চাকমা খাবারের কেন্দ্রে থাকে জুমের ভাত, সমুদ্রের মাছ থেকে তৈরি সিদোল আর পাহাড়ের টাটকা ভেষজ। রান্না হয় সেদ্ধ করে, বাঁশের চোঙে ভরে, কলাপাতায় মুড়ে আগুনে বা কম ঝোলে, তেল ও গরম মসলা প্রায় ছাড়াই। জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত চাকমা লেখকদের লেখা আর চাকমা রাঁধুনিদের প্রকাশিত রেসিপি মিলিয়ে এই লেখায় চাকমা রান্নার পদ্ধতি, পদ, উপকরণ ও রেসিপি একসঙ্গে রাখা হলো।
সিদোল ও নাপ্পি কোথায় তৈরি হয়, পাজনের নাম কোথা থেকে এল, পাহাড়ের অন্য জনগোষ্ঠীর রান্নার নাম কী, সেসব আছে আমাদের আগের লেখা পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে। এখানে কেবল চাকমা রান্না: এক বেলার পাতে কী থাকে, কোন পদ কীভাবে রাঁধা হয়, কোন ধান ও কোন শাক লাগে, আর আচার-অনুষ্ঠানে খাবারের জায়গা কোথায়।
সূচিপত্র
চাকমা খাবার চেনা যায় তিনটি জিনিসে: প্রধান খাদ্য ভাত, তরকারির প্রধান উপকরণ সিদোল, আর মসলার জায়গায় টাটকা পাতা ও ফুল। তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা বইয়ে লেখা আছে, “ভাত চাকমাদের প্রধান খাদ্য”, আর সমুদ্রের মাছ থেকে তৈরি সিদোল “চাকমাদের তরকারী রান্নার প্রধান উপকরণ”।
চাকমা রাঁধুনি Chiangmi Talukder Lena 2021 সালে দ্য ডেইলি স্টারে লিখেছেন, চাকমা রান্না পরিচিত মসলার স্বল্পতা আর মৌসুমি পাহাড়ি গাছের পাতা, ফুল ও ডাঁটার প্রচুর ব্যবহারের জন্য। তাঁর হিসাবে বেশির ভাগ রান্নার মূল উপকরণ সিদোল, শুঁটকি, রসুন, পেঁয়াজ, ছোট ঝাল মরিচ, সাবারাং, ধনেপাতা, ফুজি, হলুদ গুঁড়া, লবণ, আর কখনো কয়েক ফোঁটা তেল।
মাছ-মাংসের রান্না নিয়েও তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট: প্রথাগতভাবে গরম মসলা বা কারি পাউডার দেওয়া হয় না। কেউ কেউ মাংসে অল্প জিরা গুঁড়া দেন। সুযশ চাকমা জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত “চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ” লেখায় চুমো গোরাং ও পাদা কেবাঙ সম্পর্কে একই কথা লিখেছেন: এগুলো “প্রায় তেলহীন, গরম-মসলা ছাড়া প্রাকৃতিক মসলাযোগে” রান্না হয়।
রেস্তোরাঁর চোখেও বৈশিষ্ট্যটি একই। ঢাকার একটি চাকমা রেস্তোরাঁ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের 2022 সালের প্রতিবেদন বলছে, পাহাড়ের খাবারে তেল ও মসলা কম, যাতে প্রতিটি উপকরণের নিজের স্বাদ থাকে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার 2026 সালের একটি প্রতিবেদনেও আছে, এই রান্নায় “তেল ও মসলার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম”।
প্রথাগত চাকমা দুপুরের খাবারে থাকে জুমে ফলানো ভাত, ভাপানো বা সেদ্ধ সবজি, ভেষজ দিয়ে কম তেলে রাঁধা মাছ বা মাংস, আর সঙ্গে কাঁচা শাক ও ঝাল বাটা। Chiangmi Talukder Lena 2022 সালে দ্য ডেইলি স্টারে “চাকমা দুপুরের খাবারের থালা” নিয়ে লিখতে গিয়ে এই গড়নটিই দিয়েছেন।
তাঁর বর্ণনায় এক পাতে টক, মিষ্টি, তেতো আর ঝাল সব স্বাদ রাখা হয়, কখনো কাঁচা শাকসহ, যাতে নিয়মিত খাবার থেকেই সব রকম পুষ্টি আসে। এই খাবারকে প্রথাগতভাবে শরীরের “ওষুধ” বলা হয়, এমন কথাও তিনি লিখেছেন। পাহাড়ে সারা বছর একশোর বেশি রকম মৌসুমি সবজি ও ফল জন্মায়, আর মৌসুম বদলালে পাতের খাবারও বদলায়।
চাংমাটারা-র হিসাবেও ভাতের সঙ্গে তরকারিতে থাকে মাছ, মাংস ও সবজি, আর সমুদ্রের শুকনো মাছ বা শুঁটকি চাকমারা “বেশ পছন্দ” করেন। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখাটি আরেকটি ভাগ দেখিয়েছে: আমিষ রান্নায় মসলা দেওয়া হয়, আর নিরামিষে “শুঁটকি ও সিদোল (এক ধরনের জৈব মসল্লা) থাকে সবসময়”।
প্রিয় শাকের নামও ওই লেখায় আছে: ইয়ারেং বা বরনা শাক, ওজোন শাক, ম্যেয়ে শাক আর লুমফুল। এগুলোর বাংলা বা বৈজ্ঞানিক নাম কোনো উৎসে দেওয়া নেই।
চাকমা রান্নার সাতটি প্রথাগত পদ্ধতির নাম উজ্যা, সিক্যা, হলা, গুদেয়্যা, কেবাং, গোরাং ও কোরবো। জুমজার্নালের আর্কাইভের দুটি লেখা, তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা আর “চাকমা জাতি”, সাতটিরই ব্যাখ্যা দেয়। দুই লেখার বানান ও বর্ণনায় কিছু পার্থক্য আছে, তাই নিচে দুটোই পাশাপাশি রাখা হলো।
| পদ্ধতি | চাংমাটারা (তনয় দেওয়ান) | “চাকমা জাতি” (আর্কাইভ) |
|---|---|---|
| উজ্যা / উচ্যা | সেদ্ধ করে খাওয়া তরকারি; সাধারণত শাক জাতীয় সবজি | তরকারি সেদ্ধ করে খাওয়া; প্রধানত শাকসবজি |
| সিক্যা | আস্ত বা টুকরো মাছ হলুদ, নুন ও মরিচ মাখিয়ে বাঁশের কঞ্চিতে গেঁথে সরাসরি আগুনে পোড়ানো | লবণ, হলুদ ও মরিচ মিশিয়ে মূলত মাংসখণ্ড আগুনে সেঁকা |
| হলা | কম ঝোলের তরকারি; মাছ বেশি রাঁধা হয় এভাবে | কম ঝোলে মাছ-মাংস রান্না |
| গুদুয়্যে / গুদেয়্যা | হাঁড়িতে বেশি মরিচ দিয়ে সবজি রাঁধার এক পর্যায়ে চূর্ণ করা তরকারি | ধাতব পাত্রে বা বাঁশের চোঙায় বেশি মরিচ দিয়ে মিশিয়ে বা চূর্ণ করে তৈরি তরকারি |
| কেবাঙ / কেবাং | কলাপাতা বা অন্য পাতা দিয়ে সরাসরি আগুনে রান্না | কলাপাতা বা অন্য পাতায় মুড়িয়ে আগুনে রান্না; পাতার জন্য বিশেষ সুগন্ধ |
| গোরাঙ / গরাঙ | বাঁশের চোঙার ভেতরে রান্না; সাধারণত মিটিঙা বাঁশে মাছ-মাংস | মসলাসহ মিতিঙ্গা বা পারবো বাঁশে রান্না |
| করবো / কোরবো | মরিচ আর তাজা সবজি কুজোতে মিশিয়ে তৈরি তরকারি | প্রচুর মরিচ আর পেঁয়াজ বা শুঁটকি বা সিদোল মিশিয়ে শাকসবজি |
সিক্যার বেলায় পার্থক্যটি সবচেয়ে বড়: চাংমাটারা বলছে মাছ, “চাকমা জাতি” বলছে মূলত মাংস। দুটো লেখাতেই আগুনে সরাসরি সেঁকা আর হলুদ-লবণ-মরিচ মাখানোর কথা আছে। গুদেয়্যা চূর্ণ করার যন্ত্র হিসেবে চাংমাটারা “দাল গাজ” শব্দটি ব্যবহার করেছে; শব্দটির ব্যাখ্যা লেখায় নেই। আর করবো-র বর্ণনায় যে “কুজো” শব্দ আছে, তার অর্থও লেখাটিতে দেওয়া হয়নি।
“চাকমা জাতি” লেখাটির দাবি, এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে রান্না করা খাবার “দেশি-বিদেশি অতিথিদের ভূয়সী প্রশংসা” পেয়েছে। সুযশ চাকমা এর পেছনে জুমের ভূমিকাও দেখিয়েছেন: দূরের জুমক্ষেতে কাজের সময় অনেক হাঁড়িপাতিল বয়ে না নিয়ে সেখানেই বাঁশের চোঙ বা পাতায় রান্না সুবিধাজনক, এমন ধারণা অসংগত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। এটি তাঁর অনুমান হিসেবেই লেখা।
গোরাং হলো বাঁশের চোঙের ভেতরে রান্না, আর চাকমা ভাষায় চোঙকে বলে সুমো। Chiangmi Talukder Lena-র বর্ণনায় মাছ বা মাংস সব উপকরণের সঙ্গে মাখিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা রাখা হয়, তারপর বাঁশে ভরে মুখ কলাপাতায় আটকে কাঠের আগুন বা কয়লার আঁচে 1 থেকে 2 ঘণ্টা রাঁধা হয়।
রান্নার সময় চোঙটি মাঝে মাঝে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সব দিক থেকে সমান তাপ লাগে। Lena লিখেছেন, মাখিয়ে রাখার এই ধাপটিই মাংস নরম করে, আর এটিই সুমো রান্নার “গুরুত্বপূর্ণ দিক”। মাংস, মাছ, শুঁটকি আর বিন্নি চাল, সবই এভাবে রাঁধা হয়। বাঁশে রাঁধা মুরগিকে চাকমা ভাষায় বলা হয় সুমো-হুরো (উৎসে রোমান হরফে sumoh-huro)।
কোন বাঁশ লাগে, সে কথা আর্কাইভে আছে। চাংমাটারা বলছে “সাধারণত মিটিঙা বাঁশ দিয়ে মাছ, মাংস গোরাঙ করা হয়”, আর “চাকমা জাতি” লেখায় মিতিঙ্গা বা পারবো বাঁশের নাম আছে। খাওয়ার উপযোগী বাঁশ কোড়লের যে তালিকা দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও বাংলা উইকিপিডিয়ায় আছে, তাতেও মিতিঙ্গ্যা বাঁশের নাম আছে।
নামের বানান উৎসভেদে আলাদা: আর্কাইভে “চুমো গোরাং”, আজকের পত্রিকায় “সুমো গরাং”, Lena-র ইংরেজি লেখায় sumoh gorang। আজকের পত্রিকার 2023 সালের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “বাঁশের চোঙের ভেতরে যে খাবার রান্না করা হয় তাকে চাকমা ভাষায় বলে ‘সুমো গরাং’।” খাগড়াছড়ির বাসিন্দা প্রয়া চাকমা সেখানে বলেছেন, ‘সাধারণত মাছ ও মাংস এই দুই ধরনের সুমো গরাং হয়।’

কলাপাতায় মুড়ে আগুনে রান্নাকে আর্কাইভের লেখাগুলো বলে কেবাং বা কেবাঙ, আর সংবাদমাধ্যমে প্রায় একই বর্ণনায় নাম আসে হেবাং। Chiangmi Talukder Lena-র বর্ণনায় হেবাং হলো মাখানো মাংস, মাছ, শুঁটকি, ডিম বা সবজি কলাপাতায় মুড়ে মাটির চুলার ভেতরে বা কয়লার আঁচে সেঁকে রান্না।
তাঁর লেখায় প্রস্তুতির ধাপও আছে। কলাপাতা দুই পাশে গরম করে নরম করা হয়, কয়েকটি পাতা একটার ওপর আরেকটা রেখে পুরু স্তর বানানো হয়, যাতে সরাসরি আগুন খাবারে না লাগে। মাঝখানে মাখানো খাবার রেখে পাতা ভাঁজ করে ছোট পুঁটলি বানানো হয়, আর কলাপাতা থেকেই বের করা আঁশ দিয়ে বাঁধা হয়। পাতা খাওয়া হয় না; এটি কেবল হালকা পাতার গন্ধ দেয়।
আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখার কেবাং-বর্ণনাও একই রকম: কলাপাতা বা অন্য পাতায় মুড়িয়ে আগুনে রান্না, পাতার জন্য “এক বিশেষ সুগন্ধি ও স্বাদ সৃষ্টি হয়”। সুযশ চাকমা একে বলেছেন “পাদা কেবাঙ”। কেবাং আর হেবাং একই শব্দের দুই বানান কি না, কোনো উৎস স্পষ্ট করে বলেনি।
হেবাংয়ের সংজ্ঞা নিয়েও সংবাদমাধ্যমে মতভেদ আছে। দ্য ডেইলি স্টারের 2022 সালের প্রতিবেদনে হেবাং ভাপে রান্নার পদ্ধতি, যা বাঁশে, কলাপাতায় বা প্যানে হতে পারে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2026 সালে লিখেছে, “চাকমা ভাষায় ‘হেবাং’ বলতে মূলত ভাপে রান্না করার পদ্ধতিকে বোঝানো হয়”। প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদন বলছে, হেবাং রান্নার একটি পদ্ধতি, যা বাঁশের চোঙে বা কলাপাতায় হয়। অন্যদিকে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের 2020 সালের একটি রেস্তোরাঁ-প্রতিবেদন হেবাংকে একটি পাতা বা ভেষজ হিসেবে উল্লেখ করেছে, যা লেমনগ্রাসের ডাঁটার সঙ্গে খাবারে লেবুর মতো সতেজ স্বাদ দেয়।
আর্কাইভের সাতটি নামের বাইরে Chiangmi Talukder Lena আরও কয়েকটি চাকমা রান্নার কৌশলের নাম দিয়েছেন: টাবা (taaba), মালা (maalah), বাটা (battye) ও হুরবো (hurbo)। নামগুলো তাঁর লেখায় রোমান হরফে আছে; বাংলা হরফে এগুলোর কোনো প্রকাশিত বানান পাওয়া যায়নি। তাই এখানে বাংলা রূপগুলো রোমান বানান থেকে প্রতিবর্ণীকৃত, মূল রোমান রূপ বন্ধনীতে রাখা হলো; চাকমা উচ্চারণের সঙ্গে বানান হুবহু না-ও মিলতে পারে।
টাবা হলো পরিষ্কার ঝোলে সবুজ সবজি সেদ্ধ করে খাওয়ার পদ্ধতি। আগে শুঁটকির টুকরো বা শুকনো চিংড়ি পানি ও লবণ দিয়ে 5 থেকে 10 মিনিট ফোটানো হয়। তারপর বেশি আঁচে সবজি দিয়ে কয়েক মিনিট রাঁধা হয়, আর বাটিতে ঢেলে ঢাকনা ছাড়া রাখা হয় যাতে সব ভাপ বেরিয়ে যায়। Lena-র মন্তব্য, শাকের রং না হারিয়ে রাঁধতে “বিশেষ দক্ষতা” লাগে।
মালা হলো পুর ভরা পদ, যেখানে ভাজা সিদোল অন্য উপকরণের সঙ্গে মিশিয়ে পুর বানানো হয়। খোসা ছাড়ানো কচি বাঁশ কোড়ল দিয়ে বানালে নাম হয় বাচ্ছুরি-মালা (bachchuri-maalah)। কাঁকরোল, বুনো চিচিঙ্গা, করলা আর বুনো বেগুন দিয়েও এভাবে মালা হয়। সবজি আগে সেদ্ধ করে নেওয়া হয়, পরে হালকা ভেজে বাদামি করা হয়।
একই নামের একটি পদ মারমা রান্নাতেও আছে: প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদন বলছে, বাঁশ কোড়লের একটি পদ “মারমা ভাষায় এই খাবার পরিচিত ‘ভাচ্চুরিমালাহ’ নামে”, যা সেদ্ধ কোড়ল চিংড়ি-শুঁটকির পেস্ট ও মরিচ দিয়ে ভেজে তৈরি হয়।
Lena-র লেখা অনুযায়ী প্রায় সব শাক ও ভেষজ কাঁচা খাওয়া হয়, কোনোটা কয়েক মিনিট সেদ্ধ করে। সঙ্গে থাকে ঝাল বাটা: কয়লায় সেঁকা মরিচ ও সিদোলের সস, সিদোল-মরিচ বাটা, আর রসুন-মরিচ বাটা (ron-morich battye)। এই সস মিশিয়ে শাক সালাদ হিসেবেও খাওয়া হয়।
শুঁটকিপ্রেমীদের জন্য আছে কয়লায় সেঁকা বা পোড়ানো শুঁটকির বাটা (suguni-morich battye) আর শুঁটকির সালাদ সুগুনি হুরবো (suguni hurbo), যা শাকের সঙ্গে পার্শ্বপদ হিসেবে খাওয়া হয়। দ্য ডেইলি স্টারের 2022 সালের রেস্তোরাঁ-প্রতিবেদনেও “চিকেন হরবো” নামে একটি পদের উল্লেখ আছে। হুরবো বা হরবো আর আর্কাইভের করবো বা কোরবো একই শব্দ কি না, কোনো উৎস বলেনি।
চাকমা ভাষায় বাঁশ কোড়লকে বলে বাচ্ছুরি। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার 2025 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাঁশের গোড়ার কচি নরম অংশটিই কোড়ল, আর মাটি থেকে 4 থেকে 5 ইঞ্চি গজালে এটি খাওয়ার উপযোগী হয়। চাকমারা সাধারণত এটি ভাতের সঙ্গে তরকারি হিসেবে খান, আর শুকনো চিংড়ি ও সিদোল দিয়ে রাঁধতে পছন্দ করেন।
শেষ তথ্যটি এসেছে Tribeni Chakma-র 2016 সালের লেখা থেকে, দ্য ডেইলি স্টারে “Chakma Cooking 101” শিরোনামে। তিনি রান্নার আগের ধাপটিও লিখেছেন: কচি কোড়ল সংগ্রহ করে বা বাজার থেকে কিনে খোসা ছাড়িয়ে ছোট টুকরো করা হয়, তারপর পানিতে সেদ্ধ করে টাটকা পানিতে ধুয়ে নেওয়া হয়, যাতে বিষাক্ত উপাদান দূর হয়। সেদ্ধ কোড়ল পরে সবজি, মাংস বা ঝোলের নানা পদে দেওয়া যায়।
সব বাঁশের কোড়ল খাওয়া যায় না। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও বাংলা উইকিপিডিয়া দুটোই খাওয়ার উপযোগী কোড়ল হিসেবে মুলি, ডলু, মিতিঙ্গ্যা, ফারুয়া, বাজ্জে ও কালিছুরি বাঁশের নাম দিয়েছে, আর জাতভেদে স্বাদও আলাদা বলে উল্লেখ করেছে।
মৌসুম নিয়ে তিন উৎসের হিসাব তিন রকম। Tribeni Chakma লিখেছেন, বৈশাখে (মধ্য এপ্রিল) কোড়ল বাজারে আসে আর 5 থেকে 6 মাস থাকে, ভরা মৌসুম বর্ষায়। Chiangmi Talukder Lena বলছেন মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা বলছে মে থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ভরা মৌসুম।
নামের রূপ জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে চাকমা ভাষায় বাচ্ছুরি, মারমা ভাষায় মেহ্যাং, ত্রিপুরা ভাষায় মেওয়া। বাংলা উইকিপিডিয়া চাকমা ও ত্রিপুরা নামে একমত, কিন্তু মারমা নাম দিয়েছে “মহ্ই”। ইংরেজি উইকিপিডিয়া চাকমা নামটি লিখেছে Bhaz-chuu-ryì।
বাজারের ছবিও আছে ওই প্রতিবেদনে: রাঙামাটির বনরূপা বাজারে কোড়ল বিক্রি হচ্ছিল কেজি 80 থেকে 100 টাকায়। ননাবী চাকমা নামে একজন বিক্রেতা জানিয়েছেন, তিনি নিজের বাঁশঝাড় থেকে কোড়ল তুলে এক দফায় 300 থেকে 500 টাকা পান। রাঙামাটির একটি রেস্তোরাঁর মালিক সুচনী চাকমার কথায়, পর্যটকেরা ভাত খেতে এসে বাঁশ কোড়ল চান।
সিদোল হলো সমুদ্রের ছোট মাছ ও চিংড়ি থেকে তৈরি একধরনের মণ্ড, আর চাকমা রান্নায় এটি তরকারির প্রধান স্বাদ-উপকরণ। Chiangmi Talukder Lena একে বলেছেন গাঁজানো চিংড়ি ও নানা মাছের পেস্ট; ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের 2026 সালের প্রতিবেদন লিখেছে, এর স্বাদ কড়া, নোনতা ও গভীর, তাই অল্প পরিমাণেই দেওয়া হয়।
শুঁটকিকে Lena লিখেছেন suguni, আর জানিয়েছেন চাকমা ভাষায় এর আরেক নাম eje guri। তাঁর ভাষায়, চাকমা খাবারের কথা উঠলে মানুষ সম্ভবত সবার আগে এই দুটি উপকরণের কথাই ভাবে। সিদোল কোথায় তৈরি হয়, নাপ্পির সঙ্গে এর সম্পর্ক কী আর উপকূল থেকে পাহাড়ে এটি কীভাবে আসে, তা নিয়ে বিস্তারিত আছে সিদোল ও নাপ্পি নিয়ে আমাদের আলাদা লেখায়।
শুঁটকির গুরুত্বের পুরনো একটি প্রমাণও আর্কাইভে আছে। “চাকমা জাতির অতীত কথা ও স্মৃতি” লেখায় বলা হয়েছে, 1781 সালে ইংরেজরা পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সময় এখানকার অধিবাসীরা চট্টগ্রাম থেকে লবণ, মাছ, শুঁটকি, লোহার জিনিস ও মাটির পাত্র আমদানি করতেন।
চাকমা রান্নার সবচেয়ে পরিচিত দুটি ভেষজ ফুজি আর সাবারাং, দুটোই জুমে ফলে। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখা অনুযায়ী ফুজি একপ্রকার পাতা-মসলা, দেখতে ধনেপাতার মতো, আর সাবারাং দেখতে তুলসী পাতার মতো, যা চাকমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত প্রিয়।
লেখাটি বলছে, সবজি ও আমিষ খাবারে ফুজি দিলে “বেশ উপাদেয়” হয়। Chiangmi Talukder Lena ফুজিকে ইংরেজিতে wild parsley বলেছেন, আর তাঁর পাঁচটি রেসিপির দুটিতে শেষ ধাপে ফুজি দেওয়া হয়।
সাবারাংয়ের পরিচয় নিয়ে দুই উৎসের মধ্যে একটি অমিল আছে। পুলক খীসা আর্কাইভের “চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে” লেখায় সাবরাংকে Lemon Basil বলেছেন, আর লিখেছেন এটি পাহাড়িদের ঘরে ঘরে চাষ হয়। Chiangmi Talukder Lena তাঁর উপকরণ-তালিকায় sabarang আর lemon basil আলাদা দুটি নাম হিসেবে লিখেছেন।
পুলক খীসা আরেকটি কৌতূহলজনক তথ্য দিয়েছেন: টেকনাফের দক্ষিণে সাগরপাড়ে “সাবরাং” নামে একটি ইউনিয়ন আছে, যা তাঁর মতে চাকমাদের এই মসলা-গাছের নামেই। নামকরণের এই ব্যাখ্যা লেখকের নিজস্ব; অন্য কোনো উৎসে তা পাওয়া যায়নি।
বনের শাক-সবজির সবচেয়ে বিস্তারিত তালিকা আছে চাংমাটারা-র বিজু-অংশে। ফুল বিজুর দিন মেয়েরা জঙ্গলে যান তারা (সবজি বিশেষ), গন্ধকী, কাটুরের আগা বা মূল, কদাজা কচুর দিগ, কেতকী, গোলাক বেতের আগা (বেদাগী) ও মরিচা বেতের আগা (তিতাবিজি) সংগ্রহ করতে। ক্ষেত-খামার থেকেও সবজি আনা হয়।
Lena-র লেখায় আরও কিছু মৌসুমি উপকরণের নাম আছে: বাঁশ কোড়ল, খাওয়ার উপযোগী আদা ফুল, হলুদ ফুল, বুনো মাশরুম, Thai dragon tongue এবং বাংলায় কানাই ডিঙ্গা নামে পরিচিত একটি উদ্ভিদ। এগুলো পাওয়া যায় কেবল মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর। ঢাকার চাকমা রেস্তোরাঁ নিয়ে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে সবজির পদ হিসেবে আছে আদা ফুল, বাঁশ কোড়ল, মুলা, মাশরুম আর ফরাসি শিম।
চাকমা রান্নার পরিমাণসহ পূর্ণ রেসিপি খুব কম জায়গায় ছাপা হয়েছে। সবচেয়ে বিস্তারিত সংকলনটি Chiangmi Talukder Lena-র, 29 নভেম্বর 2022 তারিখে দ্য ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে “Recipes for a classic Chakma lunch platter” শিরোনামে। নিচে সেই পাঁচটি পদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: পদটি কী, প্রধান উপকরণ, আর রান্নার ধরন। পরিমাণ ও ধাপে ধাপে প্রণালির জন্য মূল লেখাটি দেখুন।
পরিষ্কার ঝোলে রাঁধা বাঁশ কোড়লের পদ, টাবা পদ্ধতির একটি উদাহরণ। প্রধান উপকরণ: সেদ্ধ বাঁশ কোড়ল, শুকনো চিংড়ি, সিদোল, কাঁচা মরিচ, বরবটি ও পুঁইশাক (ঐচ্ছিক), ফুজি পাতা, লবণ।
চিংড়ি আর সিদোল পানিতে ফুটিয়ে ঝোল তৈরি হয়, তাতে সেদ্ধ কোড়ল আর সবজি অল্প সময় রেঁধে ফুজি দিয়ে নামিয়ে নেওয়া হয়। তেল লাগে নামমাত্র, আর সেটিও ঐচ্ছিক।
সিদোল-মেশানো পানিতে সেদ্ধ শাক বা সবজি, সঙ্গে আগুনে সেঁকা মরিচ ও শুঁটকির বাটা। প্রধান উপকরণ: যেকোনো শাক বা সবজি (বাঁধাকপি, ছোট বেগুন, বরবটি, ঢেঁড়স ইত্যাদি), সিদোল বা মাছ-চিংড়ির পেস্ট, কাঁচা মরিচ, শুকনো চিংড়ি বা লইট্টা শুঁটকি, লবণ।
শাক অল্পক্ষণ ফুটিয়ে পুরো সেদ্ধ হওয়ার আগেই তুলে নেওয়া হয়; মরিচ আর শুঁটকি আগুনে সেঁকে হামানদিস্তায় মোটা করে বেটে পাশে দেওয়া হয়। আর্কাইভের উজ্যা বা উচ্যা, অর্থাৎ সেদ্ধ শাকসবজির পদ্ধতির সঙ্গে এর মিল আছে; “উজুনো” আর “উজ্যা” নামের সম্পর্ক উৎসে ব্যাখ্যা করা নেই।
মাছ বা মুরগির সঙ্গে রাঁধা আদা ফুলের পদ, শেষে থেঁতো করে খাওয়া হয়। প্রধান উপকরণ: ডাঁটাসহ আদা ফুল, বড় মাছ বা মুরগি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও জিরা (মুরগি হলে), ছোট ঝাল মরিচ, হলুদ, তেল, লবণ।
সব উপকরণ একসঙ্গে মেখে কিছুক্ষণ রেখে অল্প পানিতে রাঁধা হয়, যতক্ষণ না পানি শুকিয়ে তেল ওঠে; তারপর কাঠের মুষলে সব থেঁতো করা হয়। এই শেষ ধাপটি আর্কাইভের গুদেয়্যা পদ্ধতির বর্ণনার সঙ্গে মেলে: বেশি মরিচে রেঁধে চূর্ণ করা তরকারি।
বুনো আলু বা কচু দিয়ে রাঁধা মুরগির ঝোল। প্রধান উপকরণ: মুরগি, বুনো আলু বা কচু, পেঁয়াজ, আদা-রসুন বাটা, জিরা, হলুদ, মরিচ বাটা, তেল, ফুজি পাতা, লবণ।
পেঁয়াজ ও মসলা কষিয়ে মুরগি ভেজে নেওয়া হয়, পরে আলু বা কচু দিয়ে পানিতে সেদ্ধ করা হয়; নামানোর আগে ফুজি পাতার আঁটি দিয়ে অল্পক্ষণ ঢেকে রাখা হয়। পাঁচটির মধ্যে এটি তেল ও মসলায় সবচেয়ে ভারী পদ।
বাটা কাঁচা হলুদ আর লইট্টা শুঁটকির ঘন ঝোল। প্রধান উপকরণ: কাঁচা হলুদ, শুকনো লইট্টা, পেঁয়াজ, আদা-রসুন বাটা, কাঁচা মরিচ বাটা, তেল, লবণ।
পেঁয়াজ ও বাটা মসলায় শুঁটকি হালকা ভেজে হলুদ বাটা কষানো হয়, তারপর পানি দিয়ে ঝোল ঘন হওয়া পর্যন্ত রাঁধা হয়।
পাঁচটি পদের উৎস একই: Chiangmi Talukder Lena, “Recipes for a classic Chakma lunch platter”, দ্য ডেইলি স্টার, 29 নভেম্বর 2022। পুরো রেসিপি, উপকরণের পরিমাণ ও ধাপে ধাপে প্রণালি দেখুন সেখানে।
এই পাঁচটি পদ পাশাপাশি রাখলে একটি জিনিস চোখে পড়ে: টাবা ও উজুনো প্রায় তেলহীন, কিন্তু মুরগি ও কাঁচা হলুদের পদে তেল ও বাটা মসলা উল্লেখযোগ্য। চাকমা রান্না মানেই তেলহীন, এমন সরল সিদ্ধান্ত তাই এই রেসিপিগুলো সমর্থন করে না; একই রাঁধুনি অন্য লেখায় “কয়েক ফোঁটা তেল”-এর কথা বলেছেন সাধারণ রান্না প্রসঙ্গে।
চাকমা রান্নার উপকরণের বড় অংশ আসে জুম থেকে: নানা জাতের ধান, বিন্নি চাল, কচু, আলু, মরিচ, হলুদ, আদা, ফুজি ও সাবারাং। তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা ও সুযশ চাকমার লেখা দুটোতেই জুমে চাষ করা ধানের জাত ও অন্য ফসলের তালিকা আছে; দুই তালিকা পুরোপুরি এক নয়।
| বিষয় | চাংমাটারা (তনয় দেওয়ান) | “চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ” (সুযশ চাকমা) |
|---|---|---|
| ধানের জাত | 18টি: মেলে, গুরি, কুকী মেলে, বিনি, কামারাও, কবা বিনি, তোর্গি, লোবা বিনি, কবরক, হরিণ বিনি, বাধেইয়া, পাধাতটারা, লেঙদাচিগোন, আমে, গেলঙ, কালা কবরক, পাত্তেগী, লঙলঙ | মেলেধান, কুকী মেলে, কামারাঙ, তোর্গি, কবরক, বাধেই, লেঙদা চিগোন, গেলঙ, পাত্তেগী, গুরিচিনেল, বিনি, কবাবিনি, লোবাবিনি, লঙ্কাপোড়া বিনি, বানরনঙ বিনি, পাধাতটারা, আমেই কালাকবরক, সংগেলঙ |
| মসলা ও ভেষজ | মরিচ, আদা, হলুদ, সাবারাং | মরিচ, সাবারং, ফুজি |
| কচু ও আলু | কচু ওল, সাম্মো, গুরি কচু, এরা কচু, মু রাঙা কচু; আলু (বাজতারা, এদোটেঙ, রাঙাপিলা, ধুপপিলা); জুরো আলু | আলু, এরকচু, গুরিকচু, রাঙাপিলে, ধুবপিলে, ওলকচু, সাম্মোকচু, মু রাঙাকচু, এরাকচু, গুরিচকচু, নারিকেল কচু, বিনিকচু, বদাকচু; জুরো আলু |
| সবজি ও অন্যান্য | তিল, পোজি, দুমোর সুমি, তুলা, আমিলে, ঢেঁড়স, শিম, রেঙ, মামরা, মেইয়ে শাক, সিন্দিরা, সদর ফুল, বেগুন, কলা, মিষ্টি কুমড়া, জেদেনা, মুগলি, কুকী, মারেশ দাদি, ভুট্টা, পেঁপে | ভুট্টা, যব, তিল, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, মারফা, তুলা, শিম, চিন্দিরা, বেগুন, মারেজ, আমিলে, জেদেনাবিচি, মুগলি, কুকী, দুমোর সুমি, দেড়জ, রেং, মেইয়েশাক |
সুযশ চাকমা জুমকে চাকমা খাবারের উৎস হিসেবে স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন: জুমের বিন্নি চাল ছাড়া কলাপিঠা, সান্যাপিঠা, ধুগিপিঠা বা বিনিহগা বানানো সম্ভব নয়; জুমের “হোন্ চোল্” বা কাউন চালের পায়েস “একটি উৎকৃষ্ট খাবার”; আর বিজুর মিষ্টি পানীয়ের উপাদানও জুম থেকে আসে। তনয় দেওয়ান জুমকে কম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, কারণ তাঁর ভাষায় জুম থেকে “গোটা বছরের প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রকারে খাদ্যদ্রব্য” পাওয়া যায়।
জুমের নিয়মেও খাবার জড়িয়ে আছে। চাংমাটারা অনুযায়ী এক জাতের ধানের মাঝখানে অন্য জাতের বীজ রোপণ করা যায় না, যেমন মেলে ধানের মাঝে বিনি ধান নয়। ধান কাটা শুরুর “ফাঙ”-এর দিনে খানাপিনা হয়, আর “নো ভাত খাওয়া”-র সময় বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয় ও মুরুব্বিদের আপ্যায়ন করা হয়। জুম চাষের ধাপ ও মাসভিত্তিক বিবরণ আছে জুম চাষ নিয়ে আমাদের লেখায়।
সুযশ চাকমা একটি পরিবর্তনের কথাও লিখেছেন: জুমিয়ারা যে জৈব খাবার খেতেন তা অনেক অসুস্থতা দূরে রাখত, আর এখন স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় “দিন দিন জুমিয়ার সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে”।
চাকমা ভাষায় পিঠাকে বলে পিদা, আর পিঠার জন্য প্রথম পছন্দ বিন্নি চাল, সঙ্গে নারকেল ও কলা। চাংমাটারা অনুযায়ী বেশির ভাগ পিঠা ভাপে সেদ্ধ হয় মাটির তৈরি একটি পাত্রে, যার নাম পগোন; দেখতে ছারির মতো, তলায় 5 থেকে 6টি ছিদ্র। বরা পিঠা ভাজার জন্য শূকরের চর্বির তেল বা সরিষার তেল পছন্দ করা হয়।
চাংমাটারা-র তালিকায় পিঠার নাম: কলা পিদা, হগা পিদা, বিনি পিদা, সান্যা পিদা, বেঙ পিদা, ধুপি পিদা, লুদি পিদা, পাক্কোন পিদা ও বরা পিদা। সামাজিক নিয়মও সেখানে লেখা: আত্মীয়ের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি বা বউ দেখতে যাওয়ার সময় চাকমা সমাজে পিঠা “অবশ্যই প্রয়োজন হয়”।
তিনটি পিঠার প্রস্তুতি পাওয়া যায় আজকের পত্রিকার 15 জানুয়ারি 2023 তারিখের প্রতিবেদনে, ঢাকার একটি আদিবাসী খাদ্যমেলার চাকমা স্টল থেকে:
আর্কাইভের নাম সান্যা পিদা বা সান্ন্যাপিঠা আর সংবাদপত্রের ছাইন্না পিঠা একই পিঠা বলে ধরা হয়েছে আমাদের পাহাড়ি খাবার লেখায়; নামের বানানের তুলনা সেখানে আছে। বিজুর দিন পরিবেশনের জন্য “চাকমা জাতি” লেখায় বিনি হগা ও চিনি বানাহ্-র নামও আছে, তবে এগুলো কীভাবে তৈরি হয় তা লেখায় নেই।
পিঠা রেস্তোরাঁতেও পৌঁছেছে, কিছুটা বদলে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2020 সালে ঢাকার একটি রেস্তোরাঁর চাকমা বরা পিঠার বর্ণনা দিয়েছে বাদাম, নারকেল ও টক দই দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন হিসেবে। আর দ্য ডেইলি স্টারের 2022 সালের প্রতিবেদনে শীতের সন্ধ্যার গরম পিঠা ও পায়েসের কথা আছে, দুটোই বিন্নি চালের।
চাংমাটারা অনুযায়ী চাকমা সমাজে মদের তিনটি রূপ: মদ, জগরা আর কানজি। জগরা তৈরি হয় বিন্নি চাল দিয়ে, আর কানজি ও মদ সাধারণ চাল দিয়ে। মদকে গুণমান অনুযায়ী “এক চুয়ানি” ও “দুচুয়ানি”-তে ভাগ করা হয়। তনয় দেওয়ান লিখেছেন, চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও সামাজিক প্রথায় মদের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
মদ কোথায় লাগে, তারও তালিকা আছে সেখানে: চুঙলাঙ পূজায় মদ লাগে; অতীতে বিয়ের ভোজের আগে অতিথিদের এক চুমুক মদ দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো; মৃতদেহ পোড়ানোর সময়ও ওঝারা মদ ব্যবহার করেন। গ্রামাঞ্চলে এখনো এর “সীমিত ব্যবহার” আছে বলে তিনি লিখেছেন। বিয়ের দিন ঠিক করতে পাত্রের বাবা পাত্রীর বাবার কাছে মদের বোতল নিয়ে যান, এই রীতির নাম মদপিলাং (“চাকমা জাতি”)।
জগরার বর্ণনা উৎসভেদে আলাদা। সুযশ চাকমা লিখেছেন, বিজুর সময় যে “মিধা জগরা” পরিবেশন করা হয় তা বিন্নি চালের মিষ্টি মদজাতীয় পানীয়। বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান 1989 সালের “চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ” লেখায় জানিয়েছেন, একটি পূজার জন্য আলাদা করে মদ বানানো হয়, আর চাকমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এভাবে বানানো মিষ্টি জগরা দীর্ঘদিন রাখলেও টকে যায় না।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চাকমাদের পানীয় নিয়ে একটি মাঠ-প্রতিবেদন আছে পিপলস আর্কাইভ অব রুরাল ইন্ডিয়ায় (21 সেপ্টেম্বর 2024), ঊনকোটি জেলার এক চাকমা দম্পতির কথায়। সেখানে jogora তৈরি হয় সূক্ষ্ম এক জাতের আঠালো চাল (biroin chal) দিয়ে, কয়েক সপ্তাহ বাঁশে গাঁজিয়ে পরে পাতন করে, কমপক্ষে এক মাস লাগে, আর প্রস্তুতি শুরু হয় চৈত্রের প্রথম দিনে। একই প্রতিবেদনে langi নামে চালের আরেকটি পানীয় 2 থেকে 3 দিনে তৈরি হয় mooli নামের ভেষজ-শস্যের গুটি দিয়ে গাঁজিয়ে, আর mod পাতন করে।
দুই দেশের বর্ণনা মিলিয়ে দেখলে পার্থক্য স্পষ্ট: বাংলাদেশের আর্কাইভ-লেখায় জগরা মিষ্টি ও বিন্নি চালের পানীয়, পাতনের উল্লেখ নেই; ত্রিপুরার প্রতিবেদনে jogora বাঁশে গাঁজানো ও পাতিত। দুই অঞ্চলের প্রণালি আলাদা কি না, নাকি একই নামের দুটি ভিন্ন জিনিস, কোনো উৎস তা বলেনি। ত্রিপুরার ওই দম্পতি জানিয়েছেন, চালের দাম বাড়ায় আর জুমে ওই ধান কম ফলায় তাঁরা এখন jogora খুব একটা বানান না। ভারতে চাকমাদের বসতির ইতিহাস আছে ভারতের চাকমাদের নিয়ে আমাদের লেখায়।
চাকমা সমাজে খাবার কেবল পেট ভরানোর জিনিস নয়; জন্ম, ফসল, পূজা, অসুখ ও মৃত্যুর আচারে নির্দিষ্ট খাবারের নির্দিষ্ট কাজ আছে। আর্কাইভের তিনটি লেখা, চাংমাটারা, “চাকমা জাতি” আর বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের পূজা-পার্বণের লেখা, এমন অন্তত ছয়টি প্রথার কথা বলে।
| প্রথা | কী খাবার, কেন | উৎস |
|---|---|---|
| ভাতমোজা | সদ্য প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য ফেরাতে মাছ, মাংস, শুঁটকি, ডিম; আর দুধ বাড়াতে করলা ও লাউ | চাংমাটারা |
| নো ভাত খাওয়া | বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয় ও মুরুব্বিদের খানাপিনায় আপ্যায়ন করে নো ভাত খাওয়া হয়; কিয়াঙে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের “নোয়া ভাতের শিয়ঙ” দেওয়া হয় | চাংমাটারা |
| হালপালনি | আষাঢ়ের 7 তারিখ মা-লক্ষ্মীকে থালায় মুরগি ও ডিমসহ ভাত; গৃহিণী সেই তরকারি খেলে পরিবারের উন্নতি হয় বলে বিশ্বাস; সবার জন্য মদ, পাজন ও নানা খাবার | “চাকমা জাতি” |
| লক্ষ্মী পূজা | আগে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি সেদ্ধ ডিম আর সাধারণ ভাত-তরকারি দিয়ে মালক্ষ্মী মার পূজা; সকালে সবার খাওয়ার আগে ভোগ | বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান |
| ভাতজরা | শিশুর জ্বর বা চোখ-চামড়ার অসুখে কলাপাতায় এক মুঠো ভাত নদী বা ছড়ার জলে ছিটিয়ে দেওয়া; প্রেমিক যুগলও একসঙ্গে ভাতজরা দেন | বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান |
| মৃত্যু | মৃতদেহের সঙ্গে পুঁটলিতে ভাত ও অন্য খাবার শ্মশানে নেওয়া হয়, দাহের আগে শেষবারের মতো মুখে ছোঁয়ানো হয় | “চাকমা জাতি” |
সামষ্টিক পূজার ভোজ নিয়ে বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের বর্ণনা সবচেয়ে বিস্তারিত। একটি পূজায় লাগে 7টি মোরগ-মুরগি, 1টি শূকর, প্রচুর শুঁটকি আর নানা সবজি; রান্না করতে হয় বাড়ির বাইরে কোনো সুবিধাজনক জায়গায়। আরেকটি পূজার পর গ্রামের প্রান্তে বড় গাছের নিচে বলির মাংস রান্না হয়, কিন্তু সেখানে ভাত রান্না হয় না; পাড়ার সবাই যে যার বাড়ি থেকে ভাত এনে ভোজে যোগ দেন। লেখক এই প্রথায় পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব দেখেছেন।
পরিবেশ-সচেতনতার একটি খাদ্যনিয়মও চাংমাটারা-য় আছে: পূর্ণিমার সময় চাকমারা ছড়ার কাঁকড়া ও শামুক ধরেন না, খানও না, কারণ তখন শামুকের পেটে বাচ্চা আসে। উনুনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রথাও আছে মৃত্যুর পর: মৃতদেহ বাড়ি থেকে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সব পানি ও উনুনের ছাই বাইরে ফেলে দেওয়া হয়, মৃতের সঙ্গে বাড়ির সম্পর্ক ছিন্নের প্রতীক হিসেবে (“চাকমা জাতি”)।
চাংমাটারা অনুযায়ী ফুল বিজুর দিন দুপুরের পর মূল বিজুর খাবার জোগাড় শুরু হয়: গ্রামের লোকেরা শিকারে যান, কেউ নদীতে মাছ ধরতে যান, আর মেয়েরা বন থেকে শাক-সবজি আনেন। সন্ধ্যায় পরদিনের জন্য সান্যা পিদা, বরা পিদা ও হগা পিদা বানিয়ে রাখা হয়। মূল বিজুর সকালে স্নান করে এসে মেয়েরা আগের দিনের সংগ্রহ করা সবজি মিশিয়ে পাজন রাঁধেন।
সেদিন শিশুরা কুরুম বা টুরুং-এ ধান নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে উঠানে মুরগি-হাঁসের জন্য ধান ছিটিয়ে দেয়, আর গৃহস্থ তাদের পিঠা-পাজন খেতে দেন। “চাকমা জাতি” লেখাটি জানায়, মূল বিজুর দিন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য ঘরের দরজা খোলা থাকে। বিজুর তিন দিনের আচার আছে বৈসাবি নিয়ে আমাদের লেখায়।
চাকমা বাড়ির রান্নাঘরের নাম হানিশাল, আর তনয় দেওয়ানের তালিকায় এটি বাড়ির পাঁচটি অংশের একটি। সুযশ চাকমা জুমঘরের রান্নাঘরকে বলেছেন পিজোর। খাবার রাখা ও মাপার জন্য বাঁশের নিজস্ব পাত্র আছে: চাল বা ডাল মাপার “ধ”, আর শুঁটকি রাখা ও চুলার ওপরে মাছ-মাংস শুকানোর জন্য “দুলো” বা বাঁশের “লুদুং”।
“চাকমা জাতি” লেখায় নিজেদের তৈরি তৈজসপত্রের দীর্ঘ তালিকা আছে, তার কয়েকটি: দাবা (হুক্কা), দুলো, লুদুঙ, মেজাঙ, কুলো, চালোন। লেখাটি জানায়, আগে চাকমাদের তৈজসপত্র ছিল মূলত কাঠ, বাঁশ বা বেতের, তবে মাটি, টিন বা পিতলের বাসনও ব্যবহার হতো, যা বাঙালি ব্যাপারীদের কাছ থেকে বা শহর থেকে কেনা হতো।
সংরক্ষণের কৌশল নিয়ে Chiangmi Talukder Lena লিখেছেন, বাঁশ কোড়ল ও অনেক মৌসুমি উপকরণ বছরে কয়েক মাসই পাওয়া যায়, তাই শীতের শুরু থেকেই রোদে শুকিয়ে বা অন্য প্রথাগত উপায়ে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়। কাটা সবজি ঝুলিয়ে বা বেতের ডালায় ছড়িয়ে মাটির চুলার ওপরে বানানো বেতের মাচায় রাখা হয়।
শহরে চাকমা খাবার দুই দিকে বদলেছে: ঘরে উৎসবের ঐতিহ্যবাহী পিঠার জায়গা নিয়েছে বাজারের মিষ্টি, আর ঢাকার রেস্তোরাঁয় চাকমা খাবার নতুন পরিচিতি পেয়েছে। চাংমাটারা লিখেছে, শহরাঞ্চলে ও শিক্ষিত চাকমারা বিজুর দিনে ঐতিহ্যবাহী পিঠার বদলে বাজার থেকে কেনা মিষ্টি জাতীয় খাবার পরিবেশন করেন।
“চাকমা জাতি” লেখাটিও একই কথা বলেছে: সান্ন্যাপিঠা, বিনিপিঠা, কলাপিঠা, বিনি হগা, চিনি বানাহ্ পরিবেশনের রেওয়াজ থাকলেও শহরাঞ্চলে এখন এসব খুব কমই দেখা যায়; তার জায়গায় মিষ্টি, জিলাপি, চটপটি, মাংস ও কোমল পানীয়।
উল্টো দিকে ঢাকায় চাকমা খাবারের রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে, হেবাং নামের রেস্তোরাঁটি চাকমা খাবারকে কেন্দ্র করে 2018 সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2020 সালে আরেকটি রেস্তোরাঁর বর্ণনা দিয়েছে, যার মেনু রোজ বদলায় পাহাড় থেকে কী টাটকা উপকরণ এল তার ওপর। আজকের পত্রিকা লিখেছে, 2023 সালের জানুয়ারিতে ঢাকার একটি খাদ্যমেলায় খাবারের স্টলগুলোর মধ্যে চাকমা সম্প্রদায়ের স্টলই বেশি ছিল।
রেস্তোরাঁর মেনুতে আসা পদগুলোর নামও প্রতিবেদনে আছে: কাঁচা কাঁঠালের তরকারি, শামুকের তরকারি, ঝাল কাঁকড়া, হাঁসের তরকারি, চিকেন হরবো, হেবাং (দ্য ডেইলি স্টার, 2022); শুঁটকি দিয়ে বাঁশ কোড়ল ভাজি, চিংড়ি দিয়ে কাঁচা কাঁঠালের তরকারি, ব্যাম্বু চিকেন (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, 2020)। পানীয় হিসেবে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে আছে রোজেলা চা। এগুলো রেস্তোরাঁর রূপ; ঘরের রান্নার সঙ্গে কতটা মেলে, সে তুলনা প্রতিবেদনগুলোতে নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সঙ্গে তুলনা আছে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লেখায়, আর পুরো অঞ্চলের লেখাগুলো একসঙ্গে পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
চাকমাদের প্রধান খাদ্য ভাত, আর ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস ও সবজির তরকারি। তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা অনুযায়ী তরকারির প্রধান উপকরণ সিদোল, আর শুঁটকিও খুব প্রিয়। Chiangmi Talukder Lena-র বর্ণনায় এক বেলার পাতে থাকে জুমের ভাত, সেদ্ধ সবজি, ভেষজ দিয়ে কম তেলে রাঁধা মাছ বা মাংস আর কাঁচা শাক।
আর্কাইভের দুটি লেখায় সাতটি নাম: উজ্যা (সেদ্ধ), সিক্যা (আগুনে সেঁকা), হলা (কম ঝোল), গুদেয়্যা (বেশি মরিচে রেঁধে চূর্ণ), কেবাং (পাতায় মুড়ে আগুনে), গোরাং (বাঁশের চোঙে) ও কোরবো (মরিচ, শুঁটকি বা সিদোল মিশিয়ে শাকসবজি)। Chiangmi Talukder Lena এর বাইরে টাবা ও মালার কথাও লিখেছেন।
হেবাং নিয়ে উৎসে মতভেদ আছে। Chiangmi Talukder Lena লিখেছেন, মাখানো মাছ-মাংস-সবজি কলাপাতায় মুড়ে মাটির চুলায় বা কয়লার আঁচে সেঁকা। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (2026) বলছে, এটি মূলত ভাপে রান্নার পদ্ধতি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (2020) হেবাংকে একটি সুগন্ধি পাতা বলেছে। আর্কাইভে প্রায় একই পদ্ধতির নাম কেবাং।
Chiangmi Talukder Lena-র বর্ণনায় মাছ বা মাংস মসলা-ভেষজ দিয়ে মেখে প্রায় এক ঘণ্টা রাখা হয়, তারপর বাঁশের চোঙে ভরে মুখ কলাপাতায় আটকে কাঠের আগুন বা কয়লার আঁচে 1 থেকে 2 ঘণ্টা রাঁধা হয়, মাঝে মাঝে ঘুরিয়ে। আর্কাইভ অনুযায়ী এর জন্য সাধারণত মিতিঙ্গা বা পারবো বাঁশ ব্যবহার হয়।
চাকমা ভাষায় বাঁশ কোড়লের নাম বাচ্ছুরি; দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও বাংলা উইকিপিডিয়া দুটোই এই নাম দিয়েছে। চাকমারা সাধারণত শুকনো চিংড়ি ও সিদোল দিয়ে এটি রাঁধেন। রান্নার আগে খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করে সেদ্ধ করে টাটকা পানিতে ধুয়ে নেওয়া হয়, যাতে বিষাক্ত উপাদান দূর হয়।
উৎসভেদে হিসাব আলাদা। Tribeni Chakma (দ্য ডেইলি স্টার, 2016) লিখেছেন বৈশাখ বা মধ্য এপ্রিল থেকে 5 থেকে 6 মাস, ভরা মৌসুম বর্ষায়। Chiangmi Talukder Lena বলছেন মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (2025) বলছে মে থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ভরা মৌসুম।
দুটোই জুমে ফলানো চাকমা রান্নার ভেষজ। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখা অনুযায়ী ফুজি দেখতে ধনেপাতার মতো আর সাবারাং তুলসী পাতার মতো। Chiangmi Talukder Lena ফুজিকে wild parsley বলেছেন। সাবারাংকে পুলক খীসা Lemon Basil বলেছেন, তবে Lena তাঁর তালিকায় সাবারাং আর lemon basil আলাদা লিখেছেন।
চাংমাটারা-র তালিকায় নয়টি: কলা পিদা, হগা পিদা, বিনি পিদা, সান্যা পিদা, বেঙ পিদা, ধুপি পিদা, লুদি পিদা, পাক্কোন পিদা ও বরা পিদা। পিঠার জন্য বিন্নি চালই প্রথম পছন্দ, সঙ্গে নারকেল ও কলা। বেশির ভাগ পিঠা ভাপে সেদ্ধ হয় পগোন নামের ছিদ্রওয়ালা মাটির পাত্রে।
চাংমাটারা অনুযায়ী জগরা বিন্নি চালে তৈরি একধরনের মদ, আর কানজি ও সাধারণ মদ তৈরি হয় সাধারণ চালে। সুযশ চাকমা লিখেছেন, বিজুতে পরিবেশিত মিধা জগরা বিন্নি চালের মিষ্টি পানীয়। ভারতের ত্রিপুরার এক চাকমা পরিবারের বর্ণনায় (পিপলস আর্কাইভ অব রুরাল ইন্ডিয়া, 2024) jogora বাঁশে কয়েক সপ্তাহ গাঁজিয়ে পাতন করা হয়।
ভাতমোজা হলো সদ্য প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য ফেরাতে খাবার দেওয়ার প্রথা, যা তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা অনুযায়ী চাকমা সমাজে বহুল প্রচলিত। এতে সাধারণত মাছ, মাংস, শুঁটকি ও ডিম জাতীয় শরীর-গঠনের খাবার দেওয়া হয়, আর দুধ বাড়ানোর জন্য দেওয়া হয় করলা ও লাউ।
পুরোপুরি নয়। সুযশ চাকমা চুমো গোরাং ও কেবাংকে “প্রায় তেলহীন, গরম-মসলা ছাড়া” বলেছেন, আর Chiangmi Talukder Lena লিখেছেন মাছ-মাংসে প্রথাগতভাবে গরম মসলা বা কারি পাউডার দেওয়া হয় না। তবে Lena-র নিজের মুরগি ও কাঁচা হলুদের রেসিপিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল, আর জিরা, হলুদ ও আদা-রসুন বাটা আছে।
দুই আর্কাইভ-লেখা দুই রকম বলেছে। তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা অনুযায়ী সিক্যা হলো আস্ত বা টুকরো মাছ হলুদ, নুন ও মরিচ মাখিয়ে বাঁশের কঞ্চিতে গেঁথে সরাসরি আগুনে পোড়ানো। “চাকমা জাতি” লেখায় সিক্যা হলো লবণ, হলুদ ও মরিচ মিশিয়ে মূলত মাংসখণ্ড আগুনে সেঁকা।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026