icon

পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা-বিদ্রোহ (১৭৭৬-৮৭)

Jumjournal

Last updated Oct 6th, 2026 icon 0

চট্টগ্রাম জেলার সমতলভূমির উপরিভাগে অবস্থিত পাহাড়-পর্বতময় অঞ্চলটির নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি “যাযাবর চাষীদের বাসস্থান। প্রকৃতির কঠোরতা এবং ততোধিক দুর্ধর্ষ ও বন্য প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে কঠোর সংগ্রাম করিয়া ইহাদের জীবন ধারণ করিতে হয়। 

 

ভারতবর্ষের অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলের আদিম অধিবাসীদের মতই এই অঞ্চলের চাকমা, কুকি প্রভৃতি পার্বত্য অধিবাসীরা প্রকৃতির সহিত নিরবচ্ছিন্নভাবে কঠোর সংগ্রাম করিয়া জীবন ধারণ করে। সেই কঠোর সংগ্রামই তাহাদিগকে দুর্ধর্ষ করিয়া তুলিয়াছে।

 

কারা থাকত এই পাহাড়ে

চাকমা রাজ্যের অবস্থান
চাকমা রাজ্যের অবস্থান

চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলটি প্রথমে ছিল কুকি জাতির বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বাসস্থান। পরে চাকমাগণ কুকিদের আরও উত্তর-পূর্ব দিকে তাড়াইয়া দিয়া আরাকান অধিকার করে। কিন্তু ব্রহ্মযুদ্ধের সময় (১৮২৪-৫২) মগেরা আসিয়া চাকমাদের বিতাড়িত করিয়া চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ অংশ অধিকার করিলে চাকমাগণ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করিয়া সেই স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করিতে থাকে। 

 

এই অঞ্চলের পার্বত্য আদিম অধিবাসীরা এমনকি মোগল যুগেও নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখিতে পারিয়াছিল। সেই যুগেও তাহারা তাহাদের নিজস্ব স্বাধীন জীবিকার ব্যবস্থা অক্ষত ও অব্যাহত রাখিতে সক্ষম হইয়াছিল। তখন তাহারা কঠোর কায়িক পরিশ্রমে প্রস্তরময় অনুর্বর জমিতে যে শস্য উৎপাদন করিত তাহার সামান্য একটা অংশ রাজস্ব হিসাবে মোগল সম্রাটদের দিয়া তাহারা স্বাধীনভাবেই বাস করিত। কিন্তু এই অঞ্চলটি ইংরেজ শাসনের অন্তর্ভুক্ত হইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের স্বাধীন ভাবে জীবিকা নির্বাহের পুরাতন ব্যবস্থা ধ্বংস হইয়া যায় এবং অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকদের মত এই পর্বত-অরণ্যচারী আদিম মানুষগুলিও ক্রমশ ইংরেজ রাজের শোষণ ব্যবস্থার নাগপাশে আবদ্ধ হইয়া পড়ে। ক্রমশ এই অঞ্চলের উপরেও ইংরেজ রাজের শোষণযন্ত্রগুলি একে একে চাপিয়া বসিতে থাকে।

 

১৭৬০: কোম্পানির হাতে চট্টগ্রাম

১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দে এক সন্ধি দ্বারা ইংরেজদের ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ মীরকাসেমের হস্তে বাংলা-বিহার উড়িষ্যার নবাবী দান করিয়া প্রতিদান স্বরূপ বর্ধমান, চট্টগ্রাম ও মেদিনীপুর অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। সুতরাং সেই সঙ্গে এই ক্ষুদ্র চাকমা রাজ্যটি ও পার্শ্ববর্তী স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্য ইংরেজ বণিকদের কুক্ষিগত হয়। সেই সময় হইতেই ইংরেজ শাসকগোষ্ঠি ও উহার শোষণের অনুচরগণ এই আদিবাসীদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করিতে আরম্ভ করে। 

 

ম্যাকেঞ্জির বিবরণ

এই আদিবাসীদের জীবনধারা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দার ম্যাকেঞ্জি সাহেব লিখিয়াছেন: “চট্টগ্রাম বৃটিশদের অধিকারে আসিবার সঙ্গে সঙ্গেই এই পার্বত্য অঞ্চলের কোনো অংশে বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। সেই সময় বৃটিশ কর্তৃপক্ষ পার্বত্য অঞ্চলে দুইজন মাত্র পাহাড়িয়া দলপতির সন্ধান পাইয়াছিল । তাহাদের একজন ‘ফ্রু’  (Phruu) নামক আদিম জাতির নায়ক, অপরজন চাকমা জাতির নায়ক। এই দলপতিগণ মুসলমান শাসকদের নিকট রাজস্ব হিসাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্পাস পাঠাইত। তাহারা প্রথমে বৃটিশ শাসকদিগকেও কার্পাসের দ্বারা রাজস্ব দিত। কিন্তু রাজস্বের কার্পাসের পরিমাণ সম্ভবত এক এক বৎসর এক এক রূপ হইত। এই জন্যই প্রতি বৎসর এই ‘কার্পাস মহল’ একজন ফড়িয়ার ( speculator) নিকট ইজারা দেওয়া হইত। এই ইজারাদার ফড়িয়া বৃটিশ কর্তৃপক্ষের সহিত কার্পাস-রাজস্ব আদায়ের চুক্তি করিত এবং এইভাবে এই অঞ্চলের সমস্ত কার্পাস একচেটিয়া করিয়া ফেলিত। 

 

ম্যাকেঞ্জি সাহেবের মতে, মোগল যুগেই ‘কার্পাস মহল’ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফড়িয়া বা ‘স্পেকুলেটর’ নামক শোষকদের আবির্ভাব ঘটে। ইংরেজ শাসকগণ এই পার্বত্য আদিম জাতিগুলির উপর তাহাদের শোষণ যন্ত্রের অপরিহার্য অংশ রূপে এই ফড়িয়াদের লেলাইয়া দেয়। ফড়িয়ারা ইংরেজ শাসকদের সহিত রাজস্ব আদায়ের চুক্তি করিয়া নানাবিধ উৎপীড়ন দ্বারা ‘কার্পাস মহলের’ প্রস্তরময় অনুর্বর জমিতে পাহাড়িয়াদের অমানুষিক পরিশ্রমে উৎপন্ন একমাত্র শস্যের উপর একচেটিয়া প্রভুত্ব স্থাপন করে।

 

জুম প্রথা

এই অঞ্চলের আদিম প্রথায় চাষবাস ও ভূ-সম্পত্তি-প্রথার নিম্নোক্ত বিবরণটি ম্যাকেঞ্জি সাহেবের গ্রন্থে পাওয়া যায়- 

“যে প্রথায় সকল পাহাড়িয়া জাতি জমি চাষ করিত, তাহার নাম ‘ঝুম’ প্রথা। প্রতি বৎসর এপ্রিল মাসে গ্রামের সমস্ত লোক কোন একটা সুবিধাজনক স্থানে যাইয়া বসতি স্থাপন করে। তাহার পর প্রত্যেক পরিবারের সকল লোক জঙ্গল কাটিয়া চাষের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ জমি আবাদ করিয়া লয়। ফসল পাকিবার সময় বন্য পশুপক্ষীর হাত হইতে শস্য রক্ষা করিবার জন্য তাহারা ‘ঝুম’ বা দল বাঁধিয়া সারা রাত্রি জমি পাহারা দেয়। দুই বৎসর চাষের পর জমির উর্বরা শক্তি নিঃশেষ হইয়া যায়। এইভাবে যখন গ্রামের চারিপাশের সমস্ত উর্বর জমি চাষ হইয়া যায়, তখন সকল লোক ঐ স্থান ত্যাগ করিয়া অন্য স্থানে গিয়া বসতি স্থাপন করে। সহজেই বুঝিতে পারা যায় যে, এই প্রথায় চাষের ফলে কোন জমির উপরই ‘ঝুমিয়াদের’ (যাহারা ঝুম চাষে অংশ গ্রহণ করে) স্থায়ী স্বত্ত্ব জন্মিতে পারে না, এবং এই সকল জমির উপর রাজস্ব নির্ধারণ করিবারও কোন উপায় থাকে না। এই জন্যই এমনকি দলপতিরাও জমি বা বনের উপর কোন ব্যক্তিগত অধিকার দাবি করে না।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা প্রভৃতি আদিবাসীরা এইভাবে অনুর্বর পার্বত্য জমিতে তুলার ফসল ফলাইয়া এবং সেই তুলা চট্টগ্রামের সমতল ভূমিতে লইয়া আসিয়া উহার বিনিময়ে চাউল, লবণ প্রভৃতি প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করিত।

 

শোষণ-পদ্ধতি

ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বিবরণ হইতে বুঝিতে পারা যায় যে, এই অঞ্চলের পার্বত্য আদিম অধিবাসীরা ছিল যাযাবর চরিত্রের মানুষ। ইংরেজ শাসনের পূর্বে এবং অব্যবহিত পরেও ইহাদের মধ্যে জমির উপর ব্যক্তিগত স্বত্ত্বের উদ্ভব হয় নাই। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব না। হইবার ফলে ইংরেজ শাসকগণ প্রথমে এই অঞ্চলের উপর তাহাদের প্রত্যক্ষ শোষণের জাল বিস্তার করিতে না পারিয়া পরোক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিল। পরোক্ষ ব্যবস্থাটি ছিল নিম্নরূপ:

ইজারাদারি ও কার্পাস-কর

ইংরেজ শাসকগণ বাহিরের কোন ব্যক্তির সহিত কার্পাস-র আদায়ের চুক্তি করিয়া তাহাকে পার্বত্য অঞ্চল ইজারা দিত। ইজারাদার বিভিন্ন কৌশলে এই সরল প্রকৃতির পার্বত্য অধিবাসীদের নিকট হইতে রাজস্বের নির্দিষ্ট পরিমাণ তুলা হইতে কয়েক গুন অধিক তুলা আদায় করিয়া আনিত এবং চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ তুলা শাসকদের নিকট জমা দিয়া বাকি তূলা আত্মসাৎ করিত। ইহার পর ঐ তুলা বাজারে বিক্রয় করিয়া প্রচুর মুনাফা লাভ করিত। অবশ্য ইজারাদার ইংরেজ প্রভুদের সম্মতি লইয়াই ইহা করিত। শাসকগণ রাজস্ব হিসাবে যে তুলা পাইত তাহা বিক্রয় করিয়া মুদ্রায় পরিণত করিবার জন্য অন্য কোন ব্যক্তির সহিত চুক্তি করিত। এই চুক্তিতে মুদ্রার পরিমাণ নির্দিষ্ট করা থাকিত। এই দ্বিতীয় ব্যক্তিটি শাসকগণের হস্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিয়া বাকি তুলা হইতে ফটকাবাজি দ্বারা (স্পেকুলেশন) প্রচুর মুনাফা লুণ্ঠন করিত।

 

এই ব্যবস্থার ফলে পার্বত্য অধিবাসীদের জীবিকা নির্বাহ অসম্ভব হইয়া উঠে। প্রথমত, প্রথম ইজারাদারটি তাহাদের নিকট হইতে রাজস্বের নামে প্রায় সমস্ত তূলাই লুটিয়া লইত । দ্বিতীয়ত, তাহার লুণ্ঠনের পর যে সামান্য পরিমাণ তূলা থাকিত তাহা চট্টগ্রামের সমতল ভূমিতে লইয়া গিয়া উহার বিনিময়ে বা উহার বিক্রয়লব্ধ অর্থে আদিবাসীদের পক্ষে খাদ্য প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করা দ্বিতীয় ব্যক্তিটির জন্য অসম্ভব হইয়া উঠিত। কারণ, সেই ব্যক্তি বিভিন্ন উপায়ে ঐ অবশিষ্ট তুলা নামমাত্র মূল্যে তাহার নিকট বিক্রয় করিতে আদিবাসীদের বাধ্য করিত। এই অঞ্চলের আদিবাসীরা সমান ওজনের দ্রব্যের বিনিময়ে সমান ওজনের দ্রব্য লইতে অভ্যস্ত ছিল। সুতরাং তুলার ব্যাপারী দুই টাকা মূল্যের এক মণ লবণের বিনিময়ে আট টাকা মূল্যের এক মণ তুলা আত্মসাৎ করিত। এইভাবে কোন একটি বা দুইটি দ্রব্য ক্রয় করিতেই আদিবাসীদের সমস্ত তুলা নিঃশেষ হইয়া যাইত। এই উভয়বিধ শোষণের ফলে এই আদিবাসীরা অনিবার্য মৃত্যুর মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। অবশেষে তাহারা আত্মরক্ষার শেষ উপায় হিসাবে বিদ্রোহের পন্থা অবলম্বন করিতে বাধ্য হইল।

 

প্রথম বিদ্রোহ (১৭৭৬-৭৭ )

প্রথম বিদ্রোহ: রেকর্ডে যা আছে

প্রথম চাকমা-বিদ্রোহ সম্পর্কে সরকারী রেকর্ডে কেবলমাত্র একখানি পত্রের উল্লেখ দেখা যায়। এই পত্র দ্বারা চট্টগ্রামের তৎকালীন কালেক্টর গভর্ণর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসকে এই বিদ্রোহের সংবাদ দিয়াছিলেন। এই পত্রে কালেক্টর সাহেব নিম্নোক্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন:

রামু খাঁ নামক এক পাহাড়িয়া তুলার চাষের জন্য কোম্পানিকে সামান্য রাজস্ব দেয়। আমার এই স্থানে আসিবার পর হইতে, ইজারাদারগণের দুর্ব্যবহারের জন্যই হউক, অথবা তাহার বিদ্রোহী চরিত্রের জন্যই হউক, রামু খাঁ কয়েক মাস যাবৎ কোম্পানির ইজারাদারগণের সহিত ভীষণ দাঙ্গাহাঙ্গামা চালাইতেছে। ……. রামু খাঁকে বন্দী করিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা চলিতেছে।”

“কিন্তু কালেক্টরের এই চেষ্টা সফল হয় নাই, কারণ রামু খাঁ তাঁহার বাসস্থান হইতে পলায়ন করিয়াছে৷  

 

পরবর্তী কালে এই অঞ্চলের শাসনকর্তা রূপে আসিয়া আলেকজান্দার ম্যাকেঞ্জি, ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইন, আর. এইচ. এস. হাচিন্সন প্রভৃতি উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারীগণ চাকমা জাতির এই বিদ্রোহ ও অন্যান্য বিদ্রোহ সম্পর্কে বহু তথ্য খুঁজিয়া বাহির করেন। ইহাদের মধ্যে ক্যাপ্টেন লুইন-এর বিবরণটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

১৭৭৬: প্রথম বিদ্রোহ

চিম্বুক পাহাড়ে জুমের ফসল
চিম্বুক পাহাড়ে জুমের ফসল

১৭৭৬ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যভাগে চাকমাগণ প্রথমবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন চাকমা-দলপতি ‘রাজা’ শের দৌলত ও তাঁহার সেনাপতি রনু খাঁ। ইহারা উভয়ে ছিলেন পরস্পরের আত্মীয়। রনু খাঁ সাধারণের নিকট ‘সেনাপতি’ বলিয়া পরিচিত ছিলেন। চাকমাদের উপর সেনাপতি রনু খাঁর অসাধারণ প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। ইংরেজ শাসকদের দ্বারা নিযুক্ত ইজারাদারগণের শোষণ-উৎপীড়ন সহ্যের সীমা অতিক্রম করিলে রনু ও শের দৌলত চাকমা জাতির সকল লোককে একত্র করিয়া ইজারাদারি ও ইংরেজ শাসনের মূলোচ্ছেদ করিবার জন্য প্রস্তুত হন। প্রথমে কার্পাস-কর দেওয়া বন্ধ হয় এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে ইজারাদারগণের তুলার গোলা লুণ্ঠিত হয়। রামু খাঁর নেতৃত্বে চাকমাগণ ইজারাদারদের বড় বড় ঘাঁটি ধ্বংস করিয়া ফেলে। রাঙ্গুনীয়া প্রভৃতি স্থানের বড় বড় গোলা লুণ্ঠন করিয়া সমস্ত তুলা বিদ্রোহীরা লইয়া যায়। ইজারাদার ও তাহার কর্মচারীগণ চাকমা অঞ্চল হইতে পলায়ন করে এবং বহু কর্মচারী চাকমাদের হস্তে নিহত হয়।

 

ইংরেজ শাসকগণ ইজারাদারের সাহায্যে অগ্রসর হয় এবং এই অঞ্চলের সামরিক অফিসারের নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল প্রেরণ করে। চাকমাগণ তাহাদের তীর-ধনুক ও বর্শা দ্বারা আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অসম্ভব বুঝিয়া গভীর পার্বত্য অঞ্চলে সরিয়া পড়ে। ইংরেজ বাহিনী বিদ্রোহীদের কোন সন্ধান না পাইয়া ফিরিয়া আসে। চাকমাগণ সুযোগ বুঝিয়া আবার অগ্রসর হয় এবং চট্টগ্রামের সমতল ভূমিতে নামিয়া আসিয়া ইজারাদারের ঘাঁটি ও ব্যাপারীদের দোকান প্রভৃতির উপর আক্রমণ চালাইতে থাকে। ইংরেজ বাহিনী আবার পাহাড় অঞ্চলে প্রবেশ করিয়া বিদ্রোহীদের পশ্চাদ্ধাবন করে। কিন্তু এবারেও বিদ্রোহীরা গভীর পার্বত্য অঞ্চলে অদৃশ্য হইয়া যায়।

অর্থনৈতিক অবরোধের কৌশল

এইভাবে বিদ্রোহী চাকমাদের দমন করা অসম্ভব বুঝিয়া শাসকগণ এক নতুন কৌশল অবলম্বন করে। চাকমাগণ সমতল ভূমির বিভিন্ন বাজারে আসিয়া তাহাদের উদ্বৃত্ত তুলার বিনিময়ে বাজার হইতে খাদ্য, লবণ প্রভৃতি সংগ্রহ করিত। 

 

শাসকগণ জানিত যে, চাকমাগণ তুলা বাজারে লইয়া আসিতে না পারিলে খাদ্য সংগ্রহ করিতে পারিবে না এবং খাদ্যাভাবে শেষ পর্যন্ত বশ্যতা স্বীকার করিতে বাধ্য হইবে। সুতরাং তাহারা সমতল ভূমির বিভিন্ন বাজারের পথে বহু স্থানে সৈন্যের পাহারা বসাইয়া চাকমাদের বাজারে আসা বন্ধ করিবার ব্যবস্থা করে। অবশেষে তাহাদের এই কৌশল সাফল্য লাভ করে, চাকমাগণ বশ্যতা স্বীকার করিতে বাধ্য হয়। রনু খাঁ ইংরেজ শাসকগণকে ৫০১ মণ তুলা বার্ষিক রাজস্ব স্বরূপ দিতে সম্মত হইয়াছিলেন ।

 

এই প্রথম চাকমা-বিদ্রোহ ও উহার প্রধান নায়ক রনু খাঁর নাম এখনও চাকমা জাতির স্মৃতি হইতে মুছিয়া যায় নাই, এখনও চাকমাগণ এই বিদ্রোহ ও রামু খাঁর কাহিনী গর্বের সহিত স্মরণ

করে৷ 

 

দ্বিতীয় বিদ্রোহ (১৭৮২)

১৭৮২: জানবক্স খাঁর নেতৃত্বে

প্রথম বিদ্রোহের পর হইতে রামু খাঁর আর কোন উল্লেখ দেখা যায় না। ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দে চাকমা-দলপতি শের দৌলত খাঁর মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র জানবকস খাঁ ‘রাজা’ (দলপতি) নির্বাচিত হন। “জানবক্‌স খাঁ জমিদার বলিয়া নিজের পরিচয় দিলেও তিনি বহুকাল পর্যন্ত স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া চলিয়াছিলেন। 

জানবক্স খাঁ দলপতি হইয়া চাকমা অঞ্চলে ইজারাদারগণের প্রবেশ বন্ধ করিয়া দেন। ১৭৮৩ হইতে ১৭৮৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত কোন ইজারাদারই এই অঞ্চলে প্রবেশ করিতে বা রাজস্ব আদায় করিতে পারে নাই। সেই হেতু ইংরেজ প্রভুরা ইজারাদারগণের উপর সদয় হইয়া ১৭৮৩, ১৭৮৪ এবং ১৭৮৫ খ্রীষ্টাব্দে তাহাদের খাজনা মকুব করিয়াছিলেন।

 

জানবক্‌স খাঁর সময় ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দে চাকমাগণ আবার বিদ্রোহী হইয়াছিল। এই বিদ্রোহের কারণ স্বরূপ ক্যাপ্টেন লুইন লিখিয়াছেন।

“ইজারাদারগণ এই উপজাতির উপর ভীষণ অত্যাচার করিত। তাহার ফলে বহু চাকমা নিকটবর্তী আরাকান অঞ্চলেও পলায়ন করিয়াছিল। চাকমাগণ জানবক্স-এর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। কিন্তু স্থানীয় শাসকগণ পূর্বের মত অর্থনৈতিক অবরোধের দ্বারা আবার তাহাদের বশ্যতা স্বীকার করিতে বাধ্য করে।”

এই বিদ্রোহের সময়েও ইংরেজ বাহিনী চাকমাদের দমন করিতে পাহাড় অঞ্চলে প্রবেশ করিয়াছিল। কিন্তু জানবক্‌স ও সকল চাকমা গভীর পার্বত্য অঞ্চলে পলায়ন করিয়া এই অভিযান ব্যর্থ করিয়া দেয়।

 

তৃতীয় ও চতুর্থ বিদ্রোহ (১৭৮৪-৮৭) 

১৭৮৪: শেষ বিদ্রোহ

জানবক্স খাঁর নেতৃত্বে চাকমাগণ আবার বিদ্রোহ করে ১৭৮৪ খ্রীষ্টাব্দে । এই বিদ্রোহ দীর্ঘকাল ধরিয়া চলিয়াছিল। জানবক্‌স অবশেষে ১৭৮৭ খ্রীষ্টাব্দে বশ্যতা স্বীকার করেন। হাচিন্সনের বিবরণে দেখা যায়, ১৭৮৭ খ্রীষ্টাব্দেই আর একজন শের দৌলত খাঁর নেতৃত্বে চাকমাদের আর একটি বিদ্রোহ ঘটিয়াছিল। ইহাকে হাচিলন দ্বিতীয় শের দৌলত খাঁ নামে অভিহিত করিয়াছেন । ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় শের দৌলত খাঁ বশ্যতা স্বীকার করেন। 

বিদ্রোহের পরিণাম

ইংরেজ শাসক, ইজারাদার ও স্থানীয় ভূম্যধিকারিগণের সৃষ্ট অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে চাকমাগণ কোন কোন সময় আপস করিলেও যতদিন পর্যন্ত এই অঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের জন্য ইজারা প্রথা বলবৎ ছিল, ততদিন, অর্থাৎ ১৭৭৬ হইতে ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত চাকমা-বিদ্রোহ চলিয়াছিল। বিদ্রোহ-কালে চাকমাগণ যে পদ্ধতিতে উন্নত অস্ত্র সজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর সহিত যুদ্ধ পরিচালনা করিয়াছিল, তাহা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সেই যুদ্ধ ছিল একালের গেরিলা যুদ্ধেরই অনুরূপ: ইংরেজ বাহিনী চাকমা অঞ্চলে প্রবেশ করিবামাত্র তাহারা সম্মুখ যুদ্ধে বাধা দিবার চেষ্টা না করিয়া স্ত্রীপুত্র ও অস্থাবর সম্পত্তিসহ গভীর পার্বত্য অঞ্চলে পলায়ন করিত এবং এইভাবে ইংরেজ বাহিনীকে গভীর পার্বত্য অঞ্চলে টানিয়া লইয়া যাইত । ইংরেজ সৈন্যগণ চাকমাদের গ্রাম, বাড়ীঘর, ক্ষেতের শস্য সমস্ত কিছু জ্বালাইয়া দিতে দিতে অগ্রসর হইত। এইরূপে বহু দূর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াও যখন ইংরেজ বাহিনী বিদ্রোহীদের সন্ধান পাইত না, তখন তাহারা ফিরিতে আরম্ভ করিবামাত্র বিদ্রোহীদের আক্রমণ আরম্ভ হইত। চাকমাগণ বড় বড় গাছ কাটিয়া পার্বত্য পথগুলি বন্ধ করিয়া, পর্বত-গহ্বরের মুখে ফাঁদ পাতিয়া ও পানীয় জল নষ্ট করিয়া দিয়া ইংরেজ বাহিনীকে অবরুদ্ধ করিয়া ফেলিত। তাহার পর তাহারা গোপন স্থান হইতে বিষাক্ত তীর বৃষ্টি করিয়া দলে দলে ইংরেজ সৈন্য সংহার করিত। ১৭৭৬ হইতে ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই চৌদ্দ বৎসরে কত ইংরেজ সৈন্য ও ভারতীয় সিপাহী যে বিদ্রোহী চাকমাদের বিষাক্ত তীরে প্রাণ দিয়াছে, কত সৈন্য ফাঁদ পাতা পর্বত-গহ্বরে পড়িয়া এবং পানীয় জলের অভাবে পিপাসায় ছটফট করিয়া মরিয়াছে তাহার হিসাব নাই। ইংরেজ শাসকগণ অস্ত্রের জোরে বিদ্রোহী চাকমাদের পরাজিত করিতে সক্ষম হয় নাই। পার্বত্য অঞ্চলে খাদ্যের অভাবে এবং অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে, অর্থাৎ সমতল ভূমির হাট-বাজারে আসিয়া তুলার বদলে খাদ্য সংগ্রহ করিতে না পারিয়াই তাহারা শেষ পর্যন্ত বশ্যতা স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল। 

 

কিন্তু এই অঞ্চল হইতে ইজারাদারের মারফত রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা যতদিন বর্তমান ছিল ততদিন স্থায়ী শাস্তি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয় নাই। ইজারা প্রথার অবসান করিয়াই ইংরেজগণ এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হইয়াছিল। চাকমাগণ বার বার বিদ্রোহ করিবার ফলে ইংরেজ শাসকদের টনক নড়িয়া উঠে। তাহারা বুঝিতে পারে যে, তাহাদের এবং ইজারাদারদের অবাধ শোষণ ও বর্বরসুলভ উৎপীড়নই চাকমা-বিদ্রোহের কারণ, এবং যতদিন এই ইজারা প্রথার অবসান না হয় ততদিন চাকমাগণ শান্ত হইবে না। ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গীয় সরকারের প্রধান বাণিজ্যকর্তা হ্যারিস সাহেব সমস্ত বিষয় অনুসন্ধান করিয়া ‘রেভিনিউ বোর্ড’-এর নিকট সুপারিশ করেন যে, ইজারাদারের হস্তে ন্যস্ত পার্বত্য অঞ্চলের কার্পাসের একচেটিয়া বাণিজ্য প্রথা রহিত করিয়া সরাসরি ঝুমিয়াদের বা চাকমা দলপতির সহিত বন্দোবস্ত করা উচিত। এই প্রস্তাব অনুসারে ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসে ইংরেজ শাসকগণ স্থির করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইজারা প্রথা রহিত করা হইবে এবং কার্পাস-কর তুলিয়া দিয়া ঝুমিয়াদের বা চাকমা সর্দারগণের সহিত পরিমিত জমা (টাকা) ধার্য করা হইবে। ইহা ব্যতীত আশ্বাস দেওয়া হইল যে, এই কর নিয়মিতভাবে কালেক্টরের নিকট জমা দিলে উহা আর বৃদ্ধি করা হইবে না।” কিন্তু শাসকগণ এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নাই। এই সময় আরও স্থির করা হইয়াছিল যে, চাকমাদের নিকট হইতে কর স্বরূপ তুলা আদায় করিবার নিমিত্ত সরকারের পক্ষ হইতে একজন কর্মচারী নিযুক্ত করা হইবে। এই কর্মচারীই কর বাবদ দেয় সমস্ত তুলা আদায় করিয়া পরে তাহা নিলামে বিক্রয় করিবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহা করা হইত না, সমুদয় তুলা ঢাকাস্থিত কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে চালান দেওয়া হইত।” রামু খাঁর সময় হইতে রাজস্ব হিসাবে ৫০১ মণ তুলা ধার্য হইয়াছিল । রামু খাঁর মৃত্যুর পর ৫০১ মণ তুলার পরিবর্তে ১৮১৫ টাকা ধার্য হয়। ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে ৫০১ মণ তুলার মূল্য আরও বর্ধিত করিয়া তা ২২২৪৷৷৪ পাই নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হয়। পরে আপসের শর্তানুসারে চাকমা সর্দারগণই এই রাজস্ব সংগ্রহ করিয়া কালেক্টরের অফিসে জমা দিত৷ 

 

চাকমা জাতির জীবনধারা – সুপ্রকাশ রায়

 

প্রকাশনায়- ইউথ ভয়েস

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
[DISPLAY_ULTIMATE_SOCIAL_ICONS]

আরও কিছু লেখা