১৯৮৬ সালের ৫ এপ্রিল বান্দরবানের এক ম্রো গ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। কারণটা অদ্ভুত: একজন মানুষ সেদিন তাঁর নিজের বানানো একটি বর্ণমালা সবাইকে দেখাবেন। যে ভাষার হাজার বছরেও কোনো লিখিত রূপ ছিল না, সেই ভাষা সেদিন প্রথমবার অক্ষর পেল।
মানুষটির নাম মেনলে। কয়েক বছর পর তিনি নিখোঁজ হয়ে যান — আর আজও ফেরেননি। ম্রো জাতি নিয়ে যা কিছু লেখা হয়, তার প্রায় সবটাই এই একটি গল্পের চারপাশে ঘোরে, অথচ গল্পটার মৌলিক তথ্যগুলোই — সালটা কত, বর্ণমালাটা কবে বানানো আর কবে প্রকাশ, ক্রামা ধর্মে ঠিক কী বলা আছে — উৎসভেদে আলাদা।
এই লেখাটি সেই পার্থক্যগুলো চেপে যাওয়ার বদলে সামনে এনে ম্রোদের একটি সংহত পরিচিতি দাঁড় করানোর চেষ্টা: নাম, সংখ্যা, সমাজ, ধর্ম, লিপি, প্রথাগত আইন, আর চিম্বুকের ভূমি নিয়ে যে প্রশ্নটা এখনো মীমাংসা হয়নি।
একই জনগোষ্ঠীকে কোথাও লেখা হয় “ম্রো”, কোথাও “মুরুং”, ইংরেজিতে কখনো “Mru”। জুমজার্নালের আর্কাইভে “মুরুং নাকি ম্রো” লেখাটিতে প্রশ্নটি সরাসরি তোলা হয়েছে, এবং সেখানে যুক্তিটি সহজ: “কোনো জাতির নাম যদি অন্যদের কর্তৃক দু-ভাবে ডাকা হয়… তবে সংশ্লিষ্ট জাতির মানুষ কি নামে নিজেদের পরিচয় দেয় সেটাই হবে আসল নাম।”
ঐ লেখার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় আসা তরুণ-তরুণীরা নামের শেষে টাইটেল হিসেবে একমাত্র “ম্রো”-ই লেখেন। ব্যতিক্রম হিসেবে বান্দরবানের একটি পরিবারের তিনজনের কথা উল্লেখ আছে যাঁরা “মুরুং” লেখেন — এর বাইরে লেখক আর কোনো উদাহরণ পাননি।
নিজেদের ভাষায় তাঁরা কী বলেন? বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, “ম্রোরা নিজেদেরকে ‘মারুচা’ বলে অভিহিত করে থাকেন। ম্রো ভাষায় ‘মারু’ শব্দের অর্থ মানুষ।” ইংরেজি উইকিপিডিয়াতেও বিকল্প নামগুলোর তালিকায় “Mrucha” আছে — দুটি স্বাধীন উৎস এখানে মিলছে।
একটি মজার পার্শ্ব-তথ্য ঐ আর্কাইভ লেখাটিতে আছে, যা বিভ্রান্তির একটা উৎস ব্যাখ্যা করে: মারমা ভাষায় “ম্রুং” শব্দটি আছে, কিন্তু সেটি ম্রোদের বোঝায় না — মারমারা ত্রিপুরাদের ডাকেন “ম্রুং” নামে। শব্দ দুটির মিল থেকেই বাইরের লেখকদের গোলমাল বেঁধে থাকতে পারে।

বসবাসের এলাকা নিয়ে উৎসগুলো একমত। ম্রোরা প্রধানত বান্দরবান জেলার — সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলায়, এবং রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ভার্জ্যাতলী মৌজায়।
সংখ্যা নিয়ে অবশ্য একেবারেই একমত নয়। এখানে চারটি সংখ্যা পাশাপাশি রাখা দরকার:
| উৎস | সংখ্যা | সাল |
|---|---|---|
| BBS-ভিত্তিক হিসাব (ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত) | 52,455 | 2021/2022 |
| জুমজার্নালের নিজস্ব topic-নোটে সংকলিত | 51,724 | 2022 |
| আর্কাইভ: “ম্রো জনগোষ্ঠী: প্রচলিত রীতিনীতি ও প্রথা” | আনুমানিক ৩০,০০০ | সাল উল্লেখ নেই |
| বাংলা বাংলাপিডিয়া | 222,167 | 1991 আদমশুমারি |
প্রথম দুটি সংখ্যা কাছাকাছি — ৭০০-র মতো পার্থক্য, যা সম্ভবত ভিন্ন সারণি বা ভিন্ন সংশোধিত সংস্করণ থেকে আসা। কিন্তু বাংলাপিডিয়ার ২,২২,১৬৭ সংখ্যাটি বাকিদের চেয়ে চার গুণেরও বেশি। ম্রো জনসংখ্যা ১৯৯১ থেকে ২০২২-এর মধ্যে কমে এক-চতুর্থাংশ হয়ে যাওয়া অসম্ভাব্য, তাই সংখ্যাটি সম্ভবত অন্য কিছু গুনছে বা ছাপার ভুল। তবু “ভুল” বলে দেওয়ার মতো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই — মূল আদমশুমারির সারণি না দেখে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। [যাচাই প্রয়োজন]
অবস্থানগত দিক থেকে দুটি বর্ণনা প্রচলিত: আর্কাইভের লেখাটি বলছে ম্রোরা পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পঞ্চম সংখ্যাগরিষ্ঠ; প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে তাঁরা বান্দরবানের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। দুটি আলাদা পরিসরের কথা, তাই বিরোধ নয়।
বাংলাপিডিয়ার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: “ম্রো সমাজ পিতৃতান্ত্রিক”, পরিবারগুলো গোত্রে বিভক্ত, আর “ম্রোদের অর্থনৈতিক জীবন মূলত জুম নির্ভর”। ভাষার দিক থেকে ম্রোরা “তিববতী-বর্মী গ্রুপের একটি বিশেষ ভাষায়” কথা বলেন।
গোত্রের হিসাব নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা শ্রেণিবিন্যাস চালু আছে, এবং এ দুটোকে মিলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।
প্রথমটি জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত “ম্রো জনগোষ্ঠী: প্রচলিত রীতিনীতি ও প্রথা” লেখাটির — সেখানে “দল” ও “গোত্র” আলাদা করা হয়েছে। ঙারুয়া নামের দলটির অধীনে চারটি গোত্র: খাটপো, চিমলুং, জাং নাউ, চাউলা। এর বাইরের গোত্রগুলো: ঙারিং চাহ, তাং, দেং, খউ, তাম-তৃ-চাহ, কানবোক, প্রেনজু, নাইচাহ, ইয়মরে।
দ্বিতীয়টি ইংরেজি উইকিপিডিয়ার — সেখানে ম্রোদের “পাঁচটি স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক উপগোষ্ঠীতে” ভাগ করা হয়েছে: Anok, Tshüngma, Dömrong, Dopteng, Rümma।
এ দুটি একই জিনিসের দুই নাম নয় — একটি বংশ/গোত্র-ভিত্তিক, অন্যটি ভাষা ও সংস্কৃতি-ভিত্তিক। কোন গোত্র কোন উপগোষ্ঠীতে পড়ে, সেই মিলনরেখা কোনো উৎসে দেওয়া নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
পরিচয়ের প্রশ্নে ম্রো প্রথাগত আইন বেশ নির্দিষ্ট। ঐ আর্কাইভ লেখাটি অনুযায়ী ম্রো হিসেবে গণ্য হন — যিনি ম্রো পরিবারে জন্মেছেন, যাঁর পিতা ম্রো, কিংবা যিনি দত্তক সূত্রে ম্রো পরিবারে লালিত। উল্লেখযোগ্য: “মাতাকে ম্রো নারী হতে হয় এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।” আবার কেউ যদি ঘোষণা দিয়ে বা আচরণে ম্রো পরিচিতি ত্যাগ করেন, কিংবা ধর্মান্তরিত ও জাতিচ্যুত হয়ে ভিন্ন জনগোষ্ঠী থেকে স্বামী/স্ত্রী গ্রহণ করে ম্রো রীতি পরিহার করেন — তাহলে ম্রো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন তাঁর উপর প্রযোজ্য নয়।

ক্রামা বোঝার আগে জানা দরকার তার আগে কী ছিল। বাংলাপিডিয়া বলছে ম্রোরা তিন দেবতায় বিশ্বাস করেন এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব লক্ষণীয়; উৎসবের মধ্যে আছে ছিয়াছত-প্লাই, কেরাই/কাংনাত পূজা ও বসুমতি পূজা।
জুমজার্নালের আর্কাইভে কবি ও গবেষক হাফিজ রশীদ খানের “মেনলে ম্রো: পার্বত্য পুরাণের স্বপ্নবীজ” লেখাটিতে ছবিটা আরও জটিল: সর্বপ্রাণবাদী আচারে অভ্যস্ত ম্রোদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, আবার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যাও কম নয় — তবে তাঁরা “প্রচলিত বৌদ্ধধর্মীয় কৃত্যসমূহ পালনে তেমন আগ্রহী নয়”, আর বৃক্ষপূজা-পাথরপূজায় আগ্রহ প্রবল।
এই পটভূমিতেই ক্রামার জন্ম। ঐ লেখা অনুযায়ী ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে মেনলে নতুন ধর্মমত প্রচার শুরু করেন — উদ্দেশ্য ছিল “ম্রো জনতার মধ্যে সংহতি ও একাত্ববোধ জাগাতে, সততা ও নিষ্ঠার চর্চায় তাদের উদ্বুদ্ধ করতে”। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় সালটি ১৯৮৪।
ক্রামা কীসের মিশ্রণ — এখানে উৎসগুলো একমত নয়:
দুটোই দ্বিতীয়-হাতের ব্যাখ্যা, ক্রামার মূল পাঠ থেকে নয়। তাই কোনটিকে “সঠিক” বলা যাবে না — দুটোই উল্লেখ করে রাখা হলো। [যাচাই প্রয়োজন]
আচরণবিধি নিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ার ক্রামা পাতায় আছে, সংসারধর্ম পালনের জন্য আটটি “ফুং” মানার কথা, এবং মদ ও অন্যান্য নেশাদ্রব্য থেকে বিরত থাকার নির্দেশ। ঐ পাতার তথ্যসূত্র হিসেবে দেওয়া আছে ইয়াংঙান ম্রো-র ক্রামাধর্মের উৎপত্তি ও ম্রো সমাজ (২০২০) সহ তিনটি বই — অর্থাৎ ম্রো ভাষা ও সমাজ নিয়ে কাজ করা একজন ম্রো লেখকের বই-ই এখানে মূল ভিত্তি, যা তুলনামূলকভাবে শক্ত।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার দাবি অনুযায়ী ক্রামা এখন ম্রোদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুসৃত ধর্ম। কিন্তু কোনো উৎসেই অনুসারীর সংখ্যা দেওয়া নেই।
হাফিজ রশীদ খানের বর্ণনায় মেনলের আবির্ভাব ঘটে পোড়া পাড়া নামের এক ম্রো গ্রামে। তাঁর ভাষায়, মেনলে “প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে বিদ্বান ও ধনবান কোনটাই ছিলেন না। ছিলেন সহজাত প্রতিভাসম্পন্ন প্রকৃতির নিবিড় সন্তান।”
মেনলে বুঝেছিলেন, ধর্মমত ঘরে ঘরে পৌঁছাতে হলে ভাষার লিখিত রূপ লাগবে। ম্রোদের সমৃদ্ধ মৌখিক পরম্পরা ছিল, কিন্তু বর্ণরূপ ছিল না। তাই তিনি বর্ণমালা উদ্ভাবন করেন, তাতে ক্রামার সূক্তগুলো লিপিবদ্ধ হয়, আর পাশাপাশি চলে ম্রো পল্লীতে স্কুল প্রতিষ্ঠার লড়াই।
সবাই তাঁকে মেনে নেননি। ঐ লেখাতেই আছে — “ম্রোদের অনেকে যেমন দীক্ষা নিল এ নতুন ধর্মমতে, অনেকেই তেমনি প্রথার আনুগত্যে রইল বিরোধিতায়।” এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্রামা নিয়ে বেশিরভাগ লেখা কেবল বিজয়গাথা হিসেবে লেখা হয়।
তারপর তিনি নিখোঁজ হন। লেখকের ভাষায়, “ক্রামা ধর্মমত প্রচার ও ম্রো বর্ণমালা উদ্ভাবনের পর এ দুয়ের জনগ্রাহ্যতা সৃষ্টির প্রয়াসে তিনি যখন পাহাড়ের পল্লি থেকে পল্লি চষে ফিরছেন, সে রকম এক সময়ে তার অন্তর্ধানের খবর ছড়িয়ে পড়ে পাহাড় জুড়ে।”
আজও ম্রো সমাজে বিশ্বাস — মেনলে ফিরবেন। আর্কাইভের অন্য লেখাটির ভাষায়: “ম্রোরা বিশ্বাস করে তিনি এখনো বেঁচে আছেন এবং তাঁদের সামাজিক পরিবর্তনে তিনি ত্রাতা হয়ে আরো আবির্ভূত হবেন।”
যা আমরা জানি না: ঠিক কোন সালে, কোথা থেকে, কী পরিস্থিতিতে তিনি নিখোঁজ হন — কোনো fetch-করা উৎসে এই তথ্য পাওয়া যায়নি। একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে “৩৬ বছর ধরে নিখোঁজ” কথাটি আছে, কিন্তু প্রতিবেদনটি পড়া যায়নি (সার্ভার সাড়া দেয়নি), তাই সেটি এখানে তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হলো না। [যাচাই প্রয়োজন]
এই লেখার সবচেয়ে স্পষ্ট তথ্যগত বিরোধটি এখানে।
| উৎস | যা বলা হয়েছে |
|---|---|
| প্রথম আলো (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২) | “ক্রামাদি মেনলে ১৯৮২ সালে ম্রো ভাষার বর্ণমালা উদ্ভাবন করেন” |
| বাংলা উইকিপিডিয়া (ক্রামা) | “১৯৮৬ সালের ৫ এপ্রিল নিজ গ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে মেনল তাঁর নতুন উদ্ভাবিত ‘ক্রামা বর্ণমালা’ প্রকাশ করেন” |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া | “created in the 1980s”; একটি সূত্রে “In 1982, a Mro teenager named Kramadi Menle introduced the alphabet” |
| জুমজার্নাল আর্কাইভ | “৮০ দশকে মেনলে নামক এক বিদ্বান ও মিস্টিরিয়াস যুবক তাদের বর্ণমালা আবিস্কার করেন” |
দুটি সাল দুটি আলাদা ঘটনা বোঝাতে পারে — উদ্ভাবন ১৯৮২, আর জনসমক্ষে প্রকাশ ১৯৮৬। বাংলা উইকিপিডিয়ার বাক্যটিতে “প্রকাশ করেন” শব্দটি আছে, প্রথম আলোতে “উদ্ভাবন করেন”। এই মিলটা যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু কোনো উৎসই দুটোকে একসাথে বলেনি — তাই এটি আমাদের অনুমান, তথ্য নয়। [যাচাই প্রয়োজন]
আরেকটি লক্ষণীয় পার্থক্য: ইংরেজি উইকিপিডিয়ার উদ্ধৃত সূত্রে মেনলেকে ১৯৮২ সালে “teenager” বলা হয়েছে, অথচ আর্কাইভের বাংলা লেখায় তিনি “সাধুপুরুষ” ও “যুবক”। বয়সের এই ফারাক মীমাংসিত নয়।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার একটি দাবি অনুযায়ী ম্রোদের প্রায় ৮০ শতাংশ এই লিপিতে সাক্ষর। সংখ্যাটি বড় এবং যাচাইযোগ্য কোনো জরিপের উল্লেখ ছাড়া দেওয়া, তাই সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া উচিত। [যাচাই প্রয়োজন]
বর্ণমালা থাকা আর ভাষা লিখিতভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। প্রথম আলোর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২-এর প্রতিবেদনে সমস্যাটা পরিষ্কার বলা হয়েছে: “এতদিন ম্রো ভাষার ব্যাকরণ না থাকায় বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে বানান, শব্দ প্রয়োগ ও ক্রিয়াপদের ব্যবহার করে আসছিলেন।”
সেই ফাঁক পূরণে ম্রো ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বই “ততোং” লিখেছেন ইয়াংঙান ম্রো; বইটির মোড়ক উন্মোচন হয় ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। একই লেখকের ক্রামাধর্মের উৎপত্তি ও ম্রো সমাজ (২০২০) বাংলা উইকিপিডিয়ার ক্রামা পাতার তথ্যসূত্রেও আছে।
অর্থাৎ ম্রো ভাষার নথিভুক্তির কাজটা মূলত ম্রোরা নিজেরাই করছেন — বর্ণমালা থেকে ব্যাকরণ পর্যন্ত। পাহাড়ি ভাষাগুলোর সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে আলাদা একটি লেখা এই সিরিজে আসছে।
ম্রোরা প্রধানত বোমাং সার্কেলে পড়েন, এবং আর্কাইভের লেখাটি অনুযায়ী “বোমাং সার্কেল চীফ হলেন ম্রো জনগোষ্ঠীর সামাজিক ন্যায় নির্ধারক ও প্রতিবিধানকারী”। ব্রিটিশ শাসনের আগে থেকেই রোয়াজা বা পাড়াপ্রধানের মাধ্যমে সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধ মিটত।
১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের আওতায় এই ব্যবস্থাটি তিন স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়:
প্রথাগত আইনের মর্যাদা নিয়ে ঐ লেখায় একটি জোরালো যুক্তি আছে: বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আইনের সংজ্ঞায় “বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতা সম্পন্ন যে কোনো প্রথা বা রীতি”-ও অন্তর্ভুক্ত। সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রথাগত আইন “অবশ্যই বাংলাদেশে প্রচলিত সকল ধরণের আইনের সমকক্ষ”। এটি ঐ লেখকের আইনি ব্যাখ্যা — আদালতের সিদ্ধান্ত নয়। [যাচাই প্রয়োজন]
ম্রো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে যে আইনগুলো প্রযোজ্য, সেগুলোও ঐ লেখায় তালিকাভুক্ত: ১৯০০ সালের শাসনবিধির ৪০ নম্বর বিধি; ২০০৩ সালের ৩৮ নম্বর আইনের ৪(৪) ধারা; তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৬ ধারা; এবং আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২২(ঙ) ধারা।
নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর জন্য জুমজার্নালের আর্কাইভে আলাদা লেখা আছে — উত্তরাধিকারের রীতি কাকশাংমি, বিবাহবিচ্ছেদের রীতি তাখোয়া, এবং প্রথাগত আইনে ম্রো নারীর অবস্থান।
বিষয়টি সংবেদনশীল, তাই এখানে নথিভুক্ত তথ্য আর অভিযোগ আলাদা করে রাখা হলো।
যা নথিভুক্ত: চিম্বুক পাহাড় বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে, থানচি সড়কে; উচ্চতা প্রায় ২,৫০০ ফুট। ঢাকা ট্রিবিউনের ৯ নভেম্বর ২০২০-এর প্রতিবেদন (প্রতিবেদক ইমরান হোসেন) অনুযায়ী সেখানে পাঁচতারা হোটেল ও পর্যটন রিসোর্ট নির্মাণের উদ্যোক্তা R&R Holdings Limited, যা সিকদার গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের নভেম্বরে কাপ্রু পাড়ায় ম্রোরা প্রতিবাদ সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ২ নভেম্বর ২০২০-এ আন্তর্জাতিক সিএইচটি কমিশন প্রকল্পটি বাতিল এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য বিকল্প স্থান খোঁজার আহ্বান জানায়।
যা অভিযোগ (ম্রো প্রতিনিধি ও প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য): কাপ্রু পাড়া বাজার থেকে জীবননগর এলাকা পর্যন্ত প্রায় ১,০০০ একর জুমভূমি হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রের নামে দখলে নেওয়া হচ্ছে; এতে সরাসরি ৬টি ম্রো গ্রাম এবং পরোক্ষভাবে আরও ৭০ থেকে ১১৬টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে; আনুমানিক ১১,০০০ জুমচাষি উচ্ছেদের ঝুঁকিতে পড়বেন। ডোলাপাড়ার কার্বারি লংননের ভাষ্য: “আমাদের শ্মশান ও পানির উৎস দখল করে বাঁধ বানানোর কথা।”
অন্য পক্ষের বক্তব্য: ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক যোগাযোগ করলে সিকদার গ্রুপের চিফ কো-অর্ডিনেটর ফরিদ উদ্দিন ব্যস্ততার কথা বলে মন্তব্য করতে রাজি হননি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর কোনো খণ্ডন বা ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে নেই — এটিও একটি নথিভুক্ত তথ্য, এবং সেভাবেই পড়া উচিত।
জমির পরিমাণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা, ইজারার দলিল ও তার আইনি ভিত্তি — এসব যাচাই করতে হলে ভূমি অফিসের নথি ও ইজারা-দলিল দেখা দরকার, যা এই লেখার জন্য পাওয়া যায়নি। চিম্বুক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা একটি আলাদা লেখায় আসবে।
ম্রো আর মুরুং কি আলাদা জাতি?
না, একই জনগোষ্ঠী। “মুরুং” নামটি মূলত বাইরের লেখক ও গণমাধ্যমে ব্যবহৃত হয়েছে। ম্রোরা নিজেদের পরিচয়ে “ম্রো” লেখেন, আর নিজেদের ভাষায় বলেন “মারুচা” — যেখানে “মারু” অর্থ মানুষ।
ক্রামা ধর্ম কে প্রতিষ্ঠা করেন?
মেনলে ম্রো, ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে। উদ্দেশ্য ছিল ম্রো সমাজে সংহতি ও নৈতিক শৃঙ্খলা আনা। ধর্মটির নীতি কোন কোন ঐতিহ্য থেকে এসেছে তা নিয়ে উৎসে মতভেদ আছে।
ম্রো ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে কি?
আছে। মেনলে ম্রো ১৯৮০-র দশকে এটি উদ্ভাবন করেন — উৎসভেদে সাল ১৯৮২ বা ১৯৮৬। ২০২২ সালে ইয়াংঙান ম্রোর লেখা “ততোং” নামে ভাষাটির প্রথম ব্যাকরণ বই প্রকাশিত হয়।
ম্রোদের বিচার কে করেন?
প্রথাগত ব্যবস্থায় তিন স্তর — গ্রামের কার্বারি, মৌজার হেডম্যান, এবং সার্কেল চীফ (ম্রোদের ক্ষেত্রে প্রধানত বোমাং চীফ)। এই কাঠামো ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
চিম্বুক পাহাড়ে ঠিক কী হয়েছিল?
২০২০ সালে সেখানে পাঁচতারা হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান R&R Holdings Limited। ম্রোরা অভিযোগ করেন, এতে প্রায় ১,০০০ একর জুমভূমি ও একাধিক গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং নভেম্বর ২০২০-এ কাপ্রু পাড়ায় প্রতিবাদ হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026