একটা গান গাইতে সাত দিন সাত রাত লাগে — আর তাতেও শেষ হয় না।
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে রাধামন ধনপুদি পালার পরিবেশনা নিয়ে ঠিক এই কথাটাই লেখা আছে: “নানা পর্বে টানা সাত দিন সাত রাত ধরে এটি গাওয়া হয়” এবং তবু সম্পূর্ণ হয় না। যাঁরা গান, তাঁদের বলা হয় গেংখুলি — চারণ কবি, যাঁরা গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সুরে সুরে এই আখ্যান আবৃত্তি করেন।
কিন্তু এই লেখাটির আসল বিষয় সেই দৈর্ঘ্য নয়। আসল বিষয় হলো — একই পালার কাহিনি এক এক উৎসে এক এক রকম। নায়িকার নাম বদলে যায়, বাবা-মায়ের পরিচয় বদলে যায়, এমনকি গল্পের শেষটাও। এটি ভুল নয়; মৌখিক সাহিত্য এভাবেই বাঁচে। এই লেখায় সেই ভিন্নতাগুলোকে মিলিয়ে-মিশিয়ে একটা “শুদ্ধ পাঠ” বানানোর চেষ্টা করা হয়নি — বরং পাশাপাশি রেখে দেখানো হয়েছে।
বানানটাই প্রথম সমস্যা। জুমজার্নালের আর্কাইভেই শব্দটি অন্তত পাঁচ রকমে লেখা হয়েছে — গেংখুলি, গেঙখুলি, গেংগুলি, গেঙ্গুলি, গেংহুলি। মৌখিক পরম্পরার নাম যখন লিখিত রূপ পায়, এই ছড়ানোটা স্বাভাবিক; তবু একটি আর্কাইভে একটি বানান বেছে নেওয়া দরকার।
কাজটা কী, তার সবচেয়ে পরিষ্কার বর্ণনা আছে আর্কাইভের “চাকমা উপন্যাস চাই” লেখাটিতে: “গেংগুলি বা কথকরা পুরুষানুক্রমে চাকমা জনপদে জনপদে এই উপাখ্যান সুর করে আবৃত্তি করে বেড়ান।”
একই লেখায় একটি সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ আছে, যা মৌখিক সাহিত্যের প্রকৃতি বুঝিয়ে দেয়: আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে “চাকমা গাথার নতুন নতুন প্রসঙ্গ যুক্ত হয়, পুরনো কিছু কিছু অংশ হয়তো ঝরেও পড়ে। তবে বড়ো ধরণের যোগ-বিয়োগ বোধ হয় ঘটে না, কারণ পুরনো চাকমা গাথা তাদের গভীর ভালোবাসা ও ভক্তির সম্পদ।”
অর্থাৎ পাঠ স্থির নয়, কিন্তু ভাসমানও নয় — ছোট ছোট বদল হয়, কাঠামো টেকে।
বাংলাপিডিয়ায় চাকমা সাহিত্যের পুরো ইতিহাসটাই শুরু হচ্ছে এখান থেকে: “Chakma literature runs from the oral traditions of the gengkhuli singers through literary periodicals” (লেখক Willem van Schendel)। অর্থাৎ গেংখুলি চাকমা সাহিত্যের একটি শাখা নয়, তার প্রথম অধ্যায়।
আজকের অবস্থাটা উদ্বেগজনক। আর্কাইভের “বিংশ শতাব্দী পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ” লেখাটির বাক্য: “পাহাড়িদের মধ্যে এ লোকসাহিত্য চর্চাকারী এখন শুধুমাত্র গেংখুলি নামক চারণ কবিগণ।” একটি গোটা মৌখিক ঐতিহ্য টিকে আছে অল্প কয়েকজন মানুষের স্মৃতিতে।

সবচেয়ে প্রচলিত পাঠটি এরকম। চাকমাদের আদি নিবাস চম্পকনগর, তার প্রত্যন্ত এলাকায় ধনপাতা নামের একটি গ্রাম — আর্কাইভের বর্ণনায় “ছয় কুড়ি মানে একশ বিশটি চাকমা পরিবার” সেখানে থাকত, সবাই মাচাং ঘরে।
সেই গ্রামে দুই বোন — মেনকা ও কপুদি। মেনকার স্বামী জয়মঙ্গল, কপুদির স্বামী নিলগিরি। মেনকার ঘরে জন্ম নেয় রাধামন, কপুদির ঘরে ধনপুদি — রাধামন এক বছরের বড়। সম্পর্কে তারা মামাতো-মাসতুতো ভাইবোন।
তারা একসঙ্গে বড় হয়, একসঙ্গে খেলে — আর্কাইভের লেখাটিতে খেলাগুলোর নামও আছে: ঘিলে খেলা, নাদেং খেলা, পোর খেলা, পোত্তি খেলা, গুদু খেলা। বাজাতে শেখে খেংগরং, বাঁশি, ধুধুক, শিঙা, মেমত। তারপর প্রেম।
এরপরই পাঠভেদ শুরু।
আর্কাইভে সংরক্ষিত পাঠে ধনপুদির বাবা-মা মেয়ের ভালোবাসা উপেক্ষা করে প্রতিবেশী গ্রামের ধনী ছেলে আদিচরণের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করেন, এবং “জোরপূর্বক আদিচরণের সাথে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় ধনপুদির”।
লেখাটির একটি বড় সম্পদ হলো, সেখানে মূল চাকমা ভাষার পদ উদ্ধৃত আছে — ঘুম পাড়ানি গান থেকে বিয়ের দৃশ্যের বর্ণনা পর্যন্ত। এমন উদ্ধৃতি বাংলা ইন্টারনেটে বিরল।
এখানেই এই লেখার কেন্দ্রীয় কথাটা। তিনটি স্বাধীন উৎস এই আখ্যানের তিন রকম রূপ দিচ্ছে।
| আর্কাইভ: “রাধামন ধনপুদি পালা” | আর্কাইভ: “রাধামন-ধনপতি পালা” | প্রথম আলো (২০২৩) | |
|---|---|---|---|
| নায়িকার নাম | ধনপুদি | ধনপতি | ধনপুদি |
| মায়েরা কারা | মেনকা ও কপুদি — ধনপাতা গ্রামের দুই বোন | মেনকা ও কপতি — চম্পক নগরের নরপতি সাদেংগিরির কন্যা | মেনকা ও কপুদি — ধনপাদা গ্রামের দুই বোন |
| রাধামন কে | গ্রামের যুবক | রাজা বিজয়গিরির সেনাপতি | মেনকার পুত্র |
| পরিণতি | জোর করে আদিচরণের সঙ্গে বিয়ে | রাধামন ও ধনপতির বিয়ে, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী | প্রথা ভেঙে ধনপুদি রাধামনের কাছে চলে যায় |
তিনটি পাঠে গ্রামের নামও সামান্য আলাদা — ধনপাতা বনাম ধনপাদা।
এই ভিন্নতাকে “ভুল” বলা যাবে না। মৌখিক আখ্যান কোনো একটি বইয়ে বাঁধা নয়; এক গেংখুলির কাছে যা শোনা যায়, অন্যজনের কাছে তা কিছুটা অন্যরকম। বরং লক্ষণীয় হলো ভিন্নতার ধরনটা: একটি পাঠে নায়িকা প্রথার শিকার, আরেকটিতে প্রথা-ভাঙা; একটিতে নায়ক সাধারণ গ্রামের ছেলে, আরেকটিতে রাজার সেনাপতি। সমাজের ভিন্ন সময়ে ভিন্ন প্রয়োজনে কাহিনিটা নিজেকে বদলেছে বলেই মনে হয় — কিন্তু এটি ব্যাখ্যা, প্রমাণ নয়। [যাচাই প্রয়োজন]
জুমজার্নালের নিজের আর্কাইভেই দুটি বানান পাশাপাশি চলছে। একটি লেখায় “ধনপুদি”, আরেকটিতে “ধনপতি”।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন ও আর্কাইভের অন্য উল্লেখগুলোতে “ধনপুদি” রূপটিই বেশি; ড. মনিরুজ্জামানের লেখাতেও গেঙ্গুলিদের ভাণ্ডারের তালিকায় আছে “ধনপুদির গীত”। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অবশ্য শুদ্ধতার প্রমাণ নয়।
এখানে একটি জিনিস স্পষ্ট করে বলা দরকার: এটি ব্যক্তির নাম, আর জুমজার্নালের নিয়ম হলো নাম বদলানো হয় না। তাই কোনটি “ঠিক” তা এই লেখা ঘোষণা করছে না — দুটোই যে চালু আছে, সেটুকুই জানানো হলো। কোন রূপটি সাইটজুড়ে ব্যবহৃত হবে, সে সিদ্ধান্ত সম্পাদকীয়। [যাচাই প্রয়োজন]
দৈর্ঘ্য: প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী পালাটি “নানা পর্বে টানা সাত দিন সাত রাত ধরে” গাওয়া হয়, এবং তাতেও শেষ হয় না। অর্থাৎ এটি এক বসায় শোনার জিনিস নয় — পর্বে পর্বে চলা একটি ধারাবাহিক আসর।
বাদ্যযন্ত্র: এখানেও উৎসভেদ আছে। প্রথম আলো নাম করেছে খেংগড়ং ও ধুদক-এর। আর আর্কাইভের “রাধামন-ধনপতি” লেখাটিতে বলা হয়েছে গেংখুলিরা পরিবেশন করেন “কণ্ঠে বেহালার সুরে”।
বেহালা ইউরোপীয় যন্ত্র — অর্থাৎ কোনো এক সময়ে তা এই পরম্পরায় ঢুকেছে, নয়তো “বেহালা” শব্দটি এখানে স্থানীয় কোনো ছড়-যন্ত্র বোঝাতে ব্যবহৃত। কোনটি, তা কোনো উৎসে ব্যাখ্যা করা নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
কাহিনির ভেতরে অবশ্য যন্ত্রের নিজস্ব তালিকা আছে — রাধামন ও ধনপুদি বাজাতে শেখে খেংগরং, বাঁশি, ধুধুক, শিঙা ও মেমত। খেংগরং ও ধুধুক দুই জায়গাতেই ফিরে আসছে, যা এই দুটিকে পরম্পরার কেন্দ্রে রাখে।
রাধামন-ধনপুদি সবচেয়ে পরিচিত, কিন্তু একমাত্র নয়। আর্কাইভের “রাধামন-ধনপতি” লেখাটিতে আরও কয়েকটির নাম আছে:
ঐ লেখাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছে: এই পালাগুলো কেবল চাকমাদের নয় — “রাধামন-ধনপতি চাকমা এবং তঞ্চঙ্গ্যা পৌরাণিক সাহিত্যের অন্যতম একটি সাহিত্য উপাদান”। দুই জনগোষ্ঠীর ভাগ করা সম্পদ।
ড. মনিরুজ্জামানের লেখাটি তঞ্চঙ্গ্যা দিক থেকে তালিকাটি আরও বাড়ায় — গেঙ্গুলি বা চারণকবিদের গীতের মধ্যে আছে উভাগীত, ধনপুদির গীত, “পুরান কদা”, এবং অষ্টাদশ শতকের শিবচরণের গোসাইনলামা, সেই সঙ্গে রামায়ণ-মহাভারত ও জাতকের কাহিনি থেকে নেওয়া ব্যাখ্যামূলক গীতিকা।
উবাগীত (বা উভাগীত/উভোগীত) নামটি আর্কাইভের একাধিক লেখায় ফিরে আসে — বানান আবারও স্থির নয়।
এটিই সম্ভবত এই লেখার সবচেয়ে জরুরি অংশ, কারণ এখানেই সংরক্ষণের প্রশ্নটা দাঁড়ায়।
ড. মনিরুজ্জামানের বর্ণনা অনুযায়ী গেঙ্গুলিদের গীতগুলো ছিল “সংগৃহীত, হস্তলিখিত এবং প্রাচীন চাকমা (মনক্ষেমর) ও বার্মা লিপিতে চাকমা/তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় রচিত”। তারপরের বাক্যটি সরাসরি: “এর সবই অপ্রকাশিত” — ব্যতিক্রম কেবল উভাগীতের কিছু অনুবাদ, যেমন সলিল রায়ের ইংরেজি অনুবাদ ও বঙ্গীয় সংস্করণ।
আর সংগ্রহের হদিস? “গেঙ্গুলি সংগ্রহের কিছু নমুনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে ফটোকপি হিসাবে” সংরক্ষিত আছে।
এই দুটি বাক্য একসঙ্গে পড়লে যা দাঁড়ায়: একটি হাজার বছরের মৌখিক ঐতিহ্যের লিখিত অবশেষ আজ একটি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে ফটোকপি আকারে — এবং প্রায় পুরোটাই অপ্রকাশিত।
বাংলাপিডিয়া আরেকটি প্রাসঙ্গিক তথ্য দিচ্ছে: চাকমা ভাষার নিজস্ব লিপি থাকলেও “আজ তা সাধারণত ব্যবহৃত হয় না, চাকমা এখন সাধারণত বাংলা অক্ষরে লেখা হয়”। অর্থাৎ যে লিপিতে এই পুঁথিগুলো লেখা, সেই লিপি পড়তে পারা মানুষের সংখ্যাও কমছে।
বাংলাপিডিয়ার বাক্যটি ইতিহাসের পুরো রেখাটা এক লাইনে ধরে: চাকমা সাহিত্য গেংখুলিদের মৌখিক পরম্পরা থেকে সাময়িকপত্রে গিয়েছে, যার প্রথমটি “গৈরিকা”, শুরু ১৯৩৬ সালে।
আর্কাইভের সাহিত্য-বিষয়ক লেখাটিও গৈরিকার ভূমিকার কথা বলে, এবং চাকমা রাজবাড়ীর অবদান উল্লেখ করে — অরুণ রায়, সলিল রায়, কোকনদাক্ষ রায়, বিনীতা রায় প্রমুখের নাম সেখানে আছে।
একটি কৌতূহলজনক আধুনিক প্রতিধ্বনিও আছে। আর্কাইভের কুমার সমিত রায়ের জীবনী অনুযায়ী, আশির দশকে তাঁদের গানের দলটির নামই ছিল “গেংগুলি”। চারণ কবির পুরনো নামটি আধুনিক ব্যান্ডের নাম হয়ে ফিরে এসেছে — পরম্পরা যে কেবল ক্ষয়ে যায় না, রূপ বদলেও টেকে, এটি তার একটি উদাহরণ।
গেংখুলি গীত আরেকটি কাজও করে যা সাহিত্যের বাইরে। আর্কাইভের “চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে” লেখাটি জানাচ্ছে, চাকমাদের চম্পক নগর থেকে আসার বিশ্বাসটি বংশপরম্পরায় টিকে আছে “আমাদের ‘গেংখুলি গীত’ নামক লোকগীতি বা পালাগানের মাধ্যমে”। অর্থাৎ পালা এখানে জাতিগত স্মৃতির বাহকও।
গেংখুলি মানে কী?
গেংখুলি হলেন চারণ কবি বা কথক — যাঁরা পুরুষানুক্রমে চাকমা জনপদে ঘুরে ঘুরে সুরে সুরে পালা বা আখ্যান আবৃত্তি করেন। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী চাকমা সাহিত্যের ইতিহাস শুরুই হয় গেংখুলিদের মৌখিক পরম্পরা থেকে।
রাধামন-ধনপুদি কাহিনিটা কী নিয়ে?
দুই বোন মেনকা ও কপুদির ছেলে-মেয়ে রাধামন ও ধনপুদির প্রেম নিয়ে। তাঁরা মামাতো-মাসতুতো ভাইবোন, একসঙ্গে বড় হন। ধনপুদির বিয়ে অন্যত্র ঠিক হলে কাহিনি মোড় নেয় — তবে সেই মোড়টা কোন দিকে যায়, উৎসভেদে আলাদা।
পালাটি গাইতে কত সময় লাগে?
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী নানা পর্বে টানা সাত দিন সাত রাত ধরে গাওয়া হয়, তাতেও সম্পূর্ণ হয় না।
ধনপুদি না ধনপতি — কোনটা ঠিক?
দুটোই প্রচলিত। “ধনপুদি” রূপটি বেশি দেখা যায়, তবে জুমজার্নালের নিজের আর্কাইভেও দুটোই আছে। এটি ব্যক্তির নাম, তাই এখানে কোনো একটিকে “শুদ্ধ” বলে ঘোষণা করা হয়নি।
গেংখুলিদের গানগুলো কি কোথাও লেখা আছে?
বেশিরভাগই নয়। ড. মনিরুজ্জামানের লেখা অনুযায়ী গেঙ্গুলিদের হস্তলিখিত গীতগুলোর “সবই অপ্রকাশিত” — ব্যতিক্রম উভাগীতের কিছু অনুবাদ। কিছু নমুনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে ফটোকপি হিসেবে আছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026