icon

পার্বত্য জেলা পরিষদে আসন ভাগ হয় কীভাবে

Jumjournal

Published on Oct 6th, 2026 icon 2

পার্বত্য জেলা পরিষদে কে বসবেন, তা কেবল ভোটে ঠিক হয় না — আইনেই লেখা আছে কোন জনগোষ্ঠীর জন্য কয়টি আসন। রাঙামাটির ক্ষেত্রে সংখ্যাটি এতটাই নির্দিষ্ট যে খেয়াংদের জন্য একটি, পাংখোয়াদের জন্য একটি, তঞ্চঙ্গ্যাদের জন্য দুটি আসন আলাদা করে বরাদ্দ।

এই লেখাটি ১৯৮৯ সালের রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের মূল পাঠ ধরে সেই বণ্টন দেখাচ্ছে।

পরিভাষা নিয়ে একটি কথা: আইনের পাঠে “উপজাতীয়” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে সেটি দলিলের নিজের শব্দ হিসেবে উদ্ধৃত — জুমজার্নালের নিজস্ব ব্যবহার আদিবাসী।

সংক্ষেপে। তিন জেলাতেই পরিষদে ৩৪টি পদ, কিন্তু উপজাতীয়-অউপজাতীয় ভাগ আলাদা — রাঙামাটি ২০/১০, খাগড়াছড়ি ২১/৯, বান্দরবান ১৯/১১। উপজাতীয় আসনগুলো জনগোষ্ঠী ধরে ধরে ভাগ করা, আর কে কোন জনগোষ্ঠীর তা নির্ধারণ করেন সার্কেল চীফ। চেয়ারম্যান অবশ্যই উপজাতীয়, তবে যেকোনো উপজাতীয় নারী সেই পদে দাঁড়াতে পারেন।

নিচে তিন জেলার বণ্টন পাশাপাশি, সঙ্গে ভোটার হওয়ার শর্ত, নির্বাচন না হলে কী হয়, প্রথাগত বিচারের আপিল-সিঁড়ি, এবং পুলিশ ও ভূমি নিয়ে পরিষদের ক্ষমতা।

পরিষদে মোট কতজন

আইনের ৪(১) ধারা অনুযায়ী রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয় চেয়ারম্যান, ২০ জন উপজাতীয় সদস্য, ১০ জন অ-উপজাতীয় সদস্য এবং ৩ জন মহিলা সদস্য নিয়ে। মহিলা সদস্যদের মধ্যে দুজন উপজাতীয়, একজন অ-উপজাতীয়।

সব মিলিয়ে চেয়ারম্যানসহ ৩৪টি পদ। ৪(২) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও সব সদস্য জনসাধারণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন।

৪(৪) ধারায় আরেকটি শর্ত — চেয়ারম্যান উপজাতীয়দের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হবেন।

২০টি আসন সাত জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেভাবে ভাগ

এটিই আইনের সবচেয়ে নির্দিষ্ট অংশ। ৪(৩) ধারা ২০টি উপজাতীয় আসন সাতটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে, নাম ধরে ধরে:

জনগোষ্ঠী আসন
চাকমা১০
মারমা৪
তঞ্চঙ্গ্যা২
ত্রিপুরা১
লুসাই১
পাংখোয়া১
খেয়াং১

ছকটি পড়লে দুটি জিনিস চোখে পড়ে। প্রথমত, চাকমারা একাই অর্ধেক — ২০টির ১০টি। দ্বিতীয়ত, রাঙামাটিতে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠী এই তালিকায় নেই; যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্য সংখ্যাটি আইনে স্থির করা।

তিন জেলার বণ্টন পাশাপাশি

রাঙামাটির ছকটি একা দেখলে অর্ধেক ছবি পাওয়া যায়। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের আইন দুটিও একই কাঠামোয় লেখা, কিন্তু বণ্টন তিন জায়গায় তিন রকম — কারণ জনমিতিও তিন রকম।

 রাঙামাটিখাগড়াছড়িবান্দরবান
উপজাতীয় সদস্য২০২১১৯
অ-উপজাতীয় সদস্য১০৯১১
মহিলা সদস্য (২ উপজাতীয় + ১ অ-উপজাতীয়)৩৩৩
চেয়ারম্যান১১১
মোট৩৪৩৪৩৪

মোট সংখ্যা তিন জেলাতেই ৩৪, কিন্তু উপজাতীয়-অউপজাতীয় ভাগ আলাদা। বান্দরবানে উপজাতীয় আসন সবচেয়ে কম (১৯) ও অ-উপজাতীয় সবচেয়ে বেশি (১১); খাগড়াছড়িতে উল্টো।

খাগড়াছড়ি: তিন জনগোষ্ঠী, ২১ আসন

খাগড়াছড়ির ৪(৩) ধারায় বণ্টন সবচেয়ে সরল — মাত্র তিনটি জনগোষ্ঠীর নাম:

জনগোষ্ঠীআসন
চাকমা৯
ত্রিপুরা৬
মারমা৬

রাঙামাটিতে ত্রিপুরাদের একটি আসন, খাগড়াছড়িতে ছয়টি — জেলাভিত্তিক জনমিতির প্রতিফলন। আর খাগড়াছড়ির তালিকায় অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর নাম নেই।

বান্দরবান: আট ভাগ, আর সবচেয়ে বেশি যৌথ আসন

বান্দরবানের ৪(৩) ধারা সবচেয়ে জটিল — ১৯টি আসন আট ভাগে, এবং তিনটি ভাগে একাধিক জনগোষ্ঠী একসঙ্গে:

যাঁদের জন্যআসনমন্তব্য
মারমা ও খিয়াং১০যৌথ
ম্রো (মুরং)৩একক
ত্রিপুরা ও উচাই১যৌথ
তঞ্চঙ্গ্যা১একক
বম, লুসাই ও পাংখোয়া১তিন জনগোষ্ঠী মিলে একটি
চাকমা১একক
খুমী১একক
চাক১একক

তিনটি ছক পাশাপাশি রাখলে যা দাঁড়ায়, তা এক লাইনে বলা যায়: একই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের হিসাব জেলা বদলালেই বদলে যায়।

খেয়াংদের রাঙামাটিতে নিজস্ব একটি আসন, বান্দরবানে মারমাদের সঙ্গে ভাগাভাগি — যেখানে মারমাদের সংখ্যা অনেক বেশি। পাংখোয়াদের রাঙামাটিতে নিজস্ব আসন, বান্দরবানে বম ও লুসাইয়ের সঙ্গে যৌথ। তঞ্চঙ্গ্যাদের রাঙামাটিতে দুটি, বান্দরবানে একটি, খাগড়াছড়ির তালিকায় নাম নেই। চাকমাদের রাঙামাটিতে দশটি, খাগড়াছড়িতে নয়টি, বান্দরবানে একটি।

আর আঞ্চলিক পরিষদে গিয়ে হিসাবটি আরও সংকুচিত হয় — সেখানে লুসাই, বম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং ছয় জনগোষ্ঠী মিলে একটিমাত্র আসন।

একই জনগোষ্ঠী, তিন জেলায় তিন হিসাব

পার্থক্যটি ছকে দেখলে সবচেয়ে স্পষ্ট।

জনগোষ্ঠীরাঙামাটিখাগড়াছড়িবান্দরবান
চাকমা১০৯১
মারমা৪৬১০ (খিয়াংসহ যৌথ)
ত্রিপুরা১৬১ (উচাইসহ যৌথ)
তঞ্চঙ্গ্যা২তালিকায় নেই১
খেয়াং১ (নিজস্ব)তালিকায় নেইমারমার সঙ্গে যৌথ
পাংখোয়া১ (নিজস্ব)তালিকায় নেইবম-লুসাইয়ের সঙ্গে যৌথ
লুসাই১ (নিজস্ব)তালিকায় নেইবম-পাংখোয়ার সঙ্গে যৌথ
ম্রোতালিকায় নেইতালিকায় নেই৩
খুমীতালিকায় নেইতালিকায় নেই১
চাকতালিকায় নেইতালিকায় নেই১
বমতালিকায় নেইতালিকায় নেইলুসাই-পাংখোয়ার সঙ্গে যৌথ
উচাইতালিকায় নেইতালিকায় নেইত্রিপুরার সঙ্গে যৌথ

‘তালিকায় নেই’ মানে ওই জেলায় ওই জনগোষ্ঠীর কেউ থাকেন না, তা নয় — মানে সেই আইনের ৪(৩) ধারায় তাঁদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আসন লেখা নেই।

লুসাই ও পাংখোয়ারা রাঙামাটিতে নিজস্ব আসন পান, বান্দরবানে বমের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়। খেয়াংরা রাঙামাটিতে নিজস্ব, বান্দরবানে মারমাদের সঙ্গে যৌথ — যেখানে যৌথ আসনের সংখ্যা দশ, কিন্তু ওই দশটিতে খেয়াং প্রার্থীকে মারমা প্রার্থীদের সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়।

উচাই — যে নামটি কেবল একটি আইনে আছে

বান্দরবানের তালিকায় উচাই নামটি আছে, ত্রিপুরাদের সঙ্গে যৌথ আসনে। রাঙামাটি বা খাগড়াছড়ির আইনে এই নামটি নেই, আর আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২(গ) ধারার এগারোটির তালিকাতেও নেই।

একই অঞ্চলের চারটি আইনে জনগোষ্ঠীর তালিকা অভিন্ন নয় — এটি নিছক খুঁটিনাটি নয়, কারণ তালিকাই ঠিক করে দেয় কে কোন আসনে প্রার্থী হতে পারবেন।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

কে ঠিক করেন আপনি কোন জনগোষ্ঠীর

আসন যখন জনগোষ্ঠী ধরে ভাগ করা, তখন একটি প্রশ্ন অনিবার্য — কে উপজাতীয় আর কে কোন উপজাতির, সেটি নির্ধারণ করেন কে? আইনের ৪(৫) ধারায় উত্তর স্পষ্ট, এবং উত্তরটি প্রশাসনের কাছে নেই।

কোনো ব্যক্তি উপজাতীয় কি না এবং হলে তিনি কোন উপজাতির সদস্য, তা স্থির করেন জেলার সার্কেল চীফ। আর সেখানেই শেষ নয় — সার্কেল চীফের কাছ থেকে পাওয়া সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ উপজাতীয় হিসেবে চেয়ারম্যান বা কোনো উপজাতীয় সদস্যপদের প্রার্থী হতে পারবেন না।

এটি একটি অসাধারণ ব্যবস্থা। ১৯৮৯ সালের একটি আধুনিক পরিষদ-আইন প্রার্থিতার একটি মৌলিক শর্ত পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে একজন প্রথাগত পদাধিকারীর হাতে। নির্বাচন কমিশন নয়, জেলা প্রশাসক নয় — সার্কেল চীফ।

তিনটি আইনেই এই বিধান অভিন্ন, কেবল সংশ্লিষ্ট জেলার সার্কেল চীফ আলাদা।

সার্টিফিকেট প্রত্যাখ্যাত হলে তার বিরুদ্ধে আপিলের কোনো ব্যবস্থা ৪(৫) ধারায় লেখা নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

আইন কাকে কী বলে: ২ ধারার সংজ্ঞা

আসন-বণ্টন ও ভোটার তালিকা — দুটোই ২ ধারার সংজ্ঞার উপর দাঁড়িয়ে। তিনটি সংজ্ঞা আলাদা করে দেখার মতো।

‘উপজাতীয়’ মানে সাতটি জনগোষ্ঠী

রাঙামাটির আইনে ২(খ) ধারায় “উপজাতীয়” অর্থ — রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া ও খেয়াং উপজাতির সদস্য।

এই সাতটিই ৪(৩) ধারার আসন-তালিকার সাতটি। অর্থাৎ সংজ্ঞা ও বণ্টন একে অপরের সঙ্গে বন্ধ — তালিকার বাইরের কেউ এই আইনের অর্থে ‘উপজাতীয়’ নন, আর ২(ক) ধারা অনুযায়ী “অ-উপজাতীয়” মানে “যিনি উপজাতীয় নহেন”।

ফলে রাঙামাটিতে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি যদি এই সাতটির বাইরের কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য হন, আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি কারিগরিভাবে অ-উপজাতীয় শ্রেণিতে পড়ে যান।

‘সার্কেল চীফ’ মানে কোন চীফ

৪(৫) ধারায় সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষমতা যাঁর, তিনি কে — সেটিও সংজ্ঞায়িত। রাঙামাটির আইনে ২(ঞ) ধারা অনুযায়ী “সার্কেল চীফ” অর্থ চাকমা চীফ।

অর্থাৎ রাঙামাটি জেলা পরিষদের যেকোনো উপজাতীয় আসনের প্রার্থীকে — তিনি মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া বা খেয়াং যা-ই হোন — জাতিসত্তার সার্টিফিকেট নিতে হয় চাকমা চীফের কাছ থেকে।

এটি কাঠামোর একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য: সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষমতা জনগোষ্ঠী ধরে নয়, সার্কেল ধরে। বান্দরবানের ক্ষেত্রে বোমাং চীফ, খাগড়াছড়ির ক্ষেত্রে মং চীফ — কারণ সার্কেলের সীমা ও জেলার সীমা মোটামুটি মেলে।

একটি শব্দের পার্থক্য: ‘বা’ বনাম ‘এবং’

সবচেয়ে সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’-র সংজ্ঞায়, আর সেটি ধরা পড়ে কেবল দুটি আইন পাশাপাশি রাখলে।

জেলা পরিষদ আইন, ২(কক): “অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা” অর্থ যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাঁহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে বা যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণতঃ বসবাস করেন।

আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ২(খ): …যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং উক্ত জেলার কোন সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় তিনি সাধারণতঃ বসবাস করেন।

জেলা পরিষদের সংজ্ঞায় শর্তটি বিকল্প — জমি থাকলেই হয়, অথবা বসবাস করলেই হয়। আঞ্চলিক পরিষদের সংজ্ঞায় শর্তটি সংযুক্ত — দুটোই লাগে।

একটি শব্দ, কিন্তু ফল আলাদা। জেলা পরিষদের ভোটার তালিকায় ওঠার শর্ত তুলনামূলক শিথিল; আঞ্চলিক পরিষদের সদস্যপদের শর্ত কড়া।

দুটি আইনে দুই রকম সংজ্ঞা কেন — তার কোনো ব্যাখ্যা আইনের পাঠে নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

‘স্থানীয় কর্তৃপক্ষ’ কারা

২(জ) ধারা অনুযায়ী “স্থানীয় কর্তৃপক্ষ” অর্থ পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ। এই সংজ্ঞাটি ৫৪ ও ৫৫ ধারার জন্য প্রয়োজন, যেখানে অন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথ কাজ ও বিরোধের কথা আছে।

আর ২(ঘঘ) অনুযায়ী “নির্বাচন কমিশন” অর্থ সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের অধীন গঠিত নির্বাচন কমিশন — অর্থাৎ জাতীয় কমিশনই, আলাদা কোনো কর্তৃপক্ষ নয়।

পদ কখন যায়

১২ ধারায় অপসারণের কারণ ও পদ্ধতি — আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ১৪ ধারার প্রায় হুবহু।

তিনটি কারণ: যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিতি; দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি বা শারীরিক-মানসিক অসামর্থ্য; এবং অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দোষ, কিংবা পরিষদের অর্থ-সম্পত্তির ক্ষতিসাধন বা আত্মসাতের দায়।

‘অসদাচরণ’-এর সংজ্ঞাও আইনেই: ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ইচ্ছাকৃত কুশাসন।

পদ্ধতিটি দুই স্তরের। বিধি অনুযায়ী আহূত বিশেষ সভায় মোট সদস্য-সংখ্যার অন্তত তিন-চতুর্থাংশ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হতে হবে, এবং প্রস্তাবটি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ দিতে হবে।

আর ১২(৪) ধারায় একটি অতিরিক্ত ফল: এভাবে অপসারিত ব্যক্তি পরিষদের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য কোনো পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।

সভা কীভাবে চলে

২৫ ধারায় সভা-সংক্রান্ত চারটি বিধান, আর সেগুলোও আঞ্চলিক পরিষদ আইনের সমান্তরাল।

সব সভায় সভাপতিত্ব করেন চেয়ারম্যান; তাঁর অনুপস্থিতিতে উপস্থিত সদস্যরা উপজাতীয় সদস্যদের মধ্য থেকেই একজনকে সভাপতি নির্বাচিত করেন (২৫(২))।

সদস্যপদ শূন্য থাকলে, গঠনে ত্রুটি থাকলে, বা অধিকার না থাকা সত্ত্বেও কেউ কার্যধারায় অংশ নিলে — কেবল সেই কারণে পরিষদের কাজ অবৈধ হবে না (২৫(৩))।

আর প্রত্যেক সভার কার্যবিবরণীর একটি অনুলিপি সভার চৌদ্দ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে পাঠাতে হবে (২৫(৪))।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

ভোটার কারা

প্রার্থিতার শর্তের পাশে ভোটার তালিকার শর্তও জানা দরকার। ১৭ ধারা অনুযায়ী চারটি শর্ত:

  • বাংলাদেশের নাগরিক;
  • অন্যূন আঠারো বছর বয়স;
  • কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষিত নন; এবং
  • সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা।

চতুর্থ শর্তটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — সাধারণ সংসদ নির্বাচনের মতো কেবল বসবাস নয়, স্থায়ী বাসিন্দা হতে হয়। ‘স্থায়ী বাসিন্দা’ কে, তার সংজ্ঞা ২ ধারায় দেওয়া, আর তাতে অ-উপজাতীয়দের জন্য জমির শর্ত রয়েছে।

ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে নির্বাচন কমিশন (১৭(২))। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বও কমিশনের (২০ ধারা)। ১৮ ধারা অনুযায়ী তালিকায় নাম থাকলেই ভোট দেওয়ার অধিকার জন্মায়।

আর ১৯ ধারায় একটি সীমা: কেউ একই সঙ্গে চেয়ারম্যান ও উপজাতীয় সদস্যপদে প্রার্থী হতে পারবেন না।

নারী সদস্যদের ক্ষেত্রে কোটা নেই

উপজাতীয় পুরুষ সদস্যদের জন্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক কোটা থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে নেই। ৪(১)(ঘ) ধারার ব্যাখ্যায় স্পষ্ট লেখা — উপজাতীয় মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রে জেলার বিভিন্ন উপজাতির জন্য কোনো কোটা থাকবে না।

অর্থাৎ দুটি সংরক্ষিত নারী আসনে যেকোনো জনগোষ্ঠীর নারী নির্বাচিত হতে পারেন। এতে ছোট জনগোষ্ঠীর নারীদের সামনে একটি বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়, আবার বড় জনগোষ্ঠীর প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে হয়।

৪(৪ক) ধারায় আরেকটি সুযোগ রাখা আছে: যেকোনো উপজাতীয় নারী চেয়ারম্যান পদে, এবং ৪(৩)-এ উল্লিখিত যেকোনো জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত সদস্যপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। অ-উপজাতীয় নারীরা অ-উপজাতীয় সদস্যপদে।

নির্বাচন না হলে কী হয়

আইনে মেয়াদ পাঁচ বছর (১০ ধারা), আর সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ষাট দিনের মধ্যে (১৬ ধারা)। কিন্তু না হলে? এই প্রশ্নের উত্তর ১৬ক ধারায়, এবং ধারাটি পরে যুক্ত হয়েছে।

১৬ক(১) অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন না হলে মেয়াদ সমাপ্তির তারিখেই পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে, এবং পরিষদের যাবতীয় ক্ষমতা ও দায়িত্ব বর্তাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের উপর।

অন্তর্বর্তী পরিষদের গঠন

১৬ক(২) অনুযায়ী সরকার একজন চেয়ারম্যান (যিনি উপজাতীয় হবেন) ও চৌদ্দ জন সদস্য নিয়ে অন্তর্বর্তী পরিষদ গঠন করবে — সবাই মনোনীত। রাঙামাটির ক্ষেত্রে ভাগটি এরকম:

যাঁদের মধ্য থেকেসদস্য
চাকমা৪
মারমা১
খিয়াং, লুসাই ও পাংখোয়া১ (তিন জনগোষ্ঠী মিলে)
তঞ্চঙ্গ্যা১
ত্রিপুরা১
অ-উপজাতীয়৩
উপজাতীয় মহিলা১
অ-উপজাতীয় মহিলা১

এই ছকটি নির্বাচিত পরিষদের ছকের পাশে রাখলে একটি জিনিস স্পষ্ট হয়। নির্বাচিত পরিষদে খেয়াং, লুসাই ও পাংখোয়া প্রত্যেকে নিজস্ব একটি করে আসন পান। অন্তর্বর্তী পরিষদে তিন জনগোষ্ঠী মিলে একটি।

অর্থাৎ নির্বাচন না হওয়ার সবচেয়ে সরাসরি ক্ষতি হয় ছোট জনগোষ্ঠীগুলোর — তিনটি কণ্ঠ কমে একটিতে দাঁড়ায়। আর মোট সদস্যসংখ্যাও ৩৪ থেকে নেমে ১৫-তে আসে।

মেয়াদহীন ব্যবস্থা

১৬ক(৩) অনুযায়ী ১৬ ধারার অধীনে নির্বাচিত নতুন পরিষদ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত অন্তর্বর্তী পরিষদ কাজ চালিয়ে যাবে। ধারাটিতে কোনো সময়সীমা নেই।

১৬ক(৪) অনুযায়ী সরকার প্রয়োজনবোধে অন্তর্বর্তী পরিষদ পুনর্গঠন করতে পারবে — অর্থাৎ মনোনীত সদস্যদের বদলানোও সরকারের হাতে।

আর ১৬ক(৬) ধারায় একটি অগ্রাধিকার-ধারা: “এই আইনের অন্যান্য ধারায় যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই ধারার বিধানাবলী কার্যকর হইবে।”

এই ছয়টি উপ-ধারা একসঙ্গে পড়লে ব্যবস্থাটির চেহারা দাঁড়ায়: নির্বাচন না হলে পরিষদ আপনা-আপনি বাতিল, ক্ষমতা যায় সম্পূর্ণ মনোনীত একটি পরিষদে, তার মেয়াদ নির্দিষ্ট নয়, এবং সরকার চাইলে তা পুনর্গঠন করতে পারে।

বাস্তবে এ পর্যন্ত কতবার সাধারণ নির্বাচন হয়েছে বা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কত দিন চলেছে, তার নির্ভরযোগ্য নথি এই কাজে ব্যবহার করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

পরিষদ আসলে কী কী দেখে

২২ ধারা অনুযায়ী পরিষদের কার্যাবলী হলো প্রথম তফসিলে উল্লিখিত কার্যাবলী, আর পরিষদ তার তহবিলের সংগতি অনুযায়ী সেগুলো সম্পাদন করবে।

প্রথম তফসিলের পূর্ণ তালিকা এই কাজে আলাদা করে পড়া হয়নি। তবে ১৯৯৭ সালের চুক্তির (খ) খণ্ডে জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল, সেই তালিকাটি পাওয়া যায় — এবং সেটি পরিধি বুঝতে যথেষ্ট:

বিষয়মন্তব্য
ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা৬৪ ও ৬৫ ধারায় বিস্তারিত
পুলিশ (স্থানীয়)৬২ ধারায় বিস্তারিত
উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার৬৬ ধারায় বিস্তারিত
যুব কল্যাণ—
পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন—
স্থানীয় পর্যটন—
ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানপৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ বাদে
স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স প্রদানভারী শিল্পের লাইসেন্স আঞ্চলিক পরিষদের
নদী-নালা, খাল-বিলের ব্যবহার ও সেচ ব্যবস্থাকাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ বাদে
জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান সংরক্ষণ—
মহাজনী কারবারঋণ ও সুদের কারবার
জুম চাষশাসনবিধির ৪১ ধারায় এটি জেলা প্রশাসকের

শেষ সারিটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ১৯০০ সালের শাসনবিধির ৪১ ধারায় জুম চাষের নিয়ন্ত্রণ জেলা প্রশাসকের হাতে; চুক্তি অনুযায়ী তা জেলা পরিষদের দায়িত্বে আসার কথা। দুটি ব্যবস্থার সংঘর্ষ এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট।

আর ‘কাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ বাদে’ শর্তটি একই ধরনের ব্যতিক্রম, যা ৬৪ ধারার তালিকাতেও দেখা গেছে।

কর, রেট, টোল ও ফিস

চুক্তির (খ) খণ্ডে দ্বিতীয় তফসিলে যুক্ত করার জন্য যে কর-উৎসগুলোর কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোও পরিষদের আর্থিক পরিসর বোঝায়:

  • অযান্ত্রিক যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ফি
  • পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের উপর কর
  • ভূমি ও দালান-কোঠার উপর হোল্ডিং কর
  • গৃহপালিত পশু বিক্রয়ের উপর কর
  • সামাজিক বিচারের ফিস
  • সরকারি ও বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর হোল্ডিং কর
  • বনজ সম্পদের উপর রয়্যালটির অংশবিশেষ
  • সিনেমা, যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদির উপর সম্পূরক কর
  • খনিজ সম্পদ অন্বেষণ বা নিষ্কর্ষণের অনুজ্ঞাপত্র বা পাট্টা থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির অংশবিশেষ
  • ব্যবসার উপর কর
  • লটারির উপর কর

দুটি রয়্যালটি-খাত এখানে গুরুত্বপূর্ণ — বনজ ও খনিজ সম্পদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে আয়ের একটি অংশ জেলা পরিষদের তহবিলে আসার কথা।

‘সামাজিক বিচারের ফিস’ খাতটিও লক্ষণীয় — এটি ৬৬(৪) ধারার সঙ্গে মেলে, যেখানে পরিষদকে বিচারপ্রার্থী ও আপিলকারীর ফিস নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

তবে ৪৪ ধারার শর্তটি মনে রাখা দরকার: এসব কর আরোপ করতে সরকারের পূর্বানুমোদন লাগে।

টাকা কোথায় জমা, কোথায় খরচ

৩৫ ধারা অনুযায়ী পরিষদের একটি নিজস্ব তহবিল থাকে, আর ৩৬ ধারা অনুযায়ী তহবিলের অর্থ রাখতে হয় কোনো সরকারি ট্রেজারিতে বা ট্রেজারির কার্য পরিচালনাকারী ব্যাংকে।

৩৭ ধারায় ব্যয়ের অগ্রাধিকার-ক্রম নির্ধারিত, আর আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ৩৪ ধারার মতোই প্রথমে আসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন।

বাজেট প্রণয়ন হয় প্রতি অর্থবছর শুরুর আগে (৩৮ ধারা), হিসাব রাখা হয় বিধি অনুযায়ী (৩৯ ধারা), আর নিরীক্ষা হয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের দ্বারা (৪০ ধারা)।

৪৩ ধারায় ব্যক্তিগত দায়ের বিধানও আছে — গাফিলতি বা অসদাচরণে পরিষদের অর্থ বা সম্পদের ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দায়ী থাকবেন।

জেলা পুলিশ কার অধীন

এই আইনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ধারাটি সম্ভবত ৬২ — কারণ পুলিশ সাধারণত স্থানীয় সরকারের বিষয় নয়।

ধারাটি শুরু হয় সেই পরিচিত অগ্রাধিকার-বাক্যে: “আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন”। এরপর বলা হয়েছে, জেলা পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর ও তার নিচের স্তরের সব সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হবেন, এবং পরিষদ তাঁদের বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।

নিয়োগে একটি অগ্রাধিকারও লেখা: জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় থাকবে।

সীমাটি কোথায়

ক্ষমতাটি নিরঙ্কুশ নয়, এবং সীমাগুলো ধারাতেই লেখা।

প্রথমত, সাব-ইনস্পেক্টর পর্যন্ত। এর উপরের স্তর — ইনস্পেক্টর, ওসি, পুলিশ সুপার — এই ধারার আওতায় নেই।

দ্বিতীয়ত, ৬২(২) অনুযায়ী পরিষদ-নিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের চাকরির শর্তাবলী, প্রশিক্ষণ, সাজসজ্জা, দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং পরিচালনা অন্যান্য জেলা পুলিশের অনুরূপ হবে, এবং জেলা পুলিশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সব আইন তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তৃতীয়ত, ৬২(৩) অনুযায়ী তাঁরা দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে পরিষদের কাছে দায়ী থাকবেন — তবে ধারায় একটি শর্তবাক্য যোগ করা আছে, “এতদ্‌সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনের বিধান অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ”।

আর ৬৩ ধারা অনুযায়ী জেলায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার তথ্য পরিষদের চেয়ারম্যানকে অবহিত করতে হয়।

এই ধারাগুলো বাস্তবে কতটা প্রয়োগ হয়েছে — পরিষদ কখনো নিজে সাব-ইনস্পেক্টর নিয়োগ করেছে কি না — তার কোনো নথি এই কাজে পাওয়া যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

ভূমি: চারটি নির্দিষ্ট বিধান

৬৪ ধারা ভূমি নিয়ে চারটি আলাদা কথা বলে, আর চারটিই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি-বিতর্কের কেন্দ্রে।

এক — পূর্বানুমোদন। জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ যেকোনো জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় বা অন্যবিধভাবে হস্তান্তর করা যাবে না।

ব্যতিক্রমের তালিকাটি অবশ্য বেশ লম্বা: রক্ষিত (reserved) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকারখানা, এবং সরকারের নামে রেকর্ডকৃত জমি।

দুই — অধিগ্রহণে সম্মতি। পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোনো প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ও তার সম্মতি ছাড়া সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাবে না। এখানে শব্দটি ‘সম্মতি’ — কেবল পরামর্শ নয়।

তিন — ভূমি প্রশাসনের কর্মীরা। ৬৪(২) অনুযায়ী হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যাদি পরিষদ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

এই ছয়টি পদ মিলেই মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসন — জমি মাপা থেকে রেকর্ড পর্যন্ত। উল্লেখযোগ্য, তালিকার প্রথম নামটি হেডম্যান, যিনি ১৯০০ সালের শাসনবিধি অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের নিয়োগ ও তাঁরই অধীন।

চার — কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমি। ৬৪(৩) অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমি (Fringe Land) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদেরকে বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।

এই চারটি বিধান ১৯৯৭ সালের চুক্তির (খ) খণ্ডে প্রস্তাবিত সংশোধনের প্রায় হুবহু ভাষায় — অর্থাৎ চুক্তির ওই প্রতিশ্রুতিগুলো আইনে রূপ পেয়েছে।

ভূমি উন্নয়ন কর

৬৫ ধারায় আরেকটি নির্দিষ্ট বিধান: জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হাতে ন্যস্ত থাকবে, এবং জেলায় আদায়কৃত সেই কর পরিষদের তহবিলে থাকবে।

এটি আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে একটি বড় পার্থক্য — সেখানে কর আরোপ বা আদায়ের কোনো ক্ষমতা আইনে দেওয়া হয়নি। জেলা পরিষদের আছে।

৪৪ ধারা অনুযায়ী পরিষদ সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে দ্বিতীয় তফসিলে উল্লিখিত সব বা যেকোনো কর, রেট, টোল ও ফিস আরোপ করতে পারে। অর্থাৎ কর-ক্ষমতা আছে, কিন্তু প্রতিটি আরোপে সরকারের আগাম অনুমোদন লাগে।

প্রথাগত বিচার: আপিল কোথায় যায়

আসন-বণ্টনের বাইরে এই আইনের একটি ধারা প্রথাগত বিচারব্যবস্থার পুরো সিঁড়িটি লিখে দিয়েছে, আর সেটি অন্য কোনো আইনে এত স্পষ্টভাবে নেই।

৬৬(১) ধারা অনুযায়ী জেলার বাসিন্দা উপজাতীয়দের মধ্যে কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা উপজাতীয় বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় কার্বারি বা হেডম্যানের কাছে উত্থাপন করতে হবে, এবং তিনি সংশ্লিষ্ট উপজাতীয়দের মধ্যে প্রচলিত রীতি-নীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করবেন।

এখানেই সেই সংযোগ — ১৯০০ সালের শাসনবিধিতে কার্বারির কোনো উল্লেখ নেই, অথচ ১৯৮৯ সালের এই আইনে কার্বারিকে প্রথম স্তরের বিচারক হিসেবে নাম ধরে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তিন ধাপের আপিল

স্তরকেধারা
প্রথমস্থানীয় কার্বারি বা হেডম্যান — প্রচলিত রীতি-নীতি অনুযায়ী৬৬(১)
আপিলক্ষেত্রবিশেষে চাকমা সার্কেলের চীফ বা বোমাং সার্কেলের চীফ৬৬(২)
চূড়ান্ত আপিলচট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার — তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত৬৬(৩)

শেষ ধাপে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে, যা লক্ষণীয়: আপিল নিষ্পত্তির আগে বিভাগীয় কমিশনার সংশ্লিষ্ট উপজাতি থেকে তাঁর মনোনীত অন্তত তিনজন উপজাতীয় বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করবেন।

অর্থাৎ প্রথাগত আইনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা একজন সরকারি কর্মকর্তার হাতে, কিন্তু তিনি একা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না — তিনজন বিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ বাধ্যতামূলক। তবে তাঁদের মনোনয়নও তাঁরই।

৬৬(৪) অনুযায়ী পরিষদ প্রবিধান দ্বারা এই বিরোধ নিষ্পত্তির বিচার পদ্ধতি এবং বিচারপ্রার্থী ও আপিলকারীর দেয় ফিস নির্ধারণ করতে পারে।

এই ধারাটি প্রথাগত আইনে নারীর অবস্থানের প্রশ্নেও প্রাসঙ্গিক — তঞ্চঙ্গ্যা নারীর সা-চি বা বাপদিন্যার বিরোধ এই সিঁড়ি ধরেই ওঠে, আর প্রতিটি ধাপেই সিদ্ধান্তের আসনে সাধারণত পুরুষ।

তিন স্তর একসঙ্গে দেখলে

পার্বত্য চট্টগ্রামে জেলা পরিষদ একা দাঁড়িয়ে নেই। উপরে ও নিচে আরও স্তর আছে, আর একই বিষয় প্রায়ই একাধিক স্তরের তালিকায় পড়ে।

বিষয়মৌজা (১৯০০)জেলা পরিষদ (১৯৮৯)আঞ্চলিক পরিষদ (১৯৯৮)
প্রথাগত বিচারকার্বারি ও হেডম্যান বসান৬৬ ধারায় স্বীকৃত, আপিল-সিঁড়ি নির্দিষ্ট২২(ঙ) — সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান
জুম চাষ৪১ — জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণচুক্তির তালিকায় পরিষদের দায়িত্ব—
ভূমি হস্তান্তর৩৪ — জেলা প্রশাসকের অনুমোদন৬৪ — পরিষদের পূর্বানুমোদন—
কর৪২, ৪৩ — জুম কর ও খাজনা৪৪, ৬৫ — সরকারের অনুমোদনক্রমেকর আরোপের ক্ষমতা নেই
মতবিরোধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত——২২(ক) — আঞ্চলিক পরিষদের

ছকটি একটি ধরন দেখায়। একই বিষয় একাধিক আইনে, ভিন্ন কর্তৃপক্ষের হাতে। জুম চাষের নিয়ন্ত্রণ ১৯০০ সালের বিধিতে জেলা প্রশাসকের, চুক্তি অনুযায়ী জেলা পরিষদের। ভূমি হস্তান্তরে ১৯০০ সালের বিধি বলে জেলা প্রশাসক, ১৯৮৯ সালের আইন বলে পরিষদের পূর্বানুমোদন।

এই অসঙ্গতিগুলো দূর করার একটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চুক্তির (গ)১১ দফায় ছিল — আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে আইনের মাধ্যমে তা দূর করার কথা। সেটি কতদূর হয়েছে, তা এই লেখার আওতার বাইরে।

আইনটি নিজের উদ্দেশ্য কী বলে

আইনের প্রস্তাবনায় কারণটি লেখা আছে সরাসরি — রাঙামাটি পার্বত্য জেলা “বিভিন্ন অনগ্রসর উপজাতি অধ্যুষিত একটি বিশেষ এলাকা” বিধায় এর সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের জন্য একটি পরিষদ স্থাপন করা প্রয়োজন।

এই ভাষাটি ১৯৮৯ সালের — শান্তিচুক্তির আট বছর আগের। আইনটি পাস হয়েছিল ৬ মার্চ ১৯৮৯, ১৯৮৯ সনের ১৯ নং আইন হিসেবে। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জন্যও একই কাঠামোয় আলাদা আইন আছে, আর জুমজার্নালের আর্কাইভে তিনটিরই পূর্ণ পাঠ সংরক্ষিত।

সরকার আর পরিষদ

ক্ষমতার তালিকা যত লম্বাই হোক, সরকারের সঙ্গে সম্পর্কটি না জানলে ছবিটি অসম্পূর্ণ থাকে। এই আইনে সম্পর্কটি তিন ধাপে সাজানো।

প্রথম ধাপ: সম্মতি লাগে সরকারের

২৩ ধারা অনুযায়ী সরকার পরিষদের সম্মতিক্রমে কিছু বিষয় করতে পারে — অর্থাৎ এখানে সম্মতির প্রয়োজন সরকারের দিকেই।

উল্টো দিকে ৩২ ধারা অনুযায়ী পরিষদ নিজের কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ সৃষ্টি করতে পারে সরকারের অনুমোদনক্রমে, আর ৪৪ ধারার কর আরোপেও সরকারের পূর্বানুমোদন লাগে।

দ্বিতীয় ধাপ: নির্দেশ ও তদন্ত

৫০ ধারা অনুযায়ী এই আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে পরিষদের কার্যকলাপের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনে পদক্ষেপ নিতে পারে।

উল্লেখযোগ্য, ৫১ ও ৫২ ধারা — “পরিষদের কার্যাবলীর উপর নিয়ন্ত্রণ” ও “পরিষদের বিষয়াবলী সম্পর্কে তদন্ত” — ১৯৯৮ সালের সংশোধনী আইনে বিলুপ্ত করা হয়েছে। bdlaws-এর পাঠে ধারা দুটির জায়গায় কেবল বিলোপের নোট আছে।

এটি চুক্তি-পরবর্তী একটি বাস্তব পরিবর্তন: নিয়ন্ত্রণ ও তদন্তের দুটি সুনির্দিষ্ট ধারা তুলে নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় ধাপ: বাতিল

৫৩ ধারা এখনো আছে। প্রয়োজনীয় তদন্তের পর সরকার যদি মনে করে পরিষদ দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বা ব্যর্থ, প্রশাসনিক-আর্থিক দায়িত্বে অসমর্থ, জনস্বার্থবিরোধী কাজ করছে, বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে — তবে পরিষদ বাতিল করা যায়।

আর যে ধারাটি উল্টো দিকে কাজ করে

৭৯ ধারায় পরিষদের হাতে একটি অস্বাভাবিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় সরকারের আইনে বিরল।

জেলায় প্রযোজ্য জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত কোনো আইন পরিষদের বিবেচনায় জেলার জন্য কষ্টকর হলে বা উপজাতীয়দের জন্য আপত্তিকর হলে, পরিষদ কারণ ব্যক্ত করে আইনটির সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করার জন্য সরকারের কাছে লিখিত আবেদন পেশ করতে পারে।

আর ধারার শেষ অংশ — “সরকার এই আবেদন অনুযায়ী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারিবে”। ‘অনুযায়ী প্রতিকারমূলক’ শব্দ দুটিও বন্ধনীতে চিহ্নিত, অর্থাৎ সংশোধনীতে যুক্ত।

৬৭ ধারায় সমন্বয়ের একটি সমান্তরাল পথও আছে: পরিষদ ও সরকারের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার বা পরিষদ পরস্পরের কাছে প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে।

ছোট ছোট যে বিধানগুলো চোখে পড়ে না

আইনের শেষ দিকে কয়েকটি ধারা আছে, যেগুলো আলোচনায় আসে না অথচ ব্যবহারিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সার্কেল চীফের উপস্থিতি (২৬ ধারা)। চাকমা সার্কেলের চীফ এবং বোমাং সার্কেলের চীফ ইচ্ছা করলে বা আমন্ত্রিত হলে পরিষদের যেকোনো সভায় যোগ দিতে পারেন এবং যেকোনো আলোচ্য বিষয়ে মতামত দিতে পারেন। ভোটাধিকারের কথা ধারাটিতে নেই।

মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (৩১ ধারা)। সরকারের উপ-সচিব সমতুল্য একজন কর্মকর্তা পরিষদের সচিব হিসেবে থাকবেন। আঞ্চলিক পরিষদে পদটি যুগ্ম-সচিব সমতুল্য — এক ধাপ উপরে।

জরিমানার সীমা (৫৭ ধারা)। এই আইনের অধীন কোনো অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচশত টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। ১৯৮৯ সালে লেখা অঙ্কটি আজও পাঠে অপরিবর্তিত।

মামলার শর্ত (৫৮ ধারা)। চেয়ারম্যান বা পরিষদ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ আমলে নেবে না।

নথির মর্যাদা (৭৩ ধারা)। এই আইনের অধীন প্রস্তুতকৃত ও সংরক্ষিত সব রেকর্ড ও রেজিস্টার Evidence Act, 1872 অনুযায়ী প্রকাশ্য রেকর্ড বলে গণ্য হবে।

আপিলের অধিকার (৬১ ধারা)। পরিষদ বা তার চেয়ারম্যানের কোনো আদেশে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আপিলের সুযোগ আছে।

দায়মুক্তি (৭৫ ধারা)। সরল বিশ্বাসে কৃত কাজের জন্য দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা চলবে না।

এই লেখার সীমা

এটি আইন কী বলে তার বিবরণ, বাস্তবে কী ঘটেছে তার নয়। কবে নির্বাচন হয়েছে, কতদিন অন্তর্বর্তী পরিষদ চলেছে, ৬২ ধারার পুলিশ-নিয়োগ বা ৬৪ ধারার ভূমি-অনুমোদন কতটা প্রয়োগ হয়েছে — এসবের কোনো সংখ্যা এখানে ব্যবহার করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, তিনটি জেলার আইন প্রায় অভিন্ন কাঠামোয় লেখা হলেও প্রতিটি ধারা তিনটিতেই হুবহু এক কি না, তা এই কাজে ধারা ধরে ধরে মিলিয়ে দেখা হয়নি। আসন-বণ্টনের ৪ ধারা তিনটিই আলাদা করে পড়া হয়েছে; বাকি উদ্ধৃতিগুলো রাঙামাটির আইনের পাঠ থেকে।

তৃতীয়ত, ১৯৮৯ সালের এই আইনের উপর পরে বসেছে ১৯৯৭ সালের চুক্তি ও ১৯৯৮ সালের আঞ্চলিক পরিষদ আইন। ওই আইনের ২২(ক) ধারা অনুযায়ী মতবিরোধে আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত — অর্থাৎ এই পরিষদের উপরে আরেকটি স্তর আছে।

প্রশ্নোত্তর

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে মোট কতটি পদ?

চেয়ারম্যানসহ ৩৪টি — ২০ জন উপজাতীয় সদস্য, ১০ জন অ-উপজাতীয় সদস্য, ৩ জন মহিলা সদস্য (২ জন উপজাতীয়, ১ জন অ-উপজাতীয়) এবং চেয়ারম্যান।

চেয়ারম্যান কে হতে পারেন?

আইনের ৪(৪) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যান উপজাতীয়দের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। ৪(৪ক) ধারা অনুযায়ী যেকোনো উপজাতীয় নারীও এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

কোন জনগোষ্ঠীর জন্য কয়টি আসন?

চাকমা ১০, মারমা ৪, তঞ্চঙ্গ্যা ২, ত্রিপুরা ১, লুসাই ১, পাংখোয়া ১, খেয়াং ১ — মোট ২০টি।

নারী আসনে কি জনগোষ্ঠীভিত্তিক কোটা আছে?

না। আইনের ৪(১)(ঘ) ধারার ব্যাখ্যায় স্পষ্ট বলা আছে, উপজাতীয় মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রে জেলার বিভিন্ন উপজাতির জন্য কোনো কোটা থাকবে না।

খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আসন কীভাবে ভাগ?

খাগড়াছড়িতে ২১টি উপজাতীয় আসন তিন ভাগে — চাকমা ৯, ত্রিপুরা ৬, মারমা ৬। বান্দরবানে ১৯টি আসন আট ভাগে — মারমা ও খিয়াং ১০, ম্রো ৩, এবং ত্রিপুরা-উচাই, তঞ্চঙ্গ্যা, বম-লুসাই-পাংখোয়া, চাকমা, খুমী ও চাক প্রত্যেকে ১টি করে। তিন জেলাতেই মোট পদ ৩৪।

কে উপজাতীয় তা কে নির্ধারণ করেন?

জেলার সার্কেল চীফ। আইনের ৪(৫) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি উপজাতীয় কি না এবং হলে কোন উপজাতির, তা স্থির করেন সার্কেল চীফ — এবং তাঁর দেওয়া সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ উপজাতীয় হিসেবে চেয়ারম্যান বা কোনো উপজাতীয় সদস্যপদের প্রার্থী হতে পারেন না।

জেলা পরিষদের ভোটার হতে কী লাগে?

চারটি শর্ত (১৭ ধারা) — বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, বয়স অন্তত আঠারো বছর হতে হবে, উপযুক্ত আদালত কর্তৃক মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষিত হওয়া চলবে না, এবং সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন সময়মতো না হলে কী হয়?

১৬ক ধারা অনুযায়ী মেয়াদ সমাপ্তির তারিখেই পরিষদ বাতিল হয়ে যায় এবং ক্ষমতা বর্তায় সরকার-মনোনীত একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের উপর — একজন উপজাতীয় চেয়ারম্যান ও চৌদ্দ জন সদস্য নিয়ে। নির্বাচিত নতুন পরিষদ কার্যভার না নেওয়া পর্যন্ত এটি চলে, এবং ধারাটিতে কোনো সময়সীমা নেই।

প্রথাগত বিরোধের আপিল কোথায় করতে হয়?

৬৬ ধারা অনুযায়ী প্রথম নিষ্পত্তি করেন স্থানীয় কার্বারি বা হেডম্যান, প্রচলিত রীতি-নীতি অনুযায়ী। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল যায় সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফের কাছে, আর সেখান থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের কাছে — তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে সিদ্ধান্তের আগে তাঁকে সংশ্লিষ্ট উপজাতির অন্তত তিনজন বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়।

জেলা পুলিশ কি জেলা পরিষদের অধীন?

আংশিকভাবে। ৬২ ধারা অনুযায়ী জেলা পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর ও তার নিচের স্তরের সব সদস্য পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হন, পরিষদ তাঁদের বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে, এবং নিয়োগে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার থাকে। দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে তাঁরা পরিষদের কাছে দায়ী থাকেন।

জমি বেচাকেনায় কি পরিষদের অনুমোদন লাগে?

৬৪(১)(ক) ধারা অনুযায়ী জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ যেকোনো জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় বা হস্তান্তর করা যাবে না। তবে রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত জমি এই বিধানের বাইরে।

জাতীয় সংসদের আইন নিয়ে পরিষদ কি আপত্তি জানাতে পারে?

পারে। ৭৯ ধারা অনুযায়ী জেলায় প্রযোজ্য সংসদের কোনো আইন পরিষদের বিবেচনায় জেলার জন্য কষ্টকর বা উপজাতীয়দের জন্য আপত্তিকর হলে, পরিষদ কারণ ব্যক্ত করে আইনটির সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিলের জন্য সরকারের কাছে লিখিত আবেদন পেশ করতে পারে, এবং সরকার সেই আবেদন অনুযায়ী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে।

যা এখনো জানা যায়নি

  • নির্বাচন কবে হয়েছে। আইনে প্রত্যক্ষ ভোটের বিধান আছে, কিন্তু বাস্তবে নির্বাচন কবে কবে হয়েছে বা পরিষদ কীভাবে গঠিত হচ্ছে — মূল পাঠ থেকে জানা যায় না।
  • প্রথম ও দ্বিতীয় তফসিল। ২২ ধারা প্রথম তফসিলের কার্যাবলী এবং ৪৪ ধারা দ্বিতীয় তফসিলের কর-তালিকার দিকে নির্দেশ করে। তফসিল দুটির বর্তমান পূর্ণ পাঠ এই কাজে পড়া হয়নি; উপরে যা দেওয়া হয়েছে তা চুক্তির (খ) খণ্ডে প্রস্তাবিত তালিকা।
  • ‘উচাই’ নামটি। বান্দরবানের ৪(৩) ধারায় ত্রিপুরাদের সঙ্গে যৌথ আসনে এই নামটি আছে, কিন্তু রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি বা আঞ্চলিক পরিষদ আইনের তালিকায় নেই। এই অসঙ্গতির কারণ ও ফল যাচাই করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
  • সার্কেল চীফের সার্টিফিকেট। ৪(৫) ধারার অধীনে সার্টিফিকেট প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের কোনো ব্যবস্থা আইনে লেখা নেই। বাস্তবে এমন বিরোধ হয়েছে কি না, জানা যায়নি।
  • ৬২ ও ৬৪ ধারার প্রয়োগ। পরিষদ কখনো নিজে সাব-ইনস্পেক্টর নিয়োগ করেছে কি না, বা ৬৪ ধারার পূর্বানুমোদনের বিধান কতটা মানা হয় — এসবের নথি পাওয়া যায়নি।
  • বিলুপ্ত ৫১ ও ৫২ ধারা। ১৯৯৮ সালের সংশোধনী আইনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘তদন্ত’ ধারা দুটি বিলুপ্ত হয়েছে। এর বাস্তব প্রভাব কী দাঁড়িয়েছে, তা আলাদা যাচাইয়ের বিষয়।
  • তালিকার বাইরের জনগোষ্ঠী। রাঙামাটিতে বসবাসকারী যেসব জনগোষ্ঠীর নাম ৪(৩) ধারায় নেই, তাঁদের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হয় — আইনের এই পাঠে উত্তর নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
  • সংশোধনীর ইতিহাস। পাঠে বর্গাকার বন্ধনী দিয়ে একাধিক সংশোধনী চিহ্নিত; কোনটি কবে হয়েছে তা আলাদা করে দেখা হয়নি।

তথ্যসূত্র

  1. রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সনের ১৯ নং আইন) — ধারা ৪, ১০, ১৬, ১৬ক, ১৭–২০, ২৩, ২৬, ৩১, ৩২, ৪৪, ৫০–৫৩, ৫৭, ৫৮, ৬১–৬৭, ৭৩, ৭৫, ৭৯ — bdlaws.minlaw.gov.bd/act-724.html
  2. খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সনের ২০ নং আইন) — ধারা ৪ — bdlaws.minlaw.gov.bd/act-725.html
  3. বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সনের ২১ নং আইন) — ধারা ৪ — bdlaws.minlaw.gov.bd/act-726.html
  4. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮ — ধারা ২(গ), ২২(ক) — তুলনার জন্য
  5. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, ১৯৯৭ — খণ্ড (খ), ভূমি সংক্রান্ত সংশোধন প্রস্তাব — রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকাশিত বাংলা পাঠ, rhdc.gov.bd

পদ্ধতি সম্পর্কে। তিনটি জেলা পরিষদ আইনের উদ্ধৃতি bdlaws.minlaw.gov.bd-এ প্রকাশিত সরকারি বাংলা পাঠ থেকে ধারা ধরে ধরে নেওয়া, এবং প্রতিটি দাবির পাশে ধারার নম্বর দেওয়া আছে। আসন-বণ্টনের ৪ ধারা তিনটি আইনেই আলাদা করে পড়া হয়েছে; বাকি উদ্ধৃতিগুলো রাঙামাটির আইন থেকে। bdlaws-এর পাঠে সংশোধিত অংশ বর্গাকার বন্ধনীতে চিহ্নিত, এবং যেখানে তা প্রাসঙ্গিক সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তির উদ্ধৃতিগুলো রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকাশিত বাংলা পাঠ থেকে, ইউনিকোডে রূপান্তরের পর মূল পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।

সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ আগস্ট ২০২৬

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
[DISPLAY_ULTIMATE_SOCIAL_ICONS]

আরও কিছু লেখা