১৮৬০ সালে যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা জেলা হলো, তখন সেখানে চাকমা চিফ ছিলেন, বোমাং চিফ ছিলেন — কিন্তু মং চিফ বলে কেউ ছিলেন না।
জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত একটি লেখার বাক্য: “পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টির প্রাক্কালে মং চীফ বলে কেউই ছিলেন না।” উত্তরাঞ্চলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ক্যজা সাইন নামের একজন মারমা জমিদার; জুম খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ১৮৬২-৬৩ সালে তাঁকে মং রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
এই একটি তথ্যেই চাকমা সার্কেল ও তার প্রতিবেশী দুই সার্কেল বোঝার চাবি আছে: আজকের প্রথাগত প্রশাসন প্রথা আর ঔপনিবেশিক প্রয়োজনের একটি মিশ্রণ। কিছু পদ শত শত বছরের পুরনো, কিছু পদ ব্রিটিশ কাগজে তৈরি — আর দুটো আজ এক কাঠামোয় বাঁধা।
১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল চট্টগ্রাম জেলারই একটি অংশ, আর চাকমা রাজারা শাসন চালাতেন রাঙ্গুনিয়া থেকে। ১৮৬৮ সালে জেলা সদর দপ্তর রাঙামাটিতে সরে আসার পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের চাপে রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় তাঁর সদর দপ্তরও রাঙ্গুনিয়া থেকে রাঙামাটিতে সরিয়ে আনেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর রাজত্বকাল ১৮৭৪–১৮৮৫।
এরপর দুটি ধাপে কাঠামোটা দাঁড়ায়:
| সাল | যা হলো |
|---|---|
| ১৮৮৪ | Rules for Territorial Circles in the Chittagong Hill Tracts — জেলাকে ৫টি সার্কেলে ভাগ: রাজা হরিশ্চন্দ্রের সার্কেল, মং রাজার সার্কেল, বোমাং সার্কেল, সদর সাব-ডিভিশনাল খাসমহাল ও সাধু সাব-ডিভিশনাল খাসমহাল। তিন রাজার সীমানা নির্ধারিত হয়। |
| ১৮৯২ | সংশোধিত — তিন সার্কেল বহাল রেখে সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল যোগ করে মোট ৪টি সার্কেল। Rules for the Administration of the CHT নামে ১৭টি বিধি। |
| ১৯০০ | পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন (Regulation No. I of 1900); এর ১৮ নম্বর ধারার ক্ষমতাবলে ১৮৯২-এর বিধি সংশোধন করে যে বিধিমালা হয়, তা স্থানীয়ভাবে ‘Hill Tracts Manual’ নামে পরিচিত। |
১৮৯২-এর বিধিগুলোই আজকের ভূ-প্রশাসনিক একক তৈরি করেছে:
একটি ছোট অসঙ্গতি: বাংলা উইকিপিডিয়ার চাকমা সার্কেল পাতায় বলা হয়েছে ১৮৮৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম “তিনটি সার্কেলে বিভক্ত” হয়। আর্কাইভের বিবরণে ঐ বিধিতে পাঁচটি একক ছিল, যার তিনটি রাজাদের। দুটো বক্তব্য পুরোপুরি বিরোধী নয় — কিন্তু “তিনটি সার্কেল” কথাটি অসম্পূর্ণ। [যাচাই প্রয়োজন]

প্রথাগত বিচারব্যবস্থা তিন স্তরের, এবং প্রতিটি স্তরের উপরে আপিলের ঘর আছে। আর্কাইভের “ম্রো জনগোষ্ঠী: প্রচলিত রীতিনীতি ও প্রথা” লেখাটিতে ক্রমটি স্পষ্ট:
| স্তর | এলাকা | আপিল যায় কোথায় |
|---|---|---|
| কার্বারি | গ্রাম | হেডম্যানের আদালতে |
| হেডম্যান | মৌজা | সার্কেল চিফের আদালতে |
| সার্কেল চিফ / রাজা | সার্কেল | জেলার ডেপুটি কমিশনারের আদালতে |
হেডম্যান একা বিচার করেন না — প্রয়োজনে তিনি মৌজার গ্রামপ্রধান কার্বারিদের এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমাজপতিদের (যেমন লুসাই, পাংখোয়া ও বমদের “লাল”) সহযোগিতা নেন। যেসব গ্রামে কার্বারি নেই, সেখানে ঐ জনগোষ্ঠীর সমাজপতিরাই বিচার করেন।
সার্কেলভেদে কে কার অধীনে, সেটিও নির্দিষ্ট: চাকমা সার্কেলে চাকমা চিফ, বোমাং সার্কেলে বোমাং চিফ, আর মং সার্কেলে চাকমা ব্যতীত আদিবাসীদের প্রধান বিচারক মং চিফ।
এই অংশটি আর্কাইভের লেখাটির সবচেয়ে মূল্যবান দিক, কারণ এখানে প্রতিটি দাবির সঙ্গে উৎস দেওয়া আছে।
ফ্রান্সিস বুকানন, ১৭৯৮। তিনি ২১ মার্চ চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা করে ৭ এপ্রিল নাগাদ রামু পৌঁছান, এবং পথে মারমা, লেঙ্গা/কুঙ্গি, সাক, ম্রুং/টিপেরা ও বনযুগীসহ নানা জনগোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। সবশেষে সুয়ালকে দেখা করেন কং হ্লা প্রু-র সঙ্গে, যিনি বর্তমান বোমাং রাজপরিবারের পূর্বপুরুষ।
বুকাননের বিবরণ থেকেই রুয়া-সা (Rua-sa) পদবির নাম প্রথম জানা যায় — মারমাদের স্থানীয় চিফ। তাঁর লেখায় এর বর্মি নাম য়্যু-সা, আরাকানি নাম য়্যন্স, আর বাংলায় বিকৃত রূপ রোয়াজা।
ড. সুনীতিভূষণ কানুনগো তাঁর A History of Chittagong গ্রন্থে দেখিয়েছেন এ অঞ্চলে প্রচলিত আরাকানি প্রশাসনের কয়েকটি পদবির কথা — এবং তাঁর মতে “রোয়াজা” পদবিটি আরাকানি, আর “কার্বারী” একটি ফারসি শব্দ।
এটি লক্ষ করার মতো: পাহাড়ের সবচেয়ে তৃণমূল পদটির নাম ফারসি, আর তার উপরের পদটির নাম আরাকানি। প্রশাসনিক শব্দভাণ্ডারেই এ অঞ্চলের বহুমুখী ইতিহাস ধরা আছে।
ক্যাপ্টেন জে এম গ্রাহাম, ১৮ নভেম্বর ১৮৬২-র এক পত্রে — পার্বত্য চট্টগ্রামে রোয়াজা বা গ্রামপ্রধানের অস্তিত্বের প্রথম নথিভুক্ত উল্লেখ।
ক্যাপ্টেন টি এইচ লুইন, ১৮ অক্টোবর ১৮৬৭-র প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন, অতীতে রাজা বা চিফরাই গ্রামপ্রধান নিয়োগ করতেন। তাঁর ভাষায়: “Formerly the head of a village… was appointed by the Chief being generally the most able man of the village was set forward by his village fellows to be their mouthpiece and through whom they paid their tribute.”
আর্কাইভের লেখাটির একটি বিশ্লেষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ: লুইন তাঁর প্রস্তাবে চিফ বা হেডম্যানদের উপর নতুন কোনো ক্ষমতা দেননি — তিনি “আদিবাসী প্রধান ও গ্রাম হেডম্যানদের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা” করে তাদের ভূমিকাকে আইনি বৈধতা দিতে চেয়েছিলেন।
সার্কেল চিফের পদ উত্তরাধিকারযোগ্য, কিন্তু নিয়ম তিন সার্কেলে এক নয়।
চাকমা ও মং সার্কেল: রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র; একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রথম স্ত্রীর জ্যেষ্ঠ পুত্র (সামাজিক ও বৈধ বিবাহে জন্ম)। ঔরসজাত পুত্র না থাকলে জ্যেষ্ঠ কন্যার পুত্র রাজা হন।
মং সার্কেলের ব্যতিক্রম: সেখানে দত্তক পুত্র-কন্যার বেলায় রাজপদ উত্তরাধিকারযোগ্য নয়। ঔরসজাত সন্তান না থাকলে প্রথমে রাজার স্ত্রী (রানি), তারপর পিতৃ-মাতৃকুলের রক্তসম্পর্কীয় কোনো যোগ্য ব্যক্তি প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পদে বসেন।
বোমাং সার্কেল সম্পূর্ণ আলাদা: সেখানে জ্যেষ্ঠ পুত্র নয় — বোমাং রাজপরিবারের পিতৃ/মাতৃকুলে যিনি সর্ববয়োজ্যেষ্ঠ, তিনিই বোমাং সার্কেল চিফ হন। তিনি অসম্মতি না জানালে সরকার তাঁকে নিয়োগ দেন।
এই পার্থক্যটি ছোট নয়। চাকমা ও মং সার্কেলে ক্ষমতা যায় উল্লম্বভাবে — পিতা থেকে পুত্রে। বোমাং সার্কেলে যায় আনুভূমিকভাবে — বংশের প্রবীণতম ব্যক্তির কাছে। ফলে বোমাং রাজারা সাধারণত বেশি বয়সে পদে বসেন এবং শাসনকাল সংক্ষিপ্ত হয়।
১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির ৪৮ নম্বর বিধিতে সার্কেল চিফদের পদে অভিষিক্ত করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে।
পদ্ধতিটি নির্দিষ্ট: রাজার মৃত্যু বা অন্য কারণে পদ শূন্য হলে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার সরকারের পক্ষে নতুন রাজাকে তরবারি উপহার দিয়ে পদে অভিষিক্ত করান।
আর্কাইভের লেখার আরেকটি বাক্য এই ব্যবস্থার চরিত্র বুঝিয়ে দেয়: অভিষেকের পর “রাজার জীবনাবসান ব্যতীত অন্য কোনোভাবে রাজাকে অপসারণের কোনো আইনগত বিধান” নেই।
তরবারির প্রতীকটি এখানে দুইবার আসে — একবার সরকার থেকে রাজার হাতে, আরেকবার রাজপুণ্যাহে হেডম্যানদের হাত থেকে রাজার হাতে। একই বস্তু দুই দিকে আনুগত্যের চিহ্ন।
বাংলা উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় রাজপুণ্যাহ তিন দিনব্যাপী একটি উৎসব, যা “মূলত বাৎসরিক খাজনা আদায়ের জন্য একটি অনুষ্ঠান” এবং ব্রিটিশ শাসনামলে প্রথম প্রবর্তিত।
অনুষ্ঠানের কেন্দ্রীয় দৃশ্যটি হলো — “হেডম্যানেরা তলোয়ার প্রদানের মাধ্যমে রাজার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন ও খাজনা দেবেন।” চাকমা সার্কেলে এটি হয় রাঙামাটিতে, চাকমা রাজার বাসস্থানে।
অর্থাৎ রাজপুণ্যাহ একই সঙ্গে তিনটি জিনিস: রাজস্ব আদায়ের প্রশাসনিক দিন, আনুগত্যের আনুষ্ঠানিক পুনর্নবীকরণ, এবং একটি জনসমাগম।
খাজনার ভাগাভাগির একটি নির্দিষ্ট অনুপাত প্রচলিত আছে বলে জানা যায় — রাজা, হেডম্যান ও সরকারি কোষাগারের মধ্যে ভাগ। তবে সেই শতাংশের সংখ্যাগুলো কোনো পড়া-যায় এমন পাতায় নিশ্চিত করা যায়নি, তাই এখানে দেওয়া হলো না। [যাচাই প্রয়োজন]
বাংলা উইকিপিডিয়ার চাকমা সার্কেল পাতা অনুযায়ী বর্তমান চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় (জন্ম ১০ এপ্রিল ১৯৫৯), যিনি দায়িত্বে আছেন ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭ থেকে। সার্কেলটি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা জুড়ে বিস্তৃত, সদর দপ্তর রাঙামাটিতে।
প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি ভিত্তি আজও বহাল। আর্কাইভের ম্রো-বিষয়ক লেখাটি যে আইনগুলো তালিকাভুক্ত করেছে, সেগুলো প্রথাগত ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেয় — ১৯০০ সালের শাসনবিধির ৪০ নম্বর বিধি, ২০০৩ সালের ৩৮ নম্বর আইনের ৪(৪) ধারা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৬ ধারা, এবং আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২২(ঙ) ধারা।
তবে একটি প্রশ্ন থেকে যায় যার উত্তর এই লেখার উৎসগুলোতে নেই: জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের মতো নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান আসার পর প্রথাগত সার্কেল-ব্যবস্থার প্রকৃত ক্ষমতা কতটা, এবং দুটি কাঠামোর সম্পর্ক কেমন। বিষয়টি ভূমি-প্রশাসনের সঙ্গেও জড়িত, যা নিয়ে আলাদা লেখা আসছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়টি সার্কেল?
তিনটি — চাকমা, মং ও বোমাং। ১৮৮৪ সালের আঞ্চলিক সার্কেল বিধিতে খাসমহালসহ মোট পাঁচটি একক ছিল; ১৮৯২-তে তিন রাজার সার্কেল বহাল রেখে সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল যোগ করে চারটি করা হয়।
কার্বারি আর হেডম্যানের পার্থক্য কী?
কার্বারি গ্রামপ্রধান, হেডম্যান মৌজার প্রধান। কার্বারির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল যায় হেডম্যানের কাছে, হেডম্যানের রায়ের বিরুদ্ধে সার্কেল চিফের কাছে, আর তার পরের ধাপ জেলার ডেপুটি কমিশনারের আদালত।
মং সার্কেল কীভাবে তৈরি হলো?
১৮৬০ সালে জেলা সৃষ্টির সময় মং চিফ বলে কেউ ছিলেন না। উত্তরাঞ্চলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ক্যজা সাইন নামের একজন মারমা জমিদার; খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ১৮৬২-৬৩ সালে তাঁকে মং রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বোমাং রাজা কীভাবে নির্বাচিত হন?
জ্যেষ্ঠ পুত্র নন — বোমাং রাজপরিবারের পিতৃ বা মাতৃকুলে যিনি সর্ববয়োজ্যেষ্ঠ, তিনিই চিফ হন। এটি চাকমা ও মং সার্কেলের পুত্র-উত্তরাধিকার নিয়ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
রাজপুণ্যাহ কী?
বাৎসরিক খাজনা আদায়ের অনুষ্ঠান, যা ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত এবং তিন দিন ধরে চলে। হেডম্যানরা তলোয়ার দিয়ে রাজার প্রতি আনুগত্য জানিয়ে খাজনা জমা দেন।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026