চৈত্রের শেষ সপ্তাহে খাগড়াছড়ির ত্রিপুরা পাড়াগুলোতে দূর থেকে আগে শোনা যায় ঢোল আর বাঁশি। তারপর আসে দলটি। কোনো বাড়ির উঠান একটু বড় হলেই তারা থামে, গোল হয়ে দাঁড়ায়, আর শুরু হয় নাচ। নাচ শেষে গৃহস্থ দলের হাতে তুলে দেন চাল, পানীয়, কখনো মুরগির বাচ্চা। এই নাচের নাম গরিয়া নৃত্য।
গরিয়া নৃত্য ত্রিপুরাদের বর্ষবরণ উৎসব বৈসুর সঙ্গে বাঁধা একটি আচার-নাচ: বৈসু শুরুর দিন থেকে (কোথাও তার সপ্তাহখানেক আগে থেকে) নাচের দল ঢোল-বাঁশি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরে, আর নাচে পাওয়া চাল-মুরগি দিয়ে শেষে গরিয়া দেবতার পূজা হয়। বৈসু নিজে তিন দিনের উৎসব: চৈত্রের শেষ দুই দিন হারি বৈসু ও বৈসুমা, আর বৈশাখের প্রথম দিন বিসিকাতাল। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে একই দেবতার পূজা হয় আলাদা ধাঁচে, সাত দিন ধরে, মূল পূজা বৈশাখের সাত তারিখে।
বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজুর তিন উৎসব পাশাপাশি রেখে তুলনা আছে আমাদের বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুর আলাদা আচার-ক্রম লেখায়। এই লেখা কেবল ত্রিপুরাদের অংশ নিয়ে: বৈসুর তিন দিনে কী হয়, গরিয়া পূজা কে দেন আর কেন, গরিয়া নৃত্যের 22 মুদ্রা, গান ও বাদ্যযন্ত্র, আর বাংলাদেশের চর্চার সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চর্চা কোথায় আলাদা। ভারতের তথ্য যেখানে এসেছে, সেখানে আলাদা করে বলা আছে।
সূচিপত্র
বৈসু ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক উৎসব, পুরোনো বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে বরণের তিন দিন। গরিয়া নৃত্য সেই উৎসবের ভেতরে চলা একটি আলাদা ধর্মীয় আচার: গরিয়া দেবতাকে তুষ্ট করার নাচ, যা বৈসুর প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে পাঁচ থেকে সাত দিন গ্রামে গ্রামে ঘোরে, আর শেষ হয় গরিয়া পূজায়।
দুটি যে এক জিনিস নয়, তা আমাদের আর্কাইভের দুই লেখাতেই আলাদা করে লেখা। ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত বৈসুকে রেখেছে “সামাজিক উৎসব” শিরোনামে, আর গরিয়া পূজাকে রেখেছে “পূজা-পার্বণ” তালিকার প্রথমে, “বৈসু উৎসবের অন্যতম দিক” হিসেবে। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা তাঁর ত্রিপুরাব্দ-বিষয়ক লেখায় আরও স্পষ্ট: গরিয়া নৃত্যের সঙ্গে বৈসুকে “একাকার করে” আলোচনা করা হলেও গরিয়া পূজা নিজস্ব রীতিতে চলে আসছিল বলে তিনি মনে করেন।
সম্পর্কটা তাই সময়ের, আর আংশিকভাবে উদ্দেশ্যের। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার 1994 সালের বই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি লিখেছে, “বুইসুক শুরু হওয়ার দিন থেকে” গরয়া নৃত্য দল গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রত্যেক ঘরের উঠানে নাচে (পৃ. 116)। আর্কাইভ যোগ করে, হারি বৈসুর দিন থেকে টানা 5 থেকে 7 দিন চলে এই ঘোরাঘুরি। প্রথম আলোর 10 এপ্রিল 2026-এর খাগড়াছড়ি প্রতিবেদন অবশ্য সময়টা আগে টেনেছে: বৈসু শুরুর “সপ্তাহখানেক আগে থেকে” ত্রিপুরা গ্রামে নাচ শুরু হয়, আর সেই বছর প্রতিবেদনটি বেরিয়েছে বৈসুর তিন দিন আগে।
| বিষয় | বৈসু | গরিয়া পূজা ও নৃত্য |
|---|---|---|
| ধরন | সামাজিক উৎসব, বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ | দেবতা গরিয়ার পূজা, আর তাঁকে তুষ্ট করার নাচ |
| সময় | চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন | নাচ বৈসুর প্রথম দিন বা তার আগে থেকে 5–7 দিন; পূজা নাচের শেষে |
| কারা অংশ নেন | গ্রামের সব বয়সের মানুষ | নির্দিষ্ট নাচের দল (খেরেবাই), সঙ্গে অচাই |
| প্রতি বছর হয় কি না | হ্যাঁ | আর্কাইভ অনুযায়ী পারিবারিক গরিয়া পূজা প্রতি বছর বাধ্যতামূলক নয়, মানত থাকলে হয় |
দুটি নামেরই একাধিক বানান চালু, কারণ ককবরক শব্দ বাংলা হরফে লেখার একটি নির্দিষ্ট রীতি নেই, আর ত্রিপুরাদের দফা বা গোত্রভেদে উচ্চারণও আলাদা। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ভাষায়, ত্রিপুরাদের মধ্যেই “অনেক দফা” দিনটিকে বৈসু, বৈসুক, বিসু বা বৈস বলে। উৎসবের নাম নিয়ে তাই কোনো একটি রূপকে একমাত্র শুদ্ধ বলা যায় না।
নিচের ছকে উৎস ধরে ধরে বানানগুলো রাখা হলো, যেমন লেখা আছে তেমনই।
| উৎস | উৎসবের নাম | দেবতা/নাচের নাম |
|---|---|---|
| সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, 1994 | বুইসুক বা বৈসুক; দিন: হারি বুইসুক, বুইসুকমা, বিসিকাতাল | গরয়া নৃত্য বা খেরেবাই নৃত্য; গরয়া পূজা বা পরা কাইয় |
| ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত (আর্কাইভ) | বৈসু; ছবির ক্যাপশনে “হারি বৈসুক” | গরিয়া ও গরয়া, দুটিই |
| মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা (আর্কাইভ) | বৈসু, বৈসুক, বিসু, বৈস | গরিয়া |
| প্রথম আলো, 2026 | বৈসু; দিন: হারি বৈসু, বৈসুমা, বিসি কাতাল | গরাইয়া নাচ, গরাইয়া দেব; নর্তক “খেয়েবাই” |
| বিডিনিউজ২৪, 2024 | বৈসু; তৃতীয় দিন “বিচি কাতাল” | গরিয়া বা গরয়া; এক শিল্পীর মুখে “গয়রা” |
| বাংলাপিডিয়া (বাংলা) | — | গরাইয়া পূজা |
| বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি, প্রভাংশু ত্রিপুরা) | Baishu | garia |
| দ্য ডেইলি স্টার, 2012–2018 | Boisuk, Boishu, Boisu; দিন: Harboishu, Bishuma, Bisikatal | Goraiya |
| ভারতের ত্রিপুরার উৎস (আকাশবাণী, এএনআই, আদিবাসী লাইভস ম্যাটার) | Buisu, Hari Buisu | Garia, Goria, Baba Garia |
এই লেখায় উৎসবের জন্য “বৈসু” আর দেবতা ও নাচের জন্য “গরিয়া” ব্যবহার করা হয়েছে, কারণ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও আর্কাইভে এই দুটিই সবচেয়ে বেশি চলে। উদ্ধৃতির ভেতরে উৎসের নিজের বানানই রাখা হয়েছে।
শব্দের উৎপত্তি নিয়েও দুই রকম ব্যাখ্যা আছে। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বৈসুকে জুড়েছেন জ্যোতির্বিদ্যার “বিষুব সংক্রান্তি”-র সঙ্গে: তাঁর মতে এই বিষুব থেকেই অসমিয়াদের বিহু, বোডোদের বিসাগু, আর চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যা-ত্রিপুরাদের বিজু, বিষু, বৈসু নামগুলো এসেছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Buisu” ভুক্তি বলছে নামটি ককবরক “bisi” (বছর) থেকে, তবে ওই দাবির পাশে উইকিপিডিয়া নিজেই “উৎস প্রয়োজন” চিহ্ন দিয়ে রেখেছে। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বইয়ে নববর্ষের দিনের নাম “বিসিকাতাল”, যার প্রথম অংশ “বিসি”, তবে বই শব্দটির অর্থ ভেঙে বলেনি।
বৈসু হয় বাংলা বছরের শেষ দুই দিন আর নববর্ষের প্রথম দিন মিলিয়ে তিন দিন, সাধারণত এপ্রিলের 13 থেকে 15 তারিখের মধ্যে। প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪ দুটিই 2026 সালে লিখেছে, ত্রিপুরা পঞ্জিকা অনুযায়ী উৎসব শুরু হয় 29 চৈত্র; সে বছর তা পড়েছিল 13 এপ্রিল, সোমবার, আর শেষ হয় 15 এপ্রিল।
তিন দিনের এই হিসাবে বাংলাদেশের সব উৎস একমত। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা 1994 সালে লিখেছেন, চৈত্রের শেষ দুই দিনের প্রথমটি হারি বুইসুক, চৈত্রের শেষ দিনটি বুইসুকমা, আর নববর্ষের প্রথম দিন বিসিকাতাল (পৃ. 115)। আর্কাইভ, প্রথম আলো 2026 ও বিডিনিউজ২৪ 2024-এর হিসাবও একই।
বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি “Tripuris, The” ভুক্তি, যার লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা, বলছে বৈসু পালিত হয় “ত্রিপুরা বর্ষপঞ্জি মেনে”। এখানে একটি বিভ্রান্তি এড়ানো দরকার: ত্রিপুরাব্দ বা “ত্রিং” নামের যে বর্ষপঞ্জির নববর্ষ এখন ডিসেম্বরে উদ্যাপিত হয়, বৈসু সেই নববর্ষ নয়। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখা অনুযায়ী সংস্কার-করা ত্রিপুরাব্দের প্রথম দিন 1 তালহিং, যা 30 তালবুং-এর মধ্যরাতের পর শুরু হয়; আর তিনি প্রস্তাব করেছেন ত্রিপুরাব্দ ও বৈসু, দুটিই উদ্যাপিত হোক। বৈসু থেকে গেছে চৈত্র-বৈশাখের সংক্রান্তিতে।
পাশের জনগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে দিন মেলে না সবসময়। দ্য ডেইলি স্টার (9 এপ্রিল 2018) লিখেছে, মারমারা বর্মি পঞ্জিকা মানেন বলে তাঁদের উৎসব এক দিন পরে শুরু হয়। মারমাদের পানিখেলা কবে কোথায় হয়, সেই হিসাব আছে সাংগ্রাই জলকেলি: মারমাদের রিলং পোয়ে কবে, কোথায়, কীভাবে হয় লেখায়।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে একই উৎসবের নাম Buisu। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা 12 এপ্রিল 2025 গোমতী জেলার কারবুকে রাজ্যস্তরের বুইসু উৎসব উদ্বোধন করেন, এএনআই-এর বরাতে পাঞ্জাব কেশরী ইংরেজি এ খবর দিয়েছে। ভারতে গরিয়া পূজার দিন অবশ্য বৈসুর এক সপ্তাহ পরে, সে কথা নিচে আলাদা অংশে।
হারি বৈসু প্রস্তুতির দিন। ভোরে ফুল তুলে নদী বা ছড়ায় স্নান করে ফুল উৎসর্গ করা হয়, ঘর সাজানো হয়, কাপড় ধোয়া হয়, পিঠার জন্য বিন্নি চালের গুঁড়ি তৈরি হয়, আর গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। গরিয়া নৃত্যও শুরু হয় এই দিন থেকে।
উৎসগুলো দিনটির আলাদা আলাদা দিক ধরেছে। একসঙ্গে রাখলে পূর্ণ ছবিটা এরকম দাঁড়ায়:
| আচার | উৎস |
|---|---|
| ছেলেমেয়েরা ফুল তোলে, ফুল দিয়ে ঘর সাজায়, কাপড়চোপড় ধোয় | সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা 1994; আর্কাইভ |
| ঝুড়িতে ধান নিয়ে গ্রামে ঘুরে মোরগ-মুরগিকে ছিটিয়ে খাওয়ানো; গরু, মহিষ, ছাগল খুব ভোরে ছেড়ে দেওয়া | সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা 1994 |
| উঠানে চাল ছিটিয়ে পাখি ও গৃহপালিত প্রাণীকে খাওয়ানো, “গরাইয়া” দেবতাকে খুশি করতে | দ্য ডেইলি স্টার, 12 এপ্রিল 2017 |
| গৃহকর্তা গবাদি পশুর পরিচর্যা করেন, ফুলের মালা দিয়ে সম্মান জানান | আর্কাইভ |
| বিন্নি ধানের চালের গুঁড়ি; জঙ্গল থেকে কলাপাতা ও লাইরু পাতা এনে পিঠা | আর্কাইভ |
| ভোরে নদী-ছড়ায় দেবী গঙ্গার উদ্দেশে ফুল, ধূপ, প্রদীপ; সঙ্গে হাতে বোনা নতুন কাপড়ের টুকরা ভাসানো | প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪, 13 এপ্রিল 2026 |
| ফুলের একাংশে মালা গেঁথে ঘরের দরজায় টাঙানো | বিডিনিউজ২৪, 2024 ও 2026 |
| ছেলেমেয়েরা পরিষ্কার কাপড় পরে ঘরে ঘরে বেড়ায়, পিঠা খায়; বড়রাও গ্রামে ঘোরেন, তাঁদের মদ ও পানীয় দেওয়া হয় | সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা 1994 |
| গরিয়া নৃত্যের দল বের হয় | সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা 1994; আর্কাইভ |
কাপড় ভাসানোর কারণ আয়োজকের মুখে শোনা যায়। খাগড়াছড়ির খাগড়াপুরে 2026 সালের আয়োজক চামেলী ত্রিপুরা দুই সংবাদমাধ্যমকেই বলেছেন, নতুন বছরে রিনাই-রিসা বুননে যেন দক্ষতা বাড়ে, সেই প্রার্থনায় ফুলের সঙ্গে হাতে বোনা কাপড় ভাসানো হয়। এই পোশাকগুলো কী আর কীভাবে বোনা হয়, তা আছে রিনাই, রিসা ও কুবাই: ত্রিপুরা নারীর পোশাকের তিন অংশ লেখায়।
দেবী গঙ্গার নামটিও ত্রিপুরাদের নিজস্ব পূজাক্রমে আছে। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা নববর্ষে প্রথম যে পূজাগুলো দিতে হয় এবং যেগুলো না দিলে অন্য দেবতার পূজা “সম্ভব হয়না”, তার একটি তালিকা দিয়েছেন। সেখানে দ্বিতীয় নামটি “গংগাপূজা বা তৈয় পুন তানমানি”, আর তৃতীয়টি “গরয়া পূজা বা পরা কাইয়” (পৃ. 115)।
পশুপাখির যত্নের আচারটি লক্ষ করার মতো। ফুল তোলা আর নদীতে ফুল দেওয়া চাকমাদের ফুল বিজুর সঙ্গে মেলে, কিন্তু মোরগ-মুরগিকে ধান ছিটিয়ে খাওয়ানো আর গবাদি পশুকে মালা পরানোর বিবরণ এখানে ত্রিপুরা-উৎসগুলোতেই নির্দিষ্টভাবে পাওয়া গেছে।
বৈসুমা চৈত্রের শেষ দিন, বৈসুর মূল দিন। এদিন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই একে অপরের বাড়িতে যান, অতিথিকে পিঠা, পাঁচন, মদ ও সরবত দেওয়া হয়। আর্কাইভ অনুযায়ী বৈসুমার দিনে প্রাণীবধ “একেবারেই নিষিদ্ধ”, আর গরিয়া নৃত্য, পালাগান ও খেলাধুলা চলে সারাদিন, কখনো রাত পর্যন্ত।
আর্কাইভ দিনটিকে বলেছে “এক মহান দিন”: উচ্চ-নিম্ন শ্রেণির ভেদ এদিন থাকে না, বিত্তবানেরা গরিবের বাড়ি যান, গরিবেরা বিত্তবানের বাড়ি। দ্য ডেইলি স্টার (12 এপ্রিল 2017) দিনটিকে বলেছে আত্মসংযমের দিন, যেদিন বছরকে বিদায় জানানো হয়।
রান্নার কেন্দ্রে থাকে পাঁচন, বহু রকম সবজি মিলিয়ে রাঁধা তরকারি। সংখ্যা নিয়ে উৎসভেদে তফাত আছে। উন্নয়নকর্মী চামেলি ত্রিপুরা বিডিনিউজ২৪-কে (10 এপ্রিল 2024) বলেছেন, বৈসুমার দিন 104 প্রকারের সবজি রান্না হয়; দ্য ডেইলি স্টার 2017 সালে লিখেছে, ত্রিপুরারা সর্বোচ্চ 108টি স্থানীয় সবজি দিয়ে পাঁচন রাঁধেন, তালিকায় শিমুল ফুল, কলার মোচা, কলাগাছের ভেতরের অংশ, সজনে, বুনো কচু, কাসাভা, বেতের ডগা, মুলা, মিষ্টিকুমড়া।
প্রাণীবধ নিষেধের নিয়মটি গরিয়া পূজার সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে একটি টান চোখে পড়ে: বৈসুমার দিন প্রাণী হত্যা নিষেধ, অথচ গরিয়া পূজার রীতিতে প্রাণী বলি দেওয়ার জন্য আলাদা পুরোহিত আছেন। উৎসগুলো দেখায়, দুটি আলাদা দিনের আলাদা নিয়ম; গরিয়া পূজা হয় নাচের পর্ব শেষে, বৈসুমার দিনে নয়। তবে কোনো উৎস এই দুটিকে পাশাপাশি রেখে ব্যাখ্যা করেনি।
বিসিকাতাল বৈশাখের প্রথম দিন, নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর দিন। আর্কাইভ অনুযায়ী এদিন ছোটরা নতুন কাপড় পরে ঘরে ঘরে ঘুরে হাঁস-মুরগি ও পশুপাখিকে খাবার দেয়, বয়স্কদের পা ধরে প্রণাম করে, আর যুবক-যুবতী ও নবদম্পতিরা নদী বা কুয়ার পরিষ্কার পানি তুলে গ্রামের মুরব্বিদের স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেন।
এদিনের খাবারে আমিষ ফিরে আসে: আর্কাইভ লিখেছে, প্রতিটি পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী আমিষ খাবারের আয়োজন করে, অবস্থাপন্নরা গ্রামের গরিব ও বিধবাদের জন্য বিশেষ ভোজ দেন, আর ঘরের দরজা সারাদিন-রাত খোলা থাকে। বিশ্বাস, এদিন কেউ খালি মুখে ফিরে গেলে গৃহস্থের অমঙ্গল। পরিবারের সবার মঙ্গলের জন্য পূজা ও উপাসনাও হয়।
বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান কোন দিনে, সেখানে অমিল আছে। আর্কাইভ একে রেখেছে বিসিকাতালে; দ্য ডেইলি স্টার (12 এপ্রিল 2012) লিখেছে, রাঙামাটির গর্জনতলীতে ত্রিপুরারা উৎসবের প্রথম দিনেই ফুল ভাসানো, বয়স্কদের স্নান করানো ও নতুন কাপড় দেওয়ার অনুষ্ঠান করেছেন; ঢাকা ট্রিবিউনও (12 এপ্রিল 2024) প্রথম দিনে গর্জনতলী ঘাটে বয়স্কদের ফুল ও নতুন কাপড় দেওয়ার খবর দিয়েছে। বিডিনিউজ২৪-কে (2024) চামেলি ত্রিপুরা বলেছেন, বিসিকাতালের দিন বয়স্কদের প্রণাম করা হয়।
গরিয়া পূজা গরিয়া দেবতার পূজা, পরিবার ও গ্রামের মঙ্গল কামনায়। বাংলাদেশে এর দুটি রূপের কথা উৎসে আছে: পরিবারের মানত থাকলে আয়োজিত পারিবারিক পূজা, যার জন্য অচাই ও তাছাই লাগে; আর গরিয়া নাচের দল বাড়ি বাড়ি ঘুরে যে চাল, মুরগির বাচ্চা ও মদ পায়, তা দিয়ে নাচ শেষে দেওয়া পূজা।
আর্কাইভের “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” গরিয়া পূজার যে বিবরণ দিয়েছে, তার মূল কথা চারটি। পূজার উদ্দেশ্য পরিবারের মঙ্গল। আয়োজক সাধারণত পারিবারিকভাবে “কিছুটা সচ্ছল” পরিবার। বিশেষ মানত না থাকলে আয়োজন হয় না, আর প্রতি বছর আয়োজন করার “বিধান নেই”। আর আয়োজনের জন্য একটি নির্দিষ্ট দল গঠিত হয়: আয়োজক পরিবারের একজন, একজন সর্দার, এবং দুই পুরোহিত, অচাই, যিনি মন্ত্র পড়েন, আর তাছাই, যিনি প্রাণী বলি দেন।
অচাই ত্রিপুরা সমাজের সাধারণ পুরোহিত। আর্কাইভের একই লেখায় শিশুর জন্মের পরের নদী-পূজা আর নামকরণ অনুষ্ঠানেও অচাইয়ের ভূমিকা আছে, আর মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানিয়েছেন দক্ষ ও বয়স্ক অচাইদের বলা হয় “অচাইয়ুং”। তাছাই নামটি অবশ্য আর্কাইভে কেবল গরিয়া পূজার প্রসঙ্গেই এসেছে।
সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বই গরিয়া পূজার আরেকটি পথ দেখায়, যা নাচের সঙ্গে সরাসরি বাঁধা। নাচের দলের একজনের কাঁধে থাকে একটি শূল, তাতে বাঁধা থাকে একটি “খাদি”। কোনো বাড়ির উঠানে এই শূল মাটিতে বসানো হলে সেই বাড়ির মালিককে গরয়া দেবতার পূজা দিতে হয়। প্রতিটি উঠানে নাচের শেষে দলকে মদ, মুরগির বাচ্চা ও চাল দেওয়া হয়, শিল্পীরা সুর করে গৃহস্থকে আশীর্বাদ করে যান। সবশেষে দল এভাবে পাওয়া সমস্ত চাল, মুরগির বাচ্চা ও মদ দিয়ে গরয়া দেবতার পূজা করে (পৃ. 116)।

প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদনও একই ক্রম বলে: পরিবেশনা শেষে গরাইয়া দলকে পানীয়, টাকা, চাল ও ফলমূল দেওয়া হয়, আর নাচের শেষ দিনে দলের সদস্যরা গরাইয়া দেবতার উদ্দেশে পূজা করেন, সবার মঙ্গল কামনায়।
বাংলাদেশের উৎসে গরিয়াকে মঙ্গল ও সমৃদ্ধির দেবতা হিসেবে দেখা হয়েছে, তবে তাঁর পরিচয় ও কাহিনি নিয়ে বিস্তারিত পাওয়া যায় না। খাগড়াছড়ির ধীনা ডান্স একাডেমির পরিচালক ধীনা ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেছেন, ত্রিপুরাদের বিশ্বাস, নাচের মাধ্যমে গরাইয়া দেবতা তুষ্ট হন আর তাঁর আশীর্বাদে পরিবার, সমাজ ও এলাকার সুখ-সমৃদ্ধি বজায় থাকে। আর্কাইভে খার্চি পূজার চৌদ্দ দেবতার তালিকায় “কারায়া” ও “গরয়া” পাশাপাশি আছে। ভারতের ত্রিপুরার উৎসে গরিয়াকে ডাকা হয় “বাবা” বলে, আর জমাতিয়া হোদার এক সম্পাদকের মতে বাবা গরিয়ার রূপে শিব ও মাতৃশক্তির পূজা হয়; সে কথা নিচে ভারতের অংশে।
গরিয়া নৃত্য একটি দলগত লোকনৃত্য, যা গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠানে গোল হয়ে পরিবেশিত হয়। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা লিখেছেন, এতে 22টি মুদ্রা দেখানো হয়, যেগুলো প্রকৃতিকে অনুকরণ করে তৈরি; কমপক্ষে 16 জন থেকে 100, 150, এমনকি 500 জন পর্যন্ত একসঙ্গে নাচতে পারেন। নাচের দলে ঢোকা একবারের সিদ্ধান্ত নয়: একবার অংশ নিলে পরপর তিন বছর অংশ নিতে হয়।
দলের সদস্যদের বলা হয় খেরেবাই। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা নাচটিকেই বলেছেন “গরয়া নৃত্য বা খেরেবাই নৃত্য”; প্রথম আলো খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ার দলনেতা অনন্ত ত্রিপুরার বরাতে লিখেছে, অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় “খেয়েবাই”। দুটি বানান একই শব্দের কি না, কোনো উৎস তা নিশ্চিত করেনি। অনন্ত ত্রিপুরার কথায়, একজন আচাই বা ওঝা আর একজন দেওয়াই, অর্থাৎ দলনেতা, নাচ পরিচালনা করেন।
মুদ্রার সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের দুই উৎস একমত: সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার 1994 সালের বই 22টি মুদ্রার কথা বলে, আর প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদনে দলনেতা বলেছেন “২২টি তাল ও মুদ্রা”, যেগুলোতে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ক্রিয়াকলাপ দেখানো হয়। বইটি 22টির মধ্যে দশটির নাম দিয়ে “ইত্যাদি” লিখে থেমেছে (পৃ. 116):
নামগুলোর বাংলা অর্থ বইয়ে দেওয়া নেই, তাই এখানেও অনুবাদ করা হয়নি। আর্কাইভের “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” অবশ্য নাচের বিষয়বস্তু বলেছে: জুম কাটা, জুমে বীজ বোনা, আগাছা পরিষ্কার, পশুপাখি তাড়ানো, ধান কাটা, ধান পরিষ্কার, সুতা কাটা, কাপড় বোনা, অর্থাৎ জুমচাষ ও জীবিকার দৃশ্য দিয়ে নাচটি সাজানো। তালিকার “তুলা” ও “মাতাই” (দেবতা) শব্দ দুটি সেই বিবরণের সঙ্গে মেলে বলে মনে হয়, কিন্তু কোনো উৎস মুদ্রাগুলোকে এক এক করে ব্যাখ্যা করেনি।
ভারতের ত্রিপুরার কিছু সাধারণ-জ্ঞান ও পর্যটন সাইট 108টি মুদ্রার কথা লেখে, তার কয়েকটি হারিয়ে গেছে বলে। ওই সাইটগুলো কোনো উৎস দেয় না, তাই সংখ্যাটি এখানে কেবল দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হলো।
প্রথম আলোর খাগড়াছড়ি প্রতিবেদন উঠানের পরিবেশনার একটি নির্দিষ্ট ক্রম লিখেছে। 22 মুদ্রার নাচ শেষ হলে শুরু হয় বাড়ির কর্তা ও নারীদের নানা আবদার; কখনো প্রেম-বিরহের দৃশ্য, কখনো স্বামী-স্ত্রীর খুনসুটি বা ঝগড়ার অভিনয়। তারপর দলকে আপ্যায়ন। আর্কাইভ যোগ করে, নর্তক যত বেশি, নাচ তত আকর্ষণীয়।
নিয়মটি দুই উৎসে প্রায় একই ভাষায় আছে। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা লিখেছেন, কোনো শিল্পী একবার দলের সদস্য হিসেবে অংশ নিলে তাঁকে “তিন বৎসর পর পর তিনবার” অংশ নিতে হয়, নইলে শিল্পীর অমঙ্গল, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে বলে বিশ্বাস। প্রথম আলোকে দলনেতা অনন্ত ত্রিপুরা বলেছেন, একবার অংশ নিলে পরপর তিনবার অংশ নিতে হয়, আর কোনো কারণে না পারলে গরাইয়া দেবের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। বত্রিশ বছরের ব্যবধানে লেখা দুই বিবরণেই তিনবারের নিয়মটি আছে; 1994-এর বইয়ে না মানার পরিণতি হিসেবে অমঙ্গলের বিশ্বাসের কথা, 2026-এর প্রতিবেদনে ক্ষমা চাওয়ার কথা।
বৈসুর বাইরেও গরিয়া নৃত্য হয়। প্রথম আলো লিখেছে, যেকোনো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আগে ত্রিপুরা সমাজে গরাইয়া নাচের প্রচলন আছে, একসময় যুদ্ধযাত্রার আগেও হতো; এখন বর্ষবিদায় ও বরণের আগেও মঙ্গল কামনায় হয়। আর্কাইভ অনুযায়ী ত্রিপুরাদের নাচ-গান সাধারণত বিয়ে, পূজা-পার্বণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে হয়।
গরিয়া নৃত্য গানের সঙ্গে নাচ। আর্কাইভ লিখেছে, এতে “কথামালার সুরে সুরে” নৃত্য পরিবেশিত হয়; সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা লিখেছেন, প্রতিটি উঠানে নাচ শেষে শিল্পীরা সুর করে বলে গৃহস্থকে আশীর্বাদ করেন। লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরার সাত রাগের তালিকায় গরয়া নৃত্যকে রাখা হয়েছে “ত্রিপুরা সারং” রাগে।
রাগের এই তথ্যটি এসেছে আর্কাইভের ত্রিপুরা-লেখায় প্রভাংশু ত্রিপুরার বরাতে: ত্রিপুরা সংগীতের সাতটি রাগ-রাগিণীর প্রথমটি “ত্রিপুরা সারং”, আর গরয়া নৃত্য এর অন্তর্ভুক্ত; দ্বিতীয়টি “ত্রিপুরা ভৈরব”, যার অন্তর্ভুক্ত কাথারক বা বোতল নৃত্য। একই লেখা ত্রিপুরা গানকে চার ভাগে ভাগ করেছে: লোকসংগীত, বাউল, কাব্যসংগীত ও কীর্তন-ধাঁচের সংগীত, আর জানিয়েছে এসব গানের বেশিরভাগ এখনো অলিখিত।
গরিয়া নৃত্যের গানের পূর্ণ পাঠ বাংলাদেশের কোনো লিখিত উৎসে পাওয়া যায়নি। ভারতের ত্রিপুরা থেকে একটি গানের নাম পাওয়া যায়: আদিবাসী লাইভস ম্যাটারের জন্য খুমতিয়া দেববর্মা (2020) লিখেছেন, পূজা শেষে “গরিয়া বরনাই” নামের গায়ক-নর্তক দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে গান গায় তার একটির নাম “বালেরোবালোবালো”, যাতে বাবা গরিয়াকে পরের বছর আবার আসার মিনতি করা হয়। ওই লেখা উঠানে দল ও গৃহস্থের একটি প্রশ্নোত্তরও লিখেছে: দল বারবার জিজ্ঞেস করে “ঘরে কী আছে?”, গৃহস্থ বলেন দামি কিছু নেই, তারপর দল আশীর্বাদ করে ঘর যেন চালে, সোনায়, রুপায় ভরে ওঠে। এটি ভারতের এক গ্রামের বিবরণ; বাংলাদেশে একই রীতি আছে কি না, জানা যায়নি।
শোনার জন্য: জুমজার্নালের সংগীত আর্কাইভে ত্রিপুরা গানের সংগ্রহে “boisu bereni” শিরোনামে একটি গান আছে। গানটির শিল্পী ও কথার তথ্য আর্কাইভে নেই, তাই এটি গরিয়া নৃত্যের গান কি না বলা যায় না।
বাংলাদেশের সব উৎস দুটি যন্ত্রের কথা বলে: ঢোল ও বাঁশি। আর্কাইভ, প্রথম আলো 2026 আর বিডিনিউজ২৪ 2024, তিনটিতেই গরিয়া দল ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে গ্রামে ঘোরে। বাংলাপিডিয়া একটি নির্দিষ্ট ঢোলের নাম দেয়: খা-অম, যা ছাড়া “গরাইয়া পূজা” ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলে না।
বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” ভুক্তি লিখেছে, খা-অম উসুইদের খাইং-এর মতোই ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঢোল জাতীয় যন্ত্র, আর গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় খা-অম বাজানো “অপরিহার্য”। একই ভুক্তি ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশির নাম দিয়েছে শিমুর: সাধারণ বাঁশের বাঁশির চেয়ে কিছুটা লম্বা, ছিদ্র বেশি, বাজে “পরাইয়া নৃত্য” ও পূজাপার্বণে। “পরাইয়া” আর “গরাইয়া” একই নাচ কি না, নাকি একটি ছাপার ভুল, ভুক্তিটি থেকে বোঝা যায় না; সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বইয়ে গরয়া পূজার আরেক নাম “পরা কাইয়”, তবে এই দুটির যোগ কোনো উৎস দেখায়নি।
ভারতের ত্রিপুরার উৎসে যন্ত্রের নাম একটু ভিন্ন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Dances of Tripura” লিখেছে গরিয়া নাচ হয় ঢোল ও বাঁশির সঙ্গে, আর লেবাং নাচের যন্ত্রের তালিকায় বাঁশি, খাম্ব, পুং ও সারিন্দা। হিউম্যানস অব নর্থইস্ট ইন্ডিয়া (2025) গরিয়া পূজার যন্ত্র হিসেবে সুমুই (বাঁশি), খাম (ঢোল) ও সারিন্দার নাম লিখেছে, তবে কোনো উৎস দেয়নি।
ত্রিপুরাদের সব যন্ত্রের পূর্ণ তালিকা, ককবরক নামসহ, আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা: কোনটি কোন জাতির, কী দিয়ে গড়া লেখায়; সেখানে সারিন্দা, সুমুই, চংপ্রেং, খাম ও দাংদুর কথা ককবরক লেখার বরাতে আছে।
বাংলাদেশে গরিয়া নাচের পুরুষেরা পরেন সাদা ধুতি, সঙ্গে সাদা, নীল বা হলুদ জামা, আর কোমর, মাথা ও হাতে জড়ানো থাকে “রিসা” নামের লম্বা ঝুলের কাপড়, প্রথম আলো 2026 সালে খাগড়াছড়ির দলগুলো দেখে এ কথা লিখেছে। নারীরা পরেন রিনাই-রিসা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির যে ছবিগুলো এই লেখার সঙ্গে আছে, সেগুলোতেও পুরুষ নর্তকদের সাদা পোশাক, আর রাঙামাটির ছবিতে মাথা ও কোমরে লাল নকশার কাপড় দেখা যায়। রিসা শুধু নারীর বক্ষবন্ধনী নয়, পুরুষের নাচের সাজেও যে ব্যবহার হয়, সে আলোচনা আছে রিনাই-রিসার লেখায়।

বৈসুর মঞ্চে গরিয়ার পাশাপাশি প্রায়ই বোতল নৃত্যও হয়, ফলে দুটি গুলিয়ে যায়। আর্কাইভ অনুযায়ী বোতল নৃত্যের আসল নাম কাথারক নৃত্য, যা বিয়ের কাথারক পূজায় পরিবেশিত হয়; আর হজাগিরি নৃত্য খার্চি বা চতুর্দশ দেবতার পূজার সঙ্গে যুক্ত। গরিয়া নৃত্য এই দুটি থেকে আলাদা, বৈসু ও গরিয়া দেবতার সঙ্গে বাঁধা।
| নাচ | কোন পূজা বা উপলক্ষ | বৈশিষ্ট্য | উৎস |
|---|---|---|---|
| গরিয়া বা গরয়া | বৈসু, গরিয়া পূজা; যেকোনো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান | দলগত, বাড়ি বাড়ি ঘোরা, 22 মুদ্রা, ঢোল-বাঁশি | সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা; আর্কাইভ; প্রথম আলো |
| কাথারক বা বোতল নৃত্য | বিয়ের কাথারক পূজা; জুম কাটার আগে বা শুভ কাজের আগে | মাথায় দীপশিখাসহ বোতল, হাতে থালা, পানিভর্তি কলসির উপর নাচ; আরেক নাম মাঙ্গলিক নৃত্য | আর্কাইভ |
| হজাগিরি | আর্কাইভ অনুযায়ী খার্চি পূজা (চতুর্দশ দেবতা), মূলত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে; খুমতিয়া দেববর্মা (ভারত, 2020) লিখেছেন হজাগিরি অক্টোবরে ধানের দেবী মাইলুমার পূজার দিন | উইকিপিডিয়া অনুযায়ী রিয়াং দফার তরুণীদের নাচ, মাথায় বোতল বা কলস, হাতে প্রদীপ | আর্কাইভ; আদিবাসী লাইভস ম্যাটার; ইংরেজি উইকিপিডিয়া |
বৈসুতে দুটিই যে হয়, তার উদাহরণ বিডিনিউজ২৪-এর 5 এপ্রিল 2024-এর প্রতিবেদন: দীঘিনালার পোমাং পাড়ায় বৈসুর উদ্বোধনে একটি দল গরিয়া নৃত্য করেছে, আর একটি নাচের একাডেমির শিল্পীরা বোতল নৃত্য। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তি ত্রিপুরাদের বিশটি লোকনৃত্যের নাম দিয়েছে, তার মধ্যে কাথারক, কেরপূজা, গরিয়া, হজাগিরি, লেবাং ও মামিতা আছে।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গরিয়া পূজা বড় আকারের, রাজ্য-স্বীকৃত উৎসব: সাত দিনের, মূল পূজা বৈশাখের সাত তারিখে, যা সাধারণত এপ্রিলের 20 বা 21 তারিখে পড়ে। একটি বাঁশকে গরিয়ার প্রতীক ধরে পূজা হয়, রাজ্যস্তরের মূল আয়োজন করে জমাতিয়া হোদা। বাংলাদেশে পূজাটি এত বড় পরিসরে হয় বলে কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি; এখানে গরিয়ার কেন্দ্রে নাচের দল।
এই অংশের সব তথ্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের, উৎসের নামসহ।
আকাশবাণী (অল ইন্ডিয়া রেডিও) 21 এপ্রিল 2026, মঙ্গলবার, লিখেছে সেদিন গোটা ত্রিপুরায় গরিয়া পূজা হচ্ছে, আদিবাসী ও অ-আদিবাসী দুই সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নিচ্ছেন। খুমতিয়া দেববর্মা (2020) লিখেছেন, পূজার দিন বাংলা পঞ্জিকা ধরে বৈশাখের 7 তারিখ, ইংরেজিতে সাধারণত 20 এপ্রিল। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার জমাতিয়া হোদা ভুক্তি অনুযায়ী পূজা চলে সাত দিন, শুরু চৈত্রের শেষ দিনে, তার আগে হারি বুইসু; প্রথম দিনের নাম “মহা বুইসু”, আর বিসর্জনের দিন “সেনা”। কামাল জমাতিয়া (2022) আবার লিখেছেন উৎসবটি আট দিনের, আর সে বছর হারি বুইসু ছিল 14 এপ্রিল।
খুমতিয়া দেববর্মা তাঁর গ্রামের যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতে দুই পুরোহিত, “বরুয়া ওকরা” বা প্রধান পুরোহিত আর তাঁর সহকারী “বরুয়া কুসু”, উঠানে দেড় ফুটের মতো তিনটি বাঁশ পোঁতেন; মাঝের বাঁশটি বাবা গরিয়ার প্রতীক। কোনো কোনো পরিবার সদস্যপ্রতি একটি করে ডিম দেয়, প্রার্থনার পর ডিমগুলো ভাঙা হয়। পূজা শেষে পুরোহিত পরিবারের বছরের ভবিষ্যদ্বাণী বলেন। শেষ আচার বাঁশগুলোর বিসর্জন: “গরিয়া সেংকারু” নামের নির্বাচিত লোকেরা সেগুলো কাউকে না দেখিয়ে কাছের হ্রদ বা নদীতে ভাসান। আকাশবাণী 2026 লিখেছে, ভক্তেরা পাতা, রঙিন সুতা ও কাপড়ে সাজানো বাঁশ, ফুল ও ফল দেন বাবা গরিয়াকে।
সবখানে বাঁশ নয়। খুমতিয়া দেববর্মার আরেক লেখায় (2020) মধুমালা দেববর্মার বর্ণনায় গরিয়ার প্রতীক “রনদক”, চাল রাখার মাটির পাত্র; পূজায় পুরোনো চাল বদলে নতুন চাল রাখা হয়, আর ধানের দেবী মাইলুমার পূজাও একসঙ্গে হয়। দুই লেখাই বলে, প্রতিটি গ্রাম বা সম্প্রদায়ের রীতি আলাদা।
জমাতিয়াদের আয়োজনের একটি অংশ বাংলাদেশের নাচের দলের চাল সংগ্রহের কথা মনে করায়। কামাল জমাতিয়া (2022) লিখেছেন, হারি বুইসুর এক সপ্তাহ আগে বিভিন্ন পরিবার এক মুঠো করে চাল দেয়; সেই চাল প্রধান পুরোহিত “খেরফাং”-এর বাড়িতে নতুন চুলায় রেঁধে, “চুয়ান” নামের বিশেষ খামি মিশিয়ে চুয়াক বা চালের মদ বানানো হয়, যা উৎসবের আট দিন রোজ বাবা গরিয়াকে নিবেদন করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ার নাম “চুকবার সংমুং”।
এখানে উৎসে অমিল। ত্রিপুরার মন্ত্রী শুক্লাচরণ নোয়াতিয়া এএনআই-কে (2025) বলেছেন, মূল দিনে পূজার অংশ হিসেবে ছাগল ও মুরগি বলি দেওয়া হয়; ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Garia puja” ভুক্তিতেও মুরগি বলির কথা আছে। অন্যদিকে জমাতিয়া হোদার সম্পাদক বিশ্বজিৎ জমাতিয়া সেন্টিনেল আসামকে (2020) বলেছেন, তাঁদের চৈত্র পূজায়, যেখানে বাবা গরিয়ার রূপে শিব ও মাতৃশক্তির পূজা হয়, পশুবলির রীতি নেই। দুটি সম্ভবত আলাদা আয়োজনের কথা, তবে উৎসগুলো তা স্পষ্ট করেনি।
এএনআই-এর বরাতে পাঞ্জাব কেশরী (22 এপ্রিল 2025) লিখেছে, সেবছর প্রথমবারের মতো রাজ্যস্তরে বাবা গরিয়া উৎসব হয়, আগরতলায় দুই দিনের আয়োজন, উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা। মন্ত্রী নোয়াতিয়া বলেছেন, নতুন সরকার আসার পর এই ছুটি এক দিন থেকে বাড়িয়ে দুই দিন করা হয়েছে। আকাশবাণী 2026 লিখেছে, সে বছরের রাজ্যস্তরের মূল আয়োজন তেলিয়ামুড়ার গর্জনটলিতে, জমাতিয়া হোদার উদ্যোগে।
| দিক | বাংলাদেশ (পার্বত্য চট্টগ্রাম) | ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য |
|---|---|---|
| উৎসবের নাম | বৈসু, বৈসুক, বুইসুক | বুইসু; গরিয়া পূজা আলাদা উৎসব হিসেবে পরিচিত |
| গরিয়ার সময় | নাচ বৈসুর শুরু থেকে বা আগে থেকে 5–7 দিন; পূজা নাচের শেষে | চৈত্রের শেষ দিন থেকে 7 (কোথাও 8) দিন, মূল পূজা 7 বৈশাখ |
| কেন্দ্র | বাড়ি বাড়ি ঘোরা নাচের দল; মানতের পারিবারিক পূজা | ঘরে ঘরে পূজা, সঙ্গে সমষ্টিগত ও রাজ্যস্তরের আয়োজন |
| আচারের দণ্ড বা প্রতীক | নাচের দলের কাঁধের শূল, তাতে বাঁধা খাদি; উঠানে বসালে গৃহস্থকে গরিয়া পূজা দিতে হয় (সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা) | উঠানে পোঁতা বাঁশ, বা চালের পাত্র রনদক |
| পুরোহিত | অচাই (মন্ত্র), তাছাই (বলি); নাচে আচাই ও দেওয়াই | বরুয়া ওকরা ও বরুয়া কুসু (এক গ্রামের বিবরণ); জমাতিয়াদের প্রধান পুরোহিত খেরফাং |
| প্রতি বছর কি না | পারিবারিক পূজা মানত থাকলে; নাচ প্রতি বৈসুতে | প্রতি বছর, সরকারি ছুটিসহ |
| নিবেদন | নাচে পাওয়া চাল, মুরগির বাচ্চা, মদ | চাল, চালের মদ, ডিম, ফুল-ফল, মুরগি; কোথাও ছাগল |
| শেষ আচার | নাচের দলের পূজা | “সেনা”: বাঁশের প্রতীক নদী বা হ্রদে বিসর্জন |
মিলের জায়গাটিও উল্লেখ করার মতো: দুই দেশেই গরিয়ার সময় চৈত্র-বৈশাখের সংক্রান্তি ঘিরে, দুই দেশেই বাড়ি বাড়ি ঘোরা গায়ক-নর্তক দল চাল পায় আর গৃহস্থকে আশীর্বাদ করে, আর দুই দেশেই একটি দণ্ড বা বাঁশ আচারের কেন্দ্রে থাকে।
বৈসু সব ত্রিপুরা এলাকায় সমানভাবে পালিত হয় না। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা লিখেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের ত্রিপুরারা বৈসু আড়ম্বরে পালন করলেও বান্দরবান জেলার ত্রিপুরারা কখনো সামাজিকভাবে বৈসু পালন করতেন না, সম্প্রতি কিছুটা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছেন; অথচ গরিয়া নৃত্যের চর্চা তাঁদের মধ্যে এখনো আছে।
এই পার্থক্যের সঙ্গে ধর্মের একটি তথ্যও পাশাপাশি রাখা যায়, যদিও কোনো উৎস দুটিকে কারণ-ফল হিসেবে জোড়েনি। আর্কাইভের ত্রিপুরা-লেখা অনুযায়ী বান্দরবান জেলার ত্রিপুরাদের অধিকাংশ এখন খ্রিস্টধর্মাবলম্বী, আর খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতেও একটি অংশ; সারা দেশে লেখাটির আনুমানিক হিসাব সনাতন ধর্মাবলম্বী 80 শতাংশ, খ্রিস্টান 20 শতাংশ।
বৈসুর চেহারাও বদলেছে। খাগড়াছড়িতে 2024 সালে বৈসু শোভাযাত্রা হয়েছে জেলা টাউন হল চত্বর থেকে, উদ্বোধন করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, আর শোভাযাত্রার আগে শিল্পীরা গরয়া নাচ করেছেন (বিডিনিউজ২৪, 10 এপ্রিল 2024)। বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের তখনকার সভাপতি সুশীল জীবন ত্রিপুরা বলেছেন, হারানো সংস্কৃতি তুলে ধরতেই এমন আয়োজন। 2026 সালে সংগঠনটির সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরা বিডিনিউজ২৪-কে বলেছেন, বৈসু বাংলাদেশ ও ভারতের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নববর্ষ উৎসব, একসঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়।
সব কণ্ঠ উচ্ছ্বাসের নয়। দীঘিনালার পোমাং পাড়ায় 2024 সালের বৈসু উদ্বোধনে জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক বিডিনিউজ২৪-কে বলেছেন, আগে গ্রামভিত্তিক পারিবারিক-সামাজিক আয়োজনে ছড়ায় ফুল পূজা আর চড়ক পূজা হতো, এখন সবকিছুতে “বাণিজ্যিক ব্যাপার” ঢুকে গেছে, প্রকৃত ঐতিহ্য ফেরানো দরকার। একই আয়োজনে বৈসু উদ্যাপন কমিটির কার্তিক ত্রিপুরা বলেছেন, সংস্কৃতি “কালের বিবর্তনে” বদলে যাচ্ছে।
সরকারি আয়োজনও এখন বৈসুর অংশ। দ্য ডেইলি স্টার (9 এপ্রিল 2018) লিখেছে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ সে বছর 12 এপ্রিল শোভাযাত্রা ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদের গর্জনতলী ঘাটে ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ফুল ভাসানো, বয়স্কদের নতুন কাপড় দেওয়া আর নাচ-গান 2012 ও 2024 দুই বছরের প্রতিবেদনেই আছে। জেলাভিত্তিক উৎসব ও সংস্কৃতির বড় ছবি দেখতে পারেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লেখায়, আর পুরো অঞ্চলের লেখাগুলো আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
গরিয়া নৃত্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নৃত্য, বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে প্রচলিত। বাংলাদেশে এটি বৈসু উৎসবের সময় পরিবেশিত হয়; নাচের দল ঢোল-বাঁশি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরে। ভারতে ককবরকভাষী বিভিন্ন দফা গরিয়া পূজা পালন করে, রাজ্যস্তরের মূল আয়োজন জমাতিয়া হোদার।
বাংলাদেশের দুই উৎস অনুযায়ী 22টি। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি (1994) 22টি মুদ্রার কথা বলে দশটির নাম দিয়েছে, যেমন খলাফালনাই, তুলা ককনাই, রিসুনাই, মাতাই খুলুমনাই। প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির এক দলনেতাও বলেছেন 22টি তাল ও মুদ্রা। ভারতের কিছু সাধারণ-জ্ঞান সাইট উৎস ছাড়াই 108টির কথা লেখে।
বৈসু হয় চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন, মোট তিন দিন। প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, ত্রিপুরা পঞ্জিকা অনুযায়ী উৎসব শুরু হয় 29 চৈত্র। 2026 সালে বৈসু হয়েছে 13 থেকে 15 এপ্রিল। তিন দিনের নাম হারি বৈসু, বৈসুমা ও বিসিকাতাল।
প্রথম দিন হারি বৈসু: ফুল তোলা, নদীতে ফুল ও কাপড় ভাসানো, ঘর সাজানো, পিঠা তৈরি, পশুপাখির যত্ন। দ্বিতীয় দিন বৈসুমা: সবার জন্য খোলা দরজা, পাঁচন-পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন, প্রাণীবধ নিষেধ। তৃতীয় দিন বিসিকাতাল: নববর্ষ, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম ও নদীর পানিতে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেওয়া, আমিষ ভোজ।
বাংলাদেশে পারিবারিক গরিয়া পূজা প্রতি বছর বাধ্যতামূলক নয়। জুমজার্নাল আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত অনুযায়ী বিশেষ মানত না থাকলে আয়োজন হয় না, আয়োজক সাধারণত কিছুটা সচ্ছল পরিবার। তবে বৈসুর সময় নাচের দল প্রতি বছর ঘোরে, আর নাচ শেষে সংগৃহীত চাল-মুরগি দিয়ে গরিয়া দেবতার পূজা দেয়। ভারতের ত্রিপুরায় পূজাটি প্রতি বছর হয়।
দুজনই পুরোহিত, তবে কাজ আলাদা। আর্কাইভ অনুযায়ী অচাই মন্ত্র পড়েন, আর তাছাই প্রাণী বলি দেন। গরিয়া পূজার আয়োজক দলে এই দুজনের সঙ্গে থাকেন আয়োজক পরিবারের একজন সদস্য ও একজন সর্দার। গরিয়া নৃত্য পরিচালনা করেন একজন আচাই বা ওঝা ও একজন দেওয়াই বা দলনেতা, প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী।
মূলত ঢোল ও বাঁশি, বাংলাদেশের আর্কাইভ, প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪, তিন উৎসেই। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ত্রিপুরাদের ঢোল জাতীয় যন্ত্র খা-অম গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বাজানো অপরিহার্য। ভারতের ত্রিপুরার উৎসে খাম বা খাম্ব (ঢোল), সুমুই (বাঁশি) ও সারিন্দার নাম আসে।
পরপর তিন বছর অংশ নিতে হয়। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা (1994) লিখেছেন, না নিলে শিল্পীর অমঙ্গল, এমনকি মৃত্যু হতে পারে বলে বিশ্বাস। প্রথম আলোকে (2026) খাগড়াছড়ির দলনেতা অনন্ত ত্রিপুরা বলেছেন, কেউ কোনো কারণে অংশ নিতে না পারলে গরাইয়া দেবের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়।
না। জুমজার্নাল আর্কাইভ অনুযায়ী বোতল নৃত্যের আসল নাম কাথারক নৃত্য, যা বিয়ের কাথারক পূজায় বা শুভ কাজের আগে পরিবেশিত হয়; নর্তক মাথায় দীপশিখাসহ বোতল নিয়ে পানিভর্তি কলসির উপর নাচেন। গরিয়া নৃত্য দলগত, বৈসু ও গরিয়া দেবতার সঙ্গে যুক্ত, বাড়ি বাড়ি ঘুরে উঠানে হয়। বৈসুর অনুষ্ঠানে দুটিই প্রায়ই পাশাপাশি দেখা যায়।
বৈশাখের 7 তারিখে, যা সাধারণত এপ্রিলের 20 বা 21 তারিখে পড়ে। আকাশবাণী জানিয়েছে, 2026 সালে পূজা হয়েছে 21 এপ্রিল, মঙ্গলবার। জমাতিয়া হোদার রীতিতে পূজা চলে সাত দিন, চৈত্রের শেষ দিন থেকে; বিসর্জনের দিনের নাম “সেনা”। 2025 সালে প্রথমবার রাজ্যস্তরে বাবা গরিয়া উৎসব হয়েছে, আগরতলায়।
বাংলাদেশে গরিয়ার কেন্দ্রে বৈসুর সময়ের নাচের দল, আর পারিবারিক পূজা হয় মানত থাকলে। ভারতের ত্রিপুরায় এটি আলাদা, সাত দিনের, সরকারি ছুটিসহ উৎসব, মূল দিন 7 বৈশাখ; উঠানে বাঁশ পুঁতে বা চালের পাত্র রনদককে প্রতীক ধরে ঘরে ঘরে পূজা হয়, শেষে বাঁশের প্রতীক নদীতে বিসর্জন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল পাওয়া আর আশীর্বাদ দেওয়া দুই দেশেই আছে।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখা অনুযায়ী বান্দরবান জেলার ত্রিপুরারা আগে কখনো সামাজিকভাবে বৈসু পালন করতেন না, সাম্প্রতিক কালে কিছুটা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছেন; তবে গরিয়া নৃত্যের চর্চা তাঁদের মধ্যে এখনো আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের ত্রিপুরারা বৈসু আড়ম্বরে পালন করেন।
জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ
বাংলাদেশের উৎস
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎস
বিশ্বকোষ
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026