প্রতি এপ্রিলে খবরের কাগজে একই ছবি ফিরে আসে — রঙিন পোশাক, নদীতে ভাসানো ফুল, পানি ছিটানো তরুণ-তরুণী। ক্যাপশনে লেখা থাকে “পাহাড়ে বৈসাবি উৎসব”।
কথাটা সুবিধাজনক, কিন্তু ঠিক নয়। বৈসাবি কোনো একক উৎসব নয় — এটি অন্তত তিনটি আলাদা উৎসবের একটি যৌথ নাম, যেগুলোর দিনের নাম আলাদা, আচার-ক্রম আলাদা, এমনকি কেন্দ্রীয় ভাবনাও আলাদা। চাকমাদের বিজুতে যা ঘটে, মারমাদের সাংগ্রাইয়ে তা ঘটে না।
বাংলা ইন্টারনেটে বৈসাবি নিয়ে লেখার অভাব নেই — কিন্তু প্রায় সবই নামের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে থেমে যায়। কোন সম্প্রদায়ে কোন দিনে ঠিক কী হয়, সেই ক্রমটা একসাথে কোথাও নেই। এই লেখাটি সেই ক্রম সাজানোর চেষ্টা।
নামটি একটি সংক্ষেপ। বাংলা উইকিপিডিয়ার ভাষায়, “বৈসাবী নামকরণ করা হয়েছে এই তিনটি উৎসবের প্রথম অক্ষরগুলো নিয়ে” —
| অংশ | কোথা থেকে | কাদের |
|---|---|---|
| বৈ | বৈসু | ত্রিপুরা |
| সা | সাংগ্রাই | মারমা |
| বি | বিজু | চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা |
এখানে একটা কথা লক্ষ করার মতো: নামটি তিনটি জনগোষ্ঠীর উৎসব থেকে তৈরি, অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এগারোর বেশি। জুমজার্নালের আর্কাইভে “চাক জাতির আদ্যোপান্ত” লেখাটি জানাচ্ছে, চাকরাও এই উৎসব পালন করেন — মারমাদের মতোই “সাংগ্রাইং” নামে। অর্থাৎ যৌথ নামটি সবাইকে ধরে না।

সময়টা সব সম্প্রদায়ের জন্য একই। আর্কাইভের চাক-বিষয়ক লেখাটির হিসাব: “বাংলা বৎসরের শেষ দুদিন এবং নববর্ষের প্রথম দিনসহ মোট তিন দিন”। বাংলা উইকিপিডিয়াও একই কথা বলছে — চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন।
তবে উৎসব তিন দিনেই ফুরোয় না। আর্কাইভের বাক্যটি সৎ: “যদিও এই উৎসব তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু এর রেশ বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত চলতে থাকে।”
একই লেখার আরেকটি বাক্য এই পুরো আলোচনার ভিত্তি: “বৈসুক, সাংগ্রাইং ও বিজু মূলত একই সময়ের উৎসব হলেও অঞ্চল ও নৃগোষ্ঠীভেদে প্রত্যেকে নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে এ উৎসব পালন করে।” একই সময়, আলাদা উৎসব।
আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখাটি অনুযায়ী বিজু (বা বিঝু) তিন পর্বে বিভক্ত: ফুলবিজু → মূলবিজু → নুওবঝর (নতুন বছর), যে তৃতীয় দিনটিকে বলা হয় গোজ্যাপোজ্যা দিন।
প্রথম দিনের ক্রমটি বেশ নির্দিষ্ট:
শেষ আচারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং প্রায় কোনো প্রতিবেদনে আসে না — নতুন বছরের প্রস্তুতিতে ঘরের পশুপাখিও অন্তর্ভুক্ত।
আর্কাইভের ভাষায়, “বিজুর তিনদিনের মধ্যে এই মূলবিজুর দিনটিই সবচেয়ে উৎসবমুখর, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দিন”। এদিনের কেন্দ্রীয় নিয়মটি আতিথেয়তার: “জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্য ঘরের দরজা উন্মুক্ত থাকে।”
এদিন পরিবেশিত হয় নানা পিঠা, ফলমূল, সেদ্ধ আলু এবং পাজন — ন্যূনতম পাঁচ পদের সবজি দিয়ে তৈরি সেই তরকারি, যা অনেক সময় একশো পদের বেশি সবজি দিয়েও রান্না হয়। পাজন ও পাহাড়ি রান্নার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আছে পাহাড়ি খাবার নিয়ে আমাদের লেখায়।
বিজুর কাছাকাছি আরেকটি দিনের কথাও আর্কাইভে আছে — হালপালনি, যেদিন হালের বলদকে চাষ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, গৃহস্থরা জমিতে যান না, আর “বিজুর মতো সকলের জন্য প্রতি বাড়িতে মদ, পাজন ও নানা খাবার পরিবেশন করা হয়”।
“ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসু, এবং এর তিনটি দিনের নাম: ১. হারি বৈসু · ২. বৈসুমা · ৩. বিসিকাতাল।
আর্কাইভের বর্ণনায় এই দিনটি “মূলত প্রস্তুতি পর্ব”:
ফুল সংগ্রহ ও নদীতে ফুল দেওয়ার আচারটি চাকমাদের ফুল বিজুর সঙ্গে মিলে যায় — এটিই সম্ভবত এই তিন উৎসবের সবচেয়ে স্পষ্ট সাধারণ সূত্র।
বৈসুর সঙ্গে যুক্ত গরিয়া পূজা নিয়েও আর্কাইভে নির্দিষ্ট তথ্য আছে। পূজাটি প্রতি বছর করার বিধান নেই; মানত না থাকলে আয়োজনও হয় না। আয়োজনের জন্য একটি দল গঠিত হয় — আয়োজক পরিবারের একজন সদস্য, একজন সর্দার, এবং দুই ধরনের পুরোহিত: অচাই (যিনি মন্ত্র পড়েন) ও তাছাই (যিনি প্রাণী বলি দেন)। এই ভূমিকা-বিভাজনটি অন্য কোথাও সহজে পাওয়া যায় না।
“মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী সাংগ্রাইং মারমা সমাজের অন্যতম প্রধান সামাজিক-ধর্মীয় উৎসব — এবং এই “ধর্মীয়” শব্দটাই বিজু বা বৈসুর থেকে পার্থক্যটা তৈরি করে।
প্রথম দিনের কর্মসূচি আর্কাইভে ছয়টি ধাপে দেওয়া আছে:
এরপর আসে “সাংগ্রাই পানিবর্ষণ” — এবং এখানেই একটি জিনিস স্পষ্ট হয় যা জনপ্রিয় বর্ণনায় প্রায়ই হারিয়ে যায়। আর্কাইভ অনুযায়ী এদিন মন্দিরের বুদ্ধমূর্তিগুলো শোভাযাত্রা সহকারে নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো হয়।
অর্থাৎ পানি এখানে প্রথমত স্নান করানোর আচার, খেলা নয়। জলকেলি সেই আচারেরই একটি সামাজিক সম্প্রসারণ।
জলকেলির সমসাময়িক চেহারা কেমন, তার একটি নির্দিষ্ট বিবরণ আছে বাংলা ট্রিবিউনের ১৫ এপ্রিল ২০২২-এর প্রতিবেদনে: বান্দরবানে সাঙ্গু নদীর তীরে জলকেলির উদ্বোধন হয়, তারপর “মারমা তরুণ-তরুণীরা একে-অপরকে পানি ছিটিয়ে খেলা শুরু করেন”, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে। প্রতিবেদনটি জলকেলিকে বলেছে “তিন দিনব্যাপী আয়োজিত সাংগ্রাই উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ”।
মারমাদের দিনগুলোর নাম নিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ায় একটি তালিকা আছে — আক্যা (প্রথম দিন), বাক্ (প্রধান দিন) ও আপ্যাইং (বিদায়)। আর্কাইভের মারমা-বিষয়ক লেখাটিতে দিনগুলোর এই নাম নেই, তাই দুটি উৎসকে মিলিয়ে দেখা যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
বৈসাবি নামটিতে যাঁদের অক্ষর নেই, তাঁরাও উৎসবটি পালন করেন।
চাক: আর্কাইভ অনুযায়ী চাকদের অন্যতম সামাজিক উৎসব “সাংগ্রাইং বা নববর্ষ উৎসব ও নবান্ন উৎসব”। নামটি মারমাদের মতোই, এবং লেখাটি বলছে সাংগ্রাইং চাকদের “ধর্মীয়, সামাজিক” উৎসব। চাকদের নিজস্ব আচার-ক্রমের বিস্তারিত অবশ্য পাওয়া যায়নি।
তঞ্চঙ্গ্যা: তঞ্চঙ্গ্যারা উৎসবটিকে বলেন বিষু, এবং জুমজার্নালের তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত লেখাটিতে তাঁদের আচারের বেশ নির্দিষ্ট বিবরণ আছে:
এই তালিকার তৃতীয় আচারটি — বয়স্কদের স্নান করানো — বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ চাকমা বিজুর বর্ণনায় এটি নেই, অথচ এটিই সম্ভবত মারমাদের বুদ্ধমূর্তি-স্নান ও জলকেলির সঙ্গে ভাবগত দিক থেকে সবচেয়ে কাছের আচার: পানি দিয়ে পুরনো বছরের গ্লানি ধুয়ে ফেলা।
জুমজার্নালের মিডিয়া সংগ্রহে ২০১১ সালের একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে আঁকা শিশুদের ছবিতেও “ফুল বিজুর দিনে গুরুজনদের স্নান করানোর দৃশ্য” ধরা আছে — যা ইঙ্গিত দেয় আচারটি চাকমাদের মধ্যেও প্রচলিত। তবে ছবির ক্যাপশন কোনো আচারের প্রমাণ নয়, ইঙ্গিত মাত্র। [যাচাই প্রয়োজন]
| জনগোষ্ঠী | উৎসবের নাম | দিনগুলোর নাম |
|---|---|---|
| চাকমা | বিজু / বিঝু | ফুলবিজু · মূলবিজু · নুওবঝর (গোজ্যাপোজ্যা) |
| ত্রিপুরা | বৈসু বা বৈসুক | হারি বৈসু · বৈসুমা · বিসিকাতাল |
| মারমা | সাংগ্রাই / সাংগ্রাইং | আক্যা · বাক্ · আপ্যাইং (উৎস: উইকিপিডিয়া) |
| চাক | সাংগ্রাইং | পাওয়া যায়নি |
| তঞ্চঙ্গ্যা | বিষু | মূল বিষু — বাকি দিনের নাম পাওয়া যায়নি |
একটি স্পষ্ট বিরোধ: ত্রিপুরাদের উৎসবের নাম নিয়ে আমাদের নিজের আর্কাইভেই দুই রকম। “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখাটিতে বলা হয়েছে “বৈসু”, আর “চাক জাতির আদ্যোপান্ত” লেখাটিতে “বৈসুক”। বাংলা উইকিপিডিয়ায় “বৈসু”। কোনটি ত্রিপুরাদের নিজস্ব ব্যবহার, তা নিষ্পত্তি করা যায়নি — আর এটি একটি উৎসবের নাম, তাই অনুমান করে একটি বেছে নেওয়া হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
বৈসাবি কি একটি উৎসব?
না। এটি তিনটি আলাদা উৎসবের যৌথ নাম — ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু। নামটি এই তিনটির প্রথম অক্ষর নিয়ে তৈরি। সময় এক হলেও আচার-ক্রম আলাদা।
বৈসাবি কখন হয়?
বাংলা বছরের শেষ দুই দিন (চৈত্র) এবং নববর্ষের প্রথম দিন (বৈশাখ) — মোট তিন দিন। তবে উৎসবের রেশ আরও কয়েক দিন চলে।
ফুল বিজুতে কী হয়?
ভোরে ফুল সংগ্রহ, নদীতে গোসল করতে গিয়ে পাতায় করে ফুল ভাসানো, ফুল দিয়ে ঘরের আঙিনা ও দরজা সাজানো, কিয়াঙে বুদ্ধের উদ্দেশে ফুল, ঘরদোর পরিষ্কার, সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালানো, আর শিশুদের গৃহপালিত পশু-পাখিকে খাওয়ানো।
সাংগ্রাইয়ে পানি ছিটানো হয় কেন?
পানির ব্যবহার শুরু হয় ধর্মীয় আচার হিসেবে — এদিন মন্দিরের বুদ্ধমূর্তিগুলো শোভাযাত্রা করে নদীর তীরে নিয়ে স্নান করানো হয়। জলকেলি সেই আচারেরই সামাজিক সম্প্রসারণ।
ত্রিপুরাদের বৈসুর দিনগুলোর নাম কী?
হারি বৈসু, বৈসুমা ও বিসিকাতাল। প্রথম দিনটি মূলত প্রস্তুতির — পিঠার জন্য বিন্নি ধানের গুঁড়ো চাল তৈরি, কলা ও লাইরু পাতা সংগ্রহ, এবং ভোরে নদীতে ফুল উৎসর্গ।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026