icon

পার্বত্য চুক্তি ১৯৯৭: কী ছিল, কতটা হলো, কোথায় আটকে আছে

Jumjournal

Published on Oct 6th, 2026 icon 3

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে দুটি সংখ্যা প্রায়ই শোনা যায় — কেউ বলেন প্রায় সবই বাস্তবায়িত, কেউ বলেন সামান্যই। দুটোই রেকর্ডে আছে, আর দুটোই আসে আলাদা দুই পক্ষের কাছ থেকে।

এই লেখাটি সংখ্যার তর্কে না গিয়ে আগে দেখছে চুক্তিতে আসলে কী লেখা ছিল, তারপর কোন অংশ আইনে রূপ পেয়েছে, আর কোথায় দুই পক্ষের হিসাব আলাদা।

চুক্তিটি কাদের মধ্যে, আর কোন কাঠামোয়

চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল সরকারের গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে। দলিলটি চার খণ্ডে সাজানো — ক, খ, গ ও ঘ।

শুরুর ভাষাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই এক বাক্যেই পরবর্তী সব বিতর্কের সীমা টানা। চুক্তি বলছে, এটি হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায়, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রেখে।

যাঁরা চুক্তিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলিল বলেন, তাঁদের জন্য এটি দলিলের নিজের ভাষায় উত্তর — সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি প্রস্তাবনাতেই মীমাংসিত।

‘ক’ খণ্ড: সাধারণ নীতি

প্রথম খণ্ডে তিনটি বিষয় স্থির হয়েছে। উভয় পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামকে “উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল” হিসেবে বিবেচনা করে এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ ও সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন।

দ্বিতীয়ত, চুক্তির বিভিন্ন ধারায় বর্ণিত ঐকমত্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন করা হবে — অর্থাৎ চুক্তিটি নিজে থেকে কার্যকর নয়, একে আইনে রূপ দিতে হবে।

এই দ্বিতীয় শর্তটিই পরবর্তী পঁচিশ বছরের বাস্তবায়ন-বিতর্কের কেন্দ্র। চুক্তি সই হওয়া আর চুক্তি কার্যকর হওয়া — দলিল অনুযায়ীই দুটি আলাদা ধাপ।

পরিভাষা নিয়ে: চুক্তির পাঠে “উপজাতি” শব্দটি ব্যবহৃত। এখানে তা দলিলের নিজের শব্দ হিসেবে উদ্ধৃত; জুমজার্নালের নিজস্ব ব্যবহার আদিবাসী।

যা আইনে রূপ পেয়েছে

চুক্তির পর কয়েকটি কাঠামো সত্যিই তৈরি হয়েছে, আর সেগুলো যাচাইযোগ্য — কারণ আইনগুলো নিজেই বিদ্যমান:

  1. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮ — ২৫ সদস্যের পরিষদ, তিন জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানের ক্ষমতাসহ
  2. তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন ও কার্যকরকরণ
  3. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্থাপন
  4. ভারত থেকে পাহাড়ি শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন
  5. ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১

অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড়িয়েছে। বিতর্কটি কাঠামো তৈরি হয়েছে কি না তা নিয়ে নয় — কাঠামোগুলো কাজ করছে কি না তা নিয়ে।

যেখানে দুই পক্ষের হিসাব মেলে না

এখানে সতর্ক থাকা দরকার, কারণ দুই পক্ষের দাবিই প্রকাশ্য রেকর্ডে আছে, আর সংখ্যা দুটি আলাদা।

জনসংহতি সমিতির অবস্থান — আর্কাইভে সংরক্ষিত তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কাঠামো তৈরি হলেও ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। তাদের ভাষায়, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভাসহ স্থানীয় পরিষদ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন — আঞ্চলিক পরিষদের তত্ত্বাবধান ও সমন্বয়ের কর্তৃত্বকে উপেক্ষা করে।

এটি একটি নির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য অভিযোগ: আইনে (আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২২ ধারায়) তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা লেখা আছে, কিন্তু অভিযোগ হলো সেই ক্ষমতা বাস্তবে মানা হয় না।

সরকারের অবস্থান সাধারণত বাস্তবায়িত ধারার সংখ্যা দিয়ে উপস্থাপিত হয়, এবং তা জনসংহতি সমিতির হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। [যাচাই প্রয়োজন] — এই লেখার জন্য সরকারি পক্ষের নির্দিষ্ট সংখ্যাটি কোনো প্রাথমিক সরকারি নথিতে যাচাই করা যায়নি; আর্কাইভে কেবল জনসংহতি সমিতির মূল্যায়ন সংরক্ষিত আছে।

দুটি হিসাব কেন মেলে না, তার একটি কাঠামোগত কারণ আছে: একটি ধারা “বাস্তবায়িত” বলতে কেউ বোঝেন আইন হয়েছে কি না, কেউ বোঝেন আইনটি কার্যকর হয়েছে কি না। চুক্তির ‘ক’ খণ্ডের দ্বিতীয় দফাই দুটি ধাপকে আলাদা করেছিল।

কেন বিষয়টি এখনো জীবিত

চুক্তি-পরবর্তী প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আগের কাঠামোর উপর বসেছে, সেগুলোকে সরিয়ে নয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন অন্তত তিনটি স্তর একসঙ্গে চলে:

কাঠামো উৎস অবস্থা
হেডম্যান ও কার্বারি১৯০০ শাসনবিধিচালু, ঔপনিবেশিক আমল থেকে
জেলা পরিষদ১৯৮৯ আইনচুক্তির আগে তৈরি, পরে সংশোধিত
আঞ্চলিক পরিষদ১৯৯৮ আইনচুক্তির ফল
ভূমি কমিশন২০০১ আইনচুক্তির ফল

পুরনো স্তর সরানো হয়নি, নতুন স্তর যুক্ত হয়েছে। কর্তৃত্ব কোথায় শেষ আর কোথায় শুরু — সেই প্রশ্নটিই বাস্তবায়ন-বিতর্কের আসল চেহারা।

সংক্ষেপে। চুক্তি চার খণ্ডে — সাধারণ নীতি, জেলা পরিষদ আইন সংশোধন, আঞ্চলিক পরিষদ, আর পুনর্বাসন ও সাধারণ ক্ষমা। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায় হুবহু আইনে এসেছে। কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্নে দুটি জায়গায় শব্দ বদলেছে, একটি জায়গায় শর্ত যোগ হয়েছে, আর একটি দফা আইনে আসেইনি। নিচে দফা ধরে ধরে সেই হিসাব।

খণ্ড (খ): জেলা পরিষদকে যেভাবে বদলানোর কথা ছিল

দ্বিতীয় খণ্ডটি সবচেয়ে কারিগরি — এটি ১৯৮৯ সালের তিনটি জেলা পরিষদ আইনের ধারাগুলো ধরে ধরে সংশোধনের প্রস্তাব। খণ্ডটি শুরুই হয় সেই ঘোষণায়: উভয় পক্ষ ওই আইনগুলোর বিভিন্ন ধারার পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোপন করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।

এখানে কয়েকটি দফা আলাদা করে দেখা দরকার, কারণ সেগুলোই পরে জেলা পরিষদ আইনে রূপ পেয়েছে।

নামের বদল, আর একটি শব্দ যা টিকে গেল

খণ্ডের প্রথম দুটি দফা প্রতীকী, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ।

দফা ১ — “পরিষদের আইনে বিভিন্ন ধারায় ব্যবহৃত ‘উপজাতি’ শব্দটি বলবৎ থাকিবে।”

অর্থাৎ শব্দটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, এবং সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা না বদলানোর। জুমজার্নাল নিজের লেখায় ‘আদিবাসী’ ব্যবহার করে; আইন ও চুক্তির উদ্ধৃতিতে দলিলের নিজের শব্দই রাখা হয়েছে, আর এই দফাটি দেখায় সেই শব্দটি দুই পক্ষের সচেতন সিদ্ধান্ত।

দফা ২ — “পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ” নাম সংশোধন করে এটি “পার্বত্য জেলা পরিষদ” নামে অভিহিত হবে।

‘স্থানীয় সরকার’ শব্দ দুটি বাদ পড়ায় প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ স্থানীয় সরকারের সারি থেকে সরে আসে — এটি নিছক নাম নয়, শ্রেণিবিন্যাসের প্রশ্ন।

যে সংজ্ঞাটি চুক্তি থেকে হুবহু আসেনি

দফা ৩-এ ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’-র সংজ্ঞা প্রস্তাব করা হয়েছিল — যিনি উপজাতীয় নন এবং যাঁর পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং যিনি সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন।

চুক্তিতে দুটি শর্তই ‘এবং’ দিয়ে যুক্ত। কিন্তু জেলা পরিষদ আইনের ২(কক) ধারায় শব্দটি হয়েছে ‘বা’ — জমি থাকলেই হয়, অথবা বসবাস করলেই হয়।

মজার বিষয়, ১৯৯৮ সালের আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২(খ) ধারায় চুক্তির ‘এবং’-ই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একই সংজ্ঞা দুই আইনে দুই রকম, আর চুক্তির সঙ্গে মেলে দ্বিতীয়টি।

পরিচয় নির্ধারণের ক্ষমতা যেখানে হাতবদল হলো

দফা ৪(গ) একটি নির্দিষ্ট শব্দ-প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব: ৪(৫) ধারায় “ডেপুটি কমিশনার” শব্দের পরিবর্তে “সার্কেল চীফ” বসানো হবে।

এই একটি বদল বড় — কে উপজাতীয় ও কোন উপজাতির, সেই সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসকের হাত থেকে সার্কেল চিফের হাতে গেল। প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রথাগত পদাধিকারীর হাতে যাওয়ার এটি একটি বিরল উদাহরণ, এবং এটি আইনে এসেছে।

দফা ৪(ঘ)-তে সমান্তরাল একটি ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছিল অ-উপজাতীয়দের জন্য: কে অ-উপজাতীয় ও কোন সম্প্রদায়ের, তা স্থির করবেন সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ — তবে মৌজার হেডম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার চেয়ারম্যানের দেওয়া সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে। এবং সার্কেল চীফের সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ অ-উপজাতীয় সদস্যপদের প্রার্থী হতে পারবেন না।

শপথ, মেয়াদ ও সভাপতিত্ব

আরও তিনটি প্রস্তাব ছোট হলেও মর্যাদার প্রশ্নে অর্থবহ।

শপথ (দফা ৫)। মূল আইনে শপথ নিতে হতো চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের সম্মুখে। চুক্তির প্রস্তাব — তার পরিবর্তে হাইকোর্ট ডিভিশনের একজন বিচারপতির সম্মুখে।

একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার জায়গায় একজন বিচারপতি — প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা এক ধাপ উপরে ওঠে। আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ৯ ধারাতেও একই ব্যবস্থা: রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির সম্মুখে শপথ।

সম্পত্তির বিবরণ (দফা ৬)। ৮ ধারায় সম্পত্তির বিবরণ দাখিল করতে হতো “চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের নিকট”; প্রস্তাব — তার বদলে “নির্বাচন বিধি অনুসারে”।

মেয়াদ (দফা ৭)। ১০ ধারায় “তিন বৎসর”-এর জায়গায় “পাঁচ বৎসর”। এটি আইনে এসেছে — জেলা পরিষদ আইনের ১০ ধারায় এখন পাঁচ বছর, বন্ধনীতে চিহ্নিত সংশোধনী হিসেবে।

সভাপতিত্ব (দফা ৮)। চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে বা তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিষদের অন্য সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করবেন। এই ব্যবস্থাও আইনে আছে — ২৫(২) ধারায়।

ভূমি: চারটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব

চুক্তিতে প্রস্তাব ছিল — জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোনো জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাবে না। ব্যতিক্রম: রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি।

আরও তিনটি: পরিষদের আওতাধীন জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সম্মতি ছাড়া সরকার অধিগ্রহণ বা হস্তান্তর করতে পারবে না; হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-দের কার্যাদি পরিষদ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে; এবং কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল মালিকদের বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।

এই চারটিই আইনে এসেছে — রাংগামাটি আইনের ৬৪ ধারায়, প্রায় হুবহু একই ভাষায়। এটি ‘কতটা হলো’ প্রশ্নের একটি ইতিবাচক উত্তর।

ভূমি উন্নয়ন কর

চুক্তির প্রস্তাব ছিল ৬৫ নম্বর ধারা সংশোধন করে লেখা — জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হাতে ন্যস্ত থাকবে এবং আদায়কৃত কর পরিষদের তহবিলে থাকবে। এটিও আইনের ৬৫ ধারায় এসেছে।

পরিষদের কাজের তালিকা

চুক্তির (খ)৩৪ দফায় জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল, তার মধ্যে আছে ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশ (স্থানীয়), উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার, যুব কল্যাণ, পরিবেশ, স্থানীয় পর্যটন, স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স, নদী-নালার ব্যবহার ও সেচ, জন্ম-মৃত্যু ও পরিসংখ্যান, মহাজনী কারবার এবং জুম চাষ।

শেষ বিষয়টি লক্ষণীয় — ১৯০০ সালের শাসনবিধির ৪১ বিধিতে জুম চাষের নিয়ন্ত্রণ জেলা প্রশাসকের। চুক্তি সেটি জেলা পরিষদের দায়িত্বে আনার কথা বলেছে।

আর ‘কাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ ব্যতীত’ শর্তটি নদী-নালার দফায় জুড়ে দেওয়া।

কর ও রয়্যালটি

(খ)৩৫ দফায় পরিষদের কর-উৎসের তালিকায় দুটি রয়্যালটি-খাত আছে যা আর্থিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ — বনজ সম্পদের উপর রয়্যালটির অংশবিশেষ এবং খনিজ সম্পদ অন্বেষণ বা নিষ্কর্ষণের অনুজ্ঞাপত্র বা পাট্টা থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির অংশবিশেষ।

তালিকায় আরও আছে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ফি, পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের কর, হোল্ডিং কর, গৃহপালিত পশু বিক্রয়ের কর, সামাজিক বিচারের ফিস, বিনোদনের উপর সম্পূরক কর, ব্যবসা ও লটারির কর।

বিধি ও প্রবিধানে পরিষদের কণ্ঠ

দুটি দফা পরিষদের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, বিধি প্রণয়ন হবে পরিষদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে, এবং বিধি প্রণীত হওয়ার পরেও তা পুনর্বিবেচনার জন্য পরিষদের সরকারের কাছে আবেদন করার বিশেষ অধিকার থাকবে।

দ্বিতীয়ত, প্রবিধান প্রণয়নে ৬৯ ধারা থেকে “সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে” শব্দগুলো বিলুপ্ত করার প্রস্তাব — অর্থাৎ প্রবিধান বানাতে আর আগাম অনুমোদন লাগবে না। তবে শর্ত যোগ করা: প্রবিধানের কোনো অংশে সরকার দ্বিমত পোষণ করলে সংশোধনের জন্য পরামর্শ দিতে বা অনুশাসন করতে পারবে।

এই দুটি বদল ছোট মনে হলেও দিক একটাই — আগাম অনুমতির জায়গায় পরবর্তী আপত্তি।

নারীর তিনটি আসন

দফা ৪(ক)-তে একটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব: প্রতিটি পার্বত্য জেলা পরিষদে মহিলাদের জন্য তিনটি আসন থাকবে, এবং এসব আসনের এক-তৃতীয়াংশ অ-উপজাতীয়দের জন্য।

এক-তৃতীয়াংশ মানে তিনটির একটি — অর্থাৎ দুজন উপজাতীয়, একজন অ-উপজাতীয়। জেলা পরিষদ আইনের ৪(১)(ঘ) ধারায় এটি হুবহু এসেছে।

একই ধারার ব্যাখ্যায় আইনে যোগ হয়েছে একটি বাক্য, যা চুক্তিতে নেই: উপজাতীয় মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রে জেলার বিভিন্ন উপজাতির জন্য কোনো কোটা থাকবে না।

ফলে দুটি সংরক্ষিত আসনে যেকোনো জনগোষ্ঠীর নারী দাঁড়াতে পারেন — ছোট জনগোষ্ঠীর নারীদের জন্য যা বাড়তি সুযোগ, আবার বড় জনগোষ্ঠীর প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাও।

চুক্তির (গ)৪ দফায় আঞ্চলিক পরিষদের জন্যও একই অনুপাত — তিনটি সংরক্ষিত আসন, এক-তৃতীয়াংশ অ-উপজাতীয় — তবে সেখানে মোট নির্বাচিত পদ ২২, আর জেলা পরিষদে ৩৪।

খণ্ড (গ) সংক্ষেপে

তৃতীয় খণ্ডটি সম্পূর্ণ আঞ্চলিক পরিষদ নিয়ে — গঠন, আসন-বণ্টন, মেয়াদ, কার্যাবলী ও তহবিল। চৌদ্দটি দফা।

এখানে সংক্ষেপে: চেয়ারম্যানসহ ২২ জন সদস্য, তার সঙ্গে তিন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে ও ভোটাধিকারসহ। চেয়ারম্যান পরোক্ষভাবে নির্বাচিত, অবশ্যই উপজাতীয়, পদমর্যাদা প্রতিমন্ত্রীর সমকক্ষ। মেয়াদ পাঁচ বছর। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা যুগ্ম-সচিব সমতুল্য।

এই খণ্ডের দফাগুলো ও ১৯৯৮ সালের আইনের ধারাগুলো শব্দে-শব্দে মিলিয়ে দেখা হয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ নিয়ে আলাদা লেখাটিতে — সেখানে দুটি শব্দের পরিবর্তন ধরা পড়েছে যা ক্ষমতার অর্থ বদলে দেয়, আর একটি দফা যা আইনে আসেইনি।

শরণার্থী প্রত্যাবর্তন ও টাস্কফোর্স

খণ্ড (ঘ)-এর একেবারে প্রথম দফাটি চুক্তির আগের একটি ঘটনার উপর দাঁড়িয়ে।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার ও শরণার্থী নেতৃবৃন্দের মধ্যে আগরতলায় ৯ মার্চ ১৯৯৭ তারিখে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ১৯৯৭ থেকে শরণার্থীরা দেশে ফিরতে শুরু করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে বলা হয়েছে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, এবং জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব রকমের সহযোগিতা দেওয়া হবে।

এই তারিখটি কেবল ইতিহাস নয় — ভূমি কমিশন আইনের ২(চ) ধারায় ‘পুনর্বাসিত শরণার্থী’-র সংজ্ঞাই দেওয়া হয়েছে ৯ মার্চ ১৯৯৭-এর আগরতলা চুক্তির তালিকাভুক্ত শরণার্থী হিসেবে। অর্থাৎ চার বছর পরের একটি আইনের এখতিয়ার নির্ধারিত হচ্ছে ওই তালিকা দিয়ে।

অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু

একই দফায় দ্বিতীয় একটি শ্রেণির কথা আছে: তিন পার্বত্য জেলার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করে একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দুটি ধাপ — আগে ‘নির্দিষ্টকরণ’ (কে উদ্বাস্তু তা চিহ্নিত করা), তারপর পুনর্বাসন। আর এই টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যানই খণ্ড (ক)-এর তিন সদস্যের বাস্তবায়ন কমিটির একজন।

টাস্কফোর্সের কাজ কতদূর এগিয়েছে বা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে কি না — তার কোনো নির্ভরযোগ্য নথি এই লেখায় ব্যবহার করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

১৯৯৭ সালের চুক্তির পর অস্ত্র সমর্পণ। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

খণ্ড (ঘ): অস্ত্র জমা, সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসন

চতুর্থ খণ্ডটি সবচেয়ে দীর্ঘ, আর এখানেই সংঘাত থামানোর কার্যক্রমটি ধাপে ধাপে লেখা। দফাগুলোর সময়সীমা অস্বাভাবিক রকমের নির্দিষ্ট।

প্রথম ৪৫ দিন

দুটি দফা একই সময়সীমা বেঁধে দেয়।

(ঘ)১২ — জনসংহতি সমিতি তার সশস্ত্র সদস্যসহ সকল সদস্যের তালিকা এবং আওতাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণী চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে দাখিল করবে।

(ঘ)১৩ — সরকার ও জনসংহতি সমিতি যৌথভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমাদানের দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করবেন। তারপর তালিকাভুক্ত সদস্য ও তাঁদের পরিবারবর্গের স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্য সব রকমের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

ক্ষমা — এবং তার শর্ত

(ঘ)১৪ দফায় বিনিময়টি স্পষ্ট: নির্ধারিত তারিখে যাঁরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেবেন, সরকার তাঁদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করবেন, এবং যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা আছে সেগুলো প্রত্যাহার করে নেবেন।

আর (ঘ)১৫ দফায় উল্টো দিক: নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কেউ অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হলে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।

ক্ষমা শর্তসাপেক্ষ — সময়মতো অস্ত্র জমা দেওয়াই শর্ত।

(ঘ)১৬ — পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি

স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পর কী কী হবে, তা পাঁচটি উপ-দফায় বলা। সাধারণ ক্ষমা কেবল সমিতির সদস্যদের নয় — সমিতির কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত স্থায়ী বাসিন্দাদেরও।

উপ-দফাপ্রতিশ্রুতি
(ক)প্রত্যাবর্তনকারী প্রতিটি পরিবারকে এককালীন ৫০,০০০ টাকা
(খ)মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া প্রত্যাহার; অনুপস্থিতিকালীন সাজা মওকুফ; জেলে আটক থাকলে মুক্তি
(গ)কেবল সমিতির সদস্য ছিলেন — এই কারণে কারও বিরুদ্ধে মামলা, শাস্তি বা গ্রেফতার করা যাবে না
(ঘ)ব্যাংক বা সরকারি সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণ, যা বিবাদমান পরিস্থিতির কারণে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়নি — সুদসহ মওকুফ
(ঙ)আগে সরকারি চাকরিতে থাকলে স্ব স্ব পদে পুনর্বহাল; সদস্য ও পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরিতে নিয়োগ, বয়স শিথিলের সরকারি নীতিমালা অনুসরণে
(চ)কুটির শিল্প ও ফলের বাগানসহ আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণে অগ্রাধিকার
(ছ)সদস্যদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ, এবং বিদেশি বোর্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া সার্টিফিকেট বৈধ বলে গণ্য

উপ-দফা (ছ) সহজে চোখ এড়িয়ে যায়, অথচ এর বাস্তব তাৎপর্য বড়। যাঁরা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন, তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা ভারতসহ বাইরের প্রতিষ্ঠানে হয়েছে। সেই সার্টিফিকেট বৈধ না হলে চাকরি বা উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ থাকত।

উপ-দফা (গ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য — এটি ভবিষ্যতের সুরক্ষা, অতীতের ক্ষমা নয়। সমিতির সদস্য থাকাটাই আর অপরাধের ভিত্তি হতে পারবে না।

ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দুবার এসেছে — (ঘ)৭ দফায় উপজাতীয় শরণার্থীদের জন্য, আর (ঘ)১৬(ঘ) দফায় সমিতির সদস্যদের জন্য। দুই ক্ষেত্রেই শর্ত এক: বিবাদমান পরিস্থিতির কারণে ঋণের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়নি।

উন্নয়ন, কোটা ও সংস্কৃতি

একই খণ্ডে তিনটি দফা দীর্ঘমেয়াদি নীতির।

(ঘ)৯ — উন্নয়ন বরাদ্দ। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করবেন, অবকাঠামোর জন্য নতুন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করবেন, এবং পরিবেশ বিবেচনায় রেখে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ দেবেন।

(ঘ)১০ — কোটা ও বৃত্তি। চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত সরকার উপজাতীয়দের জন্য সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখবেন। সেই সঙ্গে বেশি সংখ্যক বৃত্তি, এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্যও বৃত্তি।

শর্তটি লক্ষণীয় — কোটার মেয়াদ কোনো তারিখে বাঁধা নয়, বাঁধা একটি ফলাফলে: অন্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে পৌঁছানো।

(ঘ)১১ — সংস্কৃতি। উপজাতীয় কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সচেষ্ট থাকবেন, এবং সরকার উপজাতীয় সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে বিকশিত করতে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা করবেন।

এই দফাগুলোর বাস্তবায়ন কতদূর হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান বা সরকারি প্রতিবেদন এই লেখায় ব্যবহার করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

(ঘ)১৭: ক্যাম্প প্রত্যাহার — আর যে ছয়টি থাকবে

চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দফাগুলোর একটি এটি, আর এর ভাষা বেশ নির্দিষ্ট।

চুক্তি সই ও সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে — সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সব অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া হবে, এবং এ লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।

তবে দফাটিতে ব্যতিক্রমের তালিকাও স্পষ্ট। যা থাকবে:

  • সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর)
  • স্থায়ী সেনানিবাস — তিন জেলা সদরে তিনটি, এবং আলীকদম, রুমা ও দীঘিনালা-য় আরও তিনটি

অর্থাৎ ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাস ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রত্যাহারের আওতার বাইরে; প্রত্যাহারের কথা অস্থায়ী ক্যাম্প নিয়ে।

সেনা মোতায়েনের শর্ত

একই দফায় ভবিষ্যতের ব্যবস্থাও বলা: আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও এ জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সব এলাকার মতোই প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি অনুসরণ করে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাবে।

‘দেশের সব এলাকার মতোই’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ — এটি পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ ব্যবস্থার বাইরে এনে সাধারণ নিয়মে ফেরানোর ভাষা।

আর সহায়তার প্রয়োজন হলে আঞ্চলিক পরিষদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করতে পারবে — অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় পরিষদের একটি ভূমিকা রাখা হয়েছে।

পরিত্যক্ত জমি

(ঘ)১৭(খ) দফায় একটি নির্দিষ্ট নির্দেশ: সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিকের কাছে অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

দুটি বিকল্প — মূল মালিক, নয়তো জেলা পরিষদ। রাষ্ট্রের হাতে রেখে দেওয়ার কথা নেই।

(ঘ)১৮ ও (ঘ)১৯: চাকরি ও মন্ত্রণালয়

(ঘ)১৮ — নিয়োগে অগ্রাধিকার। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সরকারি, আধা-সরকারি, পরিষদীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সব স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হবে।

শর্তটিও লেখা: কোনো পদে স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তি না থাকলে সরকার থেকে প্রেষণে অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদে নিয়োগ করা যাবে।

এই নীতিটি পরে আইনেও এসেছে — ভূমি কমিশন আইনের ১৩(৩) ধারায় সচিবসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে স্থায়ী অধিবাসী নিয়োগের বিধান আছে, আর আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২৮ ধারায় মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার।

(ঘ)১৯ — মন্ত্রণালয়। উপজাতীয়দের মধ্য থেকে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে, এবং তাকে সহায়তার জন্য একটি বারো সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি হবে।

ক্রমসদস্য
১পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী
২চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ
৩–৫চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি — রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ
৬–৮সাংসদ — রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান
৯–১১চাকমা রাজা, বোমাং রাজা ও মং রাজা
১২সরকার-মনোনীত তিনজন অ-উপজাতীয় স্থায়ী অধিবাসী

তালিকাটি চুক্তির কাঠামো-দর্শনের সারাংশ: নির্বাচিত প্রতিনিধি (পরিষদ চেয়ারম্যান, সাংসদ), প্রথাগত পদাধিকারী (তিন রাজা), এবং অ-উপজাতীয় প্রতিনিধিত্ব — তিনটিকেই একই টেবিলে বসানো।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

খণ্ড (ক): মাত্র চার দফা, কিন্তু ভিত্তি

চুক্তির প্রথম খণ্ডে মাত্র চারটি দফা, আর সেগুলোই বাকি তিন খণ্ডের কাঠামো ঠিক করে দেয়।

দফা ১ — অঞ্চলটির স্বীকৃতি

উভয় পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামকে “উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল” হিসেবে বিবেচনা করে এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং সার্বিক উন্নয়ন অর্জনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন।

দুটি শব্দ এখানে গুরুত্বপূর্ণ — ‘বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ’ ও ‘উন্নয়ন’। পুরো চুক্তির বাকি অংশ এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা।

দফা ২ — আইন বদলানোর অঙ্গীকার

এই দফাটিই চুক্তির কার্যকারিতার চাবি: উভয় পক্ষ স্থির করেছেন যে যথাশীঘ্র চুক্তির বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐকমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী ও রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হবে।

অর্থাৎ চুক্তি নিজে আইন নয় — এটি আইন বদলানোর একটি অঙ্গীকার। ১৯৯৮ সালের আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ২০০১ সালের ভূমি কমিশন আইন এবং জেলা পরিষদ আইনগুলোর সংশোধনী — এই দফারই ফল।

আর এখানেই ‘কতটা হলো’ প্রশ্নটির উৎস। চুক্তির কোনো দফা যদি আইনে রূপ না পায়, তবে সেটি অঙ্গীকার হিসেবেই থেকে যায়।

দফা ৩ — বাস্তবায়ন কমিটি

চুক্তির বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণের জন্য তিন সদস্যের একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে:

পদভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজনআহ্বায়ক
চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যানসদস্য
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতিসদস্য

কমিটিটি ছোট — তিনজন। এবং লক্ষণীয়, এর কাজ ‘পরিবীক্ষণ’ (monitoring), বাস্তবায়ন নয়। বাস্তবায়নের দায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের।

দফা ৪ — কখন থেকে, কতদিন

শেষ দফাটি চুক্তির মেয়াদ নিয়ে, এবং এর ভাষা অস্বাভাবিক রকমের খোলা:

“এই চুক্তি উভয় পক্ষ কর্তৃক সম্পাদিত ও সহি করিবার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭, খণ্ড (ক), দফা ৪

চুক্তির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। এটি বলবৎ থাকে যতক্ষণ না সব পদক্ষেপ সম্পন্ন হয় — অর্থাৎ অসম্পূর্ণতা নিজেই চুক্তিটিকে জীবিত রাখে।

স্বাক্ষর ও তারিখ

চুক্তির শেষে লেখা আছে, এটি বাংলা ভাষায় প্রণীত এবং ঢাকায় ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪০৪ সাল মোতাবেক ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে সম্পাদিত ও সইকৃত।

সরকারের পক্ষে সই করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা।

‘বাংলা ভাষায় প্রণীত’ কথাটি আইনি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ — বাংলা পাঠটিই মূল, কোনো ইংরেজি অনুবাদ নয়।

প্রশ্নোত্তর

পার্বত্য চুক্তি কবে ও কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর, সরকারের গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে।

চুক্তিতে কয়টি খণ্ড?

চারটি — ক, খ, গ ও ঘ। ‘ক’ খণ্ড সাধারণ নীতি নিয়ে।

চুক্তি কি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে?

চুক্তির নিজের ভাষায় নয়। প্রস্তাবনায় স্পষ্ট লেখা, এটি বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রেখে সম্পাদিত।

চুক্তির পর কী কী প্রতিষ্ঠান হয়েছে?

আঞ্চলিক পরিষদ (১৯৯৮ আইন), সংশোধিত তিন জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (২০০১ আইন), এবং ভারত থেকে শরণার্থী প্রত্যাবাসন।

চুক্তির চারটি খণ্ডে কী কী আছে?

খণ্ড (ক) সাধারণ — চার দফায় অঞ্চলটির স্বীকৃতি, আইন বদলানোর অঙ্গীকার, তিন সদস্যের বাস্তবায়ন কমিটি ও চুক্তির মেয়াদ। খণ্ড (খ) জেলা পরিষদ আইন সংশোধনের প্রস্তাব। খণ্ড (গ) আঞ্চলিক পরিষদের গঠন ও ক্ষমতা। খণ্ড (ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা ও অন্যান্য বিষয়াবলী — এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ।

চুক্তির মেয়াদ কতদিন?

নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ নেই। খণ্ড (ক)-এর ৪ দফা অনুযায়ী চুক্তি বলবৎ হয় স্বাক্ষরের তারিখ থেকে, এবং বলবৎ থাকে ‘উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত’। অর্থাৎ অসম্পূর্ণতা নিজেই চুক্তিটিকে জীবিত রাখে।

বাস্তবায়ন কমিটিতে কারা আছেন?

তিনজন — প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন আহ্বায়ক, চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান, এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি। কমিটির কাজ বাস্তবায়ন নয়, বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া ‘পরিবীক্ষণ’ করা।

অস্ত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা কী ছিল?

চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিন। ওই সময়ের মধ্যে জনসংহতি সমিতিকে সব সদস্যের তালিকা ও অস্ত্র-গোলাবারুদের বিবরণী দাখিল করতে হতো, এবং সরকার ও সমিতি যৌথভাবে অস্ত্র জমাদানের দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করতেন। নির্ধারিত তারিখে যাঁরা অস্ত্র জমা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি সরকার ক্ষমা ঘোষণা করার কথা।

প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্য কী কী প্রতিশ্রুতি ছিল?

খণ্ড (ঘ)-এর ১৬ দফায় সাতটি — পরিবারপ্রতি এককালীন ৫০,০০০ টাকা, মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার, জেলে থাকলে মুক্তি, কেবল সমিতির সদস্য থাকার কারণে ভবিষ্যতে মামলা না করা, ঋণ সুদসহ মওকুফ, পূর্বপদে পুনর্বহাল ও যোগ্যতা অনুসারে চাকরি, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণে অগ্রাধিকার, এবং সন্তানদের বিদেশি সার্টিফিকেট বৈধ বলে গণ্য করা।

সব সেনাক্যাম্প কি প্রত্যাহারের কথা ছিল?

না। খণ্ড (ঘ)-এর ১৭ দফা অনুযায়ী প্রত্যাহারের কথা অস্থায়ী ক্যাম্প নিয়ে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাস — তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলীকদম, রুমা ও দীঘিনালায় তিনটি — ব্যতিক্রম হিসেবে থাকবে বলে চুক্তিতেই লেখা।

চাকরিতে কোটা কতদিন থাকার কথা?

খণ্ড (ঘ)-এর ১০ দফায় কোনো তারিখ নেই, শর্তটি ফলাফলভিত্তিক — ‘চাকুরী ও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত’ সরকার উপজাতীয়দের জন্য কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখবেন।

পুনর্বাসিত শরণার্থী বলতে কাদের বোঝায়?

ভূমি কমিশন আইনের ২(চ) ধারা অনুযায়ী ৯ মার্চ ১৯৯৭ তারিখে ভারতের আগরতলায় সরকারের সঙ্গে উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সম্পাদিত চুক্তির আওতায় তালিকাভুক্ত শরণার্থী। ওই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ১৯৯৭ থেকে প্রত্যাবর্তন শুরু হয়।

চুক্তির ভাষা: চারটি লক্ষণীয় ধরন

পুরো দলিলটি পড়লে ভাষার কয়েকটি ধরন বারবার ফিরে আসে, আর সেগুলো জানা থাকলে যেকোনো দফা পড়া সহজ হয়।

এক — সময়সীমা কখনো নির্দিষ্ট, কখনো ফলাফলভিত্তিক। অস্ত্র জমা ৪৫ দিনে, কিন্তু কোটা চলবে ‘সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত’, আর চুক্তি বলবৎ থাকবে ‘সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত’। যেখানে এক পক্ষের কাজ, সেখানে তারিখ; যেখানে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, সেখানে শর্ত।

দুই — ব্যতিক্রম সবসময় নাম ধরে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ, রক্ষিত বনাঞ্চল, রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা, আলীকদম-রুমা-দীঘিনালা — চুক্তি কখনো ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ জাতীয় অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করে না, নাম লিখে দেয়।

তিন — ‘পরামর্শ’, ‘আলোচনা’ ও ‘সম্মতি’ আলাদা। জেলা পরিষদের জমি-সংক্রান্ত দফায় সরকারের অধিগ্রহণে লাগে সম্মতি; আইন প্রণয়নে লাগে আলোচনা ও পরামর্শ; বিধি প্রণয়নে আলোচনা। তিনটি ভিন্ন মাত্রার শব্দ, এবং কোথায় কোনটি — তা ইচ্ছাকৃত।

চার — প্রতিটি অধিকারের পাশে একটি শর্ত। ক্ষমা আছে, কিন্তু সময়মতো অস্ত্র জমার শর্তে। নিয়োগে অগ্রাধিকার আছে, কিন্তু যোগ্য প্রার্থী না থাকলে প্রেষণের বিধান। দুই একর জমি আছে, কিন্তু ‘স্থানীয় এলাকায় জমির লভ্যতা সাপেক্ষে’।

এই চতুর্থ ধরনটিই সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দেয় — কারণ শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে দুই পক্ষের উত্তর আলাদা হতে পারে।

দফা ধরে ধরে: কী ছিল, আইনে কী দাঁড়াল

‘কতটা হলো’ প্রশ্নের উত্তর সাধারণত রাজনৈতিক বিতর্কের ভাষায় দেওয়া হয়। কিন্তু চুক্তির দফা ও পরবর্তী আইনের ধারা শব্দে-শব্দে মিলিয়ে দেখলে উত্তরটি অনেক নির্দিষ্ট হয় — কিছু জায়গায় হুবহু মিল, কিছু জায়গায় শব্দ বদলে গেছে, আর কিছু দফা আইনে আসেইনি।

নিচের ছকটি এই আর্কাইভের কয়েকটি লেখায় করা ধারা-মিলানোর সারাংশ।

চুক্তির দফাআইনেফল
(গ)৩ — আঞ্চলিক পরিষদে ২২ সদস্য, আসন-বণ্টনসহআঞ্চলিক পরিষদ আইন ৫ ধারাহুবহু
(গ)২ — চেয়ারম্যান উপজাতীয়, প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাএকই আইন ৭ ও ১১ ধারাহুবহু
(গ)৭ — মুখ্য নির্বাহী যুগ্ম-সচিব, উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারএকই আইন ২৮ ধারাহুবহু
(খ) — জমি হস্তান্তরে পরিষদের পূর্বানুমোদনজেলা পরিষদ আইন ৬৪ ধারাহুবহু
(খ) — ভূমি উন্নয়ন কর পরিষদের তহবিলেজেলা পরিষদ আইন ৬৫ ধারাহুবহু
(ঘ)৪ — ভূমি কমিশন, আপিল নেইকমিশন আইন ১৬ ধারাহুবহু
(ঘ)৫ — কমিশনের পাঁচ সদস্যকমিশন আইন ৩(২)হুবহু (ক্রম আলাদা)
(গ)১৩ — আইন প্রণয়নে “ইহার পরামর্শক্রমে”আঞ্চলিক পরিষদ আইন ৫৩(১) — “পরামর্শ বিবেচনাক্রমে”শব্দ বদলেছে
(গ)৯(ঙ) — প্রথাগত আইন পরিষদের “আওতাভুক্ত”একই আইন ২২(ঙ) — “সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান”শব্দ বদলেছে
(ঘ)৪ — কমিশনের “পূর্ণ ক্ষমতা”, জলেভাসা জমিতেও প্রযোজ্যকমিশন আইন ৬(১)(গ) — কাপ্তাই ও বেতবুনিয়ার ব্যতিক্রম যোগশর্ত যোগ হয়েছে
(গ)১১ — ১৯০০ শাসনবিধি ও ১৯৮৯ আইনের অসঙ্গতি দূর করাসমতুল্য বিধান নেইআইনে আসেনি

ছকটি তিন ধরনের ফল দেখায়, আর তিনটিই আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এক — যা হুবহু এসেছে

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায় পুরোটাই আইনে এসেছে। আঞ্চলিক পরিষদের গঠন, আসন-বণ্টন, চেয়ারম্যানের মর্যাদা, ভূমি কমিশনের সদস্য-তালিকা, জেলা পরিষদের ভূমি-ক্ষমতা — এগুলোর ক্ষেত্রে চুক্তি ও আইনের ভাষা প্রায় অভিন্ন।

এটি ছোট অর্জন নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে তৈরি হয়েছে, এবং তাদের গঠন চুক্তিতে যা লেখা ছিল তা-ই।

দুই — যেখানে শব্দ বদলেছে

দুটি জায়গায় পরিবর্তনটি এক-দুই শব্দের, কিন্তু ফল ভিন্ন।

‘পরামর্শক্রমে’ থেকে ‘পরামর্শ বিবেচনাক্রমে’। প্রথমটি মানে পরামর্শ অনুসারে — বাধ্যবাধকতা। দ্বিতীয়টি মানে পরামর্শ বিবেচনা করে — বিবেচনার পর ভিন্ন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায়।

‘আওতাভুক্ত’ থেকে ‘তত্ত্বাবধান’। প্রথমটি এখতিয়ার, দ্বিতীয়টি তদারকি।

এই ধরনের পরিবর্তন সাধারণ পাঠকের চোখে পড়ে না, অথচ ক্ষমতার প্রশ্নে এগুলোই নির্ণায়ক।

তিন — যা আসেনি

চুক্তির (গ)১১ দফায় প্রতিশ্রুতি ছিল, ১৯০০ সালের শাসনবিধি ও ১৯৮৯ সালের আইনগুলোর মধ্যে যেসব অসঙ্গতি আছে তা আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে আইনের মাধ্যমে দূর করা হবে।

১৯৯৮ সালের আইনে এর কোনো সমতুল্য বিধান নেই। ৫৩ ধারা ভবিষ্যৎ আইন নিয়ে; বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করার কোনো নির্দেশ কোথাও নেই।

এই ফাঁকটি তাত্ত্বিক নয়। জুম চাষের নিয়ন্ত্রণ ১৯০০ সালের ৪১ বিধিতে জেলা প্রশাসকের, আর চুক্তি অনুযায়ী তা জেলা পরিষদের দায়িত্বের তালিকায়। ভূমি হস্তান্তরে ৩৪ বিধি বলে জেলা প্রশাসক, ৬৪ ধারা বলে পরিষদের পূর্বানুমোদন। কোনটি প্রাধান্য পাবে — সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তির পথটিই আইনে তৈরি হয়নি।

কেন মূল পাঠ পড়া দরকার

এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা সাধারণত দুই মেরুতে চলে — এক পক্ষ বলে চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে, অন্য পক্ষ বলে হয়নি। দুটি দাবিই সাধারণীকরণ, আর দুটিই মূল পাঠ না পড়ে যাচাই করা যায় না।

মূল পাঠ পড়লে যা পাওয়া যায়:

  • নির্দিষ্ট সংখ্যা। ৪৫ দিন, ৫০,০০০ টাকা, ২২ সদস্য, দুই একর, ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাস — প্রতিটি যাচাইযোগ্য।
  • নির্দিষ্ট শর্ত। ক্ষমা শর্তসাপেক্ষ; কোটার মেয়াদ ফলাফলভিত্তিক; ক্যাম্প প্রত্যাহার কেবল অস্থায়ী ক্যাম্পের।
  • নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম। কাপ্তাই, বেতবুনিয়া, রক্ষিত বনাঞ্চল, রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা — এগুলোর নাম চুক্তিতেই আছে।

এই তিনটি জিনিস জানা থাকলে ‘বাস্তবায়িত হয়েছে কি না’ প্রশ্নটি আর একটি হ্যাঁ-না প্রশ্ন থাকে না — দফা ধরে ধরে উত্তর দেওয়া যায়।

এই লেখার সীমা

এটি চুক্তি ও আইন কী বলে তার বিবরণ, বাস্তবে কী ঘটেছে তার নয়। কত অস্ত্র জমা পড়েছে, কতজন শরণার্থী ফিরেছেন, কতগুলো ক্যাম্প প্রত্যাহার হয়েছে, উপদেষ্টা কমিটি কতবার বসেছে — এসবের কোনো সংখ্যা এখানে ব্যবহার করা হয়নি, কারণ যাচাইযোগ্য সরকারি উৎস এই কাজে ব্যবহার করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, চুক্তির খণ্ড (খ)-এ ধারা-নম্বর ধরে বহু সংশোধন প্রস্তাব আছে; এখানে কেবল সেগুলোই তুলে ধরা হয়েছে যেগুলো পরবর্তী আইনে মিলিয়ে দেখা গেছে। বাকিগুলো ধারা ধরে ধরে যাচাই করা হয়নি।

তৃতীয়ত, চুক্তির পর তিন দশকে আইনগুলো আরও সংশোধিত হয়েছে। bdlaws-এর পাঠে সংশোধিত অংশ বর্গাকার বন্ধনীতে চিহ্নিত, কিন্তু প্রতিটি সংশোধনীর তারিখ ও প্রভাব আলাদা করে মিলিয়ে দেখা হয়নি।

যা এখনো জানা যায়নি

  • বাস্তবায়িত ধারার সরকারি সংখ্যা। সরকারি পক্ষের নির্দিষ্ট হিসাব কোনো প্রাথমিক সরকারি নথিতে এই কাজে যাচাই করা যায়নি। আর্কাইভে জনসংহতি সমিতির মূল্যায়ন আছে, সরকারি প্রতিবেদন নেই।
  • ‘খ’, ‘গ’ ও ‘ঘ’ খণ্ডের বিস্তারিত। এই লেখায় মূলত ‘ক’ খণ্ড ও বাস্তবায়নের প্রশ্নটি ধরা হয়েছে; বাকি তিন খণ্ডের ধারাভিত্তিক পাঠ আলাদা লেখার বিষয়।
  • ভূমি কমিশনের ফল। কমিশনে কত আবেদন জমা পড়েছে ও কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে, কোনো সংখ্যা পাওয়া যায়নি।
  • “বাস্তবায়িত” শব্দের সংজ্ঞা। আইন হওয়া আর আইন কার্যকর হওয়া — কোনটিকে বাস্তবায়ন ধরা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের সংজ্ঞা এক নয়। এই অমিলটি নিজেই বিতর্কের একটি বড় অংশ।

আরও পড়তে

চুক্তির প্রতিটি খণ্ড কীভাবে আইনে রূপ পেয়েছে, তা ধারা ধরে ধরে দেখা হয়েছে এই আর্কাইভের আলাদা লেখাগুলোতে:

তথ্যসূত্র

  1. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ — পূর্ণ পাঠ জুমজার্নাল আর্কাইভে সংরক্ষিত (‘ক’ খণ্ড, দফা ১–৩)
  2. জুমজার্নাল আর্কাইভ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার — জনসংহতি সমিতির মূল্যায়ন
  3. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮, ধারা ২২ — তত্ত্বাবধান ও সমন্বয়ের ক্ষমতা
  4. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ (২০০১ সনের ৫৩ নং আইন)

পদ্ধতি সম্পর্কে। চুক্তির উদ্ধৃতিগুলো রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বাংলা পাঠ থেকে, খণ্ড ও দফা ধরে ধরে নেওয়া। ওই দলিলটি পুরনো ফন্ট-এনকোডিংয়ে প্রকাশিত; ইউনিকোডে রূপান্তরের পর প্রতিটি উদ্ধৃত অনুচ্ছেদ মূল পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। আইনের উদ্ধৃতিগুলো bdlaws.minlaw.gov.bd-এর সরকারি বাংলা পাঠ থেকে। চুক্তির শেষে লেখা আছে এটি বাংলা ভাষায় প্রণীত — অর্থাৎ বাংলা পাঠটিই মূল, কোনো অনুবাদ নয়।

সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ আগস্ট ২০২৬

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
[DISPLAY_ULTIMATE_SOCIAL_ICONS]

আরও কিছু লেখা