icon

বাঙালিরাই কি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা? প্রত্নতত্ত্ব ও ঔপনিবেশিক নথি যা বলে, যা বলে না

Jumjournal

Last updated Oct 21st, 2026 icon 20

“বাঙালিরাই কি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা?” প্রশ্নটির পক্ষে-বিপক্ষে যে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঔপনিবেশিক নথি উদ্ধৃত হয়, তার কোনোটিই সরাসরি বলে না কোন ভাষার মানুষ সবার আগে এই পাহাড়ে বসতি গড়েছিলেন। পাহাড়ে ও পাহাড়ের কিনারে পাওয়া পাথরের হাতিয়ারগুলোর সঙ্গে কোনো কঙ্কাল বা বসতির স্তর পাওয়া যায়নি। আর 1869 থেকে 1909 সালের ব্রিটিশ নথি বাঙালিদের দেখায় মূলত ব্যবসায়ী, দোকানি ও রাঙামাটির একটি ছোট হালচাষি বসতি হিসেবে; কোন পাহাড়ি জনগোষ্ঠী “aboriginal”, তা নিয়ে ব্রিটিশ লেখকেরা নিজেরাও একমত ছিলেন না।

এই লেখা দুই পক্ষের কোনোটির রায় দেয় না। প্রতিটি প্রমাণের তারিখ, কে খুঁজে পেয়েছিলেন বা লিখেছিলেন, আর আজ কে সেটিকে কোন যুক্তিতে টানেন, শুধু সেটুকু এক জায়গায় রাখা হয়েছে। চাকমাদের প্রাচীনতম লিখিত ও মানচিত্র-প্রমাণ (1550-এর পর্তুগিজ মানচিত্র, মোগল আমলের তুলা-কর, 1777-এর চিঠি) আমাদের আলাদা লেখা চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কবে থেকে আছে: প্রাচীনতম লিখিত ও মানচিত্র-প্রমাণ-এ বিস্তারিত আছে, আর 1941 থেকে 2022 পর্যন্ত শুমারির অনুপাত আছে পাহাড়ি ও বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত, 1941–2022 লেখায়। সেগুলো এখানে আবার বলা হয়নি। এখানে আছে তার আগের স্তর: প্রত্নতত্ত্ব, আর 1941-এর আগের ব্রিটিশ আমলের নথি।

সূচিপত্র

  1. বাঙালিরাই কি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা: দাবিটি কারা, কোন প্রমাণে করেন
  2. প্রমাণগুলো এক নজরে: তারিখ, উৎপত্তি, কে কীভাবে পড়েন
  3. পাহাড়ে ও পাহাড়ের কিনারে কোন কোন প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার পাওয়া গেছে
  4. সীতাকুণ্ডের 1886 সালের হাতিয়ার কী দেখায়, কী দেখায় না
  5. রাঙামাটির 1958 সালের হাতিয়ারটি কোথায় গেল
  6. উয়ারী-বটেশ্বরের “4,000 বছর”: জায়গাটি কোথায়, তারিখ কী বলে
  7. মাইনী নদীর ধারের ধ্বংসাবশেষ: এক জায়গা, দুই পাঠ
  8. ব্রিটিশ লেখকেরা কাকে “aboriginal” বলেছিলেন
  9. 1872 সালের শুমারিতে মুসলমান ও হিন্দু কতজন ছিলেন
  10. 1901 সালের শুমারি: মুসলমান পুরুষ 4,314, নারী 592
  11. রাঙামাটির প্রথম বাঙালি হালচাষিরা: 1818 না 1863
  12. ব্যবসায়ী, দোকানি, ঘাসমহালের ইজারাদার: নথিতে বাঙালিরা যেভাবে আসেন
  13. ব্রিটিশ আইন কাদের “indigenous” বলেছিল
  14. 953, 1240, 1575: আরাকান ও ত্রিপুরার শাসনের সালগুলো কোথা থেকে
  15. নথিগুলো কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়, কোনটির দেয় না
  16. প্রশ্নোত্তর
  17. যা এখনো জানা যায়নি
  18. তথ্যসূত্র

বাঙালিরাই কি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা: দাবিটি কারা, কোন প্রমাণে করেন

“বাঙালিরাই আদি বাসিন্দা” অবস্থানের সবচেয়ে উদ্ধৃত সরকারি রূপটি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির, 26 জুলাই 2011 ঢাকায় কূটনীতিকদের কাছে দেওয়া ব্রিফিং। তিনি প্রমাণ হিসেবে দুটি জিনিস টেনেছিলেন: উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতত্ত্ব, আর “ঔপনিবেশিক নথি”। বিপরীত অবস্থানের লেখকেরাও ঔপনিবেশিক নথি ও ব্রিটিশ আমলের আইনই টানেন।

The Daily Star (26 জুলাই 2011) ও bdnews24.com (একই দিন)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দীপু মনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী 16 শতকের আগে সেখানে বাস করত না, তারা 16 থেকে 19 শতকের মধ্যে মূলত আশ্রয়প্রার্থী ও অর্থনৈতিক অভিবাসী হিসেবে এসেছে, আর বাঙালিরা এ ভূখণ্ডে আছেন “4,000 বছর বা তারও বেশি”। bdnews24-এর প্রতিবেদনে এই 4,000 বছরের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে “‘Wari Bateshwar’ excavations”-এর কথা আছে, আর বলা আছে যে উপমহাদেশের ও ঔপনিবেশিক “সব ঐতিহাসিক দলিলে” এই জনগোষ্ঠীকে “tribal” বলা হয়েছে। একই Daily Star প্রতিবেদনে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায়ের জবাবও ছাপা হয়: সংবিধান বলেনি যে দেশে আদিবাসী নেই; সংবিধান “indigenous” শব্দ ব্যবহার করেনি, আবার কাউকে চিহ্নিত করতে “minority” শব্দও ব্যবহার করেনি।

পরের দশকে একই প্রশ্নে আরও দুটি লেখা বেশি ছড়িয়েছে। বণিক বার্তায় 27 সেপ্টেম্বর 2024 জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিজানুর রহমান লেখেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটিসহ দেশের নানা জায়গায় নবপলীয় হাতকুঠার ও বাটালি পাওয়া গেছে, এ অঞ্চলে “প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার বছরের প্রাচীন মানববসতির ধারাবাহিকতা” আছে, আর “সপ্তদশ শতক ও তৎপরবর্তী সময়ে কিছু জনজাতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়ে তুলেছিল”; সমতলে ও পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের সম্পর্কে তাঁর বাক্য, “এরা এই ভূমিরই সন্তান”। পার্বত্য সময়-এ 7 মে 2026 এ এইচ এম ফারুক লুইনের 1869 সালের বই ও হাচিনসনের বর্ণনা টেনে লেখেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো আরাকান ও ত্রিপুরা থেকে যুদ্ধ ও অস্থিরতায় পালিয়ে এসেছিল, তাই “তারা এই ভূমির আদি বাসিন্দা নয়”।

অন্য দিকে কোপেনহেগেনের IWGIA থেকে 2000 সালে প্রকাশিত রাজকুমারী চন্দ্রা কালিন্দী রায়ের Land Rights of the Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts (আমাদের ই-বুক লাইব্রেরিতে বইটি আছে) বলে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে “since time immemorial” আছে এবং পরপর প্রশাসনগুলো তা নথিভুক্ত করেছে; প্রমাণ হিসেবে বইটি 1900 সালের শাসনবিধির “indigenous hillman” শব্দ আর ব্রিটিশ শুমারির হিসাব দেখায়। বণিক বার্তার লেখাটি আরেকটি দাবির কথাও জানায়: 21 সেপ্টেম্বর 2024 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতা”-র সংবাদ সম্মেলনে মোগল আমল থেকে এ অঞ্চলে উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল; লেখক সেটিকে প্রমাণহীন বলেছেন।

“আদিবাসী” শব্দের মানে কি সত্যিই “সবার আগে আসা মানুষ”, সেই সংজ্ঞাগত প্রশ্নটি এ লেখার বিষয় নয়। সেটি আছে আমাদের “স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী” সংজ্ঞাটি কোথা থেকে এসেছে লেখায়, আর স্বীকৃতির আইনি ফল নিয়ে আছে আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে আইনত কী বদলায়, কী বদলায় না লেখায়। এখানে শুধু প্রমাণের দিকটি: দুই পক্ষ যে নথিগুলো টানে, সেগুলোতে আসলে কী লেখা।

কে, কবে দাবি প্রমাণ হিসেবে যা টানা হয়
দীপু মনি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, 26 জুলাই 2011 পাহাড়ি জনগোষ্ঠী 16–19 শতকে এসেছে; বাঙালিরা 4,000 বছরের বেশি উয়ারী-বটেশ্বরের খনন; ঔপনিবেশিক দলিলে “tribal” শব্দ
রাজা দেবাশীষ রায়, একই দিন (Daily Star) সংবিধান আদিবাসীর অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি সংবিধানের শব্দ; 2010 সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন
রাজকুমারী চন্দ্রা কালিন্দী রায়, IWGIA, 2000 পাহাড়িরা “since time immemorial” আছেন শাসনবিধি 1900-এর “indigenous hillman”; 1872–1991 শুমারি
মিজানুর রহমান, বণিক বার্তা, 27 সেপ্টেম্বর 2024 আড়াই থেকে তিন হাজার বছরের ধারাবাহিক বসতি; কিছু জনজাতি 17 শতক ও পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়ে রাঙ্গামাটিসহ নানা স্থানের নবপলীয় হাতিয়ার; লুইনের 1869 সালের বর্ণনা
এ এইচ এম ফারুক, পার্বত্য সময়, 7 মে 2026 পাহাড়িরা আরাকান ও ত্রিপুরা থেকে পালিয়ে আসা লুইন 1869; হাচিনসন; রিজলির শ্রেণিবিভাগ
অশোক কুমার দেওয়ান, চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার, 1991 আদিকালে এ অঞ্চলে কেউ স্থায়ীভাবে বাস করত বলে মনে হয় না (আমাদের আর্কাইভের একটি লেখায় উদ্ধৃত; প্রমাণের বিবরণ সেখানে নেই)

শেষ সারিটি আলাদা করে লক্ষ করার মতো। আমাদের আর্কাইভে আজাদ বুলবুলের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব লেখায় (মূল প্রকাশ: তাক্রুপ্ সংকলন, 2013) চাকমা ইতিহাসবিদ অশোক কুমার দেওয়ানের উদ্ধৃতি আছে: “আদিকালে এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে কেউ বসবাস করতো বলে মনে হয় না। শিকারজীবী কিছু আদিম যাযাবর জনগোষ্ঠী মাঝে মাঝে পূর্বদিক থেকে এসে হানা দিয়ে কিছুদিন পর ফিরে যেতো।” একই লেখায় আছে, 19 এপ্রিল 2012 চট্টগ্রামে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পণ্ডিতেরা বলেছিলেন প্রাগৈতিহাসিক প্রত্ননিদর্শন ধরে ইতিহাস লেখা হলে চট্টগ্রামই “বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর বীজ কেন্দ্র” হিসেবে চিহ্নিত হবে। অর্থাৎ একই প্রশ্নে দুই দিকেই প্রত্নতত্ত্ব ও আদি ইতিহাসকে ডাকা হয়, আর দুই দিকেই এমন বাক্য আছে যা ঢালাও অবস্থানের সঙ্গে খাপ খায় না।

প্রমাণগুলো এক নজরে: তারিখ, উৎপত্তি, কে কীভাবে পড়েন

নিচের ছকে বারোটি প্রমাণ আছে, পুরোনো থেকে নতুন ক্রমে। প্রতিটির জন্য: কবেকার, কে পেয়েছিলেন বা লিখেছিলেন, আর বিতর্কে কে সেটিকে কীভাবে ব্যবহার করেন। “কীভাবে পড়েন” ঘরে কেবল সেই পাঠগুলোই আছে যা কোনো প্রকাশিত লেখায় পাওয়া গেছে।

প্রমাণ তারিখ ও উৎপত্তি কে কীভাবে পড়েন
সীতাকুণ্ড পাহাড়ের জীবাশ্ম-কাঠের কাঁধওয়ালা হাতিয়ার উল্লেখ 1886; রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূত্রে (বাংলাপিডিয়া)। স্থান চট্টগ্রাম জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ারের প্রথম দিকের নথিভুক্ত প্রাপ্তি; বিতর্কে কোনো পক্ষ একে কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করেনি
সীতাকুণ্ডের দ্বিতীয় হাতিয়ার 1917-এর আগে; J Coggin Brown-এর ভারতীয় জাদুঘরের তালিকা, 1917 বাংলাপিডিয়া: সীতাকুণ্ডের দ্বিতীয় নমুনা, একই জীবাশ্ম-কাঠের
রাঙামাটির পাথরের হাতিয়ার 1958; Dyson নামের এক মার্কিন নাগরিক ভূপৃষ্ঠে পান মিজানুর রহমান (2024) পার্বত্য চট্টগ্রামে নবপলীয় নিদর্শনের উদাহরণ হিসেবে রাঙামাটির নাম নেন
ছাগলনাইয়ার হাতকুঠার 1963; জাতীয় জাদুঘর সংগ্রহ করে, রামগড় সীমান্তের কাছে আমজাদহাট ইউনিয়ন থেকে মিজানুর রহমানের তালিকায় ছাগলনাইয়া আছে
উয়ারী-বটেশ্বর নরসিংদী জেলা; জনপদ যুগের রৌপ্যমুদ্রা আনুমানিক 600–400 খ্রিস্টপূর্বাব্দ (বাংলাপিডিয়া) দীপু মনি (2011): বাঙালির 4,000 বছরের উপস্থিতির প্রমাণ
মাইনী নদীর ধারে দিঘি, ফলের গাছ ও ইটের ধ্বংসাবশেষ লুইন 1869; হান্টার 1876; হাচিনসন 1906 নিজে ঘুরে দেখেন লুইন: “men of the plains”-এর বসতি, জনশ্রুতিতে ত্রিপুরার রাজার; হাচিনসন: ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী, ত্রিপুরাদের বড় বসতি
রাঙামাটিতে বাঙালি হালচাষি বসতি হান্টার 1876 (ডেপুটি কমিশনারের প্রতিবেদন): রাজা ধরম বক্স খাঁ আনেন, নোয়াবাদ বন্দোবস্ত 1818; লুইন 1869: প্রায় 120 পরিবার, “some six years ago” এ লেখায় আলোচিত বিতর্কের লেখাগুলোর কোনোটিতে নথিটি নেই
1872 সালের শুমারি মোট 63,054 (হান্টার); 381 মুসলমান, 142 হিন্দু IWGIA (2000): অ-আদিবাসী 1,097, 1.74%
লুইনের শ্রেণিবিভাগ: খ্যংথা ও টংথা লুইন 1869 পার্বত্য সময় (2026): পাহাড়িরা যাযাবর ছিল, নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মালিক নয়
“originally occupied by … the Kuki group” হাচিনসন 1906 ও 1909 পার্বত্য সময় (2026): চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা আরাকান ও ত্রিপুরা থেকে আসা
1901 সালের শুমারি মোট 124,762; বৌদ্ধ 83,000, হিন্দু 36,000, মুসলমান 5,000 (ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার 1908) IWGIA (2000): অ-আদিবাসী 8,762, 7.37%
শাসনবিধির বিধি 52 (1934 সালের সংশোধন) “Chakma, Mogh or a member of any hill tribe indigenous to the Chittagong Hill Tracts…” ছাড়া প্রবেশে পারমিট IWGIA ও জনসংহতি সমিতি: রাষ্ট্রীয় নথিতে আদিবাসিত্বের স্বীকৃতি

পাহাড়ে ও পাহাড়ের কিনারে কোন কোন প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার পাওয়া গেছে

বাংলাপিডিয়ার “Prehistory” ও “Archaeology” প্রবন্ধ মিলিয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে চারটি বিচ্ছিন্ন প্রাপ্তির কথা জানা যায়: সীতাকুণ্ডে দুটি (একটি 1886-এ উল্লিখিত, একটি 1917-এর আগে), রাঙামাটিতে একটি (1958), আর পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড় সীমান্তের কাছে ছাগলনাইয়ায় একটি (1963)। চারটির কোনোটিই খননে পাওয়া নয়; সবগুলোই ভূপৃষ্ঠে বা আকস্মিকভাবে পাওয়া।

বাংলাপিডিয়ার “Prehistory” প্রবন্ধ (লেখক সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহছান) বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া অঞ্চলের যে তালিকা দেয়, তাতে আছে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের Chaklapunji চা-বাগান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সীতাকুণ্ড ও রাঙামাটি, আর নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর। প্রবন্ধটির হিসাবে বড় সংগ্রহগুলো এসেছে লালমাই থেকে: 1989 সালে Dilip K Chakrabarti-র দল এগারোটি জায়গা থেকে 234টি জীবাশ্ম-কাঠের হাতিয়ার পায়, আর 1991 সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চারটি জায়গা থেকে পায় 240টি। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ভেতরে এমন কোনো সংগঠিত জরিপ বা সংগ্রহের কথা প্রবন্ধে নেই; রাঙামাটির নাম এসেছে একটিমাত্র হাতিয়ারের সূত্রে।

আঠারো শতকের ব্রিটিশ মানচিত্রে চট্টগ্রাম অঞ্চল: উপকূলে Seetacoon (সীতাকুণ্ড), দক্ষিণে Islamabad, পূর্বদিকে পাহাড়শ্রেণি
1776 সালের ব্রিটিশ মানচিত্রে সীতাকুণ্ড (“Seetacoon”) সমুদ্রতীরের সমতলে, পূর্বের পাহাড়শ্রেণির পশ্চিমে। মানচিত্র: ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার, 1776 (কমন্সের বিবরণ অনুযায়ী) · পাবলিক ডোমেইন · উইকিমিডিয়া কমন্স

হাতিয়ারগুলোর কাঁচামাল নিয়ে প্রবন্ধটি স্পষ্ট: লালমাই, Chaklapunji ও বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া বেশির ভাগ হাতিয়ার জীবাশ্ম-কাঠ (silicified fossil wood) দিয়ে তৈরি। আর এই ধারাকে প্রবন্ধটি কোনো একক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নয়, একটি বিস্তৃত অঞ্চলের সঙ্গে মেলায়: ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাওড়া ও খোয়াই উপত্যকায় একই রকম প্রাপ্তি, আর মিয়ানমারের ইরাবতী উপত্যকার Anyathian ও নবপলীয় হাতিয়ারের সঙ্গে “close resemblance”। প্রবন্ধের ভাষায়, এই মিল থেকে এ অঞ্চলে একটি “regional prehistoric cultural tradition”-এর ইঙ্গিত মেলে।

বাংলাপিডিয়ার “Archaeology” প্রবন্ধ এই গবেষণার সীমাও লিখে রেখেছে: গবেষণা “very preliminary stage”-এ, আর “all the stone tools have been found without any associated skeletal remains”। অর্থাৎ হাতিয়ার যাঁরা বানিয়েছিলেন, তাঁদের দেহাবশেষ এখন পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি।

সীতাকুণ্ডের 1886 সালের হাতিয়ার কী দেখায়, কী দেখায় না

সীতাকুণ্ডের হাতিয়ারটি দেখায় যে উপকূলীয় চট্টগ্রামের পাহাড়ে প্রাগৈতিহাসিক কালে পাথর বা জীবাশ্ম-কাঠের হাতিয়ার ব্যবহারকারী মানুষ ছিলেন। এটি কোনো খননের স্তরে পাওয়া যায়নি, এর বয়স কোনো পরীক্ষায় নির্ধারিত হয়নি, আর জায়গাটি আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার বাইরে, চট্টগ্রাম জেলায়।

বাংলাপিডিয়ার “Prehistory” প্রবন্ধে আছে, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় “as early as 1886” সীতাকুণ্ড পাহাড়ে জীবাশ্ম-কাঠের একটি “shouldered celt” (কাঁধওয়ালা কুঠার-ফলা) পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন, আর J Coggin Brown 1917 সালে কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে রক্ষিত প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনের তালিকায় সীতাকুণ্ডের একটি হাতিয়ারের কথা লেখেন। “Archaeology” প্রবন্ধ দুটিকে আলাদা করে গোনে: “one found in 1886 and the other sometime before 1917”।

সীতাকুণ্ড এলাকা নিয়ে প্রবন্ধটির আরেকটি বাক্য: সেখানে নুড়িপাথরের বিস্তৃত উপস্থিতি দেখা গেছে, কিন্তু সেগুলো প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার বানাতে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, “it could not be ascertained”। অর্থাৎ সীতাকুণ্ডের প্রাপ্তি এখনো দুটি বিচ্ছিন্ন নমুনা; কোনো কর্মশালা বা বসতি সেখানে চিহ্নিত হয়নি।

হাতিয়ারের বয়স নিয়েও প্রবন্ধগুলোতে নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। “কাঁধওয়ালা কুঠার” নবপলীয় ধরনের বলে চিহ্নিত, কিন্তু সীতাকুণ্ডের নমুনার কোনো রেডিওকার্বন বা স্তরভিত্তিক তারিখ বাংলাপিডিয়ায় দেওয়া নেই। বণিক বার্তার লেখায় প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার ব্যবহারকারী বসতির সময় “খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম দিকে” বলা হয়েছে একটি নামহীন “সাম্প্রতিক গবেষণা”-র সূত্রে; গবেষণাটির নাম বা প্রকাশনা লেখায় দেওয়া নেই।

এই হাতিয়ার দুই পক্ষের কারও দাবির পক্ষে সরাসরি সাক্ষ্য দেয় কি না, সেটা আলাদা প্রশ্ন। হাতিয়ারটি যে মানুষ বানিয়েছিলেন, তাঁরা কোন ভাষায় কথা বলতেন, আজকের কোন জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ, তা জানার মতো কোনো উপাদান (দেহাবশেষ, লিপি, বসতির স্তর) এখন পর্যন্ত এই প্রাপ্তির সঙ্গে নথিভুক্ত হয়নি। বাংলাপিডিয়া নিজেও হাতিয়ারগুলোকে কোনো ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করেনি; যুক্ত করেছে ত্রিপুরা ও ইরাবতী উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি আঞ্চলিক কারিগরি ধারার সঙ্গে।

রাঙামাটির 1958 সালের হাতিয়ারটি কোথায় গেল

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে পাওয়া একমাত্র প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার, যার কথা বাংলাপিডিয়ায় আছে, সেটি 1958 সালে রাঙামাটিতে পাওয়া। হাতিয়ারটি এখন খুঁজে পাওয়া যায় না: বাংলাপিডিয়ার “Archaeology” প্রবন্ধ অনুযায়ী এটি চট্টগ্রামের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে জমা হয়েছিল, কিন্তু “has now become untraceable”।

দুই প্রবন্ধের বিবরণ একটু আলাদা। “Prehistory” প্রবন্ধে আছে, Dyson নামের এক মার্কিন নাগরিক রাঙামাটি জেলায় ভূপৃষ্ঠে আকস্মিকভাবে পাওয়া একটি পাথরের হাতিয়ার 1958 সালে হস্তান্তর করেন। “Archaeology” প্রবন্ধে আছে, “Mr Dyson, an American” 1958 সালে একটি পাথরের হাতিয়ার সংগ্রহ করেন, যা পরে চট্টগ্রাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে রাখা হয় এবং এখন হারিয়ে গেছে। কোন প্রবন্ধেই হাতিয়ারটির ধরন (কুঠার, ফলা না অন্য কিছু), কাঁচামাল, রাঙামাটির ঠিক কোন জায়গা, বা বয়স দেওয়া নেই।

বণিক বার্তায় মিজানুর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামে নবপলীয় হাতিয়ারের উদাহরণ হিসেবে রাঙামাটির নাম নেন। বাংলাপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী সেই উদাহরণের পেছনে আছে এই একটিমাত্র প্রাপ্তি, যার বস্তুটি নিজেই আর পরীক্ষার জন্য পাওয়া যায় না। লেখাটিতে রাঙামাটির অন্য কোনো প্রাপ্তির নাম বা প্রকাশনা দেওয়া নেই।

ছাগলনাইয়ার হাতকুঠারটি একটু ভিন্ন। বাংলাপিডিয়ার “Prehistory” অনুযায়ী জাতীয় জাদুঘর 1963 সালে ছাগলনাইয়া উপজেলার আমজাদহাট ইউনিয়ন থেকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড়ের সীমান্তের কাছ থেকে, এটি সংগ্রহ করে, আর এটি জাতীয় জাদুঘরে “hand axe” হিসেবে প্রদর্শিত। জায়গাটি আজকের ফেনী জেলায়; পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে নয়, তবে তার সীমানার কাছে। “Archaeology” প্রবন্ধে একই ধরনের একটি প্রাপ্তিকে বলা হয়েছে নোয়াখালীর ছাগলনাইয়া এলাকার জীবাশ্ম-কাঠের “Palaeolithic scraper”। দুটি একই বস্তু কি না, প্রবন্ধ দুটি থেকে মেলানো যায় না।

উয়ারী-বটেশ্বরের “4,000 বছর”: জায়গাটি কোথায়, তারিখ কী বলে

দীপু মনি 2011 সালে বাঙালির “4,000 বছর বা তারও বেশি” উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে উয়ারী-বটেশ্বরের খননের কথা বলেছিলেন (bdnews24, 26 জুলাই 2011)। বাংলাপিডিয়ার “Wari-Bateshwar” প্রবন্ধ অনুযায়ী জায়গাটি নরসিংদী জেলায়, পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের তীরে; সেখানে পাওয়া জনপদ যুগের রৌপ্য ছাপাঙ্কিত মুদ্রার সময় আনুমানিক 600–400 খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

প্রবন্ধটি উয়ারী-বটেশ্বরকে একটি দুর্গনগর বলে: 600 মিটার × 600 মিটার ঘেরা জায়গা, চারপাশে মাটির প্রাচীর ও পরিখা, আর আশপাশে 50টি প্রত্নস্থান। দুই ধরনের ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রার একটি “Janapada or pre-Mauryan”, যা উপমহাদেশে আনুমানিক 600 থেকে 400 খ্রিস্টপূর্বাব্দে চালু ছিল। প্রবন্ধে নবপলীয় হাতিয়ারের কথাও আছে, কিন্তু সেগুলো “chance finds”, আর “no prehistoric settlement has yet been identified”।

দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটির সীমা বোঝা যায়। প্রথমত, উয়ারী-বটেশ্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্নস্থান নয়; এটি মধ্য বাংলাদেশের। দ্বিতীয়ত, বাংলাপিডিয়ায় এর সবচেয়ে নির্দিষ্ট তারিখ (মুদ্রা) প্রায় 2,400–2,600 বছর আগের; 4,000 বছরের কোনো তারিখ প্রবন্ধটিতে নেই। bdnews24-এর প্রতিবেদনে 4,000 বছরের হিসাবটি কোন খনন-প্রতিবেদন বা কার্বন-তারিখ থেকে নেওয়া, তা বলা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম কারা ছিলেন, সে প্রশ্নে উয়ারী-বটেশ্বরের কোনো প্রত্যক্ষ নথি প্রবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়নি।

বণিক বার্তার লেখাও উয়ারী-বটেশ্বর, মহাস্থানগড় ও বানগড়কে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের নগর ও বন্দরকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে। এ লেখার যুক্তি একটু আলাদা: বাংলাদেশের ভূখণ্ডে হাজার বছরের ধারাবাহিক বসতি আছে, আর বাঙালিরা সেই প্রাচীন বাসিন্দাদের উত্তরসূরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ভেতরের কোনো খননস্থানের নাম লেখাটিতে নেই।

মাইনী নদীর ধারের ধ্বংসাবশেষ: এক জায়গা, দুই পাঠ

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে ব্রিটিশ নথিতে যে একমাত্র পুরোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের বর্ণনা পাওয়া যায়, সেটি কাসালং নদীর উপনদী মাইনীর তীরে। একই জায়গা দেখে টমাস হারবার্ট লুইন 1869 সালে লিখেছিলেন সেটি “সমতলের মানুষ”-এর বসতির চিহ্ন, আর আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসন 1906 সালে লেখেন সেটি ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী ও ত্রিপুরাদের বড় বসতি।

লুইনের The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein (কলকাতা, 1869; আমাদের ই-বুক লাইব্রেরিতে আছে) বলে, কাসালংয়ের উপনদী “Myannee”-র তীরে গভীর জঙ্গলে আছে দিঘি, ফলের গাছ আর ইটের দালানের অবশেষ, যা প্রমাণ করে কোনো এক সময় এখানকার জমি “cultivated and inhabited by men of the plains”। পরের বাক্যেই লুইন জনশ্রুতি লেখেন: ধ্বংসাবশেষ পার্বত্য ত্রিপুরার এক পুরোনো রাজার, যাঁকে দক্ষিণ থেকে আসা পাহাড়ি দল সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টারের A Statistical Account of Bengal, খণ্ড 6 (1876) একই বর্ণনা লুইনের নামে পুনর্মুদ্রণ করে।

হাচিনসনের An Account of the Chittagong Hill Tracts (কলকাতা, 1906; ই-বুক লাইব্রেরিতে আছে) জানায়, লেখক নিজে জায়গাটি দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনায় আছে একটি বড় বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, চার-পাঁচটি বড় দিঘি যার প্রতিটি কোণে পোড়া ইটের বাঁধানো ঘাট (বুনো হাতির যাতায়াতে ক্ষয়ে গেছে), ঘন বনের ভেতর আমগাছ, আর মাটির ওপরে আলের মতো দাগ, যা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত টানেন একসময় পুরো এলাকা ধানচাষের আওতায় ছিল এবং “there must have been a very big settlement of Tipéras in these parts”। তিনি জায়গাটিকে বলেন “reputed to have been at one time the capital of the Tipára kingdom”, আর অনুমান করেন এটি জমাতিয়াদের আদি নিবাস হতে পারে।

দুই পাঠের তফাতটা শব্দে। লুইনের “men of the plains” বলতে তিনি কোন জনগোষ্ঠী বোঝাচ্ছেন, তা বলা নেই; তাঁর পরের বাক্যের জনশ্রুতি ত্রিপুরার রাজার কথা বলে। হাচিনসন সরাসরি ত্রিপুরাদের নাম নেন। কোনো লেখকই জায়গাটির বয়স নির্ধারণ করেননি, আর কোনো খননের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। হাচিনসনের সময়েই জায়গাটি কাসালং সংরক্ষিত বনের ভেতরে ছিল।

আমাদের আর্কাইভে আজাদ বুলবুলের লেখায় একটি বাক্য এর সঙ্গে মেলে: “মাইনী উপত্যকা পর্যন্ত জেলার উত্তরপ্রান্ত বরাবরই ত্রিপুরার প্রভাব বলয়ের মধ্যে অবস্থিত ছিল।” হাচিনসনের 1906 সালের বইয়েও আছে, পার্বত্য ত্রিপুরার মহারাজা একসময় আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাংশের বড় অংশের মালিক ছিলেন; সরকার সীমানা টানার সময় তাঁর সীমানা ফেনী নদীর ওপারে রাখা হয়, ফলে তাঁর কয়েক হাজার প্রজা ব্রিটিশ এখতিয়ারে চলে আসেন। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর পূর্ণ ইতিহাস আমাদের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় আছে।

এ লেখায় আলোচিত বিতর্কের লেখাগুলোর কোনোটিতে মাইনীর ধ্বংসাবশেষের উল্লেখ নেই। লুইন, হান্টার ও হাচিনসনের বইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে ইটের স্থাপনা ও দিঘিসহ পুরোনো চাষনির্ভর বসতির বর্ণনা এই একটি জায়গারই পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ লেখকেরা কাকে “aboriginal” বলেছিলেন

ব্রিটিশ লেখকেরা পার্বত্য চট্টগ্রামের “aboriginal inhabitants” বলতে কোনো একক জনগোষ্ঠী বোঝাননি, আর পরস্পরের সঙ্গে একমতও ছিলেন না। লুইন (1869) বলেন টংথারা হয়তো আদি বাসিন্দা; লুইনের উদ্ধৃত Hodgson (1853) বলেন খুমি, খ্যাং ও ম্রো আদি বাসিন্দা; হাচিনসন (1906) বলেন কুকি গোষ্ঠী আদিতে ছিল আর ম্রোরাই “true aboriginal tribe”। কোনো লেখাতেই বাঙালিদের এই তালিকায় রাখা হয়নি।

লুইন পাহাড়ের জনগোষ্ঠীগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করেন। প্রথম ভাগ “Khyoungtha” (খ্যংথা, আরাকানি ভাষায় “নদীর সন্তান”): তাঁর মতে এরা “pure Arracanese origin”, আর এর মধ্যে তিনি চাকমাদেরও রাখেন। দ্বিতীয় ভাগ “Toungtha” (টংথা, “পাহাড়ের সন্তান”): এরা “of mixed origin, if indeed they are not the aboriginal inhabitants of the country”, আর এর মধ্যে তিনি রাখেন ত্রিপুরা ও লুসাই বা কুকি গোষ্ঠীগুলো। লুইন Hodgson-এর 1853 সালের একটি লেখা উদ্ধৃত করেন, যেখানে Hodgson আরাকানের থেক বা চাকমাদের “aboriginal descent” বলেছিলেন; লুইন লেখেন, তিনি এতে একমত নন। আরেক জায়গায় লুইন Hodgson-এরই মত উদ্ধৃত করেন যে খুমি, খ্যাং ও ম্রো দেশের আদি বাসিন্দা, পরে ভেঙে আলাদা গোত্রে ছড়িয়ে পড়েছে।

হাচিনসনের 1906 সালের বই এবং তাঁরই লেখা 1909 সালের Eastern Bengal and Assam District Gazetteers: Chittagong Hill Tracts-এর ইতিহাস অধ্যায় শুরু হয় একই বাক্যে: পার্বত্য চট্টগ্রাম “originally occupied” ছিল কুকি গোষ্ঠীর নানা গোত্রের দখলে; তারা চাকমাদের আক্রমণে উত্তর-পূর্বে সরে যায়, আর চাকমারা, যাঁরা আগে চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণাংশে বসতি গড়েছিলেন, বর্মি যুদ্ধের সময় আরাকান থেকে আসা মগদের চাপে পাহাড়ে ঢোকেন। 1909 সালের গেজেটিয়ার জনগোষ্ঠীগুলোকে দুই ভাগ করে: চাকমা ও মগ “undoubtedly of Arakanese origin”, আর ত্রিপুরা ও কুকি গোষ্ঠী “of mixed origin, in all probability the aboriginal inhabitants”। একই গেজেটিয়ার ম্রোদের সম্পর্কে বলে “in all probability the aboriginal inhabitants of the District”; 1906 সালের বইয়ে হাচিনসন আরও জোর দিয়ে লেখেন, ম্রোদের তিনি জেলার “true aboriginal tribe” মনে করেন।

1908 সালের Imperial Gazetteer of India, খণ্ড 10 চাকমাদের বলে “probably of Arakanese origin, though they have intermarried largely with Bengalis”। “undoubtedly” থেকে “probably”: একই প্রশাসনের দুটি নথি, এক বছরের ব্যবধানে, একই জনগোষ্ঠী নিয়ে ভিন্ন মাত্রার নিশ্চয়তা দেখায়।

এই নথিগুলো আজ দুই দিকেই টানা হয়, আর দুই দিকই আলাদা বাক্য বাছে। পার্বত্য সময়-এর 2026 সালের লেখা হাচিনসনের নামে বলে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে “মায়ানমারের আরাকান ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে” এসেছে, আর লুইনের নামে বলে পাহাড়িরা “কোনো স্থায়ী ভূ-খণ্ডের একক মালিক ছিল না”। IWGIA-র বইটি ব্রিটিশ আইনের “indigenous hillman” শব্দকে আদিবাসিত্বের দলিল হিসেবে দেখায়। ওপরের অনুচ্ছেদগুলোতে যেমন দেখা গেল, একই বইগুলোতে দুই ধরনের বাক্যই আছে: কারও “Arakanese origin”, আবার ত্রিপুরা, কুকি গোষ্ঠী ও ম্রোদের সম্পর্কে “aboriginal inhabitants”। চাকমাদের উৎপত্তি নিয়ে ব্রিটিশ ও চাকমা লেখকদের মতভেদের পূর্ণ বিবরণ আছে আমাদের চাকমাদের প্রাচীনতম প্রমাণের লেখায়।

1909 সালের গেজেটিয়ারে আরেকটি ছোট বাক্য আছে যা বোঝায় সেকালের সমতলের মানুষ পাহাড়িদের কীভাবে দেখতেন: “The Bengali of the plains” পাহাড়ের বাসিন্দাদের দুই শ্রেণিতে ভাগ করেন; যাঁরা বাংলা বোঝেন তাঁরা “Jumiyas”, বাকিরা “Kukis”।

1872 সালের শুমারিতে মুসলমান ও হিন্দু কতজন ছিলেন

হান্টারের A Statistical Account of Bengal, খণ্ড 6 (লন্ডন, 1876) অনুযায়ী 1872 সালের শুমারিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যা 63,054; তার মধ্যে মুসলমান 381 ও হিন্দু 142। হান্টার এদের, সঙ্গে 570 জন গুর্খা ও 4 জন খ্রিস্টানকে মিলিয়ে, মোট 1,097 জনকে লেখেন “not strictly the people of the Chittagong Hills”।

হান্টারের 1876 সালের বইয়ের 37 নম্বর পৃষ্ঠা: পার্বত্য চট্টগ্রামের 1872 সালের শুমারির জাতিভিত্তিক বিভাজন, চাকমা 28,097, মগ 22,060, 381 জন মুসলমান ও 142 জন হিন্দুর উল্লেখ
হান্টারের A Statistical Account of Bengal, খণ্ড 6 (1876), পৃ. 37: “Ethnical Division of the People”। ছবি: W. W. Hunter · পাবলিক ডোমেইন · উইকিমিডিয়া কমন্স

হান্টারের পৃষ্ঠা 37-এর জাতিভিত্তিক হিসাব এরকম: চাকমা 28,097 (44.56%), মগ বা খ্যংথা 22,060 (34.98%), দুটি মিলে 50,157 (79.55%); বাকি 20.45%-এর মধ্যে নানা “non-Hindu aboriginal tribes” 11,800, গুর্খা 570, মুসলমান 381, হিন্দু 142, ইউরোপীয় 3 আর দেশি খ্রিস্টান 1। সংখ্যাগুলো যোগ করলে মোট 63,054 মেলে। হান্টার পাদটীকায় জানান, তাঁর সংখ্যা মূল শুমারি-প্রতিবেদন থেকে আলাদা, কারণ তিনি লুসাই অভিযানের সৈন্যদলকে বাদ দিয়েছেন।

1872 সালের মোট সংখ্যাটি নিজেই উৎসভেদে আলাদা। হান্টার বলেন 63,054; 1908 সালের Imperial Gazetteer বলে 69,607, আর যোগ করে শুমারিটি ছিল “very imperfect”। হাচিনসনের 1906 ও 1909 সালের বই দুটি 63,054 সংখ্যাটি নেয়, আর ব্যাখ্যা দেয় কেন এটি নির্ভরযোগ্য নয়: প্রধানেরা মাথাপিছু করের একটি অংশ সরকারকে দিতেন, তাই জনসংখ্যা কম দেখানোয় তাঁদের স্বার্থ ছিল। হাচিনসনের 1906 সালের বইয়ে শুমারির বছরটি 1871 লেখা, আর ছকে মুদ্রিত সংখ্যাটি 68,054; দুই জায়গায় দুই রকম।

IWGIA-র 2000 সালের বই এই 1872 সালের হিসাব থেকে একটি অনুপাত বানায়: “Indigenous” 61,957 (98.26%), “Non-indigenous” 1,097 (1.74%)। বইয়ের পাদটীকা 183 নিজেই জানায়, এই 1,097-এর মধ্যে ইউরোপীয়, আসামি ও নেপালি বংশোদ্ভূত সরকারি কর্মচারীরাও আছেন, আর বাঙালি জনসংখ্যা ছিল “about 524”; সূত্র হিসেবে Aditya Dewan (1991)-এর নাম দেওয়া। হান্টারের 381 মুসলমান ও 142 হিন্দু যোগ করলে 523 হয়।

এ লেখায় আলোচিত “বাঙালিরাই আদি বাসিন্দা” অবস্থানের তিনটি লেখার কোনোটিতে 1872 সালের শুমারির উল্লেখ নেই। IWGIA সংখ্যাটি নিয়েছে, আর তার “Non-indigenous” ঘরে গুর্খা ও ইউরোপীয়রাও আছেন, যা বইটির পাদটীকাই জানায়।

1901 সালের শুমারি: মুসলমান পুরুষ 4,314, নারী 592

1901 সালের শুমারিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যা 124,762। হাচিনসনের 1906 সালের বই অনুযায়ী মুসলমান পুরুষ ছিলেন 4,314 আর নারী 592; তাঁর ব্যাখ্যায় এরা মূলত চট্টগ্রাম থেকে আসা নৌকার ব্যবসায়ী ও বাজারের দোকানি, যাঁরা পাহাড়ে পরিবার আনতেন না। ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার (1908) মোট মুসলমান লেখে 5,000।

1908 সালের Imperial Gazetteer ধর্মভিত্তিক হিসাব দেয় গোল সংখ্যায়: বৌদ্ধ 83,000, হিন্দু 36,000, মুসলমান 5,000। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Chittagong Hill Tracts” পাতা একই পৃষ্ঠা উদ্ধৃত করে লেখে বৌদ্ধ 100,000, হিন্দু 50,000, মুসলমান 3,000, যা গেজেটিয়ারের মুদ্রিত পাঠের সঙ্গে মেলে না। এখানে “হিন্দু” শ্রেণিতে কারা আছেন, গেজেটিয়ার তা ভেঙে বলেনি; হাচিনসন 1906 সালে লেখেন তাঁর ছকের “Hindus and others” ঘরে হিন্দুদের সঙ্গে ইউরোপীয়, সাঁওতাল ও অন্যরাও আছেন।

হাচিনসনের 1909 সালের গেজেটিয়ার জনগোষ্ঠী ধরে হিসাব দেয়: চাকমা 44,829, মগ 31,906, ত্রিপুরা 23,341, ম্রো 10,540, কুকি 1,615, খুমি 1,460, খ্যাং 416, বনযোগী 696, পাংখো 144; মোট 114,456। গেজেটিয়ারের ভাষায় এই জনগোষ্ঠীগুলো জেলার মোট জনসংখ্যার “nine-tenths”। মোট 124,762 থেকে 114,456 বাদ দিলে থাকে 10,306। IWGIA-র বই 1901 সালের হিসাব দেয় আলাদা: “Indigenous” 116,000 (92.63%), “Non-indigenous” 8,762 (7.37%)। কোন হিসাবের ভিত্তিতে 116,000 সংখ্যাটি এসেছে, বইয়ে আলাদা করে বলা নেই; পাদটীকায় উৎস হিসেবে হান্টার, হাচিনসন 1909 ও পরের কয়েকটি নথির নাম আছে।

1909 সালের গেজেটিয়ার আরও দুটি তথ্য দেয় যা এই প্রশ্নে প্রাসঙ্গিক: “There is a small immigration from Chittagong”, আর মোট জনসংখ্যায় পুরুষের তুলনায় নারী মাত্র 83 শতাংশ, যার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে “bachelor immigrants”। জেলায় জন্ম নেওয়া জনসংখ্যায় অনুপাতটি 90 শতাংশ। গেজেটিয়ার সার্কেল ধরে মুসলমানদের সংখ্যাও দেয়; বোমাং সার্কেলের ছকে মুসলমান পুরুষ 2,463 আর নারী 285, আর মং সার্কেলে 118 ও 4।

1941 সাল থেকে 2022 পর্যন্ত শুমারি ধরে পাহাড়ি ও বাঙালির অনুপাত, আর কোন বছরে কোন উৎস কী সংখ্যা দেয়, তা আছে আমাদের পাহাড়ি ও বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাতের লেখায়; জাতিগোষ্ঠী গোনার পদ্ধতি নিয়ে আছে জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনা হয় কীভাবে লেখায়।

রাঙামাটির প্রথম বাঙালি হালচাষিরা: 1818 না 1863

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে স্থায়ী বাঙালি বসতির যে প্রাচীনতম নির্দিষ্ট নথি ব্রিটিশ বইগুলোতে আছে, সেটি রাঙামাটির একটি হালচাষি বসতি। হান্টার (1876) ডেপুটি কমিশনারের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলেন, চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁ “about sixty years ago” কিছু বাঙালিকে এনে রাঙামাটিতে বসিয়েছিলেন, আর এর জন্য 1818 সালে নোয়াবাদ বন্দোবস্ত পান। লুইন (1869) একই বসতির কথা লেখেন, কিন্তু বলেন এটি স্থাপিত হয়েছে “some six years ago”।

হান্টারের বিবরণ অনুযায়ী 1870-এর দশকে এই বসতির চাষের জমি ছিল প্রায় 303 একর। তিনি লেখেন, পাহাড়ের ভেতরে লাঙলে ধানচাষের, যা নিছক সমতলের বাঙালি সীমান্ত-চাষের সম্প্রসারণ নয়, মাত্র দুটি দৃষ্টান্ত ছিল: রাঙামাটি আর বোরাদম। বোরাদম ছিল চাকমাদের এক প্রধান হেডম্যানের বাসস্থান; 1874 সালে সেখানে প্রায় 75 একর জমি চাষে ছিল, যার বেশির ভাগ হেডম্যান নীলচন্দ্র নিজেই চাষ করতেন। হান্টার এ-ও লেখেন, সীমান্তের কিছু ঘাসমহালের বন্দোবস্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা জেলা হওয়ার আগেই চট্টগ্রামের কালেক্টর দিয়েছিলেন, আর সেগুলো কখনো বাতিল হয়নি।

লুইনের বর্ণনায় রাঙামাটিতে কর্ণফুলীর তীরে প্রায় 120টি বাঙালি পরিবার জমি চাষ করত, আর বসতিটি “established some six years ago” হলেও তেমন বাড়েনি। লুইনের বই 1869 সালের, তাই তাঁর হিসাবে বসতির শুরু 1860-এর দশকের প্রথম ভাগে। দুটি বিবরণ পাশাপাশি: হান্টার (ডেপুটি কমিশনারের সূত্রে) 1818 সালের বন্দোবস্তের কথা বলেন, লুইন প্রায় 1863 সালের।

দুই তারিখ মেলানোর মতো তথ্য উৎস দুটিতে নেই। হান্টার শুধু যোগ করেন, বন্দোবস্তটি “has been extended from time to time”। কোন তারিখটি ঠিক, তা নির্ধারণের নথি পাওয়া যায়নি। রাজা ধরম বক্স খাঁর সময় ও চাকমা রাজবংশের তালিকা নিয়ে আমাদের চাকমা বিদ্রোহ ও কোম্পানির নথির লেখায় আলোচনা আছে।

ব্যবসায়ী, দোকানি, ঘাসমহালের ইজারাদার: নথিতে বাঙালিরা যেভাবে আসেন

রাঙামাটির হালচাষি বসতি বাদ দিলে ব্রিটিশ নথিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা আসেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, বাজারের দোকানি, মহাজন ও ঘাসমহালের ইজারাদার হিসেবে। হান্টার (1876) লেখেন, প্রতি বছর বহু বাঙালি ব্যবসায়ী সমতল থেকে এসে শুকনো ও শীতের মৌসুমে প্রায় ছয় মাস পাহাড়ে থাকেন এবং বর্ষা নামলে ফিরে যান।

হান্টারের বইয়ে এরকম আরও কয়েকটি বর্ণনা আছে। বান্দরবানকে তিনি জেলার সবচেয়ে বড় গ্রাম বলেন, প্রায় 3,000 মানুষের, আর লেখেন সামরিক পুলিশ, সরকারি কর্মচারী ও “a few Bengali shopkeepers” ছাড়া জেলার পুরো জনসংখ্যা কৃষিজীবী। খারাপ ফসলের বছরে পাহাড়ের মানুষ বাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধার নেন, আর তিলের প্রায় পুরো ফসল বাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হয়। কয়েকজন প্রধানের গ্রামের কাছে ছোট ছোট লাঙলচাষের জমি ছিল, যা চাষ করতেন বাঙালি চাকরেরা, পাহাড়িরা নন; আর হান্টার লেখেন, জেলায় কয়েকজন বাঙালি হালচাষিও বসতি গড়েছেন, “especially along the border adjacent to the Regulation District of Chittagong”। হাচিনসন (1906) লেখেন, নদীর ধারের ঘাসমহালগুলো সরকার প্রতি বছর নিলামে দেয়, বাঙালিরা নিয়মিত জেলা চট্টগ্রাম থেকে এসে ডাক দেন, আর 1902–03 সালে এই খাত থেকে আয় ছিল 9,642 টাকা।

এর আগের সময়ের একটি বিবরণ আছে IWGIA-র বইয়ে। বইটি বলে, 1713 সালে চাকমা রাজা ফতে খাঁ মোগল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন যাতে বেপারিরা (বাঙালি বণিক) 11 মণ তুলার এককালীন উপঢৌকনের বিনিময়ে জুম্মদের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারেন। একই বই কয়েক পৃষ্ঠা পরে 1713–1777 পর্বের বর্ণনায় লেখে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে “Only indigenous people lived” এবং “no plains people entered or lived there at that time”। একই বইয়ে দুটি বাক্য পাশাপাশি: ব্যবসার অনুমতি, আর বসবাসের অনুপস্থিতি। মোগল আমলের তুলা-কর ও এর বিভিন্ন বিবরণ আছে আমাদের চাকমাদের প্রাচীনতম প্রমাণের লেখায়।

ভাষার দিক থেকে ব্রিটিশ নথি আরেকটি সম্পর্কের কথা বলে, যা এ লেখায় আলোচিত বিতর্কের লেখাগুলোতে নেই। হান্টার লেখেন চাকমারা “a corrupt form of the Bengali language” গ্রহণ করেছেন; 1909 সালের গেজেটিয়ার বলে চাকমারা চট্টগ্রাম জেলায় এসে বাঙালিদের সঙ্গে ব্যাপক বিবাহসম্পর্কে যুক্ত হন এবং “whose language they speak”; 1908 সালের ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার বলে চাকমারা “a corrupted Bengali” বলেন। এই বর্ণনাগুলো ব্রিটিশ প্রশাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি; চাকমা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে চাকমা ভাষাবিদদের নিজস্ব মত এ লেখার বিষয় নয়।

ব্রিটিশ আইন কাদের “indigenous” বলেছিল

1900 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ও তার অধীনের বিধিমালা “indigenous” শব্দটি ব্যবহার করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বোঝাতে। জনসংহতি সমিতির সংকলিত পাঠে বিধি 52 (1934 সালের সংশোধন) বলে, চাকমা, মগ, অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম, লুসাই পাহাড়, আরাকান পার্বত্য অঞ্চল বা ত্রিপুরা রাজ্যের “any hill tribe indigenous” সদস্য ছাড়া কেউ ডেপুটি কমিশনারের পারমিট ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকতে বা থাকতে পারবেন না।

শব্দটি আরও কয়েক জায়গায় আছে। দেওয়ানি বিচারের বিধির একটিতে বলা হয়েছে, আপিলকারী “a Chakma, Mogh or member of any tribe indigenous to the Hill Tracts” হলে আপিলের স্মারকলিপিতে কোর্ট-ফি লাগবে না; জনসংহতি সমিতির সংকলনে এটি বিধি 5, IWGIA-র বইয়ে বিধি 4। একই সংকলনের আইনের তালিকায় 1922 সালের আয়কর আইন সম্পর্কে লেখা আছে, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সবার ওপর প্রযোজ্য “except the indigenous hillmen”। 1860 সালের আইন XXII-এর মাধ্যমেই পাহাড়ি এলাকাকে চট্টগ্রাম জেলার আদালত ও রাজস্ব অফিসের এখতিয়ার থেকে আলাদা করে একজন “Superintendent of the Hill Tribes”-এর অধীনে দেওয়া হয়েছিল (হাচিনসন 1909)।

IWGIA-র বই এই শব্দগুলোকে আদিবাসিত্বের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে পড়ে: পাহাড়িরা “since time immemorial” আছেন, “This has been documented by successive national administrations”। জনসংহতি সমিতির ওয়েবসাইটে “Govt-Sponsored Migration & Islamization in CHT” পাতাটিও বিধি 52-এর একই বাক্য উদ্ধৃত করে এবং বলে শাসনবিধি এক শতাব্দীরও বেশি সময় বাঙালিদের জমি দখলের বিরুদ্ধে “bulwark” হিসেবে কাজ করেছে।

বিধিটির শব্দ নিজেই আরেকটি তথ্য দেয়: 1934 সালের ব্রিটিশ সংজ্ঞায় “indigenous” বলতে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়, লুসাই পাহাড়, আরাকান পার্বত্য অঞ্চল ও ত্রিপুরার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকেও ধরা হয়েছিল। আর আলাদা করে নাম নেওয়া হয়েছিল চাকমা ও মগদের। এই আইনি সংজ্ঞা ঐতিহাসিক অগ্রাধিকারের (কে আগে এসেছিল) কোনো দাবি করে না; এটি একটি প্রশাসনিক শ্রেণি, যা প্রবেশ ও বসবাসের নিয়ম ঠিক করে।

এই বিধির ইতিহাস নিয়েও নথিতে অমিল আছে। IWGIA-র কালানুক্রম বলে, 1930 সালের সংশোধনে এলাকায় প্রবেশের জন্য ডেপুটি কমিশনারের অনুমতি আর লাগত না, তবে বাইরের লোকের জমির মালিকানার নিষেধ বহাল ছিল। জনসংহতি সমিতির সংকলনে 21 আগস্ট 1934 সালের বিজ্ঞপ্তিতে সংশোধিত বিধি 52 পারমিট-ব্যবস্থাই রেখেছে। দুটি বিবরণ পাশাপাশি থাকল। বিধিমালার জমি-সংক্রান্ত দিক নিয়ে আমাদের ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন পর্যন্ত লেখায় বিস্তারিত আছে।

953, 1240, 1575: আরাকান ও ত্রিপুরার শাসনের সালগুলো কোথা থেকে

বাংলাপিডিয়ার পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবন্ধ বলে, 953 সালে আরাকানের এক রাজা আজকের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম দখল করেন, 1240 সালে ত্রিপুরার রাজা অঞ্চলটি দখল করেন, 1575 সালে আরাকানের রাজা আবার দখল নিয়ে 1666 পর্যন্ত রাখেন, আর মোগলরা 1666 থেকে 1760 পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। প্রবন্ধে এই সালগুলোর কোনো উৎস দেওয়া নেই।

এই সালগুলো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে, জনবসতির নয়। কোন রাজা কর নিতেন বা দুর্গ রাখতেন, সেটা জানা গেলেও পাহাড়ের গ্রামগুলোতে তখন কারা থাকতেন, এই সালগুলো তা বলে না। বাংলাপিডিয়ার একই প্রবন্ধ বলে, এই অঞ্চল “first known map of Bengal”-এ, আনুমানিক 1550 সালে, নথিভুক্ত হয়; সেই পর্তুগিজ মানচিত্রে চাকমাদের নাম কীভাবে আছে এবং তা কে কীভাবে পড়েন, তার বিস্তারিত আছে চাকমাদের প্রাচীনতম প্রমাণের লেখায়। বোমাং রাজবংশের 1614 সাল থেকে শুরু হওয়া তালিকা আছে বোমাং রাজাদের তালিকার লেখায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের সঙ্গে লেনদেনের প্রাচীনতম নথি হিসেবে হাচিনসন (1909) ও ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার (1908) দুটিই 10 এপ্রিল 1777 সালে চট্টগ্রামের প্রধান কর্মকর্তার ওয়ারেন হেস্টিংসকে লেখা চিঠির কথা বলে। চিঠিটির বিষয়বস্তু ও নেতার নামের বানানভেদ নিয়ে বিস্তারিত আছে চাকমা বিদ্রোহের লেখায়।

নথিগুলো কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়, কোনটির দেয় না

নিচের ছকে আলোচিত নথিগুলো দিয়ে কোন প্রশ্নের উত্তর মেলে আর কোনটির মেলে না, তা পাশাপাশি রাখা হয়েছে। “উত্তর দেয় না” মানে প্রশ্নটির বিপক্ষে প্রমাণ আছে, তা নয়; মানে এই নথিগুলোতে সেই প্রশ্নের উত্তর নেই।

প্রশ্ন নথি যা দেখায় নথি যা দেখায় না
এ অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক মানুষ ছিলেন কি?সীতাকুণ্ড, রাঙামাটি, ছাগলনাইয়ায় বিচ্ছিন্ন হাতিয়ার; লালমাই ও ত্রিপুরা পর্যন্ত একই কারিগরি ধারাতাঁদের ভাষা, দেহাবশেষ, বসতির স্তর, নির্দিষ্ট তারিখ
উয়ারী-বটেশ্বর কতটা পুরোনো?জনপদ যুগের মুদ্রা, আনুমানিক 600–400 খ্রিস্টপূর্বাব্দ; নরসিংদীতে4,000 বছরের তারিখ; পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ
পাহাড়ের ভেতরে পুরোনো স্থায়ী বসতির চিহ্ন আছে কি?মাইনী নদীর ধারে দিঘি, ইটের ঘাট, আমগাছ (লুইন 1869, হাচিনসন 1906)বসতির বয়স; খনন; লুইনের “men of the plains” বলতে কারা
1872 সালে পাহাড়ে মুসলমান ও হিন্দু কতজন?381 ও 142 (হান্টার); মোট 63,054শুমারির নির্ভুলতা (হাচিনসন নিজেই সংখ্যাটিকে অনির্ভরযোগ্য বলেন)
ব্রিটিশ লেখকেরা কাদের “aboriginal” বলেছিলেন?টংথা, কুকি গোষ্ঠী, ম্রো, (Hodgson-এর মতে) খুমি ও খ্যাংএ নিয়ে তাঁদের ঐকমত্য
পাহাড়ে স্থায়ী বাঙালি বসতির প্রাচীনতম নথি কোনটি?রাঙামাটির হালচাষি বসতি: 1818 (হান্টার) বা প্রায় 1863 (লুইন)এর আগে কোনো স্থায়ী বসতি ছিল কি না
ব্রিটিশ আইন কাদের “indigenous” বলেছিল?চাকমা, মগ, আর পার্বত্য চট্টগ্রাম, লুসাই, আরাকান ও ত্রিপুরার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী (বিধি 52)কে কবে এসেছিল তার কোনো ঐতিহাসিক রায়

প্রশ্নোত্তর

বাঙালিরাই কি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা?

প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঔপনিবেশিক নথি এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না। পাহাড়ে ও আশপাশে পাওয়া পাথরের হাতিয়ারের সঙ্গে কোনো দেহাবশেষ বা ভাষার চিহ্ন পাওয়া যায়নি (বাংলাপিডিয়া)। লুইন (1869), হান্টার (1876) ও হাচিনসন (1906, 1909) যাঁদের “aboriginal” বলেছেন, তাঁরা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী; বাঙালিদের তাঁরা মূলত ব্যবসায়ী, দোকানি ও রাঙামাটির একটি হালচাষি বসতি হিসেবে বর্ণনা করেন।

দীপু মনি 2011 সালে বাঙালিদের আদি বাসিন্দা বলার পক্ষে কী প্রমাণ দিয়েছিলেন?

bdnews24 ও The Daily Star-এর 26 জুলাই 2011 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, বাঙালিরা 4,000 বছরের বেশি এ ভূখণ্ডে আছেন, প্রমাণ উয়ারী-বটেশ্বরের খনন; আর পাহাড়ি জনগোষ্ঠী 16 থেকে 19 শতকের মধ্যে এসেছে এবং ঔপনিবেশিক দলিলে তাদের “tribal” বলা হয়েছে। একই দিন রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, সংবিধান আদিবাসীর অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি।

উয়ারী-বটেশ্বর কোথায়, আর এর বয়স কত?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উয়ারী-বটেশ্বর নরসিংদী জেলায়, পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের তীরে, একটি দুর্গনগর। সেখানে পাওয়া জনপদ যুগের রৌপ্য ছাপাঙ্কিত মুদ্রা আনুমানিক 600–400 খ্রিস্টপূর্বাব্দের। নবপলীয় হাতিয়ারও পাওয়া গেছে, তবে সেগুলো আকস্মিক প্রাপ্তি; প্রাগৈতিহাসিক বসতি সেখানে এখনো চিহ্নিত হয়নি। জায়গাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে; দীপু মনি 2011 সালে একেই বাঙালির 4,000 বছরের উপস্থিতির প্রমাণ বলেছিলেন।

সীতাকুণ্ডে 1886 সালে কী পাওয়া গিয়েছিল?

বাংলাপিডিয়ার “Prehistory” প্রবন্ধ অনুযায়ী রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় 1886 সালে সীতাকুণ্ড পাহাড়ে জীবাশ্ম-কাঠের একটি কাঁধওয়ালা কুঠার-ফলা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন; 1917-এর আগে সেখানে আরেকটি হাতিয়ার পাওয়া যায়, যার কথা J Coggin Brown-এর তালিকায় আছে। সীতাকুণ্ড চট্টগ্রাম জেলায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে। কোনো খননস্তর বা বয়স-পরীক্ষার কথা নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে কোনো প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার পাওয়া গেছে কি?

বাংলাপিডিয়ায় একটির কথা আছে: 1958 সালে রাঙামাটিতে Dyson নামের এক মার্কিন নাগরিক ভূপৃষ্ঠে একটি পাথরের হাতিয়ার পান। এটি চট্টগ্রামের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে জমা হয়েছিল, কিন্তু “Archaeology” প্রবন্ধ অনুযায়ী এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। হাতিয়ারটির ধরন, কাঁচামাল ও সঠিক স্থান কোথাও লেখা নেই।

পাথরের হাতিয়ার দিয়ে কি বোঝা যায় সেগুলো কোন জাতির মানুষ বানিয়েছিলেন?

বাংলাপিডিয়ার প্রবন্ধগুলো হাতিয়ারগুলোকে কোনো জাতি বা ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করেনি। “Archaeology” প্রবন্ধ জানায়, সব হাতিয়ার কোনো কঙ্কাল ছাড়া পাওয়া গেছে এবং গবেষণা প্রাথমিক স্তরে। “Prehistory” প্রবন্ধ লালমাই ও Chaklapunji-র হাতিয়ারকে ত্রিপুরার হাওড়া-খোয়াই উপত্যকা ও মিয়ানমারের ইরাবতী উপত্যকার হাতিয়ারের সঙ্গে তুলনা করে একটি আঞ্চলিক ধারার কথা বলে।

মাইনী নদীর ধারের ধ্বংসাবশেষ কাদের?

দুই ব্রিটিশ লেখক দুইভাবে পড়েছেন। লুইন (1869) লেখেন দিঘি, ফলের গাছ ও ইটের দালানের অবশেষ দেখায় জমিটি একসময় “men of the plains”-এর চাষ ও বসতির ছিল, আর জনশ্রুতিতে এটি পার্বত্য ত্রিপুরার এক রাজার। হাচিনসন (1906) জায়গাটি দেখে লেখেন এটি ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী বলে পরিচিত, আর সেখানে ত্রিপুরাদের বড় বসতি ছিল। কোনো খনন হয়নি।

1872 সালের শুমারিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে কতজন বাঙালি ছিলেন?

হান্টারের হিসাবে “বাঙালি” নামে আলাদা সংখ্যা দেওয়া নেই। তাঁর (1876) বই অনুযায়ী মোট 63,054 জনের মধ্যে মুসলমান 381 ও হিন্দু 142; সঙ্গে 570 গুর্খা, 3 ইউরোপীয় ও 1 দেশি খ্রিস্টান। IWGIA (2000) পাদটীকায় বাঙালি জনসংখ্যা “about 524” লেখে। ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার (1908) সে বছরের মোট জনসংখ্যা লেখে 69,607 এবং শুমারিটিকে “very imperfect” বলে।

পাহাড়ে স্থায়ী বাঙালি বসতির প্রাচীনতম নথি কোনটি?

ব্রিটিশ বইগুলোতে সবচেয়ে নির্দিষ্ট নথি রাঙামাটির হালচাষি বসতির। হান্টার (1876) ডেপুটি কমিশনারের সূত্রে বলেন, চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁ বাঙালিদের এনে বসান এবং 1818 সালে নোয়াবাদ বন্দোবস্ত পান; জমি প্রায় 303 একর। লুইন (1869) বলেন প্রায় 120 পরিবারের বসতিটি স্থাপিত হয়েছে প্রায় ছয় বছর আগে।

ব্রিটিশ লেখকেরা পার্বত্য চট্টগ্রামের “aboriginal” বাসিন্দা বলেছিলেন কাদের?

লুইন (1869) বলেন টংথা, অর্থাৎ ত্রিপুরা ও লুসাই-কুকি গোষ্ঠী, হয়তো আদি বাসিন্দা। লুইনের উদ্ধৃত Hodgson (1853) খুমি, খ্যাং ও ম্রোকে আদি বাসিন্দা বলেন। হাচিনসনের 1906 ও 1909 সালের বই বলে অঞ্চলটি আদিতে কুকি গোষ্ঠীর দখলে ছিল, আর ম্রোরা সম্ভবত আদি বাসিন্দা। চাকমা ও মগদের তাঁরা আরাকানি উৎসের বলেন।

1900 সালের শাসনবিধিতে “indigenous” শব্দ কীভাবে ব্যবহার হয়েছে?

জনসংহতি সমিতির সংকলিত পাঠে বিধি 52 (1934 সালের সংশোধন) বলে, চাকমা, মগ, অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম, লুসাই পাহাড়, আরাকান পার্বত্য অঞ্চল বা ত্রিপুরার “hill tribe indigenous” সদস্য ছাড়া কেউ পারমিট ছাড়া জেলায় ঢুকতে বা থাকতে পারবেন না। কোর্ট-ফির একটি বিধি ও 1922 সালের আয়কর আইনের প্রয়োগেও “indigenous” শব্দ আছে।

953 বা 1240 সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম কারা শাসন করত?

বাংলাপিডিয়ার পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবন্ধ বলে, 953 সালে আরাকানের এক রাজা অঞ্চলটি দখল করেন, 1240 সালে ত্রিপুরার রাজা, 1575 থেকে 1666 পর্যন্ত আবার আরাকান, আর 1666 থেকে 1760 পর্যন্ত মোগলরা। প্রবন্ধে এই সালগুলোর উৎস দেওয়া নেই, আর সালগুলো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে; পাহাড়ের গ্রামে কারা থাকতেন, তা বলে না।

যা এখনো জানা যায়নি

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ভেতরে কোনো সংগঠিত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বা খননের প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। বাংলাপিডিয়ায় শুধু রাঙামাটির একটি বিচ্ছিন্ন প্রাপ্তির কথা আছে। বণিক বার্তার লেখায় একটি “সাম্প্রতিক গবেষণা” এবং পুরা-উদ্ভিদতাত্ত্বিক ও জিনগত প্রমাণের কথা আছে, কিন্তু গবেষণাগুলোর নাম, লেখক বা প্রকাশনা দেওয়া নেই, তাই সেগুলো মিলিয়ে দেখা যায়নি।

রাঙামাটির 1958 সালের হাতিয়ারটি কোথায়, জানা যায়নি। এর ধরন, কাঁচামাল ও প্রাপ্তিস্থানের বিবরণও কোনো প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি।

সীতাকুণ্ডের 1886 সালের হাতিয়ারটির মূল বিবরণ (রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা) এবং J Coggin Brown-এর 1917 সালের তালিকার সংশ্লিষ্ট পাতা পাওয়া যায়নি; এখানে বাংলাপিডিয়ার সারাংশের ওপর নির্ভর করা হয়েছে।

দীপু মনির “4,000 বছর” হিসাবটি কোন খনন-প্রতিবেদন বা তারিখ-নির্ণয় থেকে নেওয়া, তা প্রতিবেদন দুটিতে বলা নেই।

মাইনী নদীর ধ্বংসাবশেষের বয়স ও বর্তমান অবস্থা জানা যায়নি। 1906 সালের পর জায়গাটি নিয়ে কোনো জরিপ বা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

রাঙামাটির বাঙালি হালচাষি বসতির শুরু 1818 না প্রায় 1863, তা মেলানোর মতো নথি পাওয়া যায়নি। নোয়াবাদ বন্দোবস্তের মূল কাগজ প্রকাশিত আকারে পাওয়া যায়নি।

IWGIA-র 1901 সালের “116,000” ও “8,762” সংখ্যা দুটি কোন হিসাব থেকে এসেছে, তা বইয়ে ভেঙে দেখানো নেই; হাচিনসনের 1909 সালের জনগোষ্ঠী-ছকের যোগফল 114,456।

1930 না 1934: পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশের পারমিট-ব্যবস্থা 1930-এ উঠে গিয়েছিল (IWGIA) নাকি 1934-এর সংশোধনে বহাল ছিল (জনসংহতি সমিতির সংকলন), মূল গেজেট বিজ্ঞপ্তির পাঠ পাওয়া যায়নি, তাই দুটি বিবরণ মেলানো যায়নি।

বাংলাপিডিয়ার 953 ও 1240 সালের উৎস প্রবন্ধে নেই, আর অন্য কোনো প্রাথমিক উৎসে এই দুই তারিখ পাওয়া যায়নি।

ফ্রান্সিস বুকাননের 1798 সালের দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ভ্রমণের দিনলিপি, যা ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকের পাহাড়ের বসতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হতে পারত, এর পূর্ণপাঠ পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র

জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ

  1. T. H. Lewin, The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein, Bengal Printing Company, কলকাতা, 1869। জুমজার্নাল ই-বুক; Internet Archive
  2. W. W. Hunter, A Statistical Account of Bengal, Vol. VI, Trübner & Co., লন্ডন, 1876। জুমজার্নাল ই-বুক; Internet Archive
  3. R. H. Sneyd Hutchinson, An Account of the Chittagong Hill Tracts, কলকাতা, 1906। জুমজার্নাল ই-বুক; Internet Archive
  4. Rajkumari Chandra Kalindi Roy, Land Rights of the Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, IWGIA Document No. 99, কোপেনহেগেন, 2000। জুমজার্নাল ই-বুক; IWGIA
  5. আজাদ বুলবুল, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব”, তাক্রুপ্ সংকলন, 2013; জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক

অন্যান্য প্রাথমিক নথি

  1. R. H. Sneyd Hutchinson, Eastern Bengal and Assam District Gazetteers: Chittagong Hill Tracts, Pioneer Press, এলাহাবাদ, 1909। Internet Archive
  2. The Imperial Gazetteer of India, নতুন সংস্করণ, খণ্ড 10, Clarendon Press, অক্সফোর্ড, 1908 (“Chittagong Hill Tracts” ভুক্তি, পৃ. 318–320)। Internet Archive
  3. The Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900 ও Rules for the Administration of the Chittagong Hill Tracts, জনসংহতি সমিতি সংকলিত পাঠ। PCJSS

প্রত্নতত্ত্ব

  1. সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহছান, “Prehistory”, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। লিংক
  2. “Archaeology”, বাংলাপিডিয়া। লিংক
  3. “Wari-Bateshwar”, বাংলাপিডিয়া। লিংক
  4. “পার্বত্য চট্টগ্রাম”, বাংলাপিডিয়া। বাংলা; ইংরেজি

বিতর্কের লেখা ও প্রতিবেদন

  1. “Ethnic minority, not indigenous people”, The Daily Star, 26 জুলাই 2011। লিংক
  2. “‘Indigenous people’ a misnomer: Moni”, bdnews24.com, 26 জুলাই 2011। লিংক
  3. মিজানুর রহমান, “আদি ইতিহাসের আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বিতর্ক”, বণিক বার্তা, 27 সেপ্টেম্বর 2024। লিংক
  4. এ এইচ এম ফারুক, “ভারত-মিয়ানমারে নেই, বাংলাদেশে আদিবাসী এলো কোথা থেকে?”, পার্বত্য সময়, 7 মে 2026। লিংক
  5. “Govt-Sponsored Migration & Islamization in CHT”, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (তারিখ নেই)। লিংক

ছবি

  1. Chittagong in 1776, উইকিমিডিয়া কমন্স, পাবলিক ডোমেইন। লিংক
  2. A Statistical Account of Bengal Vol 6, উইকিমিডিয়া কমন্স, পাবলিক ডোমেইন। লিংক
  3. The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein (1869), উইকিমিডিয়া কমন্স, পাবলিক ডোমেইন। লিংক

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের সব লেখা এক জায়গায়: পার্বত্য চট্টগ্রাম।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 21 অক্টোবর 2026

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
[DISPLAY_ULTIMATE_SOCIAL_ICONS]

আরও কিছু লেখা