে সাতবার গ্রাম ঘোরেন, আর আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে ওঠে। তখন থেকে বাঁশিটির নাম রিনা প্লুং।
দ্বিতীয় কাহিনিটি আছে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও লেখক সিংইয়ং ম্রোর বই ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি-তে, যা পার্বত্যনিউজের তথ্যমতে 2019 সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত। পার্বত্যনিউজের বর্ণনা অনুযায়ী, কলেরা মহামারির সময় এক ম্রো যুবক মারা যান; শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি অলৌকিকভাবে জীবিত হয়ে ওঠেন, তাই আর দাহ করা হয় না। বাড়ি ফিরে তিনি “জাহাজের পাওয়া বাঁশির মত হুবহু” একটি বাঁশি বানান, আর তখন থেকেই এর নাম রিনা প্লুং বা কলেরা বাঁশি। প্রতিবেদনে এই অংশটির প্রেক্ষাপট আর ব্যাখ্যা করা হয়নি।
দুটি কাহিনির সময়কাল জানতে চাইলে আলীকদম মুরুং কল্যাণ ছাত্রাবাসের পরিচালক ইয়ংলক ম্রো পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, সুনির্দিষ্ট সময়কাল পাওয়া যায়নি, তবে বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন এগুলো অন্তত পাঁচ-ছয়শ বছর আগের কাহিনি হবে। এটি মৌখিক অনুমান, কোনো নথিভিত্তিক হিসাব নয়। তাঁর ভাষ্যে এ দুটি কাহিনি এখনো বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্যের ম্রোদের মুখে মুখে ঘোরে।
বাংলাপিডিয়া বলছে, কলেরা, মহামারি বা দৈব-দুর্বিপাক থেকে রক্ষা পাওয়ার বিশেষ অনুষ্ঠানে কেবল রিনাপ্লুং ব্যবহার করা হয়। পার্বত্যনিউজের বর্ণনায় সিংইয়ং ম্রোর বই বলছে, রিনা প্লুং শুধু গানের আসর এবং যুবক-যুবতীদের আনন্দ-উল্লাসের মুহূর্তে বাজানো হয়। দুটি দাবি পাশাপাশি রাখা হলো; কোনটি কোন অঞ্চলের বা কোন সময়ের রীতি, কোনো উৎস তা বলেনি। চিংতুই ম্রোর তালিকায় “কলেরা বাঁশি (রিনা প্লুং)” আর “নৃত্যের বাঁশি” আলাদা বাঁশি হিসেবে আছে।
ম্রো সমাজে মহামারি ঠেকানোর আচার নিয়ে বাংলাপিডিয়ার “ম্রো” নিবন্ধে আরেকটি তথ্য আছে: মহামারি আকারে কোনো রোগ দেখা দিলে ম্রোরা বসুমতি পূজা করে, আর গ্রামবাসীর মঙ্গল কামনায় এবং মহামারি ও অশুভ শক্তি তাড়াতে দলগতভাবে ওরেং-এর পূজা করে (বাংলা সংস্করণে ওরেং নদীর দেবী)। রিনাপ্লুং এই পূজাগুলোর কোনোটিতে বাজে কি না, নিবন্ধে উল্লেখ নেই।
ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই প্লুংকে ব্যবহার অনুযায়ী তিন ভাগে দেখায়: যেকোনো সময় একা বাজানোর আট-নলের প্লুং, বিয়ের জন্য বিশেষ ছয়-নলের প্লুং, আর গবাদিপশু উৎসর্গের অনুষ্ঠানে দলবদ্ধ বাজনার প্লুং। বই অনুযায়ী দলবদ্ধভাবে, অর্কেস্ট্রায় প্লুং বাজানোর অনুমতি আছে কেবল গবাদিপশুর অনুষ্ঠানে।
শুকনো মৌসুমের সন্ধ্যায়, যখন জুমের কাজ সারা দিনের শক্তি কেড়ে নেয় না, মেয়েরা এক ঘরে জড়ো হয়ে সুতা কাটে, আর তরুণেরা এসে গল্প করে, প্রেমের গান গায় এবং আট-নলের প্লুং বাজায়; বইটি একে একক বাদ্য বলেছে। বইয়ের মতে বাঁশের জিথার, দুই-তারের বেহালা এবং “সবার ওপরে” আট-নলের প্লুং, এই যন্ত্রগুলো প্রায় কেবল এই সুতা কাটার আসরেই বাজে। তবে বইটি এটাও যোগ করেছে যে সন্ধ্যার আসরে যন্ত্র বাজানোর চেয়ে বড় কৃতিত্ব নতুন গান রচনা করা।
বিয়ের দিন দুটি বিশেষ ছয়-নলের প্লুং তৈরি করা হয়। কনে বাবা-মায়ের ঘর থেকে বের হওয়ার মুহূর্ত থেকে বরের ঘরে পৌঁছানো পর্যন্ত কনের নিজের গোত্রের তরুণেরা এ দুটি বাজান। একই শোভাযাত্রায় বরের গোত্রের তরুণেরা একটি বিশেষভাবে সাজানো শূকর বয়ে নিয়ে যান (ব্রাউন্স ও ল্যোফলার)।
দলবদ্ধ বাজনার প্লুংকে অন্যগুলো থেকে আলাদা করে দুটি বৈশিষ্ট্য: নলের মাথায় বসানো বাঁশের ঢাকনা-নল (বইয়ে “bourdon”) আর আকারের বৈচিত্র্য। বইয়ের ভাষায়, কোনো কোনো যন্ত্রের নল মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার, আবার কোনোটির নল কয়েক মিটার লম্বা আর এত ভারী যে কাঁধে ঝোলানো চাদরে বয়ে নিতে হয়। বইয়ের একটি ক্যাপশন বলছে, নাচে ব্যবহৃত সব প্লুংয়েই এই ঢাকনা-নল থাকে।
একটি দলে কটি প্লুং লাগে, তা নিয়ে দুটি হিসাব পাওয়া যায়। চিংতুই ম্রো পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, প্রতিটি দলের এক সেটে 24টি বাঁশি থাকে, আর সর্বনিম্ন 14টি লাগে; এর কম হলে সুর পরিপূর্ণ হয় না। সমকালের লেখায় আছে, এক সেটে সর্বনিম্ন 10টি বাঁশি থাকে, আর পরিপূর্ণ সেটে 25 থেকে 48 ধরনের।
| বিষয় | পার্বত্যনিউজ (চিংতুই ম্রো, 2026) | সমকাল (ফারহা তানজীম তিতিল, 2021) | ব্রাউন্স ও ল্যোফলার (1990) |
|---|---|---|---|
| এক সেটে যন্ত্র | 24; সর্বনিম্ন 14 | সর্বনিম্ন 10; পূর্ণ সেটে 25–48 ধরন | সংখ্যা নেই |
| সবচেয়ে ছোট | 3–6 ইঞ্চি | সংখ্যা নেই; “লিড সুর” | নল কয়েক সেন্টিমিটার |
| মাঝারি | 12, 24, 26 ইঞ্চি, আর একটি মাপ ছাপা হয়েছে “বিলাল্লিশ ইঞ্চি” (সম্ভবত 42) | — | — |
| সবচেয়ে বড় | 18 ফুট পর্যন্ত | সংখ্যা নেই; “বেইজ” | নল কয়েক মিটার; চাদরে বইতে হয় |
কক্সবাজার নিউজে একই কারিগরের বরাতে মাঝারি মাপ লেখা হয়েছে “12 থেকে 26 ইঞ্চি”, পার্বত্যনিউজে আরেকটি মাপ “বিলাল্লিশ ইঞ্চি” ছাপা হয়েছে, সম্ভবত 42 ইঞ্চি। চিংতুই ম্রোর কথায়, বড় বাঁশির সুর অনেক দূর থেকেও শোনা যায়, আর সবগুলো একসঙ্গে বাজালে মনে হয় যেন পাহাড় কেঁপে উঠছে।
প্লুংয়ের পাশে ম্রোদের আরেকটি লাউ-বাদ্য আছে, তার নাম তু। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের শব্দকোষ অনুযায়ী তু হলো এক নলের লাউ-মুখ-অর্গান। নির্দিষ্ট কাব্য-শ্লোকের বিধান অনুযায়ী তিনটি তু-এর একটি সেট অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এবং বড় গবাদিপশুর উৎসবে বাজানো হয়; অন্য উৎসবে এটি আচারের বস্তু হিসেবে থাকে, বাজানো হয় না। বাংলাপিডিয়ার বাঁশি-জাতীয় যন্ত্রের তালিকাতেও প্লুংয়ের ঠিক পরে “তু”-এর নাম আছে।
মৃতদেহ শায়িত রাখার পর মৃতের নাচ (wak-plai) শুরু হয়, যা দিনে তিনবার করতে হয়। বইটির বর্ণনায় এই নাচের সঙ্গী তিনটি তু, তিনটি থালা-আকৃতির কাঁসর এবং তিনটি ঢোল, যার প্রতিটি আলাদা স্বরে বাজে। যন্ত্রে কোন স্বরের পর কোন স্বর বাজবে, তা ঠিক করে দেয় অন্ত্যেষ্টির গানের (wak-long) পাঠ। গান নিজে গাওয়া হয় না; যন্ত্রগুলো কেবল গানের শব্দাংশগুলোর স্বরের উচ্চতা অনুকরণ করে। বইটি এর কারণও বলেছে: ম্রো ভাষা তিনটি স্বরস্তরের একটি তানভাষা (tonal language), তাই সুর থেকেই কথা বোঝা যায়, আর আত্মারা সেই পাঠ বোঝে।
জুমের আচারেও তু-এর দেখা মেলে। বইয়ের শব্দকোষ অনুযায়ী tur-tut হলো কাটা ও পোড়ানো জুমের সেই আচারস্থল, যেখান থেকে চাষ শুরু হয় আর উৎসর্গ দেওয়া হয়। শূকর ও মুরগি উৎসর্গের এমন এক অনুষ্ঠানের বর্ণনায় আছে, একজন লোক একক আড়াআড়ি ফুঁকনলওয়ালা তিনটি মুখ-অর্গান বা তু বয়ে নিয়ে যান, কিন্তু সেগুলো বাজানো হয় না (ব্রাউন্স ও ল্যোফলার)।
গবাদিপশুর উৎসবেও তু-এর ভূমিকা আছে। বইয়ের বর্ণনায় উৎসর্গের পশুকে ঘিরে আটবার প্রদক্ষিণ হয়, যা তু-কাব্যের আটটি শ্লোকের সঙ্গে মেলে, তু বাজানো হোক বা না হোক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তু বয়েও আনা হয় না, কারণ তা কেবল বড় উৎসবে অনুমোদিত। তু বাজাতে হলে শ্লোক জানা একজন ওস্তাদ (sra) লাগে। এই প্রস্তাবনার পর ঢোলের তাল বদলায়, আর তখন প্লুং-সহ উৎসবের নাচ শুরু হতে পারে। বইয়ের গ্রন্থপঞ্জিতে ল্যোফলারের 1975 সালের “Mru Tu Long” নামে একটি প্রবন্ধের উল্লেখ আছে; প্রবন্ধটির পাঠ পাওয়া যায়নি।
প্লুং সবচেয়ে বেশি বাজে ম্রোদের গো-হত্যা উৎসবে, যাকে বাংলাপিডিয়া “ছিয়াছত-প্লাই” আর সমকাল “চিয়াচটপ্লাই” লিখেছে। এ ছাড়া নববর্ষের চাংক্রান, অতিথি বরণ, বিয়ে এবং মানতের অনুষ্ঠানে প্লুং বাজার কথা উৎসগুলোতে আছে। প্রতিটি অনুষ্ঠানের উৎস নিচে আলাদা করে দেওয়া হলো।

বাংলাপিডিয়ার “ম্রো” নিবন্ধ (লেখক আব্দুল মাবুদ খান) অনুযায়ী জুমের ফসল তোলার পর অবস্থাপন্ন ম্রো পরিবার ছিয়াছত-প্লাই উৎসবের আয়োজন করে, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে। ম্রো যুবক-যুবতীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে প্লুংয়ের তালে তালে গরুকে ঘিরে নাচে; অনুষ্ঠানে কোনো পুরোহিত থাকে না। আমাদের আর্কাইভে এক ম্রো লেখকের ম্রো নাম নিয়ে লেখাটিও বলছে, এ উৎসবে নারী-পুরুষেরা নিজেদের বাঁশি (প্লুং) বাজিয়ে নাচগান করেন, সব জাতিকে নিমন্ত্রণ করা হয়, আর উৎসবটি বেশির ভাগ সময় শীতকালে হয়।
ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বর্ণনায় উৎসবের নাচে প্লুংবাদকেরা খোলা বিন্যাসে উৎসর্গের পশুকে ঘিরে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরেন; তাঁদের মুখোমুখি থাকে মেয়েদের একটি সারি, যারা হাত ধরে পেছন দিকে পা ফেলে নাচে, আর তাদের পায়ের মল ও গায়ে জড়ানো মুদ্রার মালা নাচের ছন্দ বাড়িয়ে তোলে। উৎসব সফল হলে বাদকেরা প্রায় দিনরাত বাজান, যদিও ভিন্ন গ্রামের দল পালা করে একে অন্যকে বিরতি দিতে পারে। পশু উৎসর্গের পরেও প্লুং-নর্তকেরা থাকেন, এমনকি খালি ঘেরার চারপাশেও নাচেন। কোনো কোনো অঞ্চলে উৎসবের শেষে বাদকেরা ভোজদাতার ঘরে উঠে মদের পাত্র ঘিরে নাচেন, আর তখন এত জোরে পা ফেলা হয় যে পুরো মেঝে কাঁপে।
পার্বত্যনিউজে চাকনাও ম্রো জানিয়েছেন, বলিদানের অনুষ্ঠানে প্লুংয়ের সুরে রাতভর নাচগান চলে, পালাক্রমে বিভিন্ন দল নাচে, আর একেকটি দলে অন্তত সাত থেকে পনেরো জন থাকেন; নৃত্যদলের শিশু ও মেয়েদের গলায় থাকে রুপার মালা আর পায়ে নূপুর। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের মল-ও-মুদ্রার বর্ণনার সঙ্গে এটি মিলে যায়।
সমকালের লেখক 2019 সালের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের চম্পাঝিরি ম্রোপাড়ায় চিয়াচটপ্লাই দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, সেখানকার ম্রোরা ক্রামা ধর্মের অনুসারী হওয়ার পর থেকে এই উৎসবে গরুকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার আদি রীতি বাদ দেওয়া হয়েছে, আর সেই রাতে প্লুংয়ের সঙ্গে রাতভর স্তোত্রপাঠ শোনা গেছে, যে স্তোত্রে ছিল ম্রোদের বর্ণমালা হারানোর উপকথা। আমাদের আর্কাইভের প্রথাগত আইনে ম্রো নারীর অবস্থান নিয়ে লেখাটিও বলছে, ক্রামা ধর্মাবলম্বী ম্রোদের গো-হত্যা উৎসব ও তার নাচ একটি প্রধান অনুষ্ঠান, যেখানে পুরুষেরা একাধিক নলের “পুং” বাজান আর নারী-পুরুষ মিলে নাচেন। গরু কেন বর্ণমালা খেয়েছিল আর মেনলে ম্রো কীভাবে নতুন লিপি দিলেন, সে কাহিনি আছে ক্রামা ধর্ম নিয়ে আমাদের লেখায়।
চাকনাও ম্রো পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, নানা উৎসব-পার্বণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে প্লুং বাজলেও গো-হত্যা অনুষ্ঠান আর নববর্ষের চাংক্রান উৎসবে এর সুর সবচেয়ে জমে ওঠে। একই প্রতিবেদন ও কক্সবাজার নিউজ বলছে, অতিথি বরণেও প্লুং বাজানো ম্রো সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রথম আলোয় 9 মে 2026 প্রকাশিত আহমেদ মুনিরের প্রতিবেদনে এর একটি দৃশ্য আছে: মারমা তরুণ উথোয়াইয়ই মারমা দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পেরিয়ে মেনরত পাড়ায় পৌঁছালে ম্রোরা প্লুং বাজিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান এবং প্লুংয়ের তালে তাঁকে ঘিরে নাচেন। বাংলাপিডিয়া যোগ করেছে, ম্রো ও খুমি সমাজে কোনো কিছুর জন্য মানত করার বিশেষ অনুষ্ঠানেও প্লুং বাজে।
সব উৎসর্গে প্লুং-দল লাগে না। ব্রাউন্স ও ল্যোফলার লিখেছেন, ছোট গবাদিপশুর অনুষ্ঠানে প্লুং-অর্কেস্ট্রা লাগে না, কিন্তু তিনটি থালা-আকৃতির কাঁসর, একটি করতাল ও একটি ঢোল সবসময় লাগে; বড় কাঁসরসহ এগুলোই আসলে আচারের যন্ত্র। বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধেও আছে, ম্রো ও খুমিদের গো-হত্যা অনুষ্ঠানে গঙ্গ বা মঙ্গ জাতীয় ধাতব চাকতি বাজানো হয়।
ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই অনুযায়ী উৎসবের প্লুং বাজান কেবল অবিবাহিত তরুণেরা; কাঁসর-ঢোলের মতো আচারের যন্ত্র বয়স্ক পুরুষেরাও বাজাতে পারেন। মেয়েরা যদি বাজান, তাঁরা বাজান বাঁশের বাঁশি। তবে আমাদের আর্কাইভের এক ম্রো লেখকের লেখায় উৎসবে নারী-পুরুষ দুজনেরই প্লুং বাজানোর কথা আছে।
বিয়ের সঙ্গে প্লুং-দলের সম্পর্কটা বইয়ে এভাবে বলা: একে একে তরুণেরা বিয়ে করেন আর দল ছেড়ে যান, তাই বড় হতে থাকা ছেলেদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়, যাতে তারা খালি জায়গাগুলো পূরণ করতে পারে। উৎসবের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে তরুণেরা প্রতি সন্ধ্যায় মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে না গিয়ে একসঙ্গে বসে প্লুং মেরামত করেন, সুর বাঁধেন আর অনুশীলন করেন, যতক্ষণ না প্রকাশ্যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাজাতে পারেন। শিশুরাও খেলায় এর অনুকরণ করে; বইয়ের একটি ছবিতে দুটি ছেলে লম্বা বাঁশের নলকে প্লুং বানিয়ে আর তিনটি মেয়ে মিলে গবাদিপশুর উৎসবের নাচ সাজিয়েছে, দুটি বড় পাথর সেখানে বাঁধা গরু।
মেয়েদের বাঁশি নিয়ে বইয়ে দুটি জায়গায় উল্লেখ আছে: একটি ছবির ক্যাপশনে “বাঁশের বাঁশি তরুণীদের বাদ্যযন্ত্র”, আর সুতা কাটার আসরের বর্ণনায় “মেয়েরা যদি বাজায়, তারা বাঁশের বাঁশি বাজায়”।
উৎসগুলোর অমিল এখানে স্পষ্ট। প্রথাগত আইন নিয়ে আর্কাইভের লেখাটি বলছে উৎসবে “ম্রো পুরুষরা” পুং বাজান; ম্রো নাম নিয়ে আর্কাইভের লেখাটি বলছে “নারী পুরুষেরা তাদের নিজস্ব বাশি (প্লুং) বাজিয়ে নাচ গান করে থাকেন”; ব্রাউন্স ও ল্যোফলার বলছেন উৎসবের প্লুং কেবল অবিবাহিত তরুণদের। পার্বত্যনিউজের প্রথম অনুচ্ছেদে আছে নারী-পুরুষ, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ সবাই দল বেঁধে প্লুংয়ের সুর ও ছন্দের তালে নাচেন; কারা বাজান, সেখানে বলা নেই।
বাংলাদেশে প্লুং ম্রো ও খুমি দুই জনগোষ্ঠীরই যন্ত্র বলে বাংলাপিডিয়া লিখেছে, আর সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ম্রোদের মধ্যেও “Plung” নামে লাউ-বাঁশের যন্ত্র নথিভুক্ত। তবে খুমিদের প্লুংয়ের আলাদা নাম, গঠন বা প্রকারভেদ নিয়ে কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি; ওপরের চারটি নাম বাংলাপিডিয়া স্পষ্টভাবে “ম্রো সমাজে” প্রচলিত বলেছে।
খুমি লেখক লেলুং খুমীর খুমী জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় বলা হয়েছে, “বাঁশির তালে তালে গো-হত্যা অনুষ্ঠান ও নবান্ন উৎসব” দিন দিন খুমি সমাজ থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে। সেখানে বাঁশিটির নাম দেওয়া নেই। খুমিসহ পাহাড়ের ছোট জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় পেতে দেখতে পারেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্রতম পাঁচ জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের লেখা।
ইউনেস্কোর সহযোগী সংস্থা ICHCAP-এর অনলাইন আর্কাইভ ichLinks-এ 2014 সালের জুলাইয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পোন্নাকিউন (Ponnar Kyun) টাউনশিপে তোলা ম্রো (“Mro, or Myo”) বাদ্যযন্ত্রের ছবি ও ভিডিও আছে। প্রতিটি যন্ত্রের বর্ণনায় শুকনো লাউ, বাঁশের নল আর নলের গায়ে ছিদ্রের কথা আছে, বেশির ভাগে মোমের জোড়ার কথাও, যা বাংলাদেশের প্লুংয়ের বর্ণনার সঙ্গে মেলে।
| ICHCAP-এ নাম | নলের বিবরণ (নথি অনুযায়ী) | মোট দৈর্ঘ্য |
|---|---|---|
| Plung | লাউয়ে দুটি বাঁশের নল | 5 ফুট 4 ইঞ্চি |
| Plung Srik | দুটি নল, 7 ও 4 ইঞ্চি | 10 ইঞ্চি |
| Dee Do | ছয়টি নল: ওপরে তিনটি, নিচে তিনটি | 3 ফুট 3.5 ইঞ্চি |
| Dee Do Rhy | ছয়টি নল: ওপরে তিনটি, নিচে তিনটি | 1 ফুট 9 ইঞ্চি |
| Don Doon | চারটি নল: ওপরে দুটি, নিচে দুটি | 2 ফুট 8.5 ইঞ্চি |
| Don DoonDri | চারটি নল: ওপরে দুটি, নিচে দুটি | 2 ফুট 8.5 ইঞ্চি |
লক্ষ করার বিষয়, ICHCAP-এর নথিতেও নলগুলো লাউয়ের “ওপরে” ও “নিচে” ভাগ করে গোনা হয়েছে, ঠিক যেভাবে বাংলাপিডিয়া প্লুংমা-প্লুংকে-তিনতেংকে গুনেছে। নথি অনুযায়ী এসব যন্ত্রে লাউয়ের মাথায় ফুঁ দিয়ে ছোট নলগুলোর ছিদ্র চেপে গান বাজানো হয় (“According to the song”)। তবে মিয়ানমারের নামগুলো (Dee Do, Don Doon) বাংলাদেশের কোন নামের সঙ্গে মেলে, তা কোনো উৎসে মেলানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার পেন মিউজিয়াম (University of Pennsylvania Museum of Archaeology and Anthropology)-এর এশিয়া বিভাগে একটি ম্রো প্লুং সংরক্ষিত আছে, বস্তু নম্বর 58-5-1। জাদুঘরের নথিতে সংগ্রহের স্থান “Renikyoung, c. 10-15 miles S. of Bendarban”, অর্থাৎ বান্দরবানের 10–15 মাইল দক্ষিণে।
নথির বর্ণনা অনুযায়ী যন্ত্রটির ভিত্তি একটি লাউ, তাতে একক রিডের একটি ফুঁকনল, আর নানা দৈর্ঘ্যের রিড-নলের একটি দুই-নলের ও একটি তিন-নলের গুচ্ছ। নলের মাথায় বাঁশের খণ্ড বসানো; দুটি লাল রঙে রাঙানো, দুটি প্রাকৃতিক রঙের, আর শেষটি সবুজ। উপাদানের ঘরে লেখা “Gourd, Reed (plant)”, আর সংগ্রহের পদ্ধতি “Museum Purchase”। নথি অনুযায়ী যন্ত্রটি জাদুঘরের “The History of Music in China Symposium” (22 নভেম্বর 2014)-এ প্রদর্শিত হয়েছিল।
নমুনাটির লাল-সবুজ রঙের নলগুলো ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে মালিকেরা ঢাকনা-নলে লাল বা সবুজ রঙে সরল নকশা আঁকেন বলে লেখা আছে।
দুটি চাপ উৎসগুলোতে উঠে এসেছে: উপকরণের অভাব আর যন্ত্রের ভঙ্গুরতা। জানুয়ারি 2026-এ ETHNOMAD-এর হয়ে ফারহানা আক্তারের লেখা প্রতিবেদন বলছে, বনের অবস্থা খারাপ হওয়ায় প্লুংয়ের উপকরণ পাওয়া কঠিন হচ্ছে; পাহাড়ের ঢাল উত্তপ্ত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় সরু বাঁশ আর নাজুক লাউ ঠিকমতো জন্মায় না, প্রতি বছর কম প্লুং তৈরি হয়, আর গ্রামের জমায়েত নীরব হয়ে আসছে।
দ্বিতীয় চাপটি যন্ত্রের নিজের স্বভাব। ব্রাউন্স ও ল্যোফলার লিখেছেন, দলের প্লুং বেশ কম বাজে, হয়তো বছরে একবার; ফলে মোমের সিল, বাঁশের নল, এমনকি লাউও সাধারণত ভঙ্গুর হয়ে যায়, আর প্রতিটি পরিবেশনার আগে যন্ত্রগুলো মেরামত ও আংশিক নতুন করে বানাতে হয়। নাচের সময়ও মেরামত লাগে: নাচের ঝাঁকুনিতে নল-লাউয়ের মোমের জোড়া সহজে আলগা হয়ে যায়, বিশেষ করে খুব লম্বা নলের ক্ষেত্রে, আর তখন বাতাস বেরিয়ে যায়। তাই মাঝে মাঝে একজন বাদক কিছুক্ষণের জন্য দল থেকে সরে গিয়ে নল আবার জুড়ে নেন।
তবু যন্ত্রটি টিকে আছে। পার্বত্যনিউজের প্রতিবেদন বলছে, দুর্গম এলাকার অনেক ম্রো এখনো প্লুং তৈরি করেন। আলীকদম, লামা ও চিম্বুকের মতো এলাকার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন আর উইকিমিডিয়া কমন্সে 2013–2014 সালে চিম্বুকে তোলা প্লুং-নাচের ছবিগুলোও তা-ই দেখায়। ম্রো জনগোষ্ঠী ও চিম্বুক অঞ্চলের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট জানতে দেখুন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতা।
প্লুং ম্রো ও খুমি জনগোষ্ঠীর একটি বায়ুবাদ্য। একটি শুকনো তিতা লাউয়ের খোলে দুই সারিতে কয়েকটি সরু বাঁশের নল গেঁথে এটি তৈরি হয়, প্রতিটি নলে থাকে বাঁশের একটি রিড। বাংলায় একে বাঁশি বলা হলেও ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই একে মুখ-অর্গান বলেছে, আর উইকিপিডিয়া একে থাই-লাও খেনের মতো লাউ-মুখ-অর্গানের পরিবারে রেখেছে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পাহাড়ে জন্মানো তিতা লাউয়ের খোল আর সরু বাঁশের নল দিয়ে। জুমজার্নালের আর্কাইভে সিংইয়ং ম্রোর লেখা বলছে, এই তিতা লাউ জুমে জন্মায় এবং খাওয়া যায় না। জোড়াগুলো মোমে আটকানো হয়: দুটি 2026 সালের প্রতিবেদনে মৌচাকের মোম, ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের 1990 সালের বইয়ে বোলতার মোম।
ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বর্ণনায় লাউয়ের গলায় বাঁশের ফুঁকনল জোড়া হয়, লাউয়ের পেটে দুই সারিতে 8–10টি নল গাঁথা হয়, প্রতিটি নলের লাউয়ের ভেতরের প্রান্তে একটি ছোট বাঁশের রিড মোমে বসানো হয়, নলের গায়ে একটি আঙুলের ছিদ্র কাটা হয়। রিডের ওপর মোমের ছোট দলা দিয়ে সুর বাঁধা হয়, আর রিড আটকে যাওয়া ঠেকাতে চুন মাখানো হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পার্থক্য কেবল নলের সংখ্যায়। নিচে দুটি ও ওপরে একটি নল থাকলে প্লুংমা (মোট 3), নিচে দুটি ও ওপরে দুটি থাকলে প্লুংকে (মোট 4), নিচে তিনটি ও ওপরে দুটি থাকলে তিনতেং প্লুং বা তুলেরুম প্লুং (মোট 5)। চতুর্থ ধরন রিনাপ্লুংয়ে নিচে পাঁচটি ও ওপরে চারটি, মোট 9টি নল থাকে।
রিনাপ্লুং নয় নলের প্লুং; প্রতিবেদন অনুযায়ী “রিনা” মানে কলেরা। বাংলাপিডিয়া বলছে কলেরা, মহামারি বা দৈব-দুর্বিপাক থেকে রক্ষার বিশেষ অনুষ্ঠানে কেবল রিনাপ্লুং ব্যবহার হয়। অন্যদিকে পার্বত্যনিউজের বর্ণনায় সিংইয়ং ম্রোর বই বলছে, রিনা প্লুং বাজে শুধু গানের আসর ও যুবক-যুবতীদের আনন্দ-উল্লাসে। দুই উৎস দুই রকম বলে।
না। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই এবং উইকিপিডিয়ার “Mru people” নিবন্ধ দুটোই বলছে, প্রতিটি নল কেবল তখনই বাজে যখন তার গায়ের ছোট আঙুলের ছিদ্রটি বন্ধ থাকে। অর্থাৎ বাঁশের সাধারণ বাঁশির উল্টো: সেখানে ছিদ্র খুলে সুর বদলানো হয়, প্লুংয়ে ছিদ্র চেপে একটি নলকে বাজতে দেওয়া হয়।
দুই উৎস দুই রকম সংখ্যা দেয়। আলীকদমের কারিগর চিংতুই ম্রো পার্বত্যনিউজকে (মার্চ 2026) বলেছেন, এক সেটে 24টি বাঁশি থাকে, সর্বনিম্ন 14টি লাগে। সমকালে (জানুয়ারি 2021) ফারহা তানজীম তিতিল লিখেছেন, এক সেটে সর্বনিম্ন 10টি, আর পরিপূর্ণ সেটে 25 থেকে 48 ধরনের বাঁশি থাকে। সবচেয়ে বড় বাঁশি গম্ভীর সুর দেয়, ছোটটি মূল সুর।
কারিগর চিংতুই ম্রো পার্বত্যনিউজ ও কক্সবাজার নিউজকে বলেছেন, ছোট বাঁশি 3 থেকে 6 ইঞ্চি, আর সবচেয়ে বড় বাঁশি 18 ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই বলছে, কোনো কোনো প্লুংয়ের নল কয়েক মিটার লম্বা এবং এত ভারী যে বাদকেরা কাঁধে বাঁধা চাদরে ঝুলিয়ে বহন করেন।
সবচেয়ে বেশি গো-হত্যা উৎসবে (ছিয়াছত-প্লাই), যা বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে হয় এবং যেখানে তরুণ-তরুণীরা প্লুংয়ের তালে গরুকে ঘিরে নাচে। এ ছাড়া নববর্ষের চাংক্রান ও অতিথি বরণে (পার্বত্যনিউজ), মানতের অনুষ্ঠানে (বাংলাপিডিয়া), আর বিয়ের শোভাযাত্রায় দুটি ছয়-নলের প্লুং (ব্রাউন্স ও ল্যোফলার) বাজে।
ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বই অনুযায়ী উৎসবের প্লুং বাজান কেবল অবিবাহিত তরুণেরা; বিয়ের পর তাঁরা দল ছাড়েন, তাই ছেলেদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দল পূরণ করা হয়। বইয়ে মেয়েদের যন্ত্র বাঁশের বাঁশি। তবে জুমজার্নালের আর্কাইভে এক ম্রো লেখকের লেখায় উৎসবে নারী-পুরুষ দুজনেরই প্লুং বাজানোর কথা আছে।
না। ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের শব্দকোষে তু এক নলের লাউ-মুখ-অর্গান, আর প্লুং বহু নলের। কাব্য-শ্লোকের বিধান অনুযায়ী তিনটি তু-এর সেট অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও বড় গবাদিপশুর উৎসবে বাজে। মৃতের নাচে তু গান গায় না, গানের শব্দাংশের স্বর অনুকরণ করে, কারণ ম্রো তিন স্বরস্তরের তানভাষা।
না। বাংলাপিডিয়া প্লুংকে ম্রো ও খুমি দুই জনগোষ্ঠীর যন্ত্র বলেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পোন্নাকিউন টাউনশিপের ম্রোদের Plung, Plung Srik, Dee Do ও Don Doon নামের লাউ-বাঁশের যন্ত্র ICHCAP 2014 সালে নথিভুক্ত করেছে। ব্রাউন্স ও ল্যোফলার বলছেন একই ধরনের যন্ত্র থাইল্যান্ড, লাওস, দক্ষিণ চীন ও বোর্নিওতেও আছে।
জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ
অন্যান্য উৎস
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026